Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ফ্যাসিবাদের স্বাভাবিকীকরণ: বাংলার এসআইআর ও আমরা

অভিষেক ঝা

 


একটি সিস্টেম্যাটিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চূড়ান্ত ধাপের আগের ধাপটিই হল ২০২৫-এর ডিসেম্বর মাসের পরে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা যার নাম ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’। নব্বই শতাংশের উপরে মানুষ যখন রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী ম্যাপিং-এর নিরিখেও ভোটাধিকার হারায় না, তখন সেই সমস্ত অবান্তর যৌক্তিক অসঙ্গতি আমদানি করতে হয় যা যাবতীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে জন্মায়। সেই সমস্ত অ্যাবসার্ড আপত্তিকেও যখন নিয়ম মেনে উত্তর দেওয়া হয় এবং সেই উত্তর নির্বাচন কমিশন দ্বারা নিযুক্ত আধিকারিকরা মেনে নেন, একদম উপরের তলা থেকে কোনও কারণ না দেখিয়ে ভোটাধিকার নিয়ে সংশয় রেখে দেওয়া হয়। এবং পুরো পশ্চিমবঙ্গ হিসাব কষতে থাকে এত এত মুসলমান ভোট দিতে না পারলে কোন কোন রাজনৈতিক দল লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভোটাধিকার নিয়ে সংশয়ের মতোই বিপজ্জনক এই হিসাবনিকাশ

 

ভারতীয় উপমহাদেশে শেষ আশি বছর ধরে নিজের অনেক ভুলত্রুটি, অনেক অস্বস্তি, অনেক অবিচার, অনেক দুর্বলতা নিয়েও যে রাষ্ট্রটি মোটের উপর নিজের নাগরিককে প্রকৃত গণতন্ত্র না হলেও, গণতন্ত্রের আশা দিয়ে মোটামুটিভাবে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, তা ভারত। এই টিকে থাকার অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি কারণ ভারতরাষ্ট্রের নাগরিকের নিজের নাগরিক অস্তিত্ব ও ভোটার অস্তিত্বকে অবিচ্ছেদ্যভাবে দেখার অভ্যাস। এই মননে— ভোট হচ্ছে মানে রাষ্ট্র আছে, ভোট দিতে পারছি মানে আমি রাষ্ট্রের অংশ, রাষ্ট্রের আমাকে ভুলে থাকা সম্ভব নয় কারণ আমার ভোটাধিকার রয়েছে। ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটাধিকার যেন একটা অদৃশ্য চুক্তি— রাজনৈতিক দলগুলির ভোটারের স্বার্থ খানিক হলেও পূরণ করার চুক্তি, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে থাকার মানসিক নিরাপত্তার চুক্তি। ভারতের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ বিভিন্ন কারণে ভারতে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চাইলে, নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে দেখিয়েই রফা করতে চেয়েছে বরাবর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। এই রফাকে আপাতভাবে বেআইনি ঠেকলেও, মানবিকতার প্রেক্ষিত থেকে এটি ভারতরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবণতার সঙ্গে মানানসই। গত শতাব্দীর শেষ দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশ থেকে আস্তে আস্তে সেটলমেন্ট সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সেটল করতে থাকা বাঙালি হিন্দুই হোক, ছিটমহল চুক্তির পর ভারতকেই নিজের দেশ হিসাবে বেছে নেওয়া নস্যশেখ মুসলমানই হোক, নেপাল থেকে প্ল্যান করে ভারতে চলে আসা নেপালি হিন্দু বা বৌদ্ধই হোক, ভুটান থেকে পালিয়ে আসা ভূপালি উদ্বাস্তুই হোক, জাফনা থেকে তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, কর্নাটক, কেরালায় এসে বাঁচার জন্য মিশে যেতে চাওয়া তামিল হিন্দুই হোক— এরা প্রত্যেকে ভারতরাষ্ট্রের অংশ হয়ে উঠতে চেয়েছে ভারতীয় ভোটব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। সুতরাং ভারতীয় ভোটব্যবস্থা ভারতরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবণতার পক্ষে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় মেশিনারি হিসাবে কাজ করে এসেছে এতদিন ধরে। ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট দেওয়ার অধিকার কোনও কাগজপত্রের খেলা নয় শুধু। এটা ভারতীয়দের মনের গভীরে থাকা নিরাপত্তার বোধ, একটা আশ্বাস যে, সবচেয়ে সাধারণ মানুষ, যতই গরিব হোন বা কাগজপত্র প্রায় না-ই থাকুক, তিনিও এই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের আসাম ছাড়া ভারতীয় নির্বাচন বাদ দেওয়া বা সন্দেহের চোখে ভোটারকে দেখার টোটালিটেরিয়ান প্রবণতা থেকে মুক্ত ছিল বিজেপি-রাষ্ট্র হওয়ার আগে অব্ধি। ভারতীয় নির্বাচনের মূল সুরটি সবাইকে কাছে টেনে নেওয়ার। এই পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে, কিন্তু, অপরীকরণের, বাদ দিয়ে দেওয়ার আতঙ্ক থাকবে না। এই ব্যবস্থা এমন একটি পরিসর যা ইতিহাসের, দেশভাগের, উদ্বাস্তুত্বের, দারিদ্র্যের ক্ষতগুলোকে ভুলিয়ে রাখে, সারিয়ে তুলতে না পারলেও। ভোটটা সবচেয়ে গরিব মজুর, উদ্বাস্তু বিধবা, জমিহীন চাষিকে অন্তত একটা ছদ্ম-আশ্বাস দেয়: “আমি গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থাটা আমারই।” ভারতীয় রাষ্ট্রকে নাগরিকের প্রতি দায়দায়িত্বমূলক চাপ থেকে রেহাই দিয়ে টিকে থাকতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছে একটি সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটের পরিসর।

এই রাষ্ট্রীয় মানসিক নিরাপত্তাটাকেই পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন— এসআইআর— ভোটার লিস্টকে প্রায় ধ্বংস করে ভেঙে দিয়েছে। যেটাকে প্রচার করা হয়েছিল সাধারণ রুটিনকার ব্যাপার, সেটা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ করে যে বিশাল সংখ্যক মানুষের নাম দশকের পর দশক ভোটার লিস্টে ছিল, যাঁদের সন্তানদের নাম তাঁদের নামের ভিত্তিতেই ভোটার লিস্টে ঢুকেছিল, তাঁরা বাদ পড়েছেন, নইলে সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত হচ্ছেন। শুনানির ডাক পড়েছে এবং এখনও বিচারাধীন হয়ে আছেন ভোটাধিকারের প্রশ্নে লক্ষ লক্ষ মানুষ। শুনানিতে এমন কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল যা সাধারণ বাঙালি— বিশেষ করে নিচুতলার মানুষ, মাধ্যমিক শিক্ষার অধিকার-বঞ্চিত মানুষ, বাংলায় বসবাসকারী দরিদ্র আদিবাসী, ক্ষমতাহীন দরিদ্র উদ্বাস্তু— কখনও রাখতে পারেন না। সেই কাগজ না থাকলে ভোটাধিকার চলে যাওয়া বা চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া ভারতীয় সংবিধানের মূল নীতিতে আঘাত। শ্রেণি ও গোষ্ঠীগতভাবে দেখলে এসআইআর-এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যাঁরা তাঁরা হলেন ‘পরিবার’ ও স্থায়ী আশ্রয়হীন মানুষ, নারী, আদিবাসী (মূলত বাংলার সাঁওতাল, তরাই ও ডুয়ার্সের চা-বাগানে ঔপনিবেশিক সময়কালে শ্রমিক হিসাবে আসতে বাধ্য হওয়া মদেশীয় গোষ্ঠী, দার্জিলিং ও কালিম্পং-এ প্রায় একই সময় আসতে বাধ্য হওয়া ভারতীয় নেপালি জাতির বিবিধ জনগোষ্ঠী, লেপচা, লিম্বু, রাজবংশী, নস্যশেখ, কুড়মি এবং আরও অনেক ছোট জনগোষ্ঠী), নমঃশূদ্র (দলিত) এবং মুসলমান। বিজেপির ভারতের যে-কোনও নীতিতে এই শ্রেণিগুলিরই কোনও-না-কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন, এই লিস্টের ওপর ভিত্তি করে, আর যাই হোক নিজেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে দাবি করতে পারে না। এটি বিজেপি যে ব্যবস্থা চায় সেই ব্যবস্থাকে মান্যতা দেওয়ার নির্বাচন মাত্র।

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে প্রশান্ত কিশোরের বাংলায় বিজেপি খুবই ভালো ফল করবে এই তত্ত্ব মুখ থুবড়ে পড়েছিল। প্রশান্ত কিশোর ভোটের ফলাফল-পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে জানান যে বাঙালি নারী যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে বাবা, বর, ছেলে, এদেরকে পাত্তা দেয় না তা তিনি তাঁর উত্তর ভারতীয় মননের জন্য প্রাথমিকভাবে ধরতে পারেননি। এই কথাটি যে-কোনও উত্তর ভারতীয় মননের ভিতরের কথা। তাই বিজেপির কাছে বাঙালি নারী এমন একটি পরিসর যাকে সে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে যে-কোনওভাবে গুরুত্ব কমিয়ে আনার নীতিতেই যাবে। এসআইআর-এর একদম প্রথম ধাপের ম্যাপিং-এর শর্তাবলি যা রাখা হয় তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাঙালি নারী। এটা বাঙালি মহিলাদেরকে যে সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে, সেইটা বিজেপি খুব ভালো করেই জানত। যেমন তারা জানত যে এই ‘ম্যাপিং’-এর ফলে মহিলাদের সঙ্গে বিজেপির সাম্প্রতিক সময়ের ভোটব্যাঙ্ক আদিবাসী এবং নমঃশূদ্ররাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঙালি নারীর সঙ্গে আরও দুই যে শ্রেণি ম্যাপিং নামক এই ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনার শিকার তারা হল এরা। বিজেপির রাজনীতি যেহেতু সর্বদাই ‘নিজ’ অপেক্ষা ‘অপর’ ধারণার উপর বেশি নির্ভরশীল, তাই বাঙালি নারীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা বিজেপির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নমঃশূদ্ররা— পূর্ব পাকিস্তান, আসাম, বাংলাদেশ থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়ে দুই ২৪ পরগনা, নদীয়া, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারে সেটল করেছেন এবং করছেন— তাঁদের হাড়ে-মজ্জায় উদ্বাস্তুত্বের ক্ষত। এঁদের প্রায় কারও কাছেই কোনও সিস্টেম্যাটিক রিসেটলমেন্টের কাগজ ছিল না। ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড বা আধারই ছিল একমাত্র পরিচয়পত্র। তার চেয়েও বেশি নিরাপত্তা নমঃশূদ্রকে দিয়েছিল ভোটব্যাঙ্ক হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি। এই এসআইআর নমঃশূদ্রের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে এক ধাক্কায় অনেকটা পিছিয়ে দেবে। নমঃশূদ্র পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এবং সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে বিজেপির ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত অস্বস্তি— একে না গেলা যায়, না উগলানো যায়। নমঃশূদ্রদের রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে গোটা দেশে ১৯৭১ বা ১৯৫২-র ভিত্তিতেই এনআরসি করা সম্ভব। বাংলায় নমঃশূদ্রদের রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে সিএএ নিয়ে আসামে বিজেপিকে অস্বস্তি পোয়াতে হয় না। তাই নমঃশূদ্রদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস বিজেপির জন্য স্বস্তিদায়ক। একইভাবে তা স্বস্তিদায়ক পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্যও, কারণ যোগেন মন্ডল-পরবর্তী রাজনীতিতে নমঃশূদ্র ও বাঙালি মুসলমান সামাজিক সম্পর্ক  এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে এই দুই গোষ্ঠীকে একইভাবে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করতে পারা প্রায় অসম্ভব। তাই নমঃশূদ্রের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আটকে গেলে তা পশ্চিমবঙ্গের সাবর্ণ আধিপত্য-কেন্দ্রিক দলগুলির পক্ষে খানিক স্বস্তির। তাদের ক্ষেত্রে তখন ভোট রাজনীতিতে একমাত্র বাঙালি মুসলমানকে একটা ছদ্ম ক্ষমতায়নের ইলিউশন দিয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে। তাই এসআইআর-এর ফলে নমঃশূদ্রের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ধাক্কা খাওয়া বিজেপির মতোই তৃণমূলের পক্ষেও আর্থ-সামাজিক রাজনীতির প্রেক্ষিত থেকে স্বস্তিদায়ক।

এই সমস্ত গোষ্ঠী ও শ্রেণি যাদের মধ্যে বাংলার নারীকে বাদ দিলে বিজেপির ভোটারই বেশি, তাদেরকে বিজেপি বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে একটি অতীব সুনির্দিষ্ট কারণে। বাংলায় মুসলমানকে রাজনৈতিকভাবে প্রায় পুরোপুরি গুরুত্বহীন করে দিতে চাওয়ার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার ইচ্ছায়। বিজেপির বাঙালি বিদ্বেষ যে মূলত বাঙালি মুসলমান-বিদ্বেষ তা ২০১৪ থেকে বাঙালির উপর পুরো ভারত জুড়ে হয়ে চলা রাষ্ট্রীয় এবং মব সংঘটিত নির্যাতনগুলির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বারো বছর ধরেও বিজেপি যা পারেনি তা হল বাঙালি মুসলমানকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানের এই ভারতে দাঁড়িয়েও প্রবল আত্মবিশ্বাসী সত্তার মূলে রয়েছে একই জায়গায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিকড় থাকা, কৃষিজমির একটি বড় অংশের মালিকানা, নিজের কায়িক ও বৌদ্ধিক দক্ষতাকে ব্যবহার করে ভারতীয় পুঁজির গুরুত্বপূর্ণ এক স্তম্ভ হয়ে থাকা, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে সুস্পষ্টভাবে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠা যে শ্রেণি নিজেদের কথা, নিজেদের দাবি, নিজেদের অধিকার সোচ্চারে বলতে পারে। সাবর্ণ আধিপত্যবাদের নিরিখে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মুসলমানের আর্থ-সামাজিক অগ্রসরতা একটি অভাবনীয় প্রতিরোধ। পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত সরকার দ্বারাই সিস্টেম্যাটিকভাবে সাম্প্রদায়িক অবহেলার শিকার হওয়া একটি গোষ্ঠী, নিজেদের গোষ্ঠীচেতনাকে ব্যবহার করে নিজের মতো করে শেষ কুড়ি বছর ধরে ক্ষমতায়নের চেষ্টায় রয়েছে। গত দশক থেকে নিজের সংরক্ষণের অধিকারকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে বাঙালি মুসলমান। সার্বিক এই উন্নয়ন অবশ্যই সাবর্ণ আধিপত্যবাদের নিরিখে উদ্বেগজনক। তাই ‘দুধেল গাই’, ‘ওয়েস্ট বাংলাদেশ’, ‘মালদা-মুর্শিদাবাদে হিন্দু শেষ’ ইত্যাদি ন্যারেটিভের প্রচার খুবই ‘স্বাভাবিক’। এখনও কোচবিহার ও ভারতের দিনাজপুরের নস্যশেখদের নিয়ে এই ন্যারেটিভ দেওয়া হয় না কারণ নস্যশেখরা বাঙালি মুসলমানের মতো নিজেদের স্বর সোচ্চারে জানান দেয় না। বাঙালি মুসলমান বিজেপি রাষ্ট্রের পক্ষে একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই আরএসএস-এর ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে মামলা সুস্পষ্টভাবে সাম্প্রদায়িক রায় পেতে সক্ষম হয়েছে এখনও অব্ধি। প্রায় দুই বছর ধরে সিস্টেম্যাটিকভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হ্রাস করা হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে। এই সিস্টেম্যাটিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চূড়ান্ত ধাপের আগের ধাপটিই হল ২০২৫-এর ডিসেম্বর মাসের পরে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা যার নাম ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’। নব্বই শতাংশের উপরে মানুষ যখন রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী ম্যাপিং-এর নিরিখেও ভোটাধিকার হারায় না, তখন সেই সমস্ত অবান্তর যৌক্তিক অসঙ্গতি আমদানি করতে হয় যা যাবতীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে জন্মায়। সেই সমস্ত অ্যাবসার্ড আপত্তিকেও যখন নিয়ম মেনে উত্তর দেওয়া হয় এবং সেই উত্তর নির্বাচন কমিশন দ্বারা নিযুক্ত আধিকারিকরা মেনে নেন, একদম উপরের তলা থেকে কোনও কারণ না দেখিয়ে ভোটাধিকার নিয়ে সংশয় রেখে দেওয়া হয়। এবং পুরো পশ্চিমবঙ্গ হিসাব কষতে থাকে এত এত মুসলমান ভোট দিতে না পারলে কোন কোন রাজনৈতিক দল লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভোটাধিকার নিয়ে সংশয়ের মতোই বিপজ্জনক এই হিসাবনিকাশ।

আসল যন্ত্রণা এখানেই। ভোটের লাভক্ষতির বাইরে গিয়ে মানুষের মনের ওপর কী হচ্ছে তা নিয়ে তীব্রভাবে সরব হল না, সংঘাতের পথে গেল না পশ্চিমবঙ্গের কোনও রাজনৈতিক দলই। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হল নিজের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ও অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ না থাকা। কোনও নাগরিকের মনে এই ভয় থাকা কাম্য নয় যে, তার নাম রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে পারে বা সন্দেহজনক তালিকায় চলে আসতে পারে। গণতন্ত্রে তাঁর রাতের পর রাত ঘুম উধাও হয়ে যাওয়া উচিত নয় এই ভেবে যে, বাবার নামে ছোট্ট গরমিল হলে তিনি ভোটাধিকার হারাবেন, বা তাঁরা চার ভাইবোন হয়ে কীভাবে প্রমাণ করবেন যে তাঁরা ছয় ভাইবোন নন। কিন্তু এসআইআর ঠিক এই অগণতান্ত্রিক অসুস্থ পরিবেশ তৈরি করেছে বাংলায়। নিজের রোজকার কাজ ফেলে কেবলই ফর্ম জমা দিতে দৌড়তে হচ্ছে। বুড়ো বাবা-মা অনেক পুরনো ভোটার স্লিপ ধরে থাকছে তাবিজের মতো। “ডি-ভোটার” হয়ে গেলে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, নিজের অস্তিত্ব লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ভোটের দিনক্ষণ, প্রার্থীতালিকা প্রকাশ, রাজনৈতিক তর্জা— সবকিছু চলছে, যেন তেমন কিছুই ঘটেনি। এটাই একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ছবি। সুস্থ গণতন্ত্রে এমন সংকট সব আলোচনার কেন্দ্রে থাকত। নেতা, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া সাধারণ মানুষের জীবন-মরণের ভয় নিয়ে কথা বলত। প্রশ্ন করত: ভোট যে মনের নিরাপত্তা দিত, সেটা কীভাবে ফিরিয়ে আনব? সংবিধানের অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি কাগজের ধাপ্পাবাজিতে পরিণত হতে দেব না, তা নিয়েই আলোচনা চলত। কিন্তু আলোচনাটা ঘুরপাক খাচ্ছে একটা নোংরা ক্ষমতার খেলায়। বিজেপি কি “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” তকমা দিয়ে বৈধ ভোটারকে এবারের ভোট দিতে না দিয়ে নিজের ভোট বাড়াবে? তৃণমূল কি মুসলমান ভোট বাদ দিয়ে জিততে পারবে? বাম-দের বা কংগ্রেসের ফলাফল কেমন হবে? এসব বিশ্লেষণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়াটাকে নির্বাচনের হিসেবের একটা স্বাভাবিক অংশ বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে।

এই স্বাভাবিকীকরণটাই সবচেয়ে অস্বাভাবিক। যখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোট থেকে বাদ দেওয়া শুধু রাজনৈতিক গণিতের খেলা বলে দেখা হয়— কে জিতবে, কে হারবে এই নিয়ে মাথা ঘামানো চলে— তখন আমরা আসলে একটা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবান্তর যুক্তির কাছে হার মেনে নিয়েছি। নির্বাচন কমিশন, যা একটি সরকারি সংস্থা মাত্র, তা এখন কোথাও অ্যাকাউন্টেবল নয় এমন রাষ্ট্রসম হয়ে উঠেছে। তার অ্যালগরিদম ঠিক করে দিতে চাইছে কাকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। তার নিয়ম মাঝপথে বদলে যায়, তার আশ্বাস ফাঁদে পরিণত হয়। তার শুনানি ভয় দেখানোর পরিসর হয়ে ওঠে। আর বাকি রাজনৈতিক দল, মিডিয়া যখন এখনও দলীয় লাভ-ক্ষতির কথা বলে, তখন তারা নয়া এই ক্ষমতা-ব্যবস্থাকে মেনে নেয়। আমরা তখন আর মানুষের অধিকার নিয়ে মরিয়া হয়ে কথা বলি না, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিবিধ রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলি। এটাই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া জায়েজ করে দেয়। এটাই গণহত্যার বীজতলার প্রস্তুতিকে মান্যতা দেয়। এটা আমাদের সবার হিন্দুত্ববাদের কাছে আত্মসমর্পণ। ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন এখনও অব্ধি গণতন্ত্র হত্যার নির্বাচন।


*মতামত ব্যক্তিগত