প্রিয়ক মিত্র
সেই থেকে গাছ সহ্য করতে পারে না সাত্যকি।
ব্যাপারটা এভাবে হয়তো না ঘটলেও পারত। কিন্তু সেদিন ওর কেন জানি মনে হয়েছিল, ও ওর ছোটবেলার ভয়টা কাটিয়ে উঠবে। তাই খানিক সাহস করেই এগিয়ে গিয়েছিল অ্যাডিনামটার দিকে।
আবার! আবার সেই মুখটা!
গাছ, সে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকাই হোক বা টবে গাঁথা, বারবার তার সবুজ ঘন আঁধার ঠেলে একটা মুখ বেরিয়ে আসে সাত্যকির সামনে। সেই কোন ছোটবেলা থেকে। মুখ, না ছায়া, বোঝেনি কখনও সাত্যকি। শুধু মুখটা স্বাভাবিক লাগে না সাত্যকির। মুখ, না ছায়া? না অবয়ব? না কি আকার কোনও? কী ওটা! জ্বিন, অপদেবতা, রাক্ষস, দানো? মুখটা পুরুষেরই। বোঝা যায়। সেই কারণে ট্রেনের জানলা হোক, গাড়ির উইন্ডো সিট হোক, বাড়ির জানলা বা বারান্দা বা ছাদ হোক; সর্বত্র আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকত ও। জানলার ধারে বসতেও চাইত না। সেই শৈশব থেকেই। কিন্তু ছোটরা জানলা ভালোবাসে, তাই খানিক জোর করেই ওকে বসানো হত। ও মুখ নিচু করে থাকত। ভয়ে। একবার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিল ওরা। মনে আছে সাত্যকির, গোটা রাস্তাটা চোখ বুজে ছিল ও। ওই দেখ বুবুন, হরিণ…, ময়ূর চলে গেল সামনে দিয়ে, দেখলি সাত্যকি?…, আপ ডরিয়ে মত, শের ইস জঙ্গলপে নেহি হ্যায়…। বাঘের ভয় ও পাচ্ছে না, কাকে বোঝাবে! বাবা, মা, বন্ধু, গাইডের গলা ওর আরও অসহনীয় লাগছিল সেদিন। বাবা-মায়ের বাগানের শখ। বাড়িভর্তি গাছ। সাত্যকি বারান্দায় যায় না, ছোট্ট ছাদটায় ওঠে না, মোরাম বিছানো রাস্তাটা দিয়ে দমবন্ধ করে মাথা নিচু করে চলে যায়। সাত্যকি মুখ ফুটে কোনওদিন কিছু বলতে পারে না। যা খেতে ভালোবাসে না, চুপচাপ খেয়ে নেয়। যা ভালোবাসে, চাইতে পারে না। গাছ যে বাড়িতে না রাখলেই ভালো, ও বোঝাতে পারত না। একটি গাছ, একটি প্রাণ; গাছ লাগান প্রাণ বাঁচান— স্লোগানগুলো সাত্যকিকে ভয় পাওয়াত। একটা গাছ মানে একটা মুখ। অনেক গাছ মানে অনেক মুখ। আর মুখগুলো, বারবারই মনে হত সাত্যকির, ক্রমশ ধেয়ে আসতে চায় ওর দিকে। পরিবেশ-কর্মী, সংরক্ষকদের সঙ্গে সাত্যকি দেখা করতে চাইত। চিঠি লিখতে চাইত তাদের। বলতে চাইত, গাছ এই পৃথিবীতে যত বাড়বে, তত হয়তো পৃথিবীর মঙ্গল, আমার নয়। অনেকগুলো মুখ তখন আমাকে ঘিরে ধরবে। তারা আমার সঙ্গে কী করতে চাইবে, জানি না। তবে বুঝতে পারি, তারা আমার জন্য বিপজ্জনক।
সেদিন নাদিয়ার বাড়িতে বিষয়টা এগোচ্ছিল মসৃণভাবে। সাত্যকির বন্ধুরা যাকে বলে, স্মুথ। কফি চলল একরাউন্ড। তার মধ্যেই নাদিয়া হঠাৎ হাতটা ধরেছিল সাত্যকির। ফেসবুকে ওদের মধ্যে যেটুকু কথা হয়েছে, তাতে, স্বভাববশতই, সাত্যকি মুখচোরা থেকেছে।
সাত্যকি খাপ খুলতে পারে না, তেমন নয়। কিন্তু ঠিক নিজের জন্য নয়। বাবাদের বিজ্ঞাপন সংস্থা কাম প্রোডাকশন হাউজ যখন বড় বহুজাতিকের সঙ্গে মিলে একটা ডিজিটাল পোর্টাল খুলল, তখন বাবা, অঞ্জনকাকু, পারমিতাদি (বলা উচিত পিসি বা মাসি, যেহেতু মা-বাবা দুজনেরই বন্ধু, কিন্তু ওই ডাকটা কোনওদিন সহ্য করতে পারেনি অবিবাহিত পারমিতাদি, সাত্যকির ফ্রেন্ড গাইড অ্যান্ড ফিলোজফারও হয়ে উঠেছিল সহজেই, তাই দিদিটাই রয়ে গেছে)— সকলেই চিন্তায় পড়ল। ওরা মিডিয়া, ইন্ডাস্ট্রি— সবই গুলে খেয়েছে ততদিনে। কিন্তু ডিজিটাল মিডিয়া বোঝার জন্য তো নতুন মাথা প্রয়োজন। সেই মাথা হয়ে উঠল সাত্যকি। নতুন পোর্টাল লঞ্চ হল সাড়ম্বরে। তরুণ সম্পাদক সাত্যকি কাঁধে নিল সেই পোর্টালের সব দায়ভার।
সাত্যকি ততদিনে পাঁচতারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পারেটিভ লিটারেচারে পিএইচডি করছে। মাঝে স্নাতকোত্তরের পর চেন্নাইয়ের নামী ইনস্টিটিউট থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা, তারপর কী খেয়াল চাপল, তামিলে এমফিল করল। তারপর কার্ডিফে আবার এক বছরের ডিপ্লোমা, সাংবাদিকতা নিয়েই। তারপর পাঁচ বছর ধরে চাকরি করেছে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে। প্রথম তিন বছর ইংরেজিতে, ওই চেন্নাইতেই পোস্টিং। তারপর ওই হাউজেরই বাংলা পোর্টালে কলকাতা করেসপন্ডেন্টের পোস্টে দু-বছর। মাঝে পিএইচডি শুরু করা, সঙ্গম লিটারেচার নিয়ে। তারপর চাকরি ছেড়ে ফ্রিলান্সিং।
আশ্চর্য ঘটনা, ওর বিট ছিল, এনভায়রনমেন্ট।
সাত্যকি পরিবেশপ্রেমী হয়ে উঠল কবে? এই প্রশ্ন নিয়ে আলোড়ন পড়ে যেতে পারে। সাত্যকির জীবন যদি সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ বা সিরিয়াল হয়, বা নিদেনপক্ষে ধারাবাহিক উপন্যাস, তাহলে তার তো দর্শক আছে। পাঠক আছে। তারা কি ভাববে না, যে এই বদল কীভাবে ঘটল? কোনও প্যানেল কি বসবে না?
আসলে এখানে একটা প্যাঁচ আছে।
সাত্যকি প্রথম প্রথম করত ক্রাইম বিট। আর তার সূত্রেই চেন্নাইয়ের পালাভাক্কমে একটা ওয়েটল্যান্ড বুজিয়ে বিপুল বিলাসবহুল রিসর্ট বানানোর পরিকল্পনা ও ফাঁস করে। তারপর থেকেই সাত্যকি এনভায়রনমেন্ট বিটে। রিপোর্টিং ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় প্রবন্ধ লেখা, জার্নাল লেখা, তারপর বই প্রকাশ। তারপর এই বিটের সূত্র ধরেই নানাভাবে বিনোদন, সংস্কৃতি, রাজনীতির নানা ক্ষেত্রেও ওর সাংবাদিকতার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। চিত্রনাট্যও লিখেছে একটি হিন্দি ডকুফিচার ওয়েব সিরিজের।
এই বিটে কাজ করাটা ওর কাছে চ্যালেঞ্জই ছিল। সাত্যকি নিয়েছিল সেই চ্যালেঞ্জ। গাছের কাছে ও যায়নি ছোট থেকে। এখন তার প্রায়শ্চিত্ত যদি করা যায়।
ওর লেখা পড়েই নাদিয়ার ভাল লেগেছিল ওকে।
নাদিয়ার প্রেমিক থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। নাদিয়া বলেছিল, ওপেন রিলেশনশিপ। নাদিয়ার প্রস্তাবটা ছিল সাদাসিধে। আড্ডা, কফি, তারপর ব্যাপারটা যেদিকে যায়। কোনও কাফেতে দেখা করা যাক তবে? নাদিয়া উত্তর দিয়েছিল টানা একদিন পর।
—আমার বাড়িতেই এসো না…
নাদিয়া ফোটোগ্রাফার। রয়টার্স, এএফপি-র জন্যও ছবি তুলেছে। পাশাপাশি ও ফেমিনিস্ট নানা অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত, সঙ্গে পরিবেশকর্মীও বটে।
নাদিয়ার বাড়িতে ঢুকেই দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল সাত্যকির।
—ডেন্ড্রোফোবিয়া!
বলেছিল পারমিতাদির সুপারিশ করা সেই সাইকোলজিস্ট। ভদ্রমহিলা অবাঙালি। পারমিতাদিকেই সাহস করে ব্যাপারটা বলেছিল সাত্যকি। পারমিতাদি তখন আস্থা শর্মার নম্বরটা দেয়।
ভদ্রমহিলা দেখাই করতে চাননি। এই গালভারি নামটা বলে ওকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, এইরকম ফোবিয়া অনেকেরই থাকে। নতুন কিছু নয়।
যদিও সাত্যকি বলেনি ওর ভিশনের বিষয়টা। কারণ কৈশোর থেকে ওর ভিশনটা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছিল। গাছ নিয়ে ভয়টা রয়ে গিয়েছিল কেবল, গলায় কাঁটা ফুটে থাকার মতো।
নাদিয়া ওর পাশে এসে বসতেই শিহরিত হয়েছিল সাত্যকি। ওর মনে হচ্ছিল, সিঁড়ি থেকে যে শ্বাসরোধী ভাবটা ওকে পেয়ে বসেছে, সেটা ওর কেটে যাবে।
গাছ। নাদিয়ার ফ্ল্যাটের বাইরের সিঁড়ি থেকে ঘর, বারান্দার ছোট্ট বাগান, সর্বত্র কেবল, গাছ।
—তোমার বাড়িতেও তো প্রচুর গাছ। ছবিতে দেখলাম। সম্ভবত, আঙ্কল তোমাকে কোনও ছবিতে ট্যাগ করেছিলেন। তুমিও আমার মতোই গাছপাগল নিশ্চয়?
সাত্যকি কী বলবে? এনভায়রনমেন্ট বিটের সাংবাদিক গাছ ভালোবাসে না? বরং ঘেন্না করে, ভয় পায়?
নাদিয়ার একটা সেমি ন্যুড ছবি ছিল ইনস্টাগ্রামে। লতা জড়ানো সারা শরীরে। ওর বাড়িতে আসার পথে গাড়িতে ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল সাত্যকি। দেখছিল, ভয় পায় কি না। না। ভয় করেনি সাত্যকির।
নাদিয়া আরেকটু এগিয়েছিল। হাত ধরার পরেও। তারপর হঠাৎই, ঘন হয়ে ওর কানে কানে জিজ্ঞেস করেছিল, আরেকটা কফি?
সাত্যকি ওর দিকে তাকিয়েছিল ঠায়। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল। ক্রমশ আদর আরও গভীর হচ্ছিল ওদের। নাদিয়া সরিয়ে দিল। হেসে বলল, কফিটা নিয়ে আসি!
নাদিয়া উঠে যাওয়ার পরেই ভূতটা মাথায় চেপেছিল সাত্যকির। কেন যে চাপল!
অ্যাডিনাম গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সাত্যকি। ভিশনটা আবার ফেরত আসে কি না, দেখতে চেয়েছিল।
গাছের দিকে দশ সেকেন্ড তাকিয়েছিল সাত্যকি। না, সেই মুখটা আসেনি।
—কফি!
নাদিয়া ওর দিকে কাপটা বাড়িয়ে দিল। নিজের কাপটা নিয়ে হেলান দিল বারান্দার কাচের দরজায়।
—তোমার কোন গাছ বেশি পছন্দ?
কফিতে চুমুক দিয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল সাত্যকি।
তারপর সহজেই বেছে নিয়েছিল নামটা।
—অ্যাডিনাম!
বলে সাহস করে টবটার দিকে তাকিয়েছিল।
অ্যাডিনামের পাতা আর ফুল হাপিস, লালচে সবুজ একটা মুখ তার বদলে দেখা যাচ্ছে।
মুখটা বীভৎস।
এবং মুখটা সাত্যকির।
স্পষ্ট, দগদগে।
নাদিয়াকে প্রায় ঠেলে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছিল সাত্যকি। নাদিয়া ওকে ফোন করেছিল বহুবার। ও ধরেনি। সাত্যকি জানে, নাদিয়া এটাকে চূড়ান্ত অপমান হিসেবেই নিয়েছিল।
সেই, সেই থেকে গাছ আর ও সহ্য করতে পারে না।
দুই.
—হাতি এমনি এমনি বেরিয়ে আসে না স্যর। সব গাছ কেটে ইউক্যালিপটাস লাগাচ্ছে। জঙ্গল নাকি সুন্দর হবে। হাতি খাবে কী বলুন তো! তাই বেরিয়ে এসে খেত নষ্ট করছে।
চিলাপাতার জঙ্গলঘেঁষা ময়ূরেশ্বরী টি-এস্টেট। তার পাশেই এই চায়ের দোকান। চা খেতে খেতে কথাগুলো শুনছিল সুস্মিতা। পোড়খাওয়া সাংবাদিক ও। দীর্ঘদিন ধরে ডুয়ার্স নিয়ে ও পড়ে রয়েছে। এখানে ওর বাঁধাধরা সোর্স ছিল অভীকদা, অভীক রায়। অভীকদা হঠাৎ মারা যাওয়ার পর থেকেই খুব ঝামেলায় পড়েছে সুস্মিতা। এখানে ট্যুরিজম সিন্ডিকেট, কাঠপাচার, যখনতখন জঙ্গল পোড়ানো— সবকিছু নিয়েই ও লিড পেত অভীকদার থেকেই।
ফরেস্ট গার্ড অখিল লামা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল।
—জঙ্গলে ঢুকবেন না কি ম্যাডাম?
সুস্মিতা উত্তর দিল না। চা বলল আরেকটা। তারপর জিনসের পকেট থেকে দোমড়ানো ছোট গোল্ডফ্লেকের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট ধরাল।
অখিল বলে চলে, এখন ট্যুরিস্ট কম। লকডাউনের পর থেকেই কমছিল। আজ তো তিনটে গাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে। হলংয়েও ট্যুরিস্ট নেই। যাচ্ছেতাই অবস্থা।
সুস্মিতাকে এসব কথা অভীকদা খুব দুঃখ করেই বলেছিল, ওর ম্যালিগন্যান্সিটা ধরা পড়ার পরপর। সুস্মিতা চেষ্টা করেছিল স্টোরিটা পারসু করতে। কিন্তু কার কাছে করবে? যার ভরসায় সে চাকরি ছেড়েছিল, সেই তার কাছে?
করে কী লাভ? তাকে তো অভীকদাও ভরসা করেছিল পুরোমাত্রায়।
সাত্যকিদা যখন প্রথম দেশকাল ডট কম-এর এডিটর হিসেবে জয়েন করল, কী যে আনন্দ পেয়েছিল সুস্মিতা! এতদিনে, এতদিনে মিডিয়া পলিসির তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে কাজ করার একটা জায়গা পাওয়া যাবে। তাও আবার বাংলায়।
সুস্মিতা খুব আদর্শবাদী সাংবাদিক নয়। কিন্তু মিডিয়ার নানা দলীয় দালালির মধ্যে, নিউজ এডিটরদের দাদাগিরির মধ্যে কায়দা করে আসল স্টোরিটা বের করে আনতে শিখেছে ও অনেক পরিশ্রম করেই। নিজের হাতে ক্ষমতা থাকতে কখনও আপস করেনি।
অথচ সাত্যকিদা করল!
চেন্নাইয়ে যে বহুজাতিকের জলাভূমি দখলের ফলে পরিযায়ী পাখিদের যাতায়াত কমে গিয়েছিল, তাদের ফর্দাফাঁই করেছিল সাত্যকিদা, ওর প্রথম সিগনিফিক্যান্ট স্টোরিতে।
মজার ব্যাপার, সেই বহুজাতিক এখন কলকাতায় কালচারাল সেন্টার খুলেছে। এবং বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে তারা আচমকাই তৎপর। তাদেরই ফান্ডিংয়ে শুরু হয়েছে দেশকাল ডট কম। আর তার এডিটরের নাম? সাত্যকি সেন!
সুস্মিতা ফোন করে তুমুল চিৎকার করেছিল সাত্যকিদার ওপর। সেদিন কোনও কারণে সাত্যকিদা ঘেঁটে। যুক্তি সাজাতে পারছিল না ঠান্ডা মাথায়, যেমনটা ও সাধারণত করে থাকে।
অভীকদা এসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। ভালোবেসেই সাত্যকিদাকে ফোন করেছিল, কংগ্র্যাচুলেট করতে। ফোন ধরেনি সাত্যকিদা। ম্যালিগন্যান্সির খবরটাও পায়নি অভীকদার। সুস্মিতা ব্লক করে দিয়েও ব্লক খুলেছিল শুধু এই খবরটা সাত্যকিদাকে জানাবে বলে। উত্তর দেয়নি। ও সাহায্য করলে আরও ভালোভাবে চিকিৎসা হত অভীকদার।
অভীকদাও আর সেসবের সুযোগ দিল না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটটা পায়ে পিষে দিল সুস্মিতা। চা-টা শেষ করে একবার জঙ্গলে যাবে। যদি কিছু স্টোরি ক্র্যাক করা যায়। দু-তিনটে ন্যাশনাল মিডিয়ায় পিচ করবে।
তিন.
—নতুন এনভায়রনমেন্ট ল-এর এগেনস্টে আপনি স্টোরি করবেন নাকি?
মুখটা দেখতে পাচ্ছে না সাত্যকি। ও পেছনে বসে। চোখে কালো চশমা। মালিকের চোখে সানগ্লাস বলে ও নকল করছে, এমনটাই ভেবে নেবে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস। কিন্তু সাত্যকি কাউকে বোঝাতে পারবে না ব্যাপারটা। তাই ও একটা চোখের সমস্যার অজুহাত ভেবে রেখেছে। তাই মার্সিডিজেও চশমা না খুলেই ও বসে।
গাড়ি ঘন থেকে ঘন জঙ্গলে ঢুকছে। সাত্যকির শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।
এমন সময়ই প্রশ্নটা করল, ওর মালিক, দেশকালের পৃষ্ঠপোষক, অবনী সান্যাল। মুখ থেকে চুরুটটা উঠছে, নামছে। ধোঁয়াটা ছড়িয়ে যাচ্ছে গাড়িতে।
সাত্যকি চুপ।
—করবেন না। ওগুলো খুব মিনিংলেস। ডেভেলপমেন্ট শুড বি সাস্টেনেবল, অমর্ত্য সেন-জঁ দ্রিজের বইটা আপনার শেলফ থেকে নিয়েই পড়ছিলাম। ওঁদেরও তো থিওরি ওইটাই।
সাত্যকি গুটিয়ে নেয় নিজেকে।
—এই জঙ্গলটাকে, বলতে পারেন, ফার্নিশ করব। এসব জংলা গাছ কোনও অ্যাপিল তৈরি করে না। ফ্যান্সি গাছ লাগাব। বুঝলেন?
সাত্যকির গলা দিয়ে কোনওক্রমে স্বর বেরল। চারপাশে গাছের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।
—আসলে ওয়াইল্ডলাইফের জন্য তো একটা ন্যাচারাল প্ল্যান্টেশন…
—বোগাস!
গাড়িটা কীসে কেঁপে উঠল, জঙ্গলের রাস্তার বাম্পারে, না কি এই হুঙ্কারে, সাত্যকি বুঝল না।
এবার হেসে উঠল সান্যাল। মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেবল শোনা যাচ্ছে।
—ওয়াইল্ডলাইফের তো এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট হয়। এমপি-তে সাভানা ল্যান্ড ম্যানুফ্যাকচার করা হচ্ছে আফ্রিকান চিতার জন্য। আপনার বুদ্ধি কী বলে? আফ্রিকান চিতা এশিয়াটিক চিতার সাবস্টিটিউট হতে পারে কখনও?
গাড়িটা ক্রমে স্লো হচ্ছে।
—আহ, কোন বাংলা পোর্টালের মিটিং এরকম ইনটু দ্য ওয়াইল্ড রিসর্টে হয় বলুন তো? এখানে আমরা কনক্লেভও করব, বুঝলেন? অ্যাক্টিভিস্ট, এনজিও, আর কয়েকজন সেলেব লাগবে। এগুলো আপনি অ্যারেঞ্জ করবেন। কিছু মডেল লাগবে, নেচার ফোটোগ্রাফির সাবজেক্ট হবে। ন্যুড হলে ভাল হয়। র হবে।
গাড়ি থেকে নামাতে হল অবনী সান্যালকে। বিশাল চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে কোমর ভাঁজ করলেন। তারপর স্টেডি হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। পথ থেকে একটা ভাঙা ডাল তুলে নিলেন। অকারণে কয়েকটা চারার ওপর সেটা তরোয়ালের মতো চালাতে চালাতে রিসর্টের গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। সাত্যকি হাঁটছে পিছু পিছু। মাথা নিচু করে। সানগ্লাসটায় পাওয়ার নেই। কাজেই খুব স্পষ্টও হয়ে উঠছে না কিছু ওর চোখে। সুবিধেই হচ্ছে।
—আপনি বরং একটা ট্রাভেল স্টোরি করুন। মেক আ ট্যাগলাইন, লাইক, আমাজন অফ বেঙ্গল।
সাত্যকি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। সিকিয়াঝোরাকে ইতিমধ্যেই ও-নামে ডাকা হয়, সেটা আর বলতে পারে না।
—ব্র্যান্ডিং! বুঝলেন! জঙ্গলের ব্র্যান্ডিংটাই আসল।
এই বাক্যটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাত্যকি একটা তুমুল হোঁচট খেল, একটা বড় অশ্বত্থগাছের শিকড় এত দূর ধেয়ে এসেছে। সেটাতেই পা হড়কেছে।
সানগ্লাসটা ছিটকে পড়ল দূরে।
হোহো করে হেসে উঠল অবনী সান্যাল। তার শোফার দূর থেকে ছুটে আসছে, বুঝতে পারল সাত্যকি।
মুখের ওপর বিশাল গাছের ছাউনিটা। তার মধ্যে গজিয়ে উঠছে একটা মুখ। বীভৎস।
মুখটা সাত্যকির। মুখটা সাত্যকির?
মুখটা এগিয়ে আসছে। যেন নিশ্বাস টের পাচ্ছে।
সাত্যকির দমবন্ধ হয়ে আসছে।
—পড়লেন কী করে? জাঙ্গল পাথে হাঁটার অভ্যেস নেই নিশ্চয়ই!
অবনী সান্যাল এগিয়ে এসে আড়াল করল গাছটা। ওর মুখটাই এখন সামনে। চোখে সানগ্লাস।
একটু নিশ্চিন্ত হল সাত্যকি।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে অবনী সান্যালের মুখ।
ক্রমশ গাছের শাখাপ্রশাখা এসে ঘিরে ফেলছে সেই মুখ।
অবনীর মুখ ঢেকে দিয়ে অন্য মুখ তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যে সাত্যকির মুখও কিছুটা মিশে।
হাঁটু গেড়ে বসছে অবনী সান্যাল।
মুখটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। নিঃশ্বাসটাও।
জংলা হাওয়া। ক্রমশ শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে সাত্যকির।
অবনীর মুখ এখন গাছের মুখ। যে মুখ ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে সাত্যকি।
সাত্যকি বুঝল, গাছ ও আর সহ্য করতে পারছে না।

