Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

কেবল মজুরি বৃদ্ধি কি ‘স্থায়ী’ সমাধান দেবে? নয়ডা শ্রমিক-বিক্ষোভ ও পুঁজিবাদের সংকট

তন্ময় বিশ্বাস

 


আজকের যে শ্রমিক-বিক্ষোভকে আপাতভাবে নিছক শ্রমিক-মালিক বিরোধ বলে মনে হচ্ছে, এবং যাকে সরকার ও মালিকপক্ষ ‘হিংসাত্মক অরাজকতা’ হিসেবে দেখাতে তৎপর, তা আদতে দীর্ঘদিনের অবদমনজাত যৌথ চিৎকার। এই চিৎকারের পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, যে ক্ষোভ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মুদ্রাস্ফীতির একটি সামাজিক বহিঃপ্রকাশ। তাই একে কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি বলে ছেড়ে দিলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না

 

১৩ এপ্রিল ২০২৬। উত্তরপ্রদেশের নয়ডা শিল্পতালুকের কথা উঠে এল খবরের শিরোনামে। কারণ শ্রমিক-অসন্তোষে উত্তাল হয়েছিল নয়ডার ফেজ় ২, সেক্টর ১ এবং সেক্টর ৮৪। বিক্ষোভের আগুন দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল শহরের ৮০টি জায়গায়। রাস্তায় বাগাওয়াতে নামলেন প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিক। ৪০০টি কারখানার শ্রমিকরা হরতাল ডাকলেন। একটা পর্যায়ে এই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ওপর পুলিশি আক্রমণ নামে, পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফায় সংঘর্ষে জড়ান শ্রমিকরা। গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভ-আন্দোলনের ওপর পুলিশি আক্রমণের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র শ্রমিকেরা হাতে পাথর তুলে নিতেও বাধ্য হন।

অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতাসীন যোগী-সরকার স্বভাবতই এই শ্রমিক-বিক্ষোভের ওপর নামিয়ে আনা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নকে ন্যায্যতা দিতে গোটা ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরেছে। সেই রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী অনিল রাজভর আবার এক ধাপ এগিয়ে এই বিক্ষোভে পেছনে পাকিস্তান-যোগসূত্রের সম্ভাবনা ‘আবিষ্কার’ করেছেন। অথচ, বিজেপির ডবল-এঞ্জিন সরকারের ‘উন্নয়নের’ চাপে ওষ্ঠাগতপ্রাণ শ্রমিকদের প্রতিটি দাবিই ছিল ন্যায়সঙ্গত। শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিলেন, কর্মঘণ্টা কমানোর দাবি জানিয়েছিলেন মালিকদের কাছে। এরপর পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে তড়িঘড়ি করে উত্তরপ্রদেশ সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমাধানের ঘোষণা করে। নয়ডা এবং গাজ়িয়াবাদের মতো শিল্পতালুকগুলিতে অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে মাসিক মজুরি ১১,৩১৩ টাকা থেকে বেড়ে ১৩,৬৯০ টাকা হয়েছে; যদিও তাতেও ন্যূনতম মজুরি ২০,০০০ টাকার কমই রইল। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, হরিয়ানার মানেসর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের কাছেও সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়ে অদক্ষ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু, সেই মজুরি বৃদ্ধিও মোটেই পর্যাপ্ত নয়।

আসলে, শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ ভারতের শ্রমবাজারের একটি অস্বাভাবিক বাস্তবকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে— নিবন্ধিত কারখানায় নিযুক্ত শ্রমিকদের সেই সমস্ত বুনিয়াদী অধিকারের দাবি জানাতে হচ্ছে, যা কিনা যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক নিযুক্তির ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক পাওনা। তাছাড়া, মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে, চুক্তি-ভিত্তিক শ্রমিকরা সবসময় যখন-তখন ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক ভুগতে হয়। পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস) ২০২৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৮.২ শতাংশ শ্রমিকের কোনও লিখিত নিয়োগপত্র নেই; এবং ৫১.৭ শতাংশ শ্রমিকের কোনও ধরনের সামাজিক সুরক্ষা বিমা-র আওতায় যোগ্য বলে বিবেচিত হননি। এর পাশাপাশি, ৪৭.৩ শতাংশ শ্রমিকের সবেতন ছুটির কোনও অধিকার ছিল না। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থায় কর্মরত শ্রমিকদের একটা বড় অংশ বাস্তবে ‘অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে’ নিযুক্ত।

এই অবস্থার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হল চুক্তি-ভিত্তিক বা প্রয়োজন-ভিত্তিক শ্রমিকের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা। অ্যানুয়াল সার্ভে অব ইন্ডাস্ট্রিস্-এর (এএসআই) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে শিল্পক্ষেত্রে চুক্তি-ভিত্তিক শ্রমিকের হার ক্রমাগত বেড়েছে: ২০১৪-১৫ সালে যা ছিল ৩৫ শতাংশ, তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩-২৪ সালে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এক ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। কোম্পানিগুলি এখন সরাসরি কর্মী নিয়োগ না করে তৃতীয় পক্ষের (intermediaries) ওপর বেশি নির্ভর করছে। আর এভাবে মধ্যস্থতাকারী ঠিকাদারদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শ্রমিকদের কপালে সাধারণত কোনও লিখিত চুক্তিপত্র জুটছে না; সেই সঙ্গে না তাঁরা পাচ্ছেন সবেতন ছুটি, না পাচ্ছেন এমপ্লয়িজ স্টেট ইনশিওরেন্স-এর (ইএসআই) মতো সামাজিক সুরক্ষা বিমার সুবিধে।

বিভিন্ন রাজ্যে এইরকম ‘অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’-এর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা চোখে পড়ে। উত্তরপ্রদেশ, যেখানে শ্রমিক-বিক্ষোভ ঘটেছে, সেখানে প্রায় ৬৭.৮ শতাংশ নিয়মিত কর্মরত শ্রমিকের কোনও লিখিত কর্ম-চুক্তি নেই, ৬২.৪ শতাংশ শ্রমিক সবেতন ছুটির সুবিধে পান না, এবং ৫৯.২ শতাংশ শ্রমিক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের যে কোনও নির্দিষ্ট অধিকার থেকে বঞ্চিত। এছাড়া, উত্তরপ্রদেশের ৪৬.৩ শতাংশ শ্রমিকের একাধারে লিখিত নিয়োগপত্র, সবেতন ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষা বিমা— এই তিনটির কোনওটিই নেই। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বঞ্চনার এই হার যথেষ্ট বেশি। বিহার, ছত্তিশগড় এবং রাজস্থানেও শিল্প-শ্রমিকরা প্রায় একইরকম বঞ্চনার শিকার।

আজকের যে শ্রমিক-বিক্ষোভকে আপাতভাবে নিছক শ্রমিক-মালিক বিরোধ বলে মনে হচ্ছে, এবং যাকে সরকার ও মালিকপক্ষ ‘হিংসাত্মক অরাজকতা’ হিসেবে দেখাতে তৎপর, তা আদতে দীর্ঘদিনের অবদমনজাত যৌথ চিৎকার। এই চিৎকারের পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, যে ক্ষোভ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মুদ্রাস্ফীতির একটি সামাজিক বহিঃপ্রকাশ। তাই একে কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি বলে ছেড়ে দিলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না।

মনে রাখা দরকার, এই একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের মূল্য— যা মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড— উল্লেখযোগ্য হারে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। লেবার ব্যুরো-র কনজ়িউমার প্রাইস্ ইনডেক্স ফর লেবার ওয়েজেস্-এর (সিপিআই-আইডব্ল্যু) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে দিল্লি-সহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলিতে পণ্যমূল্য প্রায় ৪৩.৭ থেকে ৫২.৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বছরের পর বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতি ও পণ্যমূল্যবৃদ্ধি কী ভীষণরকমভাবে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে গেছে, এই সমস্ত বিক্ষোভ-প্রতিবাদ তারই অকাট্য প্রমাণ। গত কয়েক মাসে এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে, যার মূলে প্রথমে ছিল মার্কিন শুল্কের প্রভাব এবং পরবর্তীতে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ট্রাম্পের দখলদারির ঘৃণ্য প্রচেষ্টার জেরে হরমুজ় প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা। ইতোমধ্যে, কোটাক ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজ-এর রিপোর্ট দাবি করেছে, নির্বাচন মিটলে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম লিটারে ২৫-২৮ টাকা বাড়তে পারে। তার প্রভাব এই শ্রমশীল মানুষের জীবনে পড়তে বাধ্য। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে বলেছে: ‘‘Global headline inflation is expected to increase to 4.4 percent in 2026.’’ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের অধীনে ইউনাইটেড নেশনস্ ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) প্রকাশিত রিপোর্ট জানাচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার সংকটের প্রভাবে যুদ্ধের পর ভারতে দারিদ্র্যের হার ছুঁতে পারে ২৪.২ শতাংশ, যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ২৩.৯ শতাংশ।

অতএব, নয়ডার ‘স্থানিক’ সংকটের আদত শিকড় দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে প্রসারিত হয়ে শেষে আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে নিহিত হয়েছে। দৃশ্যমান শ্রমিক-অসন্তোষ আসলে উপসর্গ মাত্র। রোগ হল পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক সংকট। এই সংকটের কারণেই আর্থিক-বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষে মরছেন গোটা বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। একদিকে কর্পোরেট মুনাফার পাহাড় জমছে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমশীল মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান ক্রমশ তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়ক তাঁর নিওলিবারালিজ়ম্: অ্যান ইরা অব গ্রোথ স্যান্স জাস্টিস্ (২০২১) নিবন্ধে লিখেছেন, নয়া-উদারবাদের আমলে ‘‘একই সঙ্গে অবশ্য শ্রমিকের উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে যায়। তার কারণ উৎপাদন পদ্ধতিতে অনেক দ্রুততার সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসে […]। এর ফলে দেশের আর্থিক উদ্বৃত্তের অংশীদারিত্বে বড়সড় বৃদ্ধি ঘটে, যা এই উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা লোকজনকে— যেমন, মালিকানার অধিকারী ধনকুবের ও তাদের উঞ্ছজীবীদের— যাদের আয় কিনা শ্রমজীবী মানুষের তুলনায় অনেকানেক বেশি, তাদের মুনাফা বৃদ্ধিতে নিশ্চয়তা দেয়। এটিই নয়া-উদারবাদী যুগে আর্থিক অসাম্যের দৃশ্যমান বৃদ্ধির মূলে নিহিত কারণ।’’ আমরা ঠিক এইরকম বৈষম্যের অনুরণনই দেখি ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬-এ। আজ বৈশ্বিক স্তরে গ্লোবাল রিসোর্সের বেশিরভাগটাই কুক্ষিগত শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর হাতে; এরাই বৈশ্বিক আয়ের ৫৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সম্পদের ৮৫ শতাংশ ভোগ করেন। এদিকে কর্পোরেটতন্ত্রভজা মোদি-জমানার ‘‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’’-এর জুমলার আড়ালে ভারতে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনকুবেরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোট জাতীয় সম্পদের ৪০.১ শতাংশ।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই বলা হোক কিংবা নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির গালভরা নামে তাকে ডাকা হোক, পুঁজি কখনওই আত্মশ্রমফল-বঞ্চিত শ্রমজীবীকে মানুষ হিসেবে দেখে না। শ্রমিক-শ্রমিকারা তার কাছে শ্রমশক্তির আধার মাত্র। তাছাড়া, পুঁজিবাদের নিজস্ব যুক্তি অনুযায়ী পুঁজির ধর্মই উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি আহরণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলা। সুতরাং, পুঁজির শোষণ চরিত্রগতভাবেই অন্তহীন। তাই, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির একচেটিয়া সর্বময়তাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে বিশ্বজুড়ে যে নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্থিরতা দিয়েছে, তার উচ্ছেদের প্রশ্ন এবং ‘‘পুঁজিবাদের বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর’’ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক-সাম্যের মন্ত্রে সংগঠিত সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রশ্নকে সম্বোধন না করে স্থানিক থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক-অসন্তোষের কিছু ‘তাৎক্ষণিক’ সমাধান করা গেলেও ‘স্থায়ী’ সমাধান অধরাই থেকে যাবে।


*মতামত ব্যক্তিগত