Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

জেফ্রি এপস্টাইন পুতুলমাত্র… নাচাল কারা?

তমাল মিত্র

 


এপস্টাইন কার হয়ে কাজ করতেন?— এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এপস্টাইনকে যারা ব্যবহার করেছিল, তারা আজও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্দার আড়ালে থেকে নতুন কোনও এপস্টাইন তৈরি করে চলেছে। আর আমরা কেবল পর্দার সামনের পুতুলনাচই দেখে চলেছি

 

 

সেদিন বইমেলা থেকে লোকাল বাসে চেপে বাড়ি ফিরছিলাম। আমার সামনের সিটে দুজন প্রৌঢ় বসেছিলেন। তাদের মধ্যেই একজন অপরজনকে বললেন, “এপস্টাইন ফাইলস নিয়ে হুলস্থুল পড়ে গেছে, দেখেছিস?”

ব্যস্ততার খাতিরে খবরের কাগজে খুব বেশি চোখ রাখা হয় না। তবুও যেন নামটা শোনা-শোনা লাগল। অনেক বছর আগে শুনেছিলাম বোধহয়।

অপর ভদ্রলোক বললেন, “আর বলিস না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিনা ওদের সামনে নাচতে গেল!”

আমি কৌতূহল সামলে রাখতে পারলাম না। মোবাইল ঘাঁটা শুরু করলাম।

এপস্টাইন জনৈক অজ্ঞাতপরিচয় ‘জেবর ওয়াই’ (Jabor Y)-কে ইমেলে লিখছেন, “The Indian Prime minisiter modi took advice, and danced and sang in israel for the benefit of the US president. IT WORKED!”

ধুর! শুধু এইটুকুর জন্য এত হৈ-হুল্লোড়, এত বাদানুবাদ!

সালটা তখন ২০১৭। ট্রাম্প সদ্য আমেরিকার মসনদে বসেছেন। সেই সময়ে ইজরায়েলের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন এবং প্যালেস্তাইন ইস্যুতে ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে এপস্টাইন নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির করতে চেয়েছিলেন সম্ভবত। একে ‘সেলস পিচ’ ছাড়া আর কী বা বলা যায়? তাছাড়া, ২০১৭-র সেই ঐতিহাসিক সফরে প্রধানমন্ত্রী নাচগান করেছিলেন কি না জানা নেই, তবে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর সমুদ্রতটে হাঁটার ছবিগুলো কিন্তু ইন্টারনেটে ভালোই ঝড় তুলেছিল।

এপস্টাইন নথিপত্রে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের উল্লেখ রয়েছে— এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। দুজনের একসঙ্গে ছবিও আছে বিস্তর। তিনি কার্যত স্বীকার করেছেন যে তিনি এপস্টাইনের ব্যক্তিগত বোয়িং ৭২৭ বিমানে (যা ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত) চড়ে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়া সফর করেছেন। অন্তত ২৬ বার। যদিও, ক্লিনটন দাবি করেছেন যে তিনি তখন এপস্টাইনের অপরাধ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

টেক-দুনিয়ায় বিল গেটসের নাম শোনেনি এমন কেউ নেই। এমন বিদ্বান, বিরাট মাপের ব্যক্তিত্ব খুব কমই দেখা যায়। টেকনোলজি ছাড়াও বিভিন্ন জনহিতকর প্রকল্পে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল যখন মার্কিন ধনকুবের বিল গেটসের নাম এপস্টাইন ফাইলসে পাওয়া গেল।

না। কোথাও কোনওরকম অস্পষ্টতা নেই। ২০১৩ সালে একটি ইমেলে এপস্টাইন লিখেছেন যে, বিল গেটসের সঙ্গে এক রাশিয়ান নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এবং তার ফলে গেটস যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সম্প্রতি এক পডকাস্টে মিলিন্ডা গেটসকে সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বললেন, “খুশির কথা এই যে, আমি এই সমস্ত থেকে এখন অনেক দূরে।”

গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায় আমার ভাবনা-চিন্তায় ছেদ পড়ল। কিন্তু আমার আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়ল না। আমার অনুসন্ধিৎসু মন। ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে অনেক অজানা তথ্য আমার সামনে ডালপালা ছড়াতে লাগল। জানতে পারলাম পারভারশন অফ জাস্টিস নামে বইটার কথা। বুঝতে পারলাম, আমার অবাক হওয়ার পালা এই মাত্র শুরু।

জেফ্রি এপস্টাইনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে, একটি মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে। তার বাবা ছিলেন নিউইয়র্ক সিটি পার্কস ডিপার্টমেন্টের একজন গ্রাউন্ডসকিপার। জেফ্রির ছোটবেলা ছিল নির্ঝঞ্ঝাট। সাদামাটা। অন্যান্য সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়ের মতোই।

ছোটবেলা থেকেই জেফ্রির পড়াশোনার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। বিশেষ করে গণিতের প্রতি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন। সব ঠিকঠাকই চলছিল, এমন সময় হঠাৎ করেই তিনি মাঝপথেই ইতি টানলেন।

তার অল্প কয়েকমাস পরেই, মাত্র ২১ বছর বয়সে জেফ্রি ম্যানহাটনের ডাল্টন স্কুলে পদার্থবিদ্যা এবং গণিত বিভাগে শিক্ষকতার সুযোগ পেলেন। ডাল্টন স্কুল যে-সে স্কুল নয়। সেখানে নিউইয়র্কের ধনী এবং প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানরা পড়তে আসত। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই সাধারণ ঘরের ছেলে জেফ্রির অমন একটি স্কুলে সুযোগ পাওয়ার ঘটনা সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল।

ডাল্টন স্কুলের তৎকালীন প্রধানশিক্ষক ডোনাল্ড বার ক্যাথলিক হলেও জন্মসূত্রে ইহুদি ছিলেন। শোনা যায়, তিনিই জেফ্রিকে চাকরি দিয়েছিলেন।

শিক্ষকতার জীবন খুব একটা ভালো কাটেনি জেফ্রির। কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর প্রতি তার আচরণ ছিল বড়ই অদ্ভুত। এমনকি, তার আচরণ বারবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ১৯৭৬ সালে খারাপ পারফরম্যান্সের কারণ দেখিয়ে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

খুব বেশিদিন জেফ্রিকে বসে থাকতে হয়নি।

বাকপটুতা ও অসাধারণ গাণিতিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে জেফ্রি বিখ্যাত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক ‘বিয়ার স্টার্নস’-এ নিজের জায়গা করে নিলেন। মাত্র চার বছরের মধ্যে, ১৯৮০ সালের দিকে তিনি বিয়ার স্টার্নস-এর লিমিটেড পার্টনার হয়ে উঠলেন। অভাবনীয় সাফল্য।

কেউ যদি ভেবে থাকেন এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রম, তাহলে ভুল করবেন।

শেয়ার মার্কেট এবং অপশন ট্রেডিং বোঝার মতো অসাধারণ ক্ষমতা তার ছিল ঠিকই, সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন অসম্ভব ধূর্ত। তিনি কর ফাঁকি দেওয়ার অসাধারণ কিছু কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। যার ফলে, বিয়ার স্টার্নসের ধনী ক্লায়েন্টরা আরও ধনী হয়ে উঠলেন। জেফ্রি এপস্টাইন হয়ে উঠলেন সকলের নয়নের মণি।

কিন্তু এবার তিনি বিপদের আঁচ পেলেন। অনভিজ্ঞতার দরুন তাঁর কৌশলে কিছু আইনি ফাঁকফোকর রয়ে গিয়েছিল। ১৯৮১ সালে, তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠল। তদন্তে জানা গেল, তিনি ব্যাঙ্কের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বন্ধুকে কুড়ি হাজার ডলারের লোন পাইয়ে দিয়েছিলেন। ইনসাইডার ট্রেডিং-এও তাঁর নাম জড়িয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবেই, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ মানে বিয়ার স্টার্নসের বিরুদ্ধে অভিযোগ। কে বিশ্বাস করবে, একজন আঠাশ বছরের যুবক কোম্পানির নাকের ডগায় থেকে জালিয়াতি করার সাহস পাবে? নিশ্চয়ই এর পেছনে বিয়ার স্টার্নসের হাত রয়েছে।

কাজেই বিয়ার স্টার্নস তাদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়ে পড়ল। এপস্টাইনের বিরুদ্ধে কোনও মামলা দায়ের করা না হলেও, তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হল।

চোখের জল ফেলে বিয়ার স্টার্নস থেকে বিদায় নিলেন জেফ্রি এপস্টাইন। “আমি নির্দোষ”— বেরিয়ে যাওয়ার আগ-মুহূর্ত অবধি এটাই দাবি করলেন তিনি।

প্রতিভা যেমনই হোক না কেন, বেশিদিন দমিয়ে রাখা যায় না। মাত্র এক বছরের মধ্যে, ১৯৮২ সালে তিনি নিজের ফার্ম ‘জে এপস্টাইন অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর সুনাম তখন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে ক্লায়েন্টের জন্য তাঁকে বেশি ভাবতে হয়নি। উল্টে তিনি প্রচার করলেন, একমাত্র তারাই তাঁর ক্লায়েন্ট হতে পারবে যাদের বার্ষিক আয় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই সময়ে, তাঁর পরিচয় হল লেসলি ওয়েক্সনারের সঙ্গে।

ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমরা প্রত্যেকেই ম্যাগাজিনের পাতায় কিংবা টিভি চ্যানেলে ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের মডেলদের দেখলেই হা-হুতাশ করে থাকি। অবশ্যই আলাদা আলাদা কারণে। লেসলি ওয়েক্সনার সেই ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের মালিক।

ওয়েক্সনার এবং এপস্টাইনের বন্ধুত্ব ছিল ‘শোলে’-র জয় ও বীরুর মতো। যাকে বলে হরিহর আত্মা। ১৯৯১ সালে ওয়েক্সনার এক চরম সিদ্ধান্ত নিলেন। বন্ধুত্বে অন্ধ হয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পদের ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ দিয়ে দিলেন এপস্টাইনকে।

এপস্টাইন কথা দিয়েছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যে ওয়েক্সনারের সম্পত্তি বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবেন তার ক্ষুরধার মস্তিষ্কের সাহায্যে।

সে গুড়ে বালি।

নিন্দুকেরা বলে, আইনি জটিলতার প্যাঁচে ওয়েক্সনারের চার বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছিলেন এপস্টাইন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল নিউইয়র্কের আপার ইস্ট সাইডের বিলাসবহুল একটি ন-তলা বাড়ি।

কী করেছিলেন এপস্টাইন এই বিপুল সম্পদ নিয়ে?

শোনা যায়, এপস্টাইন হার্ভার্ড, এমআইটি এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিলেন।

না। এবারেও আপনি ভুল ভেবে বসলেন। বিজ্ঞানের সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। বরং, তার আগ্রহের পেছনে ছিল এক বিকৃত ও বিপজ্জনক দর্শন— ট্রান্সহিউম্যানিজম এবং ইউজেনিক্স। চলতি বাংলায় যাকে বলে সুপ্রজননবিদ্যা।

এপস্টাইন বিশ্বাস করতেন, তাঁর ডিএনএ অত্যন্ত উচ্চমানের। মানবজাতির স্বার্থে, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে, তিনি তাঁর ডিএনএ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই উদ্ভট চিন্তাধারা নিয়ে তিনি বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। পাম দ্বীপে তিনি এক বিশাল বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কে কে এসেছিলেন জানেন? মারভিন মিনস্কি, লরেন্স ক্রাউস, জর্জ চার্চ এবং স্টিফেন হকিং।

হ্যাঁ। আপনি ঠিক পড়েছেন। এপস্টাইন ফাইলসে স্টিফেন হকিং-এর নাম দেখে সবাই শিউরে উঠেছিল।

তবে, বিজ্ঞানীদের অনুদান দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। তিনি চেয়েছিলেন হাতেনাতে পরীক্ষা করতে। সেই জন্য, তিনি নিউ মেক্সিকোয় অবস্থিত তার বিশাল জোরো র‍্যাঞ্চকে শিশুপ্রজননকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেখানে একসঙ্গে ২০ জন নারীকে গর্ভবতী করার ব্যবস্থাও ছিল।

বোঝাই যাচ্ছে, এপস্টাইন মেয়েদের মানুষ বলে সম্মান করতেন না। মেয়েদের নিয়ে তার বিকৃত ইচ্ছের কোনও সীমাপরিসীমা ছিল না। তিনি এটাও জানতেন, বিশ্বের অনেক জ্ঞানীগুণী লোকজন, যাঁরা লোকসমাজে ভালোমানুষের মুখোশ পরে থাকেন, তাদের অনেকেই একই ধরনের ইচ্ছে পোষণ করেন।

বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেক্স ট্রাফিকিং রিং। ভাবতে অবাক লাগে, এই পরিকল্পনায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। তিনি ছিলেন ‘গ্রুমার ইন চিফ’। তাঁর কর্মপদ্ধতি যেন কোনও সিনেমা বা ক্রাইম-থ্রিলার থেকে হুবহু টোকা।

ঘিসলাইন সাধারণত আর্থিকভাবে অসচ্ছল, ভঙ্গুর পরিবার থেকে আসা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী মডেল হতে চাওয়া মেয়েদের টার্গেট করতেন। বেশিরভাগই ছিল নাবালিকা। ঘিসলাইন তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতেন, বড় দিদির মতো শপিংয়ে যেতেন। তিনি মেয়েদের বোঝাতেন যে এপস্টাইন খুবই ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং তাঁর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলে তাদের ক্যারিয়ারের জন্যেও মঙ্গল।

বাচ্চা অবুঝ মেয়েরা ঘিসলাইনের মিষ্টি মিষ্টি কথা সহজেই বিশ্বাস করে নিত। কী করেই বা তারা বুঝবে যে, একজন মেয়ে অন্য একজন মেয়ের এমন সর্বনাশ করতে পারে?

এপস্টাইনের সেক্স র‍্যাকেটিং চক্র অনেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিল। নিউ ইয়র্কের ম্যানসন, নিউ মেক্সিকোর জোরো র‍্যাঞ্চ তো ছিলই, ফ্লোরিডার পাম বিচে তার বিশাল বড় এস্টেট ছিল। এমনকি, ভার্জিন আইল্যান্ডসের অন্তর্গত গোটা লিটল জেমস আইল্যান্ডটাই এপস্টাইন কিনে রেখেছিলেন। ৭০ একরের এই দ্বীপটি স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ নামে কুখ্যাত ছিল। এই দ্বীপে একবার কোনও মেয়ে চলে এলে, তারা আর পালাবার পথ খুঁজে পেত না।

এভাবেই কেটে গেল অনেকটা বছর।

২০০৫ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচ পুলিশের কাছে একজন অভিভাবক অভিযোগ দায়ের করলেন। তিনি বললেন যে তার ১৪ বছরের মেয়েকে জেফ্রি এপস্টাইন আটকে রেখে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতন করে চলেছে। পাম বিচ পুলিশ প্রধান মাইকেল রাইটার বিপন্ন পিতার এই আর্তি হেসে উড়িয়ে দিলেন না। কানাঘুষোয় এমন ধরনের ইঙ্গিত তিনি অনেক দিন ধরেই পেয়ে আসছিলেন। তিনি তার সীমিত ক্ষমতাবলে গোপনে তদন্ত শুরু করলেন।

পুলিশ এপস্টাইনের বাড়ির আবর্জনায় ফেলে রাখা ছেঁড়া নথিপত্র থেকে প্রায় ৫০ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করল। এফবিআই-কে সঙ্গে নিয়ে তারা একটি ৫৩-পৃষ্ঠার ইনডাইটমেন্ট প্রস্তুত করল যা এপস্টাইনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু, এর পরেও এপস্টাইনের বিচার হল কি?

এপস্টাইনের কালো হাত যে আইনের হাতের চেয়েও অনেকগুণ লম্বা!

বিচারপ্রক্রিয়ায় সরকারি কৌঁসুলি ছিলেন আলেকজান্ডার একোস্টা। ২০০৭-২০০৮ সালে, একোস্টা এপস্টাইনের হাই-প্রোফাইল আইনজীবীদের সঙ্গে একটা গোপন বৈঠক করলেন।

ফলস্বরূপ, এপস্টাইন পেয়ে গেলেন আমেরিকান আইনি ইতিহাসের অন্যতম ‘সুইটহার্ট ডিল’। যৌন পাচারের অভিযোগ তুলে নেওয়া হল। তিনি কেবল ফ্লোরিডার দুটি রাজ্যে যৌন পাচারের প্ররোচনার জন্য দোষ স্বীকার করলেন, যার সাজা মাত্র ১৮ মাস (তিনি অবশ্য ১৩ মাসেই জেল থেকে বেরিয়ে আসেন)। জেলে থাকার সময়েও তাকে সপ্তাহে ৬ দিন, প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে জেলের বাইরে নিজের অফিসে গিয়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হল। শুধু তাই নয়, তার অজ্ঞাতনামা সকল সহযোগীকেও ভবিষ্যতের যে-কোনও বিচার থেকে সুরক্ষা দেওয়া হল।

ভাবুন একবার।

২০০৮ সালে এপস্টাইন একজন ঘোষিত সেক্স অফেন্ডার। তা সত্ত্বেও, এপস্টাইনের সামাজিক ও ব্যবসায়িক ভাবমূর্তিতে কোনওরকম ভাঁটা পড়ল না। তিনি আগের মতোই তার প্রভাবশালী বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন।

সেই বন্ধুরাও তাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। যেন কিছুই হয়নি।

সবাই মুখ বুজে থাকলেও একজন কিন্তু সে দলে নাম লেখাননি।

তাঁর নাম— জুলি কে ব্রাউন। একজন অকুতোভয় সাংবাদিক। তিনি এপস্টাইনকে নিয়ে স্টোরি করবেন বলে ঠিক করলেন।

জুলি কে ব্রাউন

 

মায়ামি হেরাল্ড পত্রিকার সম্পাদক জুলির মনোভাব জানতে পেরে পত্রপাঠ না করে দিলেন। অজুহাত দিলেন, তুমি এমন কী তথ্য তুলে ধরবে যা এর আগে কেউ করেনি? এপস্টাইনকে নিয়ে কোনও কিছুই তো জানার বাকি নেই।

জুলি নাছোড়বান্দা।

তিনি ভালো করেই জানতেন, ২০০৮ সালের মামলা এক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি জানতেন, মামলা চলাকালীন একোস্টা এবং তার দল ইচ্ছাকৃতভাবে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মামলার তথ্য গোপন রেখেছিলেন যাতে তারা আদালতে এসে এই চুক্তির বিরোধিতা না করতে পারে। তিনি জানতেন, মেয়েরা তাদের প্রাপ্য বিচার পায়নি।

তিনি তদন্ত শুরু করলেন।

তাঁকে ভয় দেখানো হল, হুমকি দেওয়া হল, তবুও তাঁকে টলানো গেল না।

তাঁর ডাকে একে একে মেয়েরা এগিয়ে আসতে লাগল। ভার্জিনিয়া রবার্টস জিওফ্রে ছিল তাঁদেরই একজন। সে ক্যামেরার সামনে নির্ভয়ে বলল, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে দেখানো হল একটি ছবি— প্রিন্স অ্যান্ড্রু ভার্জিনিয়ার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, পেছনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল।

এপস্টাইনের অপরাধের তাসের ঘরে প্রথম টোকা লাগল।

২০১৮ সালের নভেম্বরে, জুলি ব্রাউন ‘পারভারশন অফ জাস্টিস’ নামে তিন পর্বের অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করলেন।

খবর পড়ে চমকে উঠল আমেরিকার মানুষ। চোখেমুখে তাদের জিজ্ঞাসা। এও কি সম্ভব?

এপস্টাইনের বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষ তৈরি হল। একপ্রকার বাধ্য হয়ে, নিউ ইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল প্রসিকিউটররা নতুন করে তদন্ত শুরু করল।

২০১৯ সালের ৬ জুলাই। প্যারিস থেকে নিজের প্রাইভেট জেটে ফেরার পথে নিউ জার্সির টেটারবোরো বিমানবন্দরে এফবিআই এপস্টাইনকে গ্রেপ্তার করল। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন পাচারের ষড়যন্ত্র ও যৌন পাচারের অভিযোগ আনা হল। ম্যানহাটানের ম্যানশনে তল্লাশি চালিয়ে হাজার হাজার আপত্তিকর ছবি, সিডি ও বিশাল অঙ্কের নগদ উদ্ধার করল পুলিশ।

সবাই ভেবেছিল, এরপরে এপস্টাইনের অন্ধকার সাম্রাজ্য কেঁপে উঠবে। মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা যৌন পাচার চক্র ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। মেয়েরা এবার অন্তত তাদের বহুকাঙ্ক্ষিত বিচার পাবে।

কিন্তু হায়! ভাগ্যের পরিহাস বোধহয় একেই বলে!

২০১৯ সালের ১০ আগস্ট। সকালবেলা। লোয়ার মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারের স্পেশাল হাউজিং ইউনিটের সেলে এপস্টাইনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল।

এই দৃশ্য দেখে কেউ কেউ ভয় পেল। কেউ আবার স্বস্তির হাসি হাসল। তখনও নিজের জবানবন্দি দেওয়ার সুযোগ পাননি এপস্টাইন।

এপস্টাইনকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তার তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করলেন।

নিউইয়র্ক সিটির চিফ মেডিকেল এগজামিনার বারবারা স্যাম্পসন ময়নাতদন্তের পর বললেন, জেফ্রি এপস্টাইন বিছানার চাদর গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

সরকারি দাবি মানতে নারাজ এপস্টাইনের পরিবার। তাঁরা সবদিক খতিয়ে দেখার জন্য প্রখ্যাত ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট ডাক্তার মাইকেল বাডেনকে নিযুক্ত করলেন।

মাইকেল বাডেন সরকারি দাবির তীব্র বিরোধিতা করলেন। বললেন, এপস্টাইনের গলার হাইয়েড বোন বা কণ্ঠাস্থি এবং থাইরয়েড কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি তিনটি স্থানে ভেঙে গিয়েছিল। ফরেনসিক বিজ্ঞানে, কণ্ঠাস্থি হাড়ের ভাঙন সাধারণত শ্বাসরোধ করে হত্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়। নিজের ৫০ বছরের কর্মজীবনে, ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে এতগুলো হাড় ভাঙতে দেখেননি তিনি।

মাইকেল বাডেন

 

সবার মনে সন্দেহের বীজ একটু একটু করে বপন হচ্ছিল। এরপর জেল-কর্তৃপক্ষের অবহেলার বৃত্তান্ত জানার পর তা যেন মহীরুহ হয়ে উঠল।

সেই রাতে দায়িত্বে ছিলেন দুজন কারারক্ষী, তোভা নোয়েল এবং মাইকেল থমাস। নিয়ম অনুযায়ী তাদের প্রতি ৩০ মিনিটে এপস্টাইনের সেল চেক করার কথা ছিল। তারা লগবুকে লিখেও ছিল যে তাদের কাজে কোনও গাফিলতি হয়নি।

কিন্তু, ভিডিও ফুটেজ সম্পূর্ণ অন্য কথা বলল। দেখা গেল, তারা কিছু না করেই ইন্টারনেটে খেলার খবর দেখছিলেন এবং দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন একসময়।

আরও সন্দেহজনক ব্যাপার, এপস্টাইনের সেলের ঠিক সামনের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সেই রাতেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।

হলিউডি ক্রাইম থ্রিলারে অভ্যস্ত জনতা এর মধ্যে আঁশটে গন্ধ পেল। তারা ‘রে রে’ করে উঠল। দাবি তুলল, সত্যিটা সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে।

২০২২ সালে, ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হল।

২০২৩ সালে, এপস্টাইনকে ব্যবসায়িক লেনদেনের কাজে সাহায্য করার জন্য জেপি মর্গান ব্যাঙ্ককে ২৯০ মিলিয়ন ডলার এবং ডয়েচে ব্যাঙ্ককে ৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হল। ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনও বেসরকারি ব্যাঙ্ককে তার গ্রাহকের অপরাধের জন্য দায়ভার নিতে হল।

তবুও জনতা শান্ত হল না। সরকার কোথাও যেন কিছু লুকাচ্ছে।

জনতার দাবি মেনে আদালত ২০২৪ সালে এপস্টাইনের ফাইলসের আংশিক নথিপত্র প্রকাশ করল। সবাই দেখল, এখানে তো নতুন কোনও তথ্যই নেই। সরকার যা প্রকাশ করেছে তা কেবল জিওফ্রে বনাম ম্যাক্সওয়েল মানহানি মামলার আইনি কচকচানি ও জোবার্গ এবং ভার্জিনিয়া জিওফ্রের মতো ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি।

এপস্টাইনের ক্লায়েন্টের তালিকা কোথায়? কারা কারা পেডোফাইল আইল্যান্ডে মেয়েদের ভোগ করতে যেত? ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের নির্বাচনী বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি দিলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি সবার আগে এপস্টাইন ফাইলের বাকি অংশ সবার সামনে তুলে ধরবেন।

ট্রাম্প এবং এপস্টাইনের সম্পর্ক বহুদিনের। ট্রাম্প নিজেই, ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এপস্টাইনকে ‘চমৎকার ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও, পরে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয় এবং সেটাও সর্বজনবিদিত।

তিনি জানতেন, এপস্টাইন ফাইলসে তাঁর নাম থাকাটা স্বাভাবিক। তাই হয়তো, নির্বাচনে জেতার পরে তিনি ফাইল প্রকাশ নিয়ে টালবাহানা করতে লাগলেন। পাম বন্ডি এবং এফবিআই চিফ কাশ প্যাটেল আমলাতন্ত্রের দোহাই দিয়ে বারবার প্রকাশ পিছিয়ে দিতে লাগলেন।

অবশেষে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আদালতের নির্দেশে এপস্টাইন ফাইলের সাড়ে তিন লক্ষ পাতার নথি সর্বসমক্ষে উন্মোচিত করতেই হল।

বিস্ময়কর নতুন তথ্য মানুষের সামনে উঠে এল। তার সঙ্গে মানুষের মনে দেখা দিল অনেক প্রশ্ন।

এপস্টাইনের বাড়িতে যে হাজার হাজার ভিডিও, সিডি পাওয়া গিয়েছিল— সেগুলোর উৎস কী? এপস্টাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার ম্যানহাটনের টাউনহাউস, পাম বিচের এস্টেট এবং পেডোফাইল দ্বীপের প্রতিটি ঘরে গোপন ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন বসানো ছিল। কিন্তু কেন? কেউ কেন এমন করবে?

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি, ব্রিটিশ রাজপুত্র এবং অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের আপত্তিকর এবং দুর্বল মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করে এপস্টাইনের কী লাভ?

ব্ল্যাকমেইল?

ব্ল্যাকমেইল করে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন এপস্টাইন? পেতে চেয়েছিলেন এমন এক ক্ষমতা যা দুনিয়ার শক্তিধর দেশেরও গদি উল্টে দিতে পারে?

সে জন্যেই কি বিশাল সেক্স র‍্যাকেট?

৭০ একরের বিশাল পেডোফাইল আইল্যান্ডে তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুরা মিডিয়ার নজরদারি ছাড়া বিন্দাস ঘুরে বেড়াত। নিজেদের বিকৃত ইচ্ছে পূরণ করত। তারা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেত না, নিজেদের অজান্তেই তারা এপস্টাইনের হাতে তুলে দিচ্ছে এক মহামূল্য সম্পদ।

অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কমপ্রোম্যাট’!

কিন্তু এর পেছনে যে বিশাল আয়োজন, যে বিশাল নেটওয়ার্কিং-এর প্রয়োজন— এই অসাধ্যসাধন জেফ্রি এপস্টাইন করলেন কী করে?

কে ছিলেন এই জেফ্রি এপস্টাইন? একটি সাধারণ ঘরের ছেলে কী করে এত সহজে সমাজের এত উঁচু স্তরে চলে যেতে পারল? এত অর্থ, এত বৈভব, এত প্রতিপত্তি শুধুই নিজের প্রতিভার জোরে?

লেসলি ওয়েক্সনারকে মনে আছে? ভিক্টোরিয়া সিক্রেটসের মালিক ওয়েক্সনার ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ ইহুদি ফিলানথ্রপিস্ট। তাই কি এপস্টাইনের প্রতি তার মনটা নরম হয়ে উঠেছিল? সেইজন্যই কি নিজের ৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়েছিলেন এক সামান্য ছেলেকে?

শুধু সে ইহুদি বলেই?

২০০৭-২০০৮ সালে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে যখন যৌন অপরাধের মামলা করা হয়েছিল, তখন ওয়েক্সনার এপস্টাইনের অন্যায় কারচুপির বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। শুধু, খাতায়-কলমে এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।

শোনা যায়, ওয়েক্সনার এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ইহুদি-আমেরিকান বিলিয়নেয়াররা মিলে ‘মেগা গ্রুপ’ নামে একটি ক্লাব গঠন করেছিলেন। এই ক্লাব ইজরায়েলের স্বার্থ বুঝে চলত। এমনকি মোসাদের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

মোসাদ!

যাদের নাম শুনলে বিশ্বের তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রী, এমনকি সেনাপ্রধানরাও কেঁপে ওঠেন!

মোসাদের সঙ্গে এপস্টাইনের যোগসূত্র এখানেই শেষ নয়।

ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। এপস্টাইনের প্রাক্তন প্রেমিকা এবং প্রধান সহযোগী। বিখ্যাত রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের কন্যা।

রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ছিলেন চেক-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মিডিয়া টাইকুন এবং মিরর গ্রুপের মালিক। এ ছাড়াও তার আর একটা পরিচয় নিয়ে গোয়েন্দামহলে বিস্তর কানাঘুষো ছিল।

তিনি ছিলেন ইজরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারস্পাই!

শোনা যায়, রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের গোয়েন্দাজীবনের সবচেয়ে বড় অপারেশন ছিল প্রমিস সফটওয়্যার কেলেঙ্কারি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৯৮০ সালে ম্যাক্সওয়েল মোসাদের হয়ে এই সফটওয়্যারটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিক্রি করেছিলেন। এই সফটওয়্যারটিতে মোসাদ এমন একটা ট্র্যাপডোর বসিয়েছিল, যার মাধ্যমে তারা ওই দেশগুলোর গোপন তথ্য জানতে পারত।

১৯৯১ সালে ক্যানারি আইল্যান্ডসের ওপর ভাসছিল তার বিলাসবহুল ইয়ট ‘লেডি ঘিসলাইন’। সেখান থেকেই এক রাতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন তিনি; পরে উদ্ধার হল তাঁর প্রাণহীন দেহ। কিন্তু গল্পের আসল চমক তখনও বাকি ছিল। এক বিদেশি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ইজরায়েল তাঁকে যে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করল, তা দেশটির ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।

বাবার মৃত্যুর পর ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল নিউ ইয়র্কে চলে এলেন। ছোটবেলা থেকেই কূটনীতির আদবকায়দায় শিক্ষিত ঘিসলাইন ছিলেন তার বাবার যোগ্য উত্তরাধিকারী। রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মেয়ে হিসেবে রাজপরিবার এবং উচ্চবিত্ত সমাজে তাঁর অবারিত প্রবেশাধিকার ছিল।

মূলত ওয়েক্সনারের সম্পদ ও ঘিসলাইনের প্রভাব-প্রতিপত্তির ওপর ভিত্তি করেই এপস্টাইন তাঁর অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

ইজরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা আরি বেন-মেনাশে এমনই অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, রবার্ট ম্যাক্সওয়েল এবং জেফ্রি এপস্টাইন দুজনেই মোসাদের এজেন্ট ছিলেন। যদিও, আরি বেন-মেনাশের মতো একজন বিতর্কিত লোকের অভিযোগ সবাই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু—

ইজরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টাইনের গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক যে কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

বারাক এপস্টাইনের ম্যানহাটনের বাড়িতে অনেকবার রাত কাটিয়েছেন। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এপস্টাইনের ফাউন্ডেশন থেকে বারাক প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ডলারের পেমেন্ট পেয়েছিলেন। কেন??

বারাক জানিয়েছেন, সেটি গবেষণার জন্য ছিল।

শুধু তাই নয়। ২০১৫ সালে, এপস্টাইন যখন একজন দণ্ডিত যৌন অপরাধী, তখন বারাকের প্রতিষ্ঠিত একটা লিমিটেড পার্টনারশিপে এপস্টাইন ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন।

এই ঘনিষ্ঠতা কি কেবল বন্ধুত্বের ছিল? নাকি আরও বেশি কিছু?

২০২৬ সালে প্রকাশিত নথিতে এমন অনেক প্রশ্ন উঠে এসেছে। একজন ইনফরমার দাবি করেছেন যে, বারাক ছিলেন এপস্টাইনের হ্যান্ডলার। সত্যি-মিথ্যে কেউ যাচাই করে দেখেনি।

প্রশ্ন জাগে, এপস্টাইনের সম্পর্ক শুধু কি ইজরায়েলের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল?

বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্রেগ আঙ্গার বলেছেন, এপস্টাইন রাশিয়ার চর হলেও হতে পারেন।

এপস্টাইনের পাচার করা মেয়েদের একটি বড় অংশ ছিল পূর্ব-ইউরোপীয় বা রাশিয়ান বংশোদ্ভূত। আঙ্গারের মতে, এই মেয়ে পাচারের পেছনে রাশিয়ান মাফিয়া বা গোয়েন্দা সংস্থার হাত থাকলেও থাকতে পারে।

তাছাড়া ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রু বা বিল ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিদের স্ক্যান্ডালে জড়ানোর ভিডিও হাতে পেলে, রাশিয়ার চেয়ে লাভবান আর কে হবে?

কিন্তু, ইজরায়েল আর রাশিয়া মিলে এত বড় ফাঁদ পেতে বসেছে আর আমেরিকার সিআইএ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারবে না— এটা বিশ্বাস করা বেশ কষ্টের।

এও বিশ্বাস করা কঠিন যে, এপস্টাইনের মতো ধুরন্ধর, স্বার্থপর লোক শুধুমাত্র বিদেশি চক্রের হয়েই কাজ করবে। আমেরিকার মাটিতে নিজের সুরক্ষার দিকটা সে ভেবে দেখবে না?

কিন্তু এপস্টাইনের সঙ্গে সিআইএ-এর যোগসূত্রটা কোথায়?

মনে আছে, মাত্র ২১ বছর বয়সের আনকোরা এপস্টাইনকে কে ডাল্টন স্কুলে চাকরি দিয়েছিলেন?

ডোনাল্ড বার। যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিস’-এ কাজ করেছিলেন। অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিস পরবর্তীতে সিআইএ-তে পরিণত হয়।

২০১৪ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ডেপুটি সেক্রেটারি অফ স্টেট ছিলেন উইলিয়াম বার্নস। ২০২৬ সালে প্রকাশিত নথিপত্র এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বার্নস তখন এপস্টাইনের সঙ্গে তিনটি বৈঠক করেছিলেন। বার্নসের ব্যাখ্যা, তখন তিনি এপস্টাইনকে শুধুমাত্র আর্থিক বিশেষজ্ঞ হিসেবেই চিনতেন।

সেই উইলিয়াম বার্নস বর্তমানে সিআইএ-র পরিচালক।

২০২৬ সালের নথি থেকে উঠে এসেছে স্টিভেন হফেনবার্গের নাম।

নব্বইয়ের দশকে, হফেনবার্গ তার পঞ্জি স্কিমের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছিলেন। এই অপরাধের জন্য হফেনবার্গের দীর্ঘ ১৮ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।

কিন্তু হফেনবার্গের দাবি তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আসলে এপস্টাইন ছিলেন এই স্কিমের মূল পাণ্ডা। এপস্টাইন তাঁকে শিখিয়েছিলেন, কীভাবে বিনিয়োগকারীদের টাকা সরিয়ে নিয়ে ব্যালেন্স শিট ম্যানিপুলেট করতে হয়। আশ্চর্যের কথা, এপস্টাইন এই মামলায় কখনও অভিযুক্ত হননি। কোনও এক অদৃশ্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায় তিনি বরাবর শাস্তির হাত থেকে পার পেয়ে গেছেন।

যেমন করে তিনি ২০০৮ সালের ফ্লোরিডা পাম বিচের মামলায় ‘সুইটহার্ট ডিল’ পেয়ে গিয়েছিলেন।

সেই মামলার প্রধান মধ্যস্থতাকারী অ্যালেক্সান্ডার একোস্টা পরবর্তীতে ট্রাম্পের শ্রমমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। ট্রাম্পের ট্রানজিশন টিমের কর্মকর্তারা একোস্টাকে ‘সুইটহার্ট ডিল’ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে তিনি জানালেন, ওপরমহল থেকে তাঁর ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই বিষয়ে সবিস্তারে জানার প্রয়োজন বোধ করেননি, কারণ বিষয়টি ছিল তাঁর বেতন-গ্রেডের ঊর্ধ্বে।

তাহলে এপস্টাইনকে যেভাবে মিডিয়ার সামনে প্রচার করা হচ্ছে, সেটাই কি তার একমাত্র পরিচয়? নাকি তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্য রহস্য? এক অন্য ইতিহাস?

ইতিহাস সাক্ষী, মৃত মানুষ কথা বলে না। কিন্তু এপস্টাইন হয়তো মরে গিয়েই এক বিশাল রহস্যের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন। তার মৃত্যুই হয়তো তার সবচেয়ে বড় জবানবন্দি।

এপস্টাইন কার হয়ে কাজ করতেন?— এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এপস্টাইনকে যারা ব্যবহার করেছিল, তারা আজও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্দার আড়ালে থেকে নতুন কোনও এপস্টাইন তৈরি করে চলেছে।

আর আমরা কেবল পর্দার সামনের পুতুলনাচই দেখে চলেছি।