নন্দন রায়
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক কি কোনওদিন বিজেপির রাজ্য সভাপতির মন বুঝতে গোপনে হোটেলের নিভৃত কক্ষে গিয়েছেন? হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা যতটা খারাপ ইসলামি সাম্প্রদায়িকতা কি তার চাইতে কম খারাপ? সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা বলে ইসলামি সাম্প্রদায়িকতা কোনওরকম ছাড় পেতে পারে না। এটাই হচ্ছে কমিউনিস্টদের বিচারবোধ। ‘শূন্য বিধায়কের’ খা খা করা বাংলার ময়দানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হয়েছে কি?
সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম তৃণমূল থেকে নিলম্বিত বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যে একটি হোটেলে যে গোপনে ওয়ান-টু-ওয়ান মিটিং করেছেন এই ঘটনা এখন বাসি হয়ে গিয়েছে। কাউকে না জানিয়ে এভাবে একটি বামপন্থী দলের নেতা একজন দাঙ্গাবাজ সাম্প্রদায়িক মুসলমান নেতার সঙ্গে গোপনে মিটিং করছেন, তাও আবার নির্বাচনের আগে, যে নির্বাচনে তৃণমূল খুব একটা স্বস্তিজনক অবস্থায় নেই বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলায়, এই বাতাবরণে সেলিমসাহেবের নিজের দলেই তিনি যথেষ্ট সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বৃহৎ বামপন্থী মহলেও এই মিটিং নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এখন অবশ্য পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এই সময় আমরা কেন বিষয়টি নিয়ে চুলকে ঘা করছি, এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই ‘আমরা’ কারা, এই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। ফলে কিছুটা কৈফিয়ৎ দেওয়া প্রয়োজন। আমরা হচ্ছি সেই বামপন্থীরা, যারা মাওবাদী থেকে অন্যান্য নকশালপন্থী গোষ্ঠীগুলি-সহ এসইউসিআই পর্যন্ত সকল বামপন্থী দলের প্রকৃত ঐক্য চাই। আমরা মনে করি এই ঐক্য তখনই সম্ভব যখন প্রতিট বামপন্থী দল বা গোষ্ঠীগুলি তাদের কৃতকর্মের আন্তরিক আত্মসমালোচনা করবে এবং এক ন্যূনতম উদ্ভাবনী কর্মসূচিতে ঐকমত্য হবে। বৃহত্তম বামপন্থী দল হিসেবে এবং সব কানার মধ্যে সবচেয়ে কম ঝাপসা দেখা দল হিসেবে সিপিএমকেই এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিতে হবে, আত্মসমালোচনার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে হবে, এবং সবচেয়ে বেশি ত্যাগস্বীকারও করতে হবে। অবশ্য আমরা জানি যে এইরকম কোনও কিছু ঘটার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই।
ওপরের অনুচ্ছেদের শেষ পংক্তিতে যে আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হল, তার জ্বলন্ত প্রমাণ সেলিমসাহেব নিজেই দিয়েছেন। এই ঘটনার দিন দুয়েক পরে গণশক্তি-র প্রথম পৃষ্ঠায় দেখা গেল আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন যে হুমায়ুনের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় তিনি নতুন গঠিত জেইউপি পার্টির কর্ণধারের ‘মন বুঝতে’ গিয়েছিলেন। এতে অন্যায়ের কী আছে? অস্যার্থ, ভোটের আগে এক রাজনৈতিক দলের নেতা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে কথা বলতে যেতেই পারেন। এ নিয়ে এত হইচই করার কোনও কারণ তিনি দেখছেন না। তিনি তো হুমায়ুনের পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা করতে যাননি! তবে দুষ্টু লোকেরা বলছে, ‘মন বোঝার’ জন্য কমরেড সেলিম যদি এতই উতলা হয়ে পড়েন, তাহলে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির সঙ্গে ‘একান্ত’ আলোচনা করার জন্য তাদের অফিসে কেন গেলেন না? ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যায়।
আমরা অবশ্য স্পষ্ট বলছি, একটি কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক হিসেবে কোথায় কোথায় তিনি গোপনে ‘মন বোঝার’ বাহানায় যেতে পারেন সে-সম্পর্কে মহম্মদ সেলিমের সম্যক ধারণা থাকা উচিত ছিল। ভোটে কয়েকটি আসন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে এক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পান্ডার সঙ্গে একান্তে গোপনে তিনি দেখা করতে পারেন না— তা সে মন বোঝার জন্য হোক বা ভোটের জন্য হোক। পার্টি যখন তার কংগ্রেসে গৃহীত দলিলে বলছে তাদের উদ্দেশ্য এক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলা, তখন সেলিমসাহেবের ফাঁস হয়ে যাওয়া অভিসার প্রমাণ করে যে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ নন।
এই কথা শুনে সিপিএম-এর যে-সব বন্ধুরা হৈ হৈ করে আমাদের মারতে উঠবেন, তাঁদের আমরা বলব, রাজ্য সম্পাদক কি কোনওদিন বিজেপির রাজ্য সভাপতির মন বুঝতে গোপনে হোটেলের নিভৃত কক্ষে গিয়েছেন? হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা যতটা খারাপ ইসলামি সাম্প্রদায়িকতা কি তার চাইতে কম খারাপ? সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা বলে ইসলামি সাম্প্রদায়িকতা কোনওরকম ছাড় পেতে পারে না। এটাই হচ্ছে কমিউনিস্টদের বিচারবোধ। ‘শূন্য বিধায়কের’ খা খা করা বাংলার ময়দানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হয়েছে কি? নির্বাচনে জয়লাভ করাটা এতটাই প্রয়োজনীয় যে, নীতি বিসর্জন দিতেও কোনও কুণ্ঠাবোধ দেশের বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে পীড়িত করে না। যে-কোনও বুর্জোয়া দলের নেতার থেকে একজন কমিউনিস্ট ক্যাডারের বিবেচনাবোধ অনেক বেশি। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যে কথাই হোক না কেন, এই সাক্ষাৎকার দিয়ে সিপিএম পার্টি ভিতরে ও বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনও সমর্থন আদায় করতে পারেনি।
কমিউনিস্ট পার্টির নীতি কী? বর্তমান শোষণ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ভারতীয় সমাজে শ্রেয়তর এক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে দিয়ে সে প্রয়াস ফলপ্রসূ হওয়া সম্ভব কিনা জানি না, কিন্তু আমরা এটা জানি যে তা যদি সম্ভব হয়ও বা, তাহলেও কমিউনিস্ট পার্টিকে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে বুর্জোয়া দলগুলির মতো নীতিহীন উপায়ে যেনতেন প্রকারে নির্বাচনে জয়লাভ করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নীতিগতভাবে অন্য দলের থেকে মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চতার অবস্থান থেকে। একেই বলে যে-কোনও কাজে কমিউনিস্ট ইম্প্রিন্ট (ছাপ) রেখে যাওয়া, যা থেকে অন্যান্য দলের থেকে আলাদা করে চেনা যায়। সেলিমসাহেব যা করেছেন তার পরিণতি হচ্ছে যে, যে-কোনও ran of the mill পার্টির থেকে কমিউনিস্ট পার্টি নৈতিক শ্রেষ্ঠতার আলাদা মর্যাদা পেতে পারে না।
কমিউনিস্ট পার্টি যে কাজই করুক না কেন— যেমন কারখানায় মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন অথবা বুর্জোয়া ব্যবস্থায় কোনও রাজ্যে সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনী লড়াই— সব ক্ষেত্রেই তারা তাদের দূরাগত লক্ষ্য অর্থাৎ বিদ্যমান সমাজের সমাজতন্ত্রে উত্তরণের আসল কাজটার সেবা করে। গণশক্তি পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতার উপরে বাঁদিকের কোণে কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের এই কথাগুলি প্রত্যহ ছাপা হচ্ছে। সেখানে হুমায়ুনের সঙ্গে নিশীথ অভিসার ওই আসল কাজটার সেবার বদলে ক্ষতিই করে। এই সমস্ত কমরেডরা নির্বাচনকেই end in itself ধরে নিয়েছেন। শুধু তাঁরাই কেন? গোটা পার্টিটাই কি নির্বাচনী লড়াইকে এক নিছক রণকৌশলের বদলে কেন্দ্রীয় কর্তব্য হিসেবে স্থির করেনি? তাঁরা সমাজ পরিবর্তনের “অপ্রিয়” কাজটিকে পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে আগামীকালের জন্য সবচেয়ে উঁচু কুলুঙ্গিতে তুলে রেখেছেন। একে বলে সংসদ-সর্বস্বতা। তার একটা তীব্র জঘন্য রূপ পশ্চিমবাংলায় দেখতে পাচ্ছি। এমনকি সাড়া জাগিয়ে যে তরুণ ব্রিগেড পাদপ্রদীপের আলোয় ইদানিং উঠে এসেছেন, সংসদসর্বস্বতার বিরুদ্ধে তাঁরাও যে খুব ভাবনাচিন্তা করে অন্য পথে এগোনোর চেষ্টা করছেন সেরকম মনে হয় না।
মহম্মদ সেলিম সম্পর্কে আর একটি পর্যবেক্ষণ আলোচনা করে আমাদের বক্তব্য শেষ করব। সেলিমসাহেবের গণতন্ত্রের প্রতি নিষ্ঠা কেমন? লেনিনের সময় থেকে চলে আসা পার্টি-কাঠামোয় গণতন্ত্রের একটা ভূমিকা আছে। পার্টির নেতৃত্ব যেন এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে একনায়কতন্ত্রীর মতো ব্যবহার করতে না পারে সেইজন্য যৌথ দায়িত্বের এবং যৌথ নেতৃত্বের ওপরে জোর দেওয়া হয়। সেখানে সেলিমসাহেব হুমায়ুনের মন বুঝতে চাওয়া এবং তাঁর সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই সমাধা করে ফেললেন? শোনা যাচ্ছে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অনেক সদস্য নাকি বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গণতন্ত্র বিষয়ে কমিউনিস্টদের ধারণা স্বচ্ছ নয়। আমরা যদি সোভিয়েত বিপ্লবের আগে এবং পরে বলশেভিকদের কার্যকলাপকে বিবেচনা করি, তবে দেখব নভেম্বর বিপ্লবের পরে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন করতে বলশেভিকদের কোনও আপত্তি ছিল না। এর কারণ বলশেভিক পার্টির নেতৃত্ব নিজেরাই গণতন্ত্রের অনুশীলন করতেন এবং দলের কর্মীদের কাছে অনুসরণযোগ্য উদাহরণ স্থাপিত করেছিলেন। সমাজতন্ত্র নির্মাণ পর্বে কোটি কোটি মানুষের সমর্থন আদায় করতে হলে সকলের মত ব্যক্ত করার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা না থাকলে সেই মহাযজ্ঞ সাফল্যের সঙ্গে সাধিত হতে পারত না। পরবর্তী পর্যায়ে গণতন্ত্রের বদলে আমলাতান্ত্রিক হুকুমদারি স্থান করে নিয়েছিল, যার ফলে জনগণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। পার্টির যৌথ নেতৃত্বকে সেলিমসাহেব যদি কনফিডেন্সে নিয়ে তাঁর মনোবাঞ্ছা ব্যক্ত করতেন, তাহলে রাতের অন্ধকারে হুমায়ুন অবধি তাঁকে যেতে হত না। আসলে, গোটা পার্টির মধ্যে গণতন্ত্রের অনুশীলন সীমিত বলেই তিনি গোপনে ষড়যন্ত্রমূলক পন্থা অবলম্বন করেছেন। তৃণমূলের গুন্ডারা যখন লাঠিপেটা করে, তখন আমরা ‘ফাউল’ বলে চেঁচিয়ে উঠি, আর জেলা অথবা রাজ্য সম্মেলনে অফিসিয়াল প্যানেলের পালটা প্যানেল পড়লে আমরা যেনতেন প্রকারে সেটাকে প্রত্যাহার করিয়ে নিজেদের মৌরসিপাট্টা বজায় রাখি। কারণ, পার্টির অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অবাধ অনুশীলন যে কোনও কায়েমি স্বার্থের বিরোধিতা করবেই। অথচ লেনিন বলেছিলেন, পার্টির নিজস্ব কোনও স্বার্থ থাকবে না, শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থই পার্টির স্বার্থ।
আসুন, সেলিমসাহেবের সঙ্গে আমরাও আয়নায় একবার নিজের মুখ দেখি।
*মতামত ব্যক্তিগত

