Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মুসলিম মেয়েলি গীতে হিন্দু পুরাণের প্রভাব: আন্তঃসাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ

মহম্মদ ইব্রাহিম

 


মুসলিম মেয়েলি গীতগুলিতে হিন্দু পুরাণের অনুপ্রবেশ কোনও ‘হিন্দুকরণ’ প্রক্রিয়ার ফল নয়; আবার একে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় বিচ্যুতি বলেও ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজনের ভাষা আধুনিক ক্ষমতাকাঠামোর সৃষ্টি; লোকজ সংস্কৃতির ভেতরে সেই বিভাজন কখনওই এত কঠোর ছিল না। গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি তাই শুধু অতীতের সাংস্কৃতিক নিদর্শন নয়— এগুলি একটি বিকল্প ইতিহাস, যেখানে সহাবস্থান, সমন্বয় ও মানবিক সম্পর্ক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে

 

ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি কোনও একক ধর্মীয় বা জাতিগত ধারায় নির্মিত নয়; এটি বহু শতাব্দীর সামাজিক সহাবস্থান, ধর্মান্তর, লোকায়ত চর্চা এবং পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা এক বহুত্ববাদী ও স্তরিত বাস্তবতা। বিশেষত বাংলা অঞ্চলে— যেখানে আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় উপাদানের সঙ্গে পরবর্তীকালে ইসলামি সমাজের সংযোজন ঘটেছে— সেখানে সংস্কৃতি কখনওই শুদ্ধ বা একরৈখিক রূপে বিকশিত হয়নি। ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটলেও লোকাচার, ভাষা, আবেগ ও প্রতীকী জগৎ অনেক ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক থেকেছে।

এই প্রেক্ষাপটে গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীত বা বিবাহগীতগুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই গীতগুলি ধর্মীয় অনুশাসনের প্রকাশ নয়; বরং নারীকেন্দ্রিক লোকজ অভিজ্ঞতা, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার সুরারোপ। আশ্চর্যজনকভাবে, এই গীতগুলিতে হিন্দু পুরাণ ও লোকধর্মের চরিত্র— রাধা-কৃষ্ণ, বেহুলা-লখিন্দর, হর-গৌরী, বাঁশি, কদম্ববৃক্ষ, নদীতীর ইত্যাদি— খুব স্বাভাবিক ও অনায়াসভাবে উপস্থিত। এই উপস্থিতি কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুকরণ নয়, বরং লোকায়ত সংস্কৃতির ভাষায় আবেগ প্রকাশের একমাত্র উপলব্ধ রূপকের ব্যবহার।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য মুসলিম মেয়েলি গীতে হিন্দু পুরাণের প্রভাবকে ‘সম্প্রীতি’ বা ‘সমন্বয়’-এর রোমান্টিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নয়। বরং দেখানো যে, লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় সীমানা প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে এবং সংস্কৃতি নিজস্ব গতিতে ক্ষমতা, ইতিহাস ও প্রাত্যহিক জীবনের চাপে নতুন অর্থ নির্মাণ করে। গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি সেই বিকল্প সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানবিক অভিজ্ঞতা, প্রেম, বিরহ ও সামাজিক সম্পর্ক মুখ্য হয়ে ওঠে। সংগৃহীত গীতের পাঠ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আন্তঃসাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেই এই নিবন্ধে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

গ্রামীণ-জীবনে উৎসব, সামাজিক আচরণে, লোকাচারে দেখা যায় পারস্পরিক অংশগ্রহণ। দুর্গাপূজা থেকে ঈদ— সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ পরম্পরা বহমান। যেমন সত্যপিরের পূজা বা পির-দরগায় হিন্দুদের মানত করা— এ-সবই মিশ্র সংস্কৃতির প্রতিফলন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পির-আউলিয়া ও লোকদেবতার প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধা গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য।

রামায়ণ-মহাভারতের গল্প, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, চাঁদ-ধনপতি-বেহুলা— এগুলো বাংলা জুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলিতে যেমন হিন্দুদেবীর কাহিনি, তেমনি পির-সাহিত্যে পির-ফকিরদের জীবনকাহিনিও স্থান পেয়েছে। এই পুরাণগুলো মুসলিম-সহ সমস্ত জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ করেছে। সৃষ্টি হয়েছে এক সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতি।

মুসলিম মেয়েলি গীতগুলো শুধু লোকসঙ্গীত নয়; নারীসমাজের লোকায়ত জীবনের নানা দিক— আনন্দ, বেদনা, লোকাচার, সামাজিক রীতিনীতি, নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক এবং শাশুড়ি-ননদির নিগ্রহ, স্বামীর সোহাগ, সতীনের কলহ, ভালোবাসা ইত্যাদি গার্হস্থ্য বিষয় ফুটে ওঠে। এক কথায় নিরক্ষর নারীমনের স্বতঃস্ফূর্ত নানন্দিক প্রকাশ। এই কারণেই লোকগানে পুরাণকাহিনি বা ধর্মীয় চরিত্রগুলি বিশ্বাসের স্তরে নয়, বরং প্রতীকী ভাষা হিসেবে নানা রূপে ব্যবহৃত হয়। বাংলার লোকজ জীবনে রামায়ণ-মহাভারত, রাধা-কৃষ্ণ, মনসামঙ্গল বা ধর্মমঙ্গলের কাহিনি দীর্ঘকাল ধরে আবেগ প্রকাশের এক পরিচিত সাংস্কৃতিক শব্দভাণ্ডার তৈরি করেছে। মুসলিম মেয়েলি গীতগুলিতেও এই শব্দভাণ্ডারের ব্যবহার দেখা যায়। এখানে হিন্দু পুরাণ কোনও ধর্মীয় অনুকরণের নিদর্শন নয়; বরং লোকায়ত সমাজে প্রচলিত আবেগভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ। ফলে মুসলিম মেয়েলি গীতে হিন্দু পৌরাণিক অনুষঙ্গের উপস্থিতি ধর্মীয় সীমানা ভাঙার ঘটনা নয়, বরং লোকসংস্কৃতির স্বাভাবিক আন্তঃমিলনের ফল।

মধ্যযুগে মুসলিম সাহিত্য-সাধকদের হাতে ইসলামি সাহিত্য বলে আলাদা কোনও সাহিত্যশাখা গড়ে ওঠেনি। মুসলমান কবিগণ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও তাঁরা সোহরাব-রুস্তম, লাইলা-মজনু, শিরি-ফরহাদ ইত্যাদির চেয়ে হিন্দু ধর্মদর্শন, হিন্দুপুরাণ যেমন রাম-লক্ষ্মণ, সীতা-দ্রৌপদী ও রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি পছন্দ করতেন। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলার রূপকে তাঁরা ইসলামি আধ্যাত্মিকতা প্রচার করতেন। যেমন— “হিন্দুরা বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা”— শাহানুর সৈয়দ। অন্যদিকে, হিন্দু কবিরা হাসান-হোসেন পালা, সত্যপিরের পালা নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। মধ্যযুগের সমস্ত সাহিত্যধারায় বৈষ্ণব পদাবলি, অনুবাদসাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, জীবনীসাহিত্য, লোকসাহিত্য, ময়মনসিংহ গীতিকা প্রভৃতি ব্যালাড জাতীয় রচনার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির চিত্র নানাভাবে পরিস্ফুট হয়েছে।

গৌড়বঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা প্রভৃতি জেলাগুলি উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং সুস্পষ্ট হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। গৌড়বঙ্গ অঞ্চলে ধর্মান্তর ছিল এক জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। নিম্নবর্ণ ও ক্ষুদ্র পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সামাজিক ন্যায় ও সমতার আকাঙ্ক্ষায় ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হলেও, ধর্মান্তর তাদের পূর্বতন লোকাচার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি। ফলে গৌড়বঙ্গের মুসলিম সমাজে গড়ে ওঠে এক স্বতন্ত্র লোকায়ত পরিচয়, যেখানে ইসলামীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি আদি দেবতা, স্থানীয় লোকদেবতা ও হিন্দু পুরাণজাত সাংস্কৃতিক চিহ্ন সহাবস্থান করে। এই সমন্বয় কোনও পরিকল্পিত সংস্কৃতি-সংমিশ্রণ নয়; বরং প্রাত্যহিক জীবনের চাপে গড়ে ওঠা এক স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি সেই বাস্তবতারই সঙ্গীতরূপ, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মানবিক অনুভব বেশি গুরুত্ব পায়। শেরশাবাদী মুসলিমদের গায়ে-হলুদ, ধামাইল-ধাঁচ, মুর্শিদাবাদি মুসলিমদের ‘পিরের গান’, বাঙালির বিয়ের বউ-ভাত-রাতি— এগুলো মূলত হিন্দু লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। মুসলিম পরিবারে ‘নবান্ন উৎসব’, শীতলাপূজায় আস্থা, পিরের মাজারে হিন্দুদের মানত— এগুলি গৌড়বঙ্গের জৈবিক সমন্বয়ের প্রমাণ।

গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি এই সমম্বিত সংস্কৃতির উজ্জ্বল পরম্পরা। গীতগুলির বিষয় ও চরিত্ররা হিন্দুশাস্ত্র ও পুরাণকাহিনি বা চরিত্রদের দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আমি, আমার সংগৃহীত গীত থেকেই নিবন্ধের মূল বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করব।

লসা (বর) বা আরসকে (কনে) ‘থুবড়া’ খাওয়ানো মুসলিম বিবাহ-রীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। থুবড়ার আসরে আমন্ত্রিত পুরুষ/মহিলা সকলে লসা/আরসকে ক্ষীর খাওয়ায়। ক্ষীর খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এটি একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। এ সময় মেয়েরা/গীদালেরা ‘গীদ’ গায়—

সোপের ওপরে বৈস্যা আরসের ঝলকিছে রূপরে,
মোহন বাঁশি শুন্যা উঠরে সখি ক্ষীর খ্যায়া লও রে।
বাপ হামার আসলে পরে তবে খাবো ক্ষীরো রে
মোহন বাঁশি শুন্যা উঠরে সখি ক্ষীর খ্যায়া লও রে।
………………………………………………………………

মায়ের দুয়া হবে বেটি কিয়ামতের দিনের হাসি রে,
মোহন বাঁশি শুন্যা উঠরে সখী ক্ষীর খ্যায়া লও রে।

ক্ষীর খাওয়ানোর অনুষঙ্গে একটি যৌথ সামাজিক পারিবারিক উৎসবের চিত্র বর্ণিত হয়েছে। ক্ষীর খাওয়াতে এসে অনেকে লসা/আরসকে নানা উপহার প্রদান করে। এই রীতি শেরশাবাদী মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। বর্তমানে এই রীতি-রেওয়াজের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অন্যদের কাছ থেকে আরস দানসামগ্রী পাবে, কিন্তু মায়ের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে ‘দুয়া’ পাবে, যার দ্বারা জীবনের কল্যাণ সাধিত হবে। মায়ের দুয়া এবং দশের দুয়ার সাহায্যে কেয়ামতের কঠিন ময়দান খুব সহজে পেরিয়ে যাবে। এই গানটিতে মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর আলো পড়েছে। অন্যদিকে হিন্দু পৌরাণিক সংস্কৃতির প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। ‘মোহন বাঁশি শুন্যা উঠরে’— এখানে মোহন শব্দটি কৃষ্ণের প্রেম-ঐতিহ্য; বাঁশি তাঁর পরিচিত প্রতীক। ‘মোহন’— শ্রীকৃষ্ণের বিশেষণ; ক্ষীর— প্রতীকীভাবে সুখ-সমৃদ্ধি বোঝায়, বাঁশি আনন্দরস, দেবভাব। গানের প্রতিটি স্তবকে পংক্তিটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে— মোহন বাঁশি শুন্যা উঠবে সখী ক্ষীর খ্যায়া লও রে— প্রেমিক-কৃষ্ণের বাঁশির সুরে সাড়া দিয়ে রাধাভাবে ভাবিত ‘আরস’ কৃষ্ণরাগে অভিসারী হোক। বৈষ্ণব সাহিত্যে কৃষ্ণকে ডাকা হয় ‘মোহন’ নামে। যিনি আকৃষ্ট করেন— এটি কৃষ্ণের রূপ মাধুর্যের বিশেষণ। ‘সখী’— বৈষ্ণব কীর্তনের ভাষাশৈলী।

রাধা, কৃষ্ণ, বাঁশি ইত্যাদি খুব স্বাভাবিকভাবেই লোকায়ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ধর্মান্তরিত মুসলিমদের ধর্ম বদল হলেও আদি সংস্কার-সংস্কৃতির বদল হয়নি। ফলে মুসলিম মেয়েলি গীতগুলিতে এই লৌকিক সমাজের সমন্বয়ী মানসিকতার প্রকাশ স্পষ্ট হয়েছে।

লসার মাথায় চল্লিশা পাগড়ি
রাস্তায় যেতে খুলিও না হে—
লসা, কাঁচা নিন্দে পাগল।
………………………………

লসার হাতে মোহন বান্ধা বাঁশি
রাস্তায় যেতে বাজায়ও না হে—
লসা কাঁচা নিন্দে পাগল।

এই গানটিতে লসা অর্থাৎ বরের বিবাহ-যাত্রা ও সাজসজ্জার কথা নানা আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে। লসা সুসজ্জিত হয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে। লসার মাথায় বিরাট পাগড়ি। লসা কাঁচাঘুমে আচ্ছন্ন— অর্থাৎ কনের প্রেমে পাগল। প্রেমরাগে তন্দ্রালু। তাই নারী-পুরুষ বরযাত্রীরা হাসি ঠাট্টার ভঙ্গিতে সতর্ক করছে যেন তার সাজসজ্জা নষ্ট না হয়। লসার পাগড়ি যেন কৃষ্ণের মাথার অলঙ্কার। কৃষ্ণের মতো প্রেমাচ্ছন্ন লসা বাঁশি যেন না বাজায়। লসার চিত্তের উদ্বেলতা বেড়ে যাবে। লসা কৃষ্ণের মতো রাধার রূপ-অনুরক্ত। লসার প্রেম-আবেগ, অনুরাগ-মাদকতা রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

কালু মোল্লের কাণ্টাতে আছে
সুরুওয়ালা ব্যাতের বেড়্যা…
সেনা বেড়্যার ভিতরে আছে
ক্যালা হোনে ছোড়া
ক্যালা হোনে ছোড়া আহারে।
সেনা ছোড়ার মাথাতে আছে
প্রেমী সাপের ফেণি …
সেনা সাপে কামড়াইলে মারে
সুমাইয়া ছিনারির মাঞ্জা।

আলোচ্য গীতটি মুসলিম গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ, তবু এতে বাংলার লোকজ ধর্মীয় মিলন-ধারা সুস্পষ্ট, হিন্দু-পুরাণ, শাস্ত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে। পদাবলি সাহিত্য কৃষ্ণবর্ণ বা কালোর রূপের মধ্যে কৃষ্ণকে কল্পনা করে থাকে। কালো বা কৃষ্ণবর্ণের একটি ছোঁড়া বা ছেলে, যার মাথাতে আছে প্রেমিক সাপের ফণা। পৌরাণিক চরিত্র কৃষ্ণের কথা এসেছে। যদিও কৃষ্ণের মুকুটে ময়ূরের পালক সুসজ্জিত থাকে। কিন্তু গ্রামীণ গীতালদের লোকভাষায় এখানে প্রেমিক কৃষ্ণই উঠে এসেছে। সাপ হচ্ছে কামের প্রতীক, ক্রোধের প্রতীক। কালু মোড়লের কাণ্টাতে অর্থাৎ বাড়ির পেছনে যে সরু বেতের বেড়া আছে, সেখানে সাপ সুমাইয়া নাম্নী আরসের (কনের) কোমরে দংশন করেছে। অর্থাৎ প্রেম-দংশনে বিদ্ধ করেছে। সুমাইয়া সেই প্রেম-দংশনে জর্জরিত। এ যেন নাগ-নাগিনীর রূপকে প্রেম-ভালোবাসার চিত্র। ‘কালো ছোঁড়া’ প্রেমিক সাপ, হিন্দু পুরাণের অনুষঙ্গ। মুসলিম মেয়েলি গানে দেবদেবীর লৌকিক রূপান্তরে রাধা-কৃষ্ণ, রাম-সীতা ইত্যাদি লসা-আরস, ছেলেলাল, আবালবালির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় সুস্পষ্ট।

মাঝকার টোনও লিয়্যা রাখাল রে
বাঁশি ভালো বানায় রাখাল রে
মারে গাড্ডু খেলা রাখাল রে
যাইও নদীর ধারে রাখাল রে।

*

খিলি কদোমের তলেরে ডোমোনা
বাজাও রসের বাঁশি হামার ডোমোনা রে।
খিলি কদোমের তলেরে ডোমোনা—
বাজাও হাউসের বাঁশি হামার ডোমোনা

*

বালির চরে বাঁশি বাজে মা
ঘর হইতে শুনিরে
পানিতে ভরা নয়ন রে।

উক্ত দুটি গীতে রাখাল বা ডোমোনা, অন্য কেউ নয়— প্রেমিক। বাঁশি, কদম্ববৃক্ষ, নদীতীর— ইত্যাদির অনুষঙ্গে আবার মনে পড়ে যায় পৌরাণিক চরিত্র কৃষ্ণের কথা। কৃষ্ণ নদীতীরে কদম্ববৃক্ষে বংশীবাদকরূপে হাজির থাকত শ্রীরাধিকা ও গোপিনীদের অপেক্ষায়। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার মন উতলা হলে, তার ‘রাঁধন-বাড়ন’ সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেত। এখানে ‘প্রেমিক রাখাল’ ও ‘গো-পালক কৃষ্ণ’ তুলনীয়।

রাধার মতোই আরসের মন অজানা বাঁশির সুরে ব্যাকুল। চোখ জলে পরিপূর্ণ। অকথিত ব্যথা-যন্ত্রণার কথা মাকে খুলে জানায়। সংসারের কাজে মন বসে না। ব্যাকুল নারী মন। এ যেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের শ্রীরাধিকা।

চৈত আর বৈশাখে আরে বেহুলা
গাঙ্গে উড়ে বালু হে
আষাঢ়ে আরে আগুন গে বেহুলা
গাঙ্গে নতুন পানি হে।

*

গাঙের কুলে বেহুলা কান্দিছে অঝোরে রে হে
কিবা দুঃখ হয়েছে বেহুলা
ডানাখানি ধৈব়্যা সদাগর নৌইকাতে তুল্যা ল্যাও হে
অর্ধেক রাস্তায় যাইয়্যা সদাগর পুছিছে হে
বেহুলা কান্দে কেন অঝোরে, অঝোরে রে হে।

প্রথম গীতটিতে রাগের (ক্রোধের) মধ্য দিয়ে অনুরাগ ব্যক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে আরসের দুঃখ-দীর্ণ জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘বেহুলা’ মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান নারী চরিত্র। ‘আরস-নারী’ পৌরাণিক চরিত্র বেহুলার সঙ্গে উপমিত। মঙ্গলকাব্যগুলির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘সদাগর’। বেহুলার অনুষঙ্গে লখিন্দর বা চাঁদসদাগরকে বোঝানো হয়েছে। মেয়েলি গীতগুলিতে মুসলিম গীদালেরা অনেক গানেই বেহুলাকে নায়িকা কল্পনা করেছে, আর লখিন্দরকে নায়ক। সমকালীন সমাজে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল, এই ‘গীদ’গুলিই তার প্রমাণ। তদানীন্তন সমাজ-কাঠামোয় এই ভাবনা ছিল সহজাত। গীদালদের এই ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।

মনসামঙ্গল কাহিনি— মনসার দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা, চাঁদসদাগরের ঘৃণা, লখিন্দরের বিয়ে ও মৃত্যু, বেহুলার তপস্যা— দেবতা-মানব সম্পর্কের কাহিনি। বেহুলার কান্না, শোক, সদাগরের যাত্রা— সবই সেই কাহিনির দৃশ্যকে প্রতিফলিত করেছে। দ্বিতীয় গানদুটি এই ধর্মীয় পুরাণের সাংস্কৃতিক রূপ।

হ্যাসল ঘরের চান্দাড়ে গৌরি খুদি-বোল্লার চাকো হে
সেনা চাক ভাঁঙিতে গৌরি ছিঁড়লো গলার হারো হে।
সেও হারের ল্যাইগা গৌরী কানছে জারের জার হে
কাইল নাকি আছে গৌরী বিসইতবারের হাটো হে।
হালের গরু বেইচা গৌরী কিনব গলার হারো হে
হ্যাসাল ঘরের চান্দাড়ে গৌরী খুদি বোল্লার চাকো হে।

দ্বারভাঙিয়া সমাজের একটি মুসলিম মেয়েলি গীত:

লেহো গৌরী, লেহো গৌরী আন্‌ গোনা শোনা
মতি ভাঙ্গে কাড়ি
ঢেমনা কো মারো পাইয়া লাত রে
বিভা হুয়োকে আসে খাড়ি।

হাসাল (হেঁসেল) ঘর, খুদি-বোল্লার চাক, গলার হার, বৃহস্পতিবারের হাট, গৌরী— এসব মোটিফ বাংলার বিয়ের গানের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। এই গানের গঠন, ভাষা, শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি— মধ্যযুগীয় বাংলা লোকগানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বহন করে যা আজও মুসলিম লোকগানগুলিতে প্রবহমান। দ্বিতীয় গানে, গৌরী গৌরবর্ণা নারী বা পার্বতী দুর্গা। গানের তালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘গৌরী’ শব্দটি বারবার ধ্বনিত হয়েছে। শিবের স্ত্রী গৌরী— শক্তি, সৌন্দর্য, উর্বরতা ও মাতৃত্বের দেবী হিসেবে পূজিত হন।

আষাঢ় শাউনে ক্যাইসা উবজিল হে
ভরা ভাদোরে তুলা ফুটিল হে
আমিও যাব মাও বাবার বাড়ি হে
কেও জোগাবে তোমার মহল হে
কোলে আছে সাহেব সদাগর ছেলে হে
কপালে আছে তিলক লোটার ফোটা হে
সেও জোগাবে আমার মহল হে
আষাঢ় শাউনে ক্যাইসা উবজিল হে
ভরা ভাদোরে তুলা ফুটিল হে।

গানটি গ্রামীণ চেতনায় রচিত হলেও, এর মধ্যে হিন্দু পুরাণ ও বৈষ্ণব ভাবধারার স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। ভাদ্র মাসের পর আশ্বিন বা শারদোৎসবের মাস। মাঠে কাশফুল ফুটেছে। এই সময় উমা মায়ের কাছে আসে। এখানে গৃহকন্যার ইচ্ছে হয়েছে মাতৃগৃহে যাওয়ার। গানটির নায়িকা গিরিকন্যা উমার সঙ্গে তুলনীয়। ‘আমিও যাব মাও বাপের বাড়ি’— এটি শুধু পারিবারিক আকুলতা নয়, বরং আত্মা-ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বৈষ্ণব পদাবলির জীবাত্মার পরমাত্মার কাছে যেন ফিরে যাওয়া। আবার ‘সদাগর’ মনসামঙ্গলের চরিত্র, কিন্তু মনসামঙ্গল নিজেই হিন্দু পুরাণে নাগদেবীর কাহিনির রূপান্তর। ‘সদাগর’ চরিত্রের উল্লেখ পুরাণজাত লোকবিশ্বাসকে জড়িয়ে এনেছে। ভাদ্রমাস, বর্ষাকাল, প্রকৃতির উর্বরতা— এসবই হিন্দু পুরাণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্য একটি গীত:

কারবা লাইগ্যা মানুষ কৈব়্যাছিনু
ত্যাল কাজল দিয়্যা
কেবা আইস্যা লিয়্যা গেল রে
ঢাকে বাড়ি দিয়্যা।

এই গানে ‘ঢাকে বাড়ি দিয়্যা’ পংক্তিটি গিরিগৃহ থেকে উমার বিদায়ের পৌরাণিক ইতিহাস স্মৃতিপটে নিয়ে আসে। বিয়ের দিনে মেয়েকে বিদায় দেওয়ার মুহূর্তে মায়ের মনের দুঃখ-কষ্ট, আহাজারির কথা বলা হয়েছে। ‘ঢাক বাজানো’ বিয়ে বা যে কোনও পার্বণে হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ।

অদ্ভুতভাবে শেরশাবাদী সমাজে প্রচলিত ‘গীদে’ শরত এবং তার অনুষঙ্গে উমার মাতৃগৃহে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সাহেব, সদাগর, তিলকলোটা, ঢাকের বাদ্য সমস্ত কিছু মিলে সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে হিন্দু সংস্কৃতির ছবি ফুটে উঠেছে। বিস্ময়কর হলেও সম্প্রীতির শাশ্বত ভাবনা সম্প্রদায়-নিরপেক্ষভাবে মেয়েলি গীতগুলিতে সুস্পষ্টভাবে পরিস্ফুট হয়েছে।

উপরের আলোচনা ও গীত-পাঠ থেকে স্পষ্ট যে, গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি কোনও বিচ্ছিন্ন বা ‘শুদ্ধ’ ধর্মীয় সংস্কৃতির ফসল নয়। বরং এগুলি দীর্ঘদিনের সামাজিক সহাবস্থান, ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠীর স্মৃতি এবং লোকায়ত আবেগভাষার যৌথ নির্মাণ। রাধা-কৃষ্ণ, বেহুলা-লখিন্দর, হর-গৌরীর মতো পৌরাণিক চরিত্র ও প্রতীকগুলি এখানে দেবত্বের গাম্ভীর্য নিয়ে নয়, বরং প্রেমিক-প্রেমিকা, নারী-পুরুষের আকুলতা ও দাম্পত্যজীবনের রূপক হিসেবে উপস্থিত।

এই গীতগুলিতে হিন্দু পুরাণের অনুপ্রবেশ কোনও ‘হিন্দুকরণ’ প্রক্রিয়ার ফল নয়; আবার একে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় বিচ্যুতি বলেও ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং এটি লোকায়ত মুসলিম সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক আধুনিকতা, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় কঠোর অনুশাসনের বদলে সামাজিক জীবনের সঙ্গে সমঝোতা করে চলে। লোকসংস্কৃতির এই স্তরে ধর্ম নয়, মানুষের অনুভব, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সমকালীন সাম্প্রদায়িক ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই মেয়েলি গীতগুলির তাৎপর্য আরও গভীর। এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজনের ভাষা আধুনিক ক্ষমতাকাঠামোর সৃষ্টি; লোকজ সংস্কৃতির ভেতরে সেই বিভাজন কখনওই এত কঠোর ছিল না। গৌড়বঙ্গের মুসলিম মেয়েলি গীতগুলি তাই শুধু অতীতের সাংস্কৃতিক নিদর্শন নয়— এগুলি একটি বিকল্প ইতিহাস, যেখানে সহাবস্থান, সমন্বয় ও মানবিক সম্পর্ক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

 

সহায়ক গ্রন্থ: