Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তিস্তার চল-চিত্র

অভ্রদীপ ঘটক

 

আমাদের জলপাইগুড়ি শহরের একটু পাশ দিয়ে পুর্ব প্রান্ত ঘেঁষে তিস্তা নদী বয়ে গেছে। কোথাও সরু, কোথাও চওড়া। স্থানীয়দের কথায় পাতলা তিস্তা আর মোটা তিস্তা। বর্ষায় এর প্রচণ্ড স্রোত। ইয়া বড় বড় ঢেউ আসে আর ঢেউ যায়। তিস্তা ভাসায় দু-কুল। আধডোবা মাটির বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে কোমর-জলে।

তিস্তা নদীর দু-পারেই কাশবন, দেড়মানুষ উঁচু, সন্ধে থেকে গভীর রাতে শেয়াল ডাকে। মানুষখেকো রাক্ষুসে শেয়াল। ওই কাশবনে সন্ধের পর আর কেউ পা মারায় না। তিস্তাবুড়ি নাকি ঘুরে বেড়ায় মধ্যরাতের বালির সাদা চরে। মাঝে-মাঝে লালচক্ষু ট্রাকটারের আলো। বালি তুলে পাচার চলছে। চাষবাস করেও খাচ্ছে মানুষ। তিস্তায় ভেসে যাওয়া কাঠের ব্যাপারি বাঁধের ওপর বসে বিড়ি খায়।

পাকা রাস্তার দু-পাশে লম্বা বাধের ওপর খাবার দোকান হরেক, ছেলেছোকরার ভিড়। বাইকের আনাগোনা চলে, সঙ্গে অকালসিগারেট-ঠোটে স্থানীয় সুন্দরী। কোথাও ক্ষয়াটে মাঝি আলকাতরা লেপে শুকোতে দিয়েছে নতুন নৌকো।

এসব যেন সিনেমার নানা লোভনীয় দৃশ্য!

এহেন দৃশ্যকল্প অবশ্য এই সময়ের। বিগত ৪০ বছর ধরে দেখে আসছি তিস্তা মায়াবী, তিস্তা অদ্ভুত। এ মায়া ক্যামেরাবন্দি না করে থাকা যায়?

আমি তিস্তার পাড়ে যেতাম সেই ক্লাস এইট-নাইন থেকে, বাবার ক্যামকর্ডার নিয়ে।

মিলেনিয়ামের গোড়ায়। ইন্টারনেট সবে আসছে। আমাজনের ওয়েবসাইটে শুধুমাত্র বই পাওয়া যায়। ক্যাসেটে লাকি আলি আর হ্যারি বেলাফোন্টে। গেমের পাইরেটেড ভিসিডিতে ছেয়েছে বাজার।

আমার সাইকেল তখন পেগাস্যাস।

উড়ে যাচ্ছে মফস্বলের অলিগলি পার করে, রিকশায় বসে থাকা ফুটফুটে ফুলের মতো মেয়েদের চোখে চোখ সরিয়ে উড়ে যাই আমি তিস্তা নদীর পাড়ে। এক মায়াবী ম্যাজিক যেন, দিগন্তদেখা আমার মফস্বলীয় দর্শন।

সঙ্গে স্টিলকালারের ঢাউস ক্যামকর্ডার স্কুলব্যাগে পুরে চলেছি মুহূর্ত ধরতে। ভাগ্যিস ধরে রেখেছিলাম!

তখন মজেছিলাম তিস্তার ক্যালেন্ডার-মার্কা দৃশ্যকল্পে। মেঘ, নীলাকাশ, নদীর বালিচর, বয়ে যাওয়া তিস্তা, কাশবন… ব্যস, শটে শটে ক্যালেন্ডার।

স্কুল থেকে দূরে ছিল তিস্তা। ক্লাস টুয়েলভে বিজয়ার পর বিয়ার খেতে চলে গেছিলাম তিস্তায়, আমি আর অরিন্দম পাণ্ডে, সে ব্যাটা এখন বিশ্ববিখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জেন।

বখে গেছিলাম খানিক, হকিংস থেকে কমলকুমার তদ্দিনে সিলেবাসে ঢুকে গেছে।

প্রিয় অরগানিক কেমিস্ট্রি পড়াতাম শুভঙ্করকে সেই তিস্তার পারেই। সঙ্গে মুভি ক্যামেরায় ধরে রাখতাম নৌকাবিহার থেকে সমুদ্রের মতো তিস্তার স্রোত। তিস্তার স্রোত উঠত যখন— সেও আছে সংগ্রহে। তিস্তার জল ছিল গভীর।

তিস্তায় এক ভয়াবহ বন্যা হত। জলপাইগুড়ির মানুষ বন্যা বলতে ১৯৬৮ সালের বন্যার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সে ছিল ভয়াবহ বন্যা। আমি দেখেছি ৯০ দশকের শেষ পর্যন্ত তিস্তায় বন্যা মানে নদী সমুদ্র হয়ে যেত। ফুঁসছে রাক্ষুসী তিস্তা। ভেসে যাচ্ছে মানুষ, গবাধি পশু।

বাঁধের ওপারে, অর্থাৎ শহরের দিকটায়, ত্রিপল টাঙিয়ে বাঁধের পাড়ের মানুষদের জন্য শরণার্থী শিবির করা হত। বিডিও অফিস থেকে দেওয়া হত চাল, ডাল, আনাজ।

তিস্তাবরাবর পুর্বে হাঁটতে থাকলে বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর রয়েছে ভূতের চর। সে-চরের মানুষ হাজার বন্যাতেও চর ছেড়ে ডাঙায় আসবেন না। ভিটেমাটি ছেড়ে নড়বেন না।

গভীর রাতে মিলিটারি নামিয়ে খানিকটা জোর করেই ওদের নিয়ে এসে শিবিরে রাখা হত প্রতিবার। ওঁরা কোনও অজ্ঞাত কারণে গলাজলে দাঁড়িয়ে থেকেও আসতে চাইতেন না ভিটে ছেড়ে। কেন, কে জানে? তিস্তার দুই পাড়ে এরকম অনেক অজ্ঞাত প্রশ্নাতীত বিষয় রয়ে যায়।

সে সময় “জল দেখতে যাওয়া এক অদ্ভুত পৈশাচিক ব্যাপার ছিল শহরের মানুষের কাছে।” জল দেখতে যাওয়া অর্থাৎ বন্যায় তিস্তার জল বাড়তে বাড়তে যখন নদী সমুদ্র হয়ে যেত, চরের মানুষ অসহায়ের মতো ছোটাছুটি করত, ভিটে আঁকড়ে থাকতে চাইত অথচ চোখের সামনে দেখতে পেত একটা একটা করে আসবাব, বাসনপত্র তিস্তা টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে, কান্নায় ভেঙে পড়ত চরের অসহায় মানুষগুলো… সেই ইমোশনাল লাইভ দেখতে জলপাইগুড়ি শহরের মানুষ ঘাড়ে পাউডার দিয়ে বৈকালিক ভ্রমণে আসতেন। ঠিক যেমনভাবে ট্রেনে কাটা পড়া মানুষ দেখতে ভিড় জমে যায়।

তিস্তা বরাবরই আমার কাছে রোমান্টিক জায়ান্টের মতো। কলেজজীবনে প্রেম করিনি, নাটকের দল করেছি একখানা। তার রিহার্সালও দিয়েছি তিস্তার পাড়ে। চারদিকে ধু ধু বালিচর, আমরা রিহার্সাল দিচ্ছি। স্থানীয় যুবক মনোজিত দাড়িয়ে আছে। মনোজিত মাঝি। গানটানও করে। আমাদেরই বয়সী হবে হয়তো।

কলকাতায় দীর্ঘ ১২ বছর চাকরি-করা-কালীন বছরে সাকুল্যে এক-দুবার আসতে পারতাম তিস্তায়। তখন আমার তিস্তার টান প্রবল। প্রেম আরও প্রবল।

সেক্টর ফাইভ তখন সদ্য গজাচ্ছে।

তারা টিভিতে নাইট ডিউটি সেরে ভোরের দিকে, কলকাতায় প্রথম এবং সদ্য খোলা ক্যাফে কফি ডে-তে আমি, সন্দিকা আর অর্ণব খালিপেটে এক্সপ্রেসো শট নিতে নিতে তিস্তার গপ্পো করছি। মোবাইল তখন ২ মেগাপিক্সেল!

সেই ছোট্ট সন্দিকা আজকাল কলকাতা বইমেলায় আমার বই কিনতে নিজে নিজে ড্রাইভ করে আসে! সে যাকগে।

এর পরের পর্যায়ে ২০১০ কি ১১ সাল, আকাশ বাংলায় রূপম ইসলামের মিউজিক ভিডিও করা হবে। অয়নদা তখন আকাশের তারা। ওঁর দায়িত্ব রূপম। অতঃপর আমি সেই মিউজিক ভিডিওর দায়িত্ব এবং ছুটি নিয়ে সোজা জলপাইগুড়ি।

অগত্যা সেই তিস্তার পাড়। স্থানীয় ছেলেমেয়েকে পাকড়ে শুটিং সারলাম “দ্যাখো মানসী”। পয়লা বৈশাখে দেখাবে, অথচ তখনই তিস্তায় কী ভীষণ জলোচ্ছ্বাস! শুটিং হল, এডিটও। রূপমদা দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিল আকাশের গ্রাফিক্স রুমে।

দীর্ঘ বিরতি নিয়ে, যতবার তিস্তায় ফিরি, দেখি নতুন নতুন মুখ। কাউকে চিনতে পারি না। চেনা মুখ চোখে পড়ে না কেন? এরা কারা?

ওসবের ধার ধারি না কেউই। আমরা কাশবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে থাকি বরং।

কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, গোয়া থেকে যারাই আমার বাড়িতে আসে বন্ধুত্ব কিংবা কর্মসূত্রে, ধরে ধরে হাজির করি তিস্তার পাড়ে। আমার বিয়ের পর কলকাতা থেকে আসা বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন, তিস্তার পাড়ে সারাদিন ফটোগ্রাফি চর্চা চলল।

এরপর একদিন নিজের কোম্পানি তৈরি করে তথ্যচিত্রের কাজ শুরু করি সারা বাংলা জুড়ে। সেই কাজের ফাঁকে ২০১৬ সালে তৈরি করে ফেললাম তিস্তা নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচিত্র টান, তিস্তাপাড়ের প্রেম আর তিস্তায় ঘটে যাওয়া মৃত্যু নিয়ে। এই তিস্তা দেখিয়ে গোটা সাতেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার-টুরস্কার ঝুলিতে ঢুকিয়ে বসে আছি।

এরপর থেকে প্রায় প্রতি ফিল্মেই একটুকরো তিস্তা রেখেই দিতাম। সে বড় রোমান্টিক তিস্তা। আমার ফিল্মতুতো তিস্তা।

তিস্তার ঘন কাশবনে ঋতুবৃত্ত ছবির শুটিং করেছিলাম। দেড়-দু-মানুষ সমান উঁচু কাশের ঝোপে হাতে বিরাট বন্দুক হাতে কোলে ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ইভানা। পেছনে আমার বন্ধু বুড্ডা তলোয়ার নিয়ে। দুজনেই ছুটে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসে, তিস্তায়।

গল্প বলছি লাভ অ্যান্ড ডেথ-এর।

কোভিডের সময় এল। আমার প্রথম ফিচার ফিল্ম নিষাদ-এর শুটিং চলল উত্তরবঙ্গ জুড়ে। প্রথম ফিচার ফিল্ম, আর তিস্তা থাকবে না তাই হয়? এক দীর্ঘ কথোপকথন ছিল তিস্তার পারে। অনেক রাত্রে। শীতের রাত। প্রচুর লোকলস্কর নিয়ে শুটিং চলছে নদীর তীরে সবজিক্ষেতের পাশে। কুয়াশায় ঘেরা নদীতীর। কিছু দূরে, পেছনের দিকে দেখি ট্রাকটর চলছে। দুটো রক্তচক্ষু ঘুরছে। তখন রাত প্রায় ১১টা। ডিসেম্বর মাস। পরিস্থিতি বৈধ না অবৈধ তা বলা মুশকিল, তবে কমন সেন্স বলে একটা ব্যাপার রয়েই যায়, যেটা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে প্রয়োগ করা বড় বিপদের।

এরপর আস্তে আস্তে অনেক কাজ করেছি তিস্তাপারে। অনেক জল গড়িয়েছে, উত্তাল হয়েছে কখনও, কখনও শুকিয়েছে তিস্তা। তিস্তার বাথান নিয়ে কাজ করেছি। মহিষবাথান। তাঁর বৃদ্ধ রাখালের গল্প। তিস্তাপারে দিনের পর দিন কাটিয়েছি তথ্যচিত্রের কাজে। কোমরজল পার করে মাঝতিস্তার চরে মংলুদার বাড়ি গিয়ে সদ্য দোয়ানো গরুর দুধের চা খেয়ে এসেছি।

উত্তরের দিকে তিস্তাব্রিজ পার করে সোজা বৈকুণ্ঠপুর অরণ্যের দিকে গেলে দেখা যাবে, ওদিকে তিস্তার চরে অনেক মানুষ থাকেন। একদিকে বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল, বাকি তিনদিকে ভরা তিস্তা নদী। এই চর এদের মা-বাপ। চর এদের টান।

এই মানুষগুলোর পরিচয় জানতে ইচ্ছে হয়নি। কোথা থেকে এসেছিল… চর ভেসে গেলে কোথায় বা যাবে কে জানে? মনেও হয়নি এরা কি অনুপ্রবেশকারী, নাকি বাংলাভাষায় কথা বলছে তাই বাংলাদেশি! হতেও পারে! নাও পারে! কে জানে! এদের রাজনৈতিক অ্যাঙ্গেল নিয়ে ভাবিনি তখনও। তিস্তার মায়ার মজে ছিলাম বরাবর।

ভরা বর্ষায় আমি আর পদ্মপর্ণা ভারি ট্রাইপড কাঁধে ৪-৫ বার কোমরজল পার করে পৌঁছেছি চরের মধ্যিখানে। ওদের খড়ের বাড়ির ছায়ায় বসে খেয়েছি পরম তৃপ্তিতে। পরদিনই দুজনেই জ্বরে কাবু।

মংলুদার ছেলে হুদা আমাদের নৌকা নিয়ে ঘুরিয়েছে তিস্তা যখন ভরা বন্যায় টইটম্বুর।

নৌকা চলেছে এক মানুষজলে ডোবা শরবনের মধ্যে। ভরা নদী, আকাশের মুখ ভার।

জলের ওপর সাপ চলে যায়। টিটিপাখি নৌকার মাথায় চক্কর কাটতে কাটতে ডাকে, টি… টি …। একফালি চরে দাঁড়িয়ে একটা ছাগল। মংলুদার বাড়ি জলের তলায়। আমরা নামার জন্য ডাঙ্গা পাচ্ছি না। চক্কর মেরে যাচ্ছি নৌকা নিয়ে। সন্ধে নেমে আসে, আমরা জলেই ভেসে আছি ঘন্টার পর ঘন্টা। চারিদিকে তাকাই শুধু জল আর জল। স্রোতের টান ওঠে। অন্ধকারে আলো দেখা যায় তিস্তাব্রিজে।

তিস্তার পাড়ে, বোদাগঞ্জের দিকে জঙ্গল-লাগোয়া চরে সেবার মহাকালপুজো। হাতির পুজো। ক্যামেরা নিয়ে আমি আর পদ্মপর্ণা হাজির। এ পুজো হিন্দু-মুসলমান মিলেই করে। বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য থেকে পালে পালে হাতি এসে ধান খেয়ে যায়। মহাকালবাবার জন্য চরের ওপর আলাদা করে একটুকরো জমিতে ওরা ধান চাষ করে। হাতিকে চরের মানুষ ভালোবাসে। বিরক্ত হয় না। এখানে ম্যান-অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট নেই। সহাবস্থান আছে। চরের মানুষ আবার জলকেও ভয় পায় না। ওদের ভয় একমাত্র আগুনকে।

আমার হোমটাউন জলপাইগুড়ি হওয়ার দরুণ তিস্তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজ করে গেছি। তবে বেশিরভাগই তিস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে হাইলাইট করে।

এই সেবার সেদিনই, মেচেনী তথ্যচিত্রের কাজ চলছিল। তিস্তাবুড়ির গান, বড়সড় আয়োজন করে শুটিং চলছে শহর থেকে অনেকটা দূরে তিস্তার উজানে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রান্তরে। তিস্তাবুড়ি। তিস্তা নদীকে রক্ষার এক অতি আদিম প্রার্থনা। মিথ, আর লোকাচারের মিশ্রণ। উত্তরের রাজবংশী সমাজের ঘরে ঘরে এ এক অন্যাধারার পুজোর প্রস্তুতি। বছরের বিশেষ দুই মাস চৈত্র ও বৈশাখ, উত্তরবঙ্গের বহু জায়গায় পালিত হয় এই ব্রত, তিস্তাবুড়িপুজো।

আমাদের এখন শ্রাবণ মাস, তবু বৃষ্টির লেশমাত্র নেই উত্তরবঙ্গে।

ওপারে ঘন সবুজ ঘাসের বন, ঝকঝকে আকাশ। মাঝে ঘোলাটে তিস্তা।

তিস্তাবুড়ির পুজোর শেষে, যখন ভেলা বিসর্জন হয়, রাজবংশী মহিলারা বিরহের মেচেনী গান করেন, কাঁদতে থাকেন করুণ সুরে।

সৌরভদার কাল্ট তথ্যচিত্র কারবালা কথা-য় দেখেছিলাম, হজে যাত্রা করার সময় লক্ষ মানুষ একসঙ্গে হাঁটছেন লম্বা পথ, তারা কোথাও একটা বসে গান করে চলেছেন সারা রাত ধরে। সেই গানে উঠে আসছে হাসান হোসেনের শোকের এক পর্যায় থেকে নিজের চাওয়া, না-পাওয়া, মা-বাবা-প্রিয়জনের মৃত্যুশোক, সমস্ত ভেতরের যন্ত্রণার মুক্তি। এ কান্নার ধর্ম নেই, সবচেয়ে বড় কোনও গভীর কারণ নেই। দরকার পড়ে না। আকাশ-বাতাস ভরে যাচ্ছে, ভারী হয়ে উঠছে কান্নার শব্দে। তিস্তাবুড়ির বিসর্জনের কান্নার সুরে আমি সেই তথ্যচিত্রে দেখা অপার্থিব কান্নার সুরের ছোঁয়া পেয়েছিলাম।

তিস্তার জলের গর্জনের সঙ্গে অচেনা সুর মিলে গিয়ে সুরের মূর্ছনা তৈরি হয়। আনক্যানি লাগতে থাকে হঠাৎ। অস্বস্তি হতে থাকে।

তিস্তাবুড়ির গানের দলের একটি মেয়ে পদ্মপর্ণাকে ফিসফিস করে বলে, দিদি আপনারা বারবার বিসর্জনের গান গাওয়াচ্ছেন, এবার বৃষ্টি হবেই।

আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। প্রবল গরম। শুকনো বালির ওপর সচকিত গিরগিটি সাবলীল। দেড় মাস ধরে জলপাইগুড়িতে বৃষ্টি নেই। নদীর হাওয়াও তপ্ত।

আমি স্ক্রিপ্ট ঘাঁটতে থাকি একমনে। বারবার গানের রি-টেক হয়। মনমতো হচ্ছে না। এক হাঁটু জলে নেমে গিয়ে ভেলা ভাসাই। তড়িৎ ক্যামেরা নিয়ে কোমরজলে টেক নিচ্ছে।

ওঁরা দীর্ঘ গান গাইছেন, কেঁদে চলেছেন হাপুস নয়নে। লালপেড়ে সাদা শাড়িতে বৃদ্ধা দুজন মহিলা। কিছু দূরে হলুদ শাড়িতে পাঁচজন ১৪-১৫ বছরের মেয়ে, তারাও কাঁদছে হাঁটুজলে।

আবার ফিসফিস— বৃষ্টি আসবেই। তিস্তাবুড়ির পুজো, বিসর্জনের গান মানেই, ফসলের ওপর, মাটির ওপর, ক্ষেতের ওপর, মানুষের ওপর শীতল বৃষ্টি, গ্রামীণ মহিলাদের গোপন অতৃপ্তির কথকতা। তিস্তাবুড়িকে ডাকলেই জল আসে।

শুটিং শেষ হয় সন্ধের আগ দিয়ে। অদ্ভুতভাবে এর জাস্ট পরই চারদিক সাদা হয়ে বৃষ্টি আসে। প্রবল বৃষ্টি। সে বৃষ্টি আর থামে না। চারদিক ভেসে যায়। তিস্তায় জল বেড়ে ওঠে।

বৃষ্টির ফিসফিস, তিস্তাবুড়ির পুজো মানে জল, জল…।

এসব রোমান্টিকতায় আমার প্রিয়তমা তিস্তা। বাঁধের পাড়ে কত কত স্মৃতি নিয়ে হাঁটতে থাকি।

এতদিন আমার তিস্তাযাপনের বহর দেখে তিস্তাবুড়ি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, ওই দেখতে থাক ব্যাটা।

নিজেকে, মাঝেমাঝে তিস্তার বুকে দাঁড়ালে, ক্যালাস ভেজিটেবল জেনারেশন মনে হয়! তিস্তার বুকের ওপর দিয়ে চলছে বালি-মাফিয়া, বন্দুক হাতে, বুলেট হাঁকিয়ে। ট্রাকটরে কেমিক্যাল ছড়িয়ে চাষবাস, মাছগুলো সব মরে ভেসে ওঠে সার সার। এসব চোখে পড়ছে না আইফোনের লং ল্যান্ডস্কেপে। রঙিন রিলের আড়ালে নদীর ওপার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী সার সার। তিস্তার পূর্বপারে, পাকা বাড়ি বানিয়ে পাকাপাকিভাবে সম্পন্ন গৃহস্থ। কলোনি কালচার এদিকে। যাকেই জিজ্ঞেস করুন, বলবে আমার জন্ম এখানেই। সে ৬০ বছরের বৃদ্ধেরও একই বচন। অথচ মাত্র ১৫ বছর আগেও এই তিস্তার পাড়ে ছিল ধু ধু প্রান্তর। লোকবসতির লেশমাত্র ছিল না। এই ভূতুরে ভোটারের দল কোথা থেকে এল তা কিন্তু নেটিজেনরাও জানেন না। তিস্তার পথ ধরে চলতে থাকলে দেখি সার সার কলোনি তৈরি হয়ে গেছে। এদের কেউ চেনে না। সব্বাই নাকি হাজার হাজার বছর ধরে এখানেই আছে, অথচ কয়েক বছর আগেও এদের চিহ্নমাত্র ছিল না। এসবও তো রয়েছে।

অস্বীকার করা যায়?

তিস্তার পাড়ে আড়াই লক্ষের বাইক কিংবা এসইউভি চড়ে হাওয়া খেতে খেতে ছাগল আর সাপলুডো খেলতে থাকা পাগল এড়িয়ে আমাদের চোখ আর যায় না কাশবনের অন্ধকারে। কাফসিরাপ, গাঁজা, আরও কত কী পাচার হয়ে যাচ্ছে এপার থেকে ওপার!

এসব আসুক দেখি ফিল্মে! আসুক চলচিত্রের ফ্রেম-বাই-ফ্রেমে। কথা হোক। হোক কলরব। হয়ে যাক শহুরে মোমবাতি বিপ্লব। এ-কথা আমি নিজেই নিজেকে বলতে থাকি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব দুষ্প্রাপ্য মণিমুক্তো আহরণের পর-পরই আমার এক পর্যায়ে তিস্তার সিনেম্যাটিক  মোহভঙ্গ হয় ধীরে ধীরে। তিস্তার ম্যাজিক ডিজলভ হতে থাকে সিটিজেন কেন ছবির দীর্ঘ ট্রানজিশনের মতোই। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নানা ফিল্ম তৈরি করতে গিয়ে তিস্তার অপার্থিব শটের বাইরে পার্থিব তিস্তাপারের বৃত্তান্ত দেখানোর সুযোগ এখনও হয়ে ওঠেনি। সে বালিমাফিয়া হোক কিংবা গরুপাচার, আমার কালেক্টিভ কনশাসনেসে এখনও তিস্তা মায়াবিনী।