সুমন কল্যাণ মৌলিক
নয়ডার আন্দোলন ভারতের শ্রমের বাজারের এক বৃহত্তর সংকটের ছবিটা আমাদের সামনে উপস্থিত করে। নয়ডা নব্বই-এর দশকে চালু হওয়া সংস্কার কর্মসূচি ও কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রতিবাদ। এই হিংসার মধ্যে এক ধরনের ন্যায্যতা আছে যা আপাদমস্তক হিংসাশ্রয়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। সাধারণভাবে রাষ্ট্রের শিল্পব্যবস্থায় একধরনের সামাজিক চুক্তি থাকে। কিন্তু নব্বই-এর দশকের পর থেকে নয়া শ্রম আইনের ধুয়ো তুলে রাষ্ট্র তার ভূমিকা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছে। আজ প্রকৃত অর্থে ভারতের সমস্ত শিল্পে ঠিকাশ্রমিকদের উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চলছে। ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মূল ধারা নিজেদের মৌরসিপাট্টা বজায় রাখতে ঠিকাশ্রমিকদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। এই বিপুল শ্রমশক্তি আজ তাই কাউকেই ভরসা করে না, তারা নিজেদের জানান দিতে চাইছে, প্রত্যাঘাত করতে চাইছে। আর সেটা করতে গিয়ে এই মানুষেরা 'শ্রমিক ও শ্রেণিরাজনীতি'র প্রশ্নটাকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে ফেলেছেন
ময়নাদেবীর কথা
রোজ সকাল ৮ টার সময় রাস্তায় এসে দাঁড়ান কোম্পানির বাসের জন্য। গন্তব্য নয়ডা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া (ফেজ-২) তে অবস্থিত গুরুদাস অমরদাস ইন্টারন্যাশানাল প্রাইভেট লিমিটেড কারখানা। এখানে তৈরি হয় কেবল যা অটোমোবাইল ও ডাটা কমুনিকেশন শিল্পে বহুলব্যবহৃত। ক-দিন আগে তার বাঁধতে গিয়ে ময়নাদেবীর বুড়ো আঙুলে ক্ষত হয়েছে। কিন্তু বিশ্রাম নেওয়া ময়নাদেবীর কাছে বিলাসিতা, কারণ বাড়িতে আছে তাঁর তিন সন্তান। একদিন কাজে না আসলে তাঁর ৫০০ টাকার ক্ষতি। নয়ডা থেকে ১৬০ কিমি দূরে মুরাদাবাদ শহর থেকে কাজের খোঁজে এখানে এসেছিলেন। বারো ঘন্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তাঁর মাইনে ১১৩১৩ টাকা। এর আগে ময়নাদেবী এক হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে বেতন মিলত মাসে ৯০০০ টাকা। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ময়নাদেবী প্রায় প্রতিদিন ওভারটাইম করেছেন। সেই মজুরির মূল্য ঘন্টাপ্রতি ২৫ টাকা। ওভারটাইমে নর্মাল সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি দেওয়ার নিয়ম, ন্যূনতম মজুরির অধিকার ঠিকাশ্রমিকদের কাছে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের গল্প। ১২ ঘন্টা কাজের মধ্যে বিশ্রাম নেই বললেই চলে, টয়লেটে একটু বেশিক্ষণ থাকলে বরাদ্দ সুপারভাইজারদের গালি। মজুরদের এই বধ্যভূমিতে কর্পোরেট হাঙরদের মুনাফা ছাড়া বাকি সব গৌণ। সরকার বিজ্ঞাপিত নিয়মকানুন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংশোধিত হওয়ার কথা। কিন্তু ন্যাশানাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন (এনসিআর)-এর অন্তর্ভুক্ত নয়ডা হোক বা গুরগাঁও— উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানা সরকার গত দশ বছরে একবারের জন্যও বাজারদর অনুযায়ী সংশোধন করেনি, ঠিকাশ্রমিকদের এক পয়সাও মজুরি বৃদ্ধি হয়নি। এটাই ভারতের প্রায় সমস্ত ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল হাবের বাস্তবতা। গড়ে বারো ঘণ্টা খাটনি, বেশিরভাগ জায়গায় মাসমাইনে পনেরো হাজার টাকার কম। কাজের কোনও স্থায়িত্ব নেই, নেই চিকিৎসার সুবিধা, কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকের দায় নেই। এভাবেই চলে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। ঝাঁ চকচকে ওয়ারহাউসের ভেতর অনন্ত নরকযাপন।
দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায়
ক-দিন আগে নয়ডার বিভিন্ন ছোট-বড় কারখানার শ্রমিকরা যে অভূতপূর্ব বিদ্রোহ করেছেন তার কারণ অনুসন্ধানের জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন হয় না। এই বিস্তীর্ণ শিল্পতালুকে মাসে বারো থেকে পনেরো হাজার টাকায় বাঁচা যায় না। গুরগাঁও বা নয়ডার মতো ঘিঞ্জি এলাকায় যেখানে নাগরিক পরিষেবা শূন্যের কাছাকাছি, সেখানে একটি এক কামরা ঘরের ভাড়া ৫০০০-৭০০০ টাকা। চাল, ডাল, তেল, সবজির এই অগ্নিমূল্যের বাজারে স্বামী-স্ত্রী ও দুটো বাচ্চা আছে এমন সংসারে অতি সাধারণ খাওয়াদাওয়া করলেও মাসে খরচ হয় নিদেনপক্ষে দশ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, ফোনের বিল, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ যুক্ত হয়ে অন্তত দরকার বাইশ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারদর ও মজুরির পাটিগণিত কোনওদিন মেলে না। ভারতের শ্রমশক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সংগঠিত শিল্পের অসংগঠিত শ্রমিকরা কোনওদিনই তাঁদের ন্যায্য মজুরি পান না। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘State of working India report’ অনুসারে ৯২ শতাংশ মহিলা ও ৮২ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক মাসে দশ হাজার টাকার কম মাইনে পেতেন। ২০১৫ সালে উত্তরপ্রদেশে অদক্ষ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ছিল মাসিক ৯০৭৮ টাকা। অথচ সপ্তম কেন্দ্রীয় পে কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছিল বাজারদর অনুযায়ী ২০১৫ সালে ন্যূনতম মজুরি হতে হবে ১৮,০০০ টাকা। ফলত এই বিপুলা শ্রমশক্তির আর্থিক অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে বাড়িতে কারও গুরুতর অসুখবিসুখ বা মেয়ের বিয়ে বা এলপিজির দাম বৃদ্ধির মতো ঘটনায় তাঁদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যায়।
রূপকথাদের জন্ম হয়
এই অত্যাচার যখন চরম বিন্দুতে পৌঁছে যায় তখন হয় প্রত্যাঘাত। ৯ এপ্রিল (২০২৬) এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণের সাক্ষী থাকে দেশ। ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নের আটটি এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন। আশি হাজারের বেশি শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি ও আদর্শ কাজের সময়ের দাবিতে ব্যারিকেড লড়াই শুরু করেন। রাস্তা বন্ধ, কারখানার বাহারি গ্লোসাইনে ইটবৃষ্টি, মালিকপক্ষের গাড়ি ভাঙচুর কর্পোরেট হাঙরদের আতঙ্কিত করে তোলে। অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন গৃহপরিচারিকা ও গিগ শ্রমিকরা আন্দোলনে যোগ দেন। ইনকিলাব মজদুর কেন্দ্রের এক সংগঠক আমাদের মনে করিয়ে দেন কদিন আগের (২ এপ্রিল) নয়ডা থেকে ৭০ কিমি দূরে অবস্থিত হরিয়ানার মানসেরে হন্ডা অটোমোবাইলের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে হাজার হাজার শ্রমিকের লড়াকু আন্দোলনের কথা। এই গোটা পর্বে আমরা এক আপাত স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু পরিকল্পিত প্যাটার্ন দেখতে পাই। হন্ডার সামনে যে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল তা ৪ এপ্রিল মুনজল সোয়া লিমিটেডের কারখানায় ছড়িয়ে যায়। সেখান থেকে ৬ এপ্রিল সত্যম অটো, রূপ পলিমারস এবং ৮ এপ্রিল রিচা গ্লোবাল এবং মডেলেমা কারখানা। হরিয়ানা সরকার আন্দোলনের চাপে ৯ এপ্রিল (২০২৬) মজুরি সংশোধন করে, ততদিনে গুরগাঁওয়ের একাধিক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। নয়ডার আন্দোলন এতটাই তীব্র ছিল যে ৯ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় দুদিন বন্ধ থাকে। বাধ্য হয়ে হরিয়ানা সরকার ন্যূনতম মজুরি (অদক্ষ শ্রমিক) বাড়িয়ে ১৩,৬৯০ টাকা করে। এই সামান্য সংশোধন স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট নয়, কিন্তু মনে রাখতে হবে শ্রমিক আন্দোলন সরকারকে বাধ্য করেছে এই মজুরি সংশোধন করতে।
নতুন রাজনীতির প্রকরণ
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিকশক্তির এই প্রত্যাঘাত এক নতুন ধরনের শ্রমিক রাজনীতির চেহারা আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। সাধারণভাবে শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার প্রচার, সংগঠন, ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন পার্বিক আলোচনা, ট্রেড ইউনিয়ন, লেবার কমিশনার, রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের মধ্যস্থতার (collective bargaining) চিরাচরিত পদ্ধতিকে সরিয়ে শ্রমশক্তি নিজেদের দাবি আদায়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে নেমেছে। আলাদা আলাদা ইউনিটের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলোচনার কোনও অবকাশ না রেখে তারা সোজাসুজি সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। আমরা মানসেরে, নয়ডাতে দেখলাম যে ঠিকাশ্রমিকদের শক্তির এক প্রদর্শন যা এতদিনের আলোচনার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের, তাঁদের জীবন, চিন্তাভাবনা, দাবিদাওয়াকে আলোচনার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করল। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই শ্রমশক্তির নেতৃত্ব কারা, কোন সংগঠন, তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে— সে সম্পর্কে রাষ্ট্রের এজেন্সিগুলির কোনও ধারণা নেই। বরং শ্রমিকরা কারখানার প্রবেশপথ বন্ধ করছেন, পথ অবরোধ করছেন, একটা মাত্রায় পুলিশের মারের পাল্টা ভাঙচুর করছেন, সেকেন্ডের মধ্যে রিল বানিয়ে আন্দোলনের নানা ছবি সোশাল মিডিয়ায় আপলোড করছেন— এগুলো আগে কখনও দেখা যায়নি। এই মানুষদের মধ্যে যে মরিয়া ভাব দেখা গেল তার প্রধান কারণ তাঁদের কাজের কোনও স্থায়িত্ব নেই। এই আন্দোলনে যোগদানের পরিণতি কী হতে পারে সেটা জেনেই তাঁরা এতে ঝাঁপিয়েছেন। এই নতুন ধরনের আন্দোলন তথা প্রতিরোধ হচ্ছে পুঁজির বর্তমান রূপের বিরুদ্ধে সশব্দ প্রতিবাদ। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর অনুসরণে আমরা বলতে পারি: “What the bourgeoisie therefore produces, above all, are its own grave-diggers.” আজ যেটা দেখা যাচ্ছে তার একটা পূর্বাভাস দেখা গিয়েছিল ২০১২ সালে ঐতিহাসিক মারুতি-সুজুকি শ্রমিক আন্দোলনে যেখানে মূল ধারার ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে প্রান্তে ঠেলে দিয়ে শ্রমিকরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিত।
এই নতুন ধরনের আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক সরোজ গিরি তাঁর “The Noida Industrial Protests and Working Class Power” (দ্য ওয়ার) শীর্ষক প্রবন্ধে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে নয়া-উদারবাদের এই যুগে যখন স্থায়ী কাজ, সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো কবরে চলে গেছে তখন বিগত সময়ের মতো ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ধরন আজ অচল। মধ্যস্থতা-নির্ভর (collective bargain) ষাট-সত্তর দশকের শ্রমিক আন্দোলনের পরিণতিতে মূল ধারার আমলাতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি আজ সংগঠিত শিল্পের ‘হোয়াইট কলার’ জবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই মূল ধারার ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা আজ মূলত ম্যানেজমেন্টের বর্ধিত অংশ। পে-কমিশন, ওয়েজ বোর্ডে উচ্চ মজুরির সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা ও বাৎসরিক বন্ধ পালনের রাজনীতি দিয়ে এই সমস্ত ধরনের সুযোগসুবিধাবঞ্চিত, ভঙ্গুর বিপুল ঠিকাশ্রমিকদের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়ছে নতুন রাজনীতি। সরোজ তাঁর প্রবন্ধে নয়ডার ঘটনাকে কোনও অনুকরণযোগ্য মডেল বলেননি কিন্তু মনে করিয়ে দিয়েছেন:
To say that this direct action is in search of or looking for a new political form of organising, might be presumptuous. I think one should not jump the gun here. One should be able to stay with this situation of flux for some time at least. What looks like direct action might already be the new “form’ of political organising. Or it might contain the elements for the new form of political organising.
রাষ্ট্রের চেনা উত্তর
মানসের-নয়ডা-গুরগাঁও শ্রমিক আন্দোলনের যে নতুন ভাষ্য উপস্থিত করেছে তার প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলির উত্তর কিন্তু সেই চেনা ছকেই আটকে থেকেছে। ঘটনার আকস্মিকতা ও বিশালতায় চমকিত রাজ্য সরকারগুলো প্রথমে সামান্য বেতন বৃদ্ধি করেছে। এই বেতন বৃদ্ধি যত সামান্যই হোক না কেন এর প্রতীকী তাৎপর্য অপরিসীম। যোগীর বুলডোজার-রাজের নিত্যনৈমিত্তিক চমক-ধমকের পাশাপাশি নয়ডার প্রত্যেকটি কারখানার সামনে বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখা আছে সরকার কর্তৃক ঘোষিত নয়া মজুরির হার। সঙ্গে অবশ্যই আছে লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস ও অপহরণ করার প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু সেখানেও যে দক্ষতায় পুলিশের সন্ত্রাস, নারী শ্রমিকদের উপর নির্যাতনের ছবি আন্দোলনকারীরা সোশাল মিডিয়ায় আপলোড করেছেন তাতে সরকারের মুখ পুড়েছে। এরপরে শুরু হয়েছে ডাইনি খোঁজার পালা। প্রথমে পাকিস্তানের এজেন্ট ও পরে বহুব্যবহৃত আর্বান নকশালের তত্ত্ব। এই ছকে প্রগতিশীল সাংবাদিক, ছাত্র, বিকল্প ধারার শ্রমিক সংগঠক, থিয়েটারকর্মী, বামপন্থী পুস্তক প্রকাশক-সহ বহু মানুষকে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আগুন তো নিভছেই না, বরং নতুন নতুন জায়গায় বিস্তৃত হচ্ছে। এ-লেখা যখন লিখছি তখন ইলেকট্রিক স্টেবিলাইজার ও সুইচ তৈরির সংস্থা ভি-গার্ডের কারখানাতে ঘেরাও আন্দোলন শুরু হয়েছে। রাজস্থানে সাফাইকর্মীদের আন্দোলন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
উত্তর খোঁজার সময় এসেছে
নয়ডার আন্দোলন ভারতের শ্রমের বাজারের এক বৃহত্তর সংকটের ছবিটা আমাদের সামনে উপস্থিত করে। নয়ডা সংকটের শুরু নয় বরং বিদ্যমান সংকটের বহিপ্রকাশ। নব্বই-এর দশকে চালু হওয়া সংস্কার কর্মসূচি ও কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রতিবাদ। এই হিংসার মধ্যে এক ধরনের ন্যায্যতা আছে যা আপাদমস্তক হিংসাশ্রয়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। সাধারণভাবে রাষ্ট্রের শিল্পব্যবস্থায় একধরনের সামাজিক চুক্তি থাকে। মনে করা হয় শ্রমিক নিয়ম মেনে কাজ করবে, মালিক তার ন্যায্য মজুরি দেবে, রাষ্ট্র এই দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী একটা ব্যবস্থা তৈরি করবে এবং সামাজিক সুরক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু নব্বই-এর দশকের পর থেকে নয়া শ্রম আইনের ধুয়ো তুলে রাষ্ট্র তার ভূমিকা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছে। কাজের ধরন যেহেতু ঠিকা তাই মজুরি হোক বা কাজের সময় গোটাটাই মালিক-নির্ভর। আজ প্রকৃত অর্থে ভারতের সমস্ত শিল্পে ঠিকাশ্রমিকদের উপর (যাঁরা শ্রমশক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠ) মধ্যযুগীয় বর্বরতা চলছে। এই ঠিকাদাররাজে মে দিবসে প্রাপ্ত সাধারণ অধিকারটুকুও তাঁদের নেই। ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মূল ধারা নিজেদের মৌরসিপাট্টা বজায় রাখতে ঠিকাশ্রমিকদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। এই বিপুল শ্রমশক্তি আজ তাই কাউকেই ভরসা করে না, তারা নিজেদের জানান দিতে চাইছে, প্রত্যাঘাত করতে চাইছে। আর সেটা করতে গিয়ে এই মানুষেরা ‘শ্রমিক ও শ্রেণিরাজনীতি’র প্রশ্নটাকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে ফেলেছেন। প্রথাগত, নিরাপদ, মালিকের পক্ষে স্বস্তিদায়ক তথা স্থিতাবস্থার সমর্থক ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিকে তাঁরা একাধারে প্রত্যাখান করছেন অন্যদিকে নতুন রাজনীতির প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরছেন। নয়ডা বহু জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।
*মতামত ব্যক্তিগত

