Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষের পটভূমি

বিশ্বনাথ উদিত

 

 

অটোমান সাম্রাজ্যের বিভাজনের বর্তমান রূপ মোটামুটি স্থির হয়ে যায় ১৯২২ সালের নাগাদ। কিন্তু ইহুদিদের জাতীয় স্বভূমির সমস্যা ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলতে থাকে, কখনও লেলিহান অগ্নিশিখা হয়ে প্রকাশ পায়। ত্রিশের দশকে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিদের হাতে ইহুদিনিধন ও বিতাড়নের ফলে প্যালেস্তাইনে অভিবাসনের ঢল নামে, যার বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আকার দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নবগঠিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৯৪৭ সালে বর্তমান প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েলের বিভাজন সম্পন্ন করে। কিন্তু অশান্তি সম্পূর্ণ আরব দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি সে গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র মুসলমান জগতেই অস্থিরতা সৃষ্টি করে

 

ইজরায়েলের পত্তন, মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক মানচিত্রের নির্মাণ এবং আরব–ইজরায়েল যুদ্ধের পটভূমি ডেভিড ফ্রমকিনের A Peace to End All Peace বইটিতে অত্যন্ত বিশদভাবে ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। অনেকেই এই বইটিকে এ-বিষয়ের ‘বাইবেল’ বলে মনে করেন। মূলত এই বইটিকে অবলম্বন করেই বর্তমান প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের দেশগুলোর কাছে অনেকটাই অজানা ছিল এবং তাদের আগ্রহের বৃত্তেরও বাইরে অবস্থান করত। অটোমান সুলতান কনস্টানটিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল, তুরস্ক) থেকে আরব ভূখণ্ড শাসন করত। এই শাসনব্যবস্থা ছিল অদক্ষ, অসৎ ও অনুজ্জীবিত। বস্তুত, বড় শহরগুলোর বাইরে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীগুলিই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করত।

বিশ্ব-মানবসভ্যতার আদি প্রাণকেন্দ্র মেসোপটেমিয়া (মূলত বর্তমান ইরাক)— যে অঞ্চল থেকে প্রসারিত হয়ে জুদিয়া, ব্যবিলনিয়া ও অসিরিয়া, সুমের ও অক্কাদ সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল— সে সব সভ্যতা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষে উসমানীয় মধ্যপ্রাচ্য জেগে ছিল এক অলস, মন্থর এবং মূলত মুসলমান জনজাতি-অধ্যুষিত ভূখণ্ড হিসেবে। ধর্ম ও বিশ্বাসই ছিল সামাজিক জীবনের প্রধান ভিত্তি।

বিস্তীর্ণ মরুভূমি-সম্বলিত আরব অঞ্চলে তখনও তেলের প্রাচুর্য আবিষ্কৃত হয়নি; বস্তুত অর্থনৈতিক বিকাশে তেলের ভূমিকা তখনও সঠিকভাবে অনুভূত হয়নি। সেই সময় বিশ্বের অমিত শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটেন এই অঞ্চলের ওপর নজর রাখত মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী রুশ সাম্রাজ্যের প্রভাব থেকে একে মুক্ত রাখার তাগিদে, যাতে ভারতীয় উপমহাদেশে রুশ প্রভাব বিস্তার না ঘটে।

উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লবের অভিঘাতে জার্মানি তুরস্কের সঙ্গে রেল-যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, প্রাথমিকভাবে বাণিজ্য বিস্তারের স্বার্থে। যদিও পরবর্তীকালে ব্রিটেনের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হলে এই স্থলযোগাযোগের সামরিক গুরুত্ব হয়ে ওঠে অপরিসীম। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডন বা ইজরায়েল তখনও রাষ্ট্র হিসেবে আধুনিক মানচিত্রে স্থান পায়নি। পারস্যে ছিল শাহের রাজত্ব (আংশিকভাবে রুশ-প্রভাবিত), আর মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে ছিল উসমানীয় (বা অটোমান) সুলতানের শাসন। উপকূলীয় অঞ্চলে স্পষ্ট ছিল ব্রিটিশ প্রভাব।

শিল্পবিপ্লব তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। জার্মানি দ্রুত ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তুলনায় ব্রিটেন অন্যান্য রাষ্ট্রের দ্রুত উন্নতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানজনিত স্থল-যোগাযোগের অসুবিধার কারণে ক্রমশ তার প্রাধান্য হারাতে থাকে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে (১৮৮০-৮৫) ব্রিটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা ও অটোমান শাসনের স্বৈরাচারী খামখেয়ালিপনায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে অটোমান রাজত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। এই শূন্যস্থানেই ধীরে ধীরে জার্মানি প্রবেশ করে। পরবর্তী তিন দশকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে তুলনামূলক ক্ষমতার এক নতুন বিন্যাস গড়ে ওঠে। জারের সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে, কিন্তু জার্মান সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ব্রিটেনকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তোলে।

অন্যদিকে অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠে। সেই সময় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা যেন প্রায় স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত হত।

বিশ শতকের গোড়ায় ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টানটিনোপলে সমাজব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল। বহু প্রজন্ম ধরে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অংশের মানুষ এখানে বসবাস করলেও তারা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়নি। তুরস্কের মানুষ মূলত তুর্কি ভাষাভাষী মুসলমান হলেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। সাম্রাজ্যের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে আরবি ভাষার নানা রূপ প্রচলিত ছিল। প্যালেস্তাইনে বহু যুগ ধরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদির বাস ছিল।[1] মুসলমানদের মধ্যেও নানা সম্প্রদায়গত বিভাজন বিদ্যমান ছিল, যদিও সুন্নি সম্প্রদায়ই ছিল প্রধান। তারা অটোমান সুলতানকে মহম্মদের উত্তরসূরি তথা খলিফা হিসেবে মর্যাদা দিত, যদিও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সে বিশ্বাস বা আনুগত্য সর্বত্র ছিল না।

এই সময়ের সুলতান আবদুল হামিদ ছিলেন স্বৈরাচারী, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় অপটু। তাঁর শাসনামলের অত্যাচার ও সামগ্রিক ব্যর্থতা থেকেই তরুণ তুর্কি বিদ্রোহের জন্ম হয়। এর সূচনা ঘটে ১৯০৮ সালে সালনিকায় (বর্তমানে গ্রিসের অংশ), যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে কনস্টানটিনোপলে বিপ্লবের রূপ নেয়। এর ফলেই তরুণ তুর্কিরা ক্ষমতায় আসে। তাদের মধ্যে ইহুদিদের প্রভাব কিছুটা থাকলেও ব্রিটেন তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। বরং এই প্রভাবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ইহুদি স্বভূমি প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়।

এই স্বভূমির আশ্বাস বাইবেলে বর্ণিত আছে, এবং তা ইহুদিদের এক গভীর মনোগত বাসনা ছিল। প্রতি বছর বড় ধর্মীয় উৎসব পাসওভার (Passover) পালনের শেষ পর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী ইহুদিরা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করত— “আগামী বছর জেরুজালেমে।”

ব্রিটেনের অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাও ইহুদিদের একটি স্বভূমির ধারণাকে কাম্য মনে করতেন। এই মনোভাবের পেছনে ধর্মীয় ও মানবিক কারণের পাশাপাশি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থও ছিল। ব্রিটেন তখন ইজিপ্ট ও বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী আরব ভূখণ্ড শাসন করত। এই নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারিত করে যদি প্যালেস্তাইনকে অন্তর্ভুক্ত করা যেত, তবে রাজনৈতিক লাভের পাশাপাশি কৌশলগত সামরিক স্বার্থও সুরক্ষিত হত। সেই লক্ষ্য পূরণের একটি উপায় হিসেবে প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের বসতি স্থাপন করে তাদের একটি বন্ধুরাষ্ট্রে পরিণত করা গেলে ব্রিটেনের দিক থেকে সবদিকই রক্ষা পেত।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এই বিষয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিকদের মধ্যে মতভেদ ছিল। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায় ইহুদিরা রাশিয়ায় নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হচ্ছিল। এর ফলে তারা রাশিয়া ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং এমনকি জেরুজালেমের আশপাশে এসে বসবাস করছিল। যদিও অটোমান সুলতান প্যালেস্তাইনকে ইহুদিদের স্বীকৃত বাসভূমি হিসেবে মান্যতা দিতে আগ্রহী ছিলেন না।

১৯১৪ সালে অটোমান সাম্রাজ্য ছিল শিথিলভাবে সংযুক্ত, পশ্চাৎপদ এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির কাছে আংশিকভাবে সমর্পিত। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়ায় ফরাসিদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল; তারা সেখানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল এবং নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকারও অর্জন করেছিল। তরুণ তুর্কিরা সদ্য ক্ষমতায় এসে এই সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তনে আগ্রহী হয়। কিন্তু সে সময় তারা উত্তরের প্রতিবেশী বলকান দেশগুলির চাপে পর্যুদস্ত ছিল— যে অঞ্চলগুলো একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বলকান যুদ্ধের পর সেখান থেকে পিছু হটতে তারা বাধ্য হয়। পাশাপাশি অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির আগ্রাসনের আশঙ্কাও তাদের তাড়িত করছিল। বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যোগ দেয় এবং মিত্রশক্তির— মূলত ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার— সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি একজন বলশেভিক ইহুদি বিপ্লবীর[2] সঙ্গে তরুণ তুর্কিদের যোগাযোগও ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।

ইহুদিদের অনেকেই বলশেভিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা জারতন্ত্রকে ঘৃণা করত, আর জারের লক্ষ্য ছিল কনস্টানটিনোপল দখল করা। সেই কারণে কনস্টানটিনোপলের প্রতি ইহুদিদের এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব গড়ে ওঠে— যদিও পরবর্তীকালে স্বভূমির প্রশ্নে তুর্কিদের সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়।

অনভিজ্ঞ ও আবেগপ্রবণ তরুণ তুর্কি নেতাদের অপরিকল্পিত ও দুঃসাহসী যুদ্ধযাত্রায় একদিকে রুশ শক্তি এবং অন্যদিকে ইজিপ্টে অবস্থানরত ব্রিটিশ বাহিনীকে নাড়া দিতে গিয়ে ১৯১৫ সালের গোড়ায় অটোমান সাম্রাজ্য বিপুল শক্তিক্ষয়ের সম্মুখীন হয় এবং কিছুটা হীনবল হয়ে পড়ে।

এদিকে কুশলী ব্রিটেন আরব ও তুর্কিদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যের ভিতরে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে থাকে। এই উদ্দেশ্যে তারা মক্কা ও মদিনার অবস্থানজনিত ধর্মীয় ভাবাবেগকে গুরুত্ব দিয়ে সুলতানের পরিবর্তে হিজাজের এমির হুসেইনকে খলিফার মর্যাদার উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ-ভারত এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। উসমানীয় সুলতানের প্রভাব খর্ব করার এমন উদ্যোগের ফলে ভারতীয় সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে— এই আশঙ্কাই ছিল তাদের মূল কারণ। কারণ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশই তখন সুন্নি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত ছিল।

সেই সময়ের অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে ব্রিটেন সম্পূর্ণভাবে অবহিত ছিল না। ফলে যুদ্ধপরিকল্পনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ছিল অনেকটাই। রেললাইন স্থাপনের ফলে জার্মানি যখন স্থলযোগাযোগে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যায়, তখন ব্রিটেনের প্রধান ভরসা ছিল ইজিপ্টে অবস্থিত তাদের সাম্রাজ্য থেকে সুয়েজ হয়ে জলপথ। এই জলপথ সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই প্যালেস্তাইনের ওপর প্রভাব বজায় রাখার গুরুত্ব ছিল বিশেষ। এরপর ডারদানেলস প্রণালী পেরিয়ে জলপথেই কনস্টানটিনোপলে পৌঁছনোর পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু বিস্তীর্ণ আরব ভূখণ্ডে পৌঁছনোর প্রধান উপায় ছিল মূলত অনির্মিত স্থলপথ— অর্থাৎ উটের পিঠে চড়ে যাতায়াত, যা বহিঃশক্তির পক্ষে এই অজানা ভূখণ্ডে অত্যন্ত দুরূহ ছিল। এই পরিস্থিতিতে হিজাজের শাসক হুসেইনকে খলিফা করার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর সহায়তা গ্রহণ করে তুরস্ক থেকে আরব ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে সেখানে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টায় ব্রিটেন রত থাকে।

কাজটি ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে যেমন কোনও মুসলমান সম্প্রদায় খ্রিস্টান শাসন মেনে নেবে না, তেমনি ব্রিটেনের মিত্র ফ্রান্স ও রাশিয়া— অন্তর্দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও— অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের দিকে নজর রাখছিল। তাদের স্বার্থও সমানভাবে রক্ষা করতে হত। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আরব ভূখণ্ড কীভাবে ভাগ হবে এবং কে কোথায় প্রভাব বিস্তার করবে— সে ছিল এক জটিল কূটনৈতিক অঙ্ক।

ইংরেজদের প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডকে ইহুদিদের বাসভূমি করার পরিকল্পনায় রাশিয়ার সমর্থন ছিল না। ইহুদিদের প্রতি রাশিয়া আদৌ সদয় ছিল না; সে দেশে বিপুল সংখ্যক ইহুদির বসবাস থাকলেও তারা নিজেদের মহল্লা বা ঘেটোর মধ্যে গুটিয়ে থাকতে বাধ্য ছিল। সাধারণ নাগরিক-স্বাধীনতা তাদের ছিল না, এবং ইহুদিনিধন সেখানে প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।

রাশিয়ার বাইরেও ইউরোপজুড়ে ইহুদিরা ছড়িয়ে ছিল। অনেকেই মনে করত, ইহুদিরা সারা বিশ্বে এক ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে— তারা উদ্যোগী, বুদ্ধিমান, তাই যথেষ্ট শক্তিশালী এবং বিদ্রোহের জন্ম দিতে সক্ষম। অন্যদিকে, বিদ্বেষ ও অত্যাচারের শিকার বহু ইহুদির স্বপ্ন ছিল নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য বাইবেলে আশ্বাসপ্রাপ্ত এক স্বভূমির। ব্রিটেন সেই আকাঙ্ক্ষাকেই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে তাদের মিত্র হিসেবে পেতে চাইছিল।

তবে এ-প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীর সর্বত্র ইহুদিরা যে নিপীড়িত ছিল তা নয়। বহু দেশেই তারা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সমাজে মিশে গিয়েছিল এবং শিক্ষা, সম্পদ ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল।

বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেনের ধারণা ছিল যে তারা সহজেই তুরস্ক দখল করতে পারবে। সে-ক্ষেত্রে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্য ভাগ করে নেওয়াও সম্ভব হবে। এমনকি যুদ্ধ চলাকালেই এই ভাগ-বাটোয়ারার রূপরেখা ঠিক করতে তারা নিজেদের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি— সাইকেস-পাইকো চুক্তি— সম্পাদন করে ফেলে। তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে মিত্রশক্তির উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণরূপে সাম্রাজ্যবাদী, যা আমেরিকা মোটেই সমর্থন করেনি। অথচ যুদ্ধের রসদ ও আর্থিক সংস্থানের জন্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স ক্রমশই আমেরিকার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল।

তুরস্কের শক্তিকে খাটো করে দেখে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জলপথে কনস্টানটিনোপল দখলের উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক অগ্রগতির পর গালিপোলিতে (ডারদানেলস প্রণালী) দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তারা শেষ পর্যন্ত ১৯১৬ সালে পর্যুদস্ত হয়। এই পরাজয়ের ধাক্কায় দুই দেশেই তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং তার ফলস্বরূপ সরকার পরিবর্তন ঘটে। অন্যদিকে তুরস্কও সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে প্রায় নিঃশেষিত হয়ে পড়ে। এই সময় রাশিয়া আর্মেনিয়া রণাঙ্গনে তুরস্ককে পরাজিত করে কনস্টানটিনোপলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

কিন্তু রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ক্রমশ জারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। খাদ্যসংকট, বাজারে অগ্নিমূল্য এবং সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা জারের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের জন্ম দেয়। এর প্রভাব পড়ে দক্ষিণ সীমান্তে যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর মনোবলে— তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেনারা নিরুদ্যম ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে তুরস্ক রক্ষা পায় এবং নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সময় পায়।

১৯১৭ সালের মার্চ মাসে জার ক্ষমতা ছেড়ে দেন, যার ফলে এক অপ্রত্যাশিত শূন্যতার সৃষ্টি হয়। রাজতন্ত্রের অবসানে সাময়িকভাবে বিভিন্ন দলের জোটে একটি প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়, কিন্তু সেই সরকারও দেশের সম্মানরক্ষার যুক্তিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

লেনিন তখন জুরিখে নির্বাসনে ছিলেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বলশেভিক সহযোদ্ধার সঙ্গে। তাঁর ভাবনা ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র; এমনকি বলশেভিক বিপ্লবীরাও সবসময় তাঁর চিন্তার নাগাল পেতেন না। তিনি জারের যুদ্ধনীতির কট্টর বিরোধী ছিলেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, সাম্রাজ্যবাদ ছিল পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর, এবং সেখান থেকেই সমাজতন্ত্রের জন্ম অনিবার্য। সমগ্র ইউরোপজুড়ে বামপন্থী বিপ্লবীদের মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তুলে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন জোরদার করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই সময়ের দাবি— এই ছিল কঠোরভাষী ও দৃঢ়চেতা লেনিনের অবস্থান।

যদিও সেই সময় বহু বিপ্লবীই যুদ্ধে নিজের দেশের জয়লাভকে কাম্য মনে করতেন, লেনিন এমন দেশপ্রেমকে মেকি বলে মনে করতেন এবং সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার বৈপ্লবিক চিন্তার পরিপন্থী বলে অভিহিত করতেন। লেনিনের এই মনোভাব বুঝতেন প্রাক্তন বলশেভিক ইহুদি নেতা ও জারের শত্রু হেল্পম্যান (ওরফে পারভুস), যাঁর কথা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। হেল্পম্যানের যোগাযোগ ছিল তরুণ তুর্কিদের সঙ্গে এবং সেই সূত্রে জার্মান সরকারের সঙ্গেও। তিনি জার্মানদের বোঝাতে সমর্থ হন যে লেনিনকে রাশিয়ায় ফিরিয়ে আনতে পারলে সে দেশকে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ফলে জার্মান সরকার একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে লেনিন ও তাঁর কমরেডদের দেশে ফিরে যেতে সাহায্য করে।

লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সাত মাস পর ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় এসেই লেনিন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ থেকে সরে আসার উদ্যোগ শুরু করেন, এবং জারের পতনের এক বছরের মাথায় রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসে। এটি ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে এক বড় ধাক্কা, কারণ এর ফলে জার্মানি পূর্ব ফ্রন্ট থেকে সেনা সরিয়ে পশ্চিম ফ্রন্টে শক্তি নিয়োগের সুযোগ পায়।

তিন বছর যুদ্ধের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স ক্রমশ আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তারা আমেরিকাকে যুদ্ধে মিত্রপক্ষে যোগ দিতে আহ্বান জানায়। বিচক্ষণ প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসন প্রাথমিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আদৌ আগ্রহী ছিলেন না। তিনি সাম্রাজ্যবাদী ভাবনার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা ধরনের শর্ত আরোপের কথা ভাবতে শুরু করেন।

দৃঢ়চেতা ও কৌশলী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ অবশ্য যুদ্ধজয়ের বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। অপরদিকে যুদ্ধের প্রাথমিক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে জার্মানিও নিজেদের বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তারা আমেরিকাকে কার্যত বিরোধী পক্ষ ধরে নিয়ে সাবমেরিন হামলায় তাদের তিনটি বাণিজ্য জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এই ঘটনায় আমেরিকার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে এবং দ্বিধা কাটিয়ে তারা মিত্রপক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়।

ব্রিটেনের কাছে সাম্রাজ্যরক্ষার স্বার্থে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে ইজিপ্ট হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের স্থলপথে ভারত পর্যন্ত যোগাযোগ নির্বিঘ্ন রাখা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথে প্যালেস্তাইনকে একটি স্থলসেতু হিসেবে গণ্য করা হত। ফলে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সঙ্গে ইহুদিদের প্রতি ব্রিটেনের সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাব কার্যত সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাইবেলের প্রতি আনুগত্য ব্রিটেনের বহু নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ইহুদিদের জাতীয় স্বভূমির ধারণার প্রতি সহানুভূতির একটি বড় কারণ ছিল। আমেরিকাতেও এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু ইহুদিদের জাতিসত্তা যেহেতু কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ছিল না, তাই বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের মধ্যে এই প্রশ্নে দ্বিধা ছিল নানা মাত্রায়। অনেক ইহুদি বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজে মিশে গিয়ে অত্যন্ত সফল, এমনকি প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছিলেন। একটি পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে— এই আশঙ্কা তাঁদের অনেককেই চিন্তিত করেছিল। বিশেষ করে মিত্রশক্তির বিরোধী দেশগুলিতে বসবাসকারী ইহুদিদের ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। আবার রাশিয়ায় ইহুদিরা নির্যাতনের শিকার হলেও, জার যেহেতু মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাই সেখানকার বহু ইহুদি ব্রিটেনের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল ছিলেন না।

যুদ্ধকালীন পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবে এই জটিল পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯১৭ সালের শেষভাগে ইহুদি জাতীয় স্বভূমি স্থাপনের অঙ্গীকার ঘোষণা করেন— যা ইতিহাসে ব্যালফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসনও এই অঙ্গীকারের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ব্রিটেন চাইছিল এই ঘোষণাটি সারা বিশ্বের ইহুদিদের মধ্যে প্রচার পাক, যাতে যুদ্ধে তাদের সমর্থন আদায় করা যায়।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই বলশেভিকরা রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করে এবং বিশ্ব-রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। বহু ইহুদির মধ্যে বলশেভিক প্রভাব থাকায় অনেক দেশেই— বিশেষত ফ্রান্সে— ইহুদিদের প্রতি অবিশ্বাস ও বিমুখতা আরও বৃদ্ধি পায়।

ইতিমধ্যে ব্রিটিশ ফৌজ জেরুজালেমে প্রবেশ করে এবং ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বাগদাদ দখল করে— মূলত ভারতীয় মুসলমান সেনাদের সক্রিয় সহায়তায়, যাতে খ্রিস্টান-বিরোধী আবেগ প্রশমিত রাখা যায়। এরপর শুরু হয় প্যালেস্তাইন দখলের লড়াই; বছরের শেষ নাগাদ প্যালেস্তাইনও ব্রিটিশদের দখলে আসে। প্যালেস্তাইনে তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদির বসবাস ছিল। যুদ্ধকালে তাদের একটি বড় অংশ তুর্কি বাহিনীর হাতে নিহত হয়। ব্রিটিশ ফৌজের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল দামাস্কাস— বিশ্বের প্রাচীনতম নিরবচ্ছিন্ন মানববসতিগুলির অন্যতম একটি শহর।

কিন্তু রাশিয়া যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ায় জার্মানি পশ্চিম ফ্রন্টে অতিরিক্ত শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হয়। ফলে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেয় এবং ব্রিটিশ বাহিনীর একটি বড় অংশকে এশিয়া থেকে সরিয়ে সেখানে পাঠাতে বাধ্য হতে হয়। তবু হিজাজের রাজপুত্র ফয়সাল তাঁর আরব বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় সিরিয়ার উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। এদিকে রাশিয়া যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ককেশাসে অবস্থানরত রুশ সেনাবাহিনী বিভ্রান্ত ও নিরুদ্যম হয়ে ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে দেশে ফিরে যেতে থাকে। সেই সুযোগে দক্ষিণে পরাজিত তুর্কি বাহিনীর একটি অংশ উত্তর-পূর্ব দিকে, অর্থাৎ ককেশাসের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ও আজারবাইজান।

উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তেলের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধ হয়, বিশেষ করে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে। মোটরগাড়ির ব্যবহার, হঠাৎ করে পরিবহনের অতিরিক্ত চাহিদা, জাহাজ ও যুদ্ধবিমানের ব্যাপক প্রয়োগ— এই সবকিছুই তেলের উপর নির্ভরশীল। আজারবাইজানের বাকু অঞ্চলে বৃহৎ তেলক্ষেত্র থাকায় সেদিকেই প্রধান শক্তিগুলির নজর যায়। জার্মানিও এই সুযোগে বাকু দখলের চেষ্টা করে।

কিন্তু পশ্চিম সীমান্তে প্রবল যুদ্ধে জার্মানি পিছু হটতে বাধ্য হয়। একই সময়ে বুলগেরিয়া ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে তুরস্কের সঙ্গে জার্মানির স্থলযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে তুরস্কের যুদ্ধরসদের জোগান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। চারদিক থেকে প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়তে দেখে ১৯১৮ সালের অক্টোবরের শেষে তুরস্ক ব্রিটিশদের শর্তে যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। অনেক তুর্কি নেতা দেশ ছেড়ে জার্মানিতে পালিয়ে যান, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই জার্মানিও কার্যত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। শক্তি ও যুদ্ধকৌশল প্রদর্শনের এই খেলা শেষ হয় লক্ষ লক্ষ সৈন্য ও সাধারণ মানুষের প্রাণনাশের মধ্য দিয়ে। বিস্তীর্ণ অটোমান সাম্রাজ্য নেতৃত্বহীন হয়ে কার্যত ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে এবং বাস্তবে তা ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে যায়। তুর্কি সুলতান ও ফয়সাল উভয়েই তখন ব্রিটেনের আজ্ঞাবাহী। এরপর শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির গুছিয়ে নেওয়ার খেলা।

ব্রিটেন যুদ্ধে সহযোগিতা আদায় করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নানারকম ভাগ-বাটোয়ারার আপত্কালীন চুক্তি ও আশ্বাসে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেছিল; আর অপরদিকে আমেরিকার আদর্শবাদী প্রেসিডেন্ট উইলসন ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী দেওয়া-নেওয়ার বিরোধী। এরপর শুরু হয় মিত্রশক্তির ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের দীর্ঘ আলোচনা— মিত্রদের মধ্যে তীব্র বিতণ্ডা, বিশ্বাসভঙ্গ, অসুস্থতা, পদত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত জোটের ভেতর গভীর বিভাজন। অপরদিকে পরাজিত শক্তিগুলিও নতুন করে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পাওয়া ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করে— বিশেষত কামাল আতাতুর্কের উত্থানের মধ্যে দিয়ে।

যুদ্ধের শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ড তুর্কি শাসন থেকে মুক্ত হয়। ব্রিটেনের দখলে আসে ইরাক, যা অটোমান সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয় (এর আগে এই ভূখণ্ড মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিত ছিল)। স্থানীয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিরোধিতা প্রশমিত রাখার কৌশল হিসেবে ভারতীয় মুসলমান সেনা সাময়িকভাবে এই অঞ্চলের দখল নেয়; পরে ব্রিটিশরা সেখানে ফয়সালকে ক্ষমতায় বসায়।

ফ্রান্স ইহুদিদের জন্য প্যালেস্তাইনে ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানে জাতীয় আবাস স্থাপনের ঘোর বিরোধী ছিল। সে সময় সিরিয়া অগোছালোভাবে ফয়সালের শাসনে ছিল, পিছন থেকে ব্রিটিশ সহায়তায়। ফ্রান্স সিরিয়ার উপর নিজেদের দাবিতে অনড় থাকে এবং জেগে ওঠা আরব জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ১৯২০ সালে দামাস্কাস দখল করে ফয়সালকে অপসারিত করে, যদিও সিরিয়ার সীমানা চূড়ান্ত হতে আরও কিছু সময় লাগে। সিরিয়া ও পরিবর্ধিত লেবানন ফ্রান্সের শাসনে আসে। তবে সে সব বিশদ আলোচনায় না গিয়ে, আমরা প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের পুনর্বাসনের প্রশ্নেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখব।

যুদ্ধে তুরস্কের (অটোমান) সেনার হাতে বহু ইহুদি নিহত হয়। তার পর ইহুদিরা মূলত রাশিয়া ও পোল্যান্ড থেকে (তখন যা রাশিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার অধিভুক্ত ছিল) বিতাড়িত হয়ে জাতীয় আবাসের সন্ধানে প্যালেস্তাইনে আসতে শুরু করে। এবার প্যালেস্তাইনের আরব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ। জর্ডন নদীর পূর্বপারে তখন কোনও সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা ছিল না। বেদুইনদের আক্রমণের আশঙ্কায় মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে বসবাস করত। কিছু ইহুদি গোষ্ঠীরও সেখানে বাস ছিল, এবং মাঝে মাঝে বড় ধরনের হানাদারি ঘটত। ব্রিটেনের নজরদারিতে ইহুদি জাতীয় আবাস স্থাপনের কথা মুখে মুখে প্রচারিত হতে থাকায় এবং ক্রমাগত ইহুদি অভিবাসীদের আগমনে বিভিন্ন আরব গোষ্ঠী ক্রমশ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ব্রিটেন তখন রণক্লান্ত ও আর্থিকভাবে ক্লিষ্ট; নতুন করে শক্তি নিয়োগের উৎসাহ নিভে গেছে। সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্দ কাটছাঁট হয়ে এক-চতুর্থাংশে নেমে আসে, ফলে নতুন করে সেনা মোতায়েন প্রশ্নের বাইরে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেন ট্রান্স-জর্ডনে (জর্ডন নদীর পূর্বপারে) শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য হিজাজের শাসক আমির হুসেনের পুত্র আবদুল্লাকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু আবদুল্লা সে কাজের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণিত হয়। অন্য দিকে ইরাকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হুসেনের অপর পুত্র ফয়সাল ছিলেন অবিশ্বাসী ও সুযোগসন্ধানী। এ-সময়েই ইরাকে বিপুল তেলভাণ্ডারের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে। এই সব জটিলতার ফলে ব্রিটেন ক্রমশ নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে।

একদিকে স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতা এবং অপরদিকে ইহুদিদের প্রতি দেওয়া আশ্বাস— এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জর্ডন নদীর পশ্চিম অংশে প্যালেস্তাইন গঠিত হয়; পূর্বপারের ট্রান্স-জর্ডনকে কেটে নেওয়া হয়— যা যুদ্ধ-পূর্ব প্যালেস্তাইনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং পরে জর্ডন নামে পরিচিত হয়। এই খণ্ডিত প্যালেস্তাইন সরাসরি ব্রিটেনের শাসনের অধীনে রাখা হয়, সেখানে নতুন জনবিন্যাসজনিত সমস্যা সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ব্রিটেন ব্যালফোর ঘোষণার ভিত্তিতে ইহুদিদের তাদের স্বভূমির অধিকার গ্রহণে উৎসাহিত করে, এবং ইহুদিদের অভিবাসন শুরু হয়। কিন্তু এই অভিবাসনের ফলে জনবিন্যাসে যে আমূল পরিবর্তন ঘটবে, সে বিষয়ে লন্ডনের কোনও সুস্পষ্ট পূর্বপরিকল্পনা বা সম্যক চিন্তা ছিল না। সম্ভবত তারা ধরে নিয়েছিল যে কয়েক হাজার বছর ধরে ইহুদিরা এই অঞ্চলে বসবাস করেছে এবং ধর্মীয় প্রণোদনার পাশাপাশি অন্য দেশে উৎপীড়নের শিকার হয়ে তারা এখানে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজেদের ভূখণ্ড গড়ে তুলবে। কিন্তু সংখ্যাগুরু আরব জনগোষ্ঠীর কাছে এই ধারণা ইহুদিদের প্রাধান্য মেনে নেওয়ার সমার্থক ছিল, যা তারা নিজেদের ধর্ম ও সামাজিক মর্যাদার অবমাননা বলে মনে করত। এর ফলেই অচিরেই বিবাদ ও দাঙ্গার সূচনা হয়।

প্যালেস্তাইনে কর্মরত সেনা ও আধিকারিকরা ইংরেজ সরকারের ইহুদি নীতির যুক্তি বা মানসিকতা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত সরকারের তখন উৎসাহে ভাটা পড়েছিল; প্রশাসনিক দায়ভার লাঘব করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। ফলে নীতি ব্যাখ্যা বা বোঝানোর তেমন কোনও প্রচেষ্টাও হয়নি। মাঠপর্যায়ের সেনারা দেখল— একটি তুলনামূলকভাবে শান্ত অঞ্চল ইহুদি অভিবাসনের ফলে অশান্ত হয়ে উঠছে, যদিও এমন নয় যে অবারিত স্রোতে ইহুদিরা আসতে শুরু করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেনাদের সহানুভূতি স্থানীয় আরবদের পক্ষেই গেল। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইহুদিরা দাঙ্গায় ক্রমশ পর্যুদস্ত হতে থাকে। তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, এবং কোথাও কোথাও তারা জোটবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে লন্ডনেও ইহুদি নীতি নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। কিন্তু সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ খ্যাতি ও ক্ষমতার শীর্ষে এবং ইহুদিদের প্রতি দায়বদ্ধতায় অটল। তিনি প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি অসামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তবু তাতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

অবস্থা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল, তা বোঝার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। মুসলমান সমাজে মুফতির পদ অত্যন্ত সম্মাননীয়। মুফতি নিয়োগের জন্য একটি নির্বাচকমণ্ডলী থাকত, যারা তিনজনের নাম সরকারের কাছে পাঠাত; সরকারিভাবে সেই তালিকা থেকে একজনকে নিয়োগ করা হত। প্যালেস্তাইনে এই দায়িত্ব ইংরেজরাই নিজেদের হাতে নেয়। জেরুজালেমের মুফতির পদ ছিল বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন; ইংরেজরা তাকে গ্র্যান্ড মুফতি বলে উল্লেখ করত। ১৯২১ সালে ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন ইহুদিবিদ্বেষী প্রতিনিধি, রিচমন্ড, নিয়ম ভেঙে নির্বাচকমণ্ডলীর তালিকার বাইরে থেকে একজন দাঙ্গায় যুক্ত, দশ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে— নাম আমিন আল-হুসেইনি— গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে নিয়োগ করেন। হুসেইনি ছিল একজন কট্টর চরমপন্থী; আপসহীন সংঘর্ষই ছিল তার পথ। সে আরবদের দাঙ্গায় উসকানি দেয়, কিন্তু তাতে আরব মুসলমান সমাজ কোনওভাবেই লাভবান হয়নি। শেষ পর্যন্ত হুসেইনি জার্মানিতে পালিয়ে গিয়ে হিটলারের সঙ্গে যোগ দেয়।

সেই সময় প্যালেস্তাইনে আরবদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ধনী জমির মালিক ছিল, বাকিরা সামান্য মালিকানা ছাড়াও অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করত। বেশিরভাগ জমি ছিল অনুর্বর, চাষের পদ্ধতি বহুদিন ধরে চলে আসা পশ্চাৎপদ; সময় সেখানে যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধের শেষে অনুমান করা যায়, প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ছয় লক্ষ। চারদিক থেকে ইহুদিদের অভিবাসন ঘটতে থাকে।

ইহুদিরা ছিল কর্মঠ, উদ্যমী ও বুদ্ধিমান। বিভিন্ন দেশে কঠিন পরিস্থিতিতে বাস করার ফলে তারা নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আগ্রহী ছিল। অনেকেই সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় অনুপ্রাণিত, কেউ কেউ অর্থবান। লন্ডন থেকে আরব প্রতিনিধিদের বোঝানো হতে লাগল যে অভিবাসী ইহুদিরা অনাবাদি বা পতিত জমি কাজে লাগিয়ে, কিংবা অন্য পেশায় জীবনধারণে প্রস্তুত ও সক্ষম। ইহুদিদের পক্ষ থেকেও বলা হতে লাগল যে আরব অধিবাসীদের পূর্ণ স্বাধীনতা বা জীবনধারায় কোনও বিঘ্ন ঘটানো হবে না; বরং তারা সমগ্র ভূখণ্ডের উন্নয়ন ঘটাবে, আর আরব মালিকেরা জমি বিক্রি করতে চাইলে তারা সামর্থ্য অনুযায়ী তা কিনে নেবে। ইহুদিদের চাহিদায় জমির দাম বিশ থেকে চল্লিশ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেল। অনেক অবস্থাপন্ন আরব সেই সুযোগে জমি বিক্রি করতে লাগল— এদের মধ্যে অনেক নেতৃস্থানীয় আরব প্রতিনিধিও ছিল। জমি বিক্রির পরে তারাই ইহুদিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হল। ইহুদিরা নতুন অধিগৃহীত জমি নিজেরাই চাষ করতে লাগল। এদের অনেকের মধ্যে সমাজতন্ত্রী মানসিকতার কারণে মজুর নিয়োগ করা তাদের দৃষ্টিতে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে ওইসব জমির আগেকার দরিদ্র আরব মজুরদের কাজে টান পড়ল, যা তাদের উদ্বেগের কারণ হল। ইহুদি নেতৃত্বের যুক্তি ছিল, প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে তখনকার জনসংখ্যার কয়েক গুণ মানুষ ভালোভাবে বাস করতে পারে। ইংরেজ সরকারের ধারণা ছিল, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ এখানে ভালোভাবে বাস করতে পারে। বিস্তীর্ণ অনাবাদি ও পতিত জমি উদ্ধার করে সেচের ব্যবস্থা করে চাষ করা সম্ভব। কিন্তু আরবরা সে যুক্তি শুনতে রাজি ছিল না। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলতেই লাগল।

১৯২২ সালেই একজন ইহুদি ইঞ্জিনিয়ার রুটেনবুর্গের উদ্যোগে এবং চার্চিলের (তখন উপনিবেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী) আর্থিক সহযোগিতায় অজ ও জর্ডন নদী-উপত্যকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়, যা সংলগ্ন এলাকার উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই সামান্য আর্থিক সাহায্য নিয়েও লন্ডন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ড তখন আর্থিকভাবে বিপন্ন এবং যুদ্ধে লোকক্ষয়ে অবসন্ন। সেই সময়ে জনমত নতুন কোনও ঝুঁকি নেওয়ার বিপক্ষে। পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ (হাউজ অব লর্ডস) প্যালেস্তাইন থেকে হাত তুলে নেওয়ার পক্ষে জোরালো মত দিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করে; তবে সেই মত সরকারের পক্ষে বাধ্যতামূলক ছিল না। চার্চিল নিম্নকক্ষে (হাউজ অব কমন্স) দীর্ঘ, যুক্তিপূর্ণ ও আবেগঘন বক্তব্য রাখার পর কক্ষের মত জোরালোভাবে সরকারের পক্ষে এসে যায়। ফলে সরকার প্যালেস্তাইন সম্বন্ধে— ইতিমধ্যে জাতিপুঞ্জের আরোপিত— দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর চার্চিল জানিয়ে দেন যে ইংল্যান্ড প্যালেস্তাইনে তার নীতি ও দায়িত্ব পালনে সঙ্কল্পবদ্ধ।

কিন্তু কর্তিত প্যালেস্তাইন তখন যুদ্ধ-পূর্ব প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডের এক-চতুর্থাংশ মাত্র— বিশেষত জর্ডন নদীর পূর্ব দিকের ট্রান্স-জর্ডনকে প্যালেস্তাইন থেকে ছেঁটে ফেলার পর।

অটোমান সাম্রাজ্যের বিভাজনের বর্তমান রূপ মোটামুটি স্থির হয়ে যায় ১৯২২ সালের নাগাদ। কিন্তু ইহুদিদের জাতীয় স্বভূমির সমস্যা ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলতে থাকে, কখনও লেলিহান অগ্নিশিখা হয়ে প্রকাশ পায়। ত্রিশের দশকে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিদের হাতে ইহুদিনিধন ও বিতাড়নের ফলে প্যালেস্তাইনে অভিবাসনের ঢল নামে, যার বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আকার দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নবগঠিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৯৪৭ সালে বর্তমান প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েলের বিভাজন সম্পন্ন করে। কিন্তু অশান্তি সম্পূর্ণ আরব দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি সে গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র মুসলমান জগতেই অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই অশান্তির গভীরতার একটি প্রকাশ ঘটে ৯/১১-র বিভীষিকায়— ২০০১ সালে, যখন আমেরিকার টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনের উপর বিমানহামলায় সারা বিশ্বে তোলপাড় পড়ে যায়। ওসামা বিন লাদেন (তালিবানের অন্যতম কারিগর) এই আঘাতকে আশি বছর আগে শুরু হওয়া পশ্চিমি আগ্রাসনের— যা অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে কয়েকটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেয় এবং প্যালেস্তাইনে ইহুদি জাতীয় আবাস সৃষ্টি করে— এবং পরবর্তীকালে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিদান হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই সব পদক্ষেপ মুসলমান জীবনযাত্রাকে কোরান-বর্ণিত পবিত্র আইনের অবমাননা করে আধুনিক পশ্চিমি ধ্যানধারণার বশবর্তী করার চেষ্টা। ওসামার ভাষায়, আমেরিকানরা জীবন উপভোগ করতে চায়,[3] আর প্রকৃত বিশ্বাসী মুসলমান মৃত্যুবরণ করতে ভালোবাসে; তাদের কর্তব্য ইজরায়েলকে বিলুপ্ত করে পুরনো প্যালেস্তাইন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বলা বাহুল্য, সব মুসলমান এই মত পোষণ করেন না; বহু মানুষ সন্ত্রাসবাদের বিরোধী। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মুসলমান— বিশেষত তরুণ প্রজন্ম— পশ্চিমি উদার গণতান্ত্রিক ভাবধারায় প্রভাবিত।

২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে মার্কিন সেনার হাতে ওসামার মৃত্যু হয়। প্রতিবাদে লাদেনের সমর্থনে গর্জন ও দেওয়াললিখন পাকিস্তান ছাড়িয়ে— এবং শেখ হাসিনার উদ্বেগ বাড়িয়ে— বাংলাদেশকেও আলোড়িত করে।[4] পঁচিশ বছর পরে, আজও আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ অব্যাহত।


[1] সেই সময় প্যালেস্তাইন বলতে মোটামুটি বর্তমান জর্ডন, প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েলের সংযুক্ত ভূখণ্ড বোঝাত, কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না। ইহুদিরা প্যালেস্তাইনকেও ইজরায়েল বলত। এই অঞ্চল ছিল ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের আদি ভূমি। বাইবেলে এই অনির্দিষ্ট পবিত্র ভূমিকে ইহুদিদের জন্য ভগবানের দ্বারা নির্ধারিত হিসাবে আশ্বাস দেওয়া আছে। কোরানেও তার স্বীকৃতি আছে তবে সেখানে ব্যাখ্যায় কিছু জটিলতা আছে।
[2] হেল্পম্যান, ওরফে পারভুস।
[3] দি ইকোনমিস্ট, ৫-৫-২০১১।
[4] দি ইকোনমিস্ট, ২৭-৯-২০০১।