বিশ্বনাথ উদিত
তথ্য বলছে ২০২৬-এ বিজেপি তৃণমূলের থেকে ৩২ (লক্ষ) ভোট বেশি পেয়েছে। আমরা কপট ভোটের কথা বলেছি, কিন্তু তার বাইরেও তো হিসাব আছে। মানুষকে তো মনে করানো হত সমস্ত অনুদান স্থানীয় নেতাদের হাতে বাঁধা, ‘নির্বাচন কমিশন দুইদিন কিন্তু তৃণমূল চিরদিন’। বহু অঞ্চলে ভোটদানের উপর তীক্ষ্ণ নজরদারি ছিল। নেতাদের উপর দলের প্রচণ্ড চাপ ছিল কোন অঞ্চলে কত ভোটে এগিয়ে থাকতে হবে সে ব্যাপারে আর নেতারা মানুষের ঘরে ঢুকে বুঝিয়ে আসত বিরোধী ভোটের কর্মফল। সামগ্রিকভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল একটা চাপা ভয়ের বাতাবরণ। এইসব ব্যাভিচার এবার হয়নি। মানুষ বিশ্বাস করেছে ক্ষমতা বদলে গেলেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থাকবে, হয়তো বা আরও কিছু সুরাহা হবে। ১০টা অসহায় ভীত মানুষ আশ্বাস পেয়ে যদি তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে ঘুরে যায় তাহলেই ব্যবধান ২০টা কমে যায়। গুন্ডাদমনের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস এই ফলটা আনতে পারে। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকায় সে আশ্বাস দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে। ভয় কাটিয়ে ভোট ঘুরে যেতেই পারে। তারুণ্যের দাবি এবং ভয়মুক্তি, দুইয়ে মিলে খুব সহজেই ১৬ ভোট (২.৫ শতাংশ) ঘুরে গিয়ে ৩২ ভোটের উল্টো ব্যবধান তৈরি করতে পারে। কোনও হিন্দুজাগরণের দরকার নেই
প্রধান নির্বাচনী কমিশনার হিসাবে জ্ঞানেশ কুমারের নিজের নির্বাচন থেকে শুরু করে তথাকথিত গরমিলের কারণে সাতাশ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বঞ্চনা এখন বহু আলোচিত এবং নির্বাচনের পর একপাশে সরিয়ে রাখা বিষয়। এই অনৈতিক কাজের মাধ্যমে একটা বড় নৈতিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা হল ভয়মুক্ত স্বাধীন নির্বাচন, যা এতদিন পশ্চিমবঙ্গে ছিল বিরল। নির্বাচন কমিশনের এই অসামান্য সাফল্যে প্রশ্ন উঠতেই পারে জ্ঞানেশ কুমারই কি তৃণমূল দলের পতনের কারিগর? যদি তাই হয় তাহলে কতটা?
জ্ঞানেশ কুমারের কাজের দুটি দিক: বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) এবং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পুরোপুরি কমিশনের কব্জায় নিয়ে নেওয়া। প্রথম দিকটি নিয়ে অদক্ষতার ও সরকারি অসহযোগিতার গভীর সমালোচনা থাকলেও দ্বিতীয় দিকটি কট্টর তৃণমূলি ছাড়া সাধারণভাবে বাকি মানুষের সম্মতি, এমনকি প্রশংসা পেয়েছে।
সবাই এখন মুখর তৃণমূলের দুর্নীতি, দুরাচার এবং স্বৈরাচার কত গভীর ও ব্যাপক ছিল সে আলোচনায়! কিন্তু সে তো দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে, সব সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচন তৃণমূল জিতে আসছিল; এমনকি অনেক বুদ্ধিমান শিক্ষিত মানুষ বলতে শুরু করেছিল এই দলটা গরিব মানুষের দল, শহুরে শিক্ষিত সম্পন্ন মানুষ তৃণমূলকে তেমন একটা ভোট দেয় না। আর একটা সচেতন প্রয়াস ছিল ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমস্ত নাটুকেপনা সত্ত্বেও গরিব মানুষের জন্য উৎসর্গিতপ্রাণ বাংলার লড়াকু মেয়ে। সেই মেয়েকে কি বাংলা ত্যাগ করল? আমরা যথাসম্ভব তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজব।
২০২১ বনাম ২০২৬
তথ্য বলছে এবার (২০২৬) চূড়ান্ত তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ছিল ৬৮২ (সরলীকরণের জন্য আমরা লক্ষের এককে সংখ্যা দেখব এবং যথাসম্ভব দশমিক এড়িয়ে যাব, এতে আমাদের আলোচনায় সঠিকতা মূলগতভাবে ব্যাহত হবে না) আর ভোট পড়েছে ৬৩৩, যা কিনা শতকরা প্রায় ৯৩টি। ২০২১ সালে মোট ৭৩৪-এর মধ্যে ভোট দিয়েছিল ৬০২ জন, অর্থাৎ শতকরা প্রায় ৮২ জন। দেখা যাচ্ছে যে এ-বছর তালিকায় উপস্থিত ভোটার-সংখ্যা কমে গেলেও ভোট পড়েছে পাঁচ বছর আগের তুলনায় বেশি, যা শতাংশের হিসাবে ধরা পড়েছে।
মোট ভোটারের সংখ্যাটা (৬৮২) এসেছে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) পর, তার আগে ছিল ৭৬৫। সংশোধনে বাদ গেছে প্রায় ৬৩ জনের নাম যারা মৃত, স্থানান্তরিত বা একাধিকবার উল্লিখিত (আমরা সহজ করে বলব নেই-ভোটার)। এই নেই-ভোটার তালিকায় অবধারিতভাবে কিছু ভুলভ্রান্তি ছিল, পরে তা কিছুটা দূর হয়েছে, কিছুটা রয়ে গেছে, বিরাট সমস্যা হয়নি। কিন্তু আরও ২৭টি (মানে ২৭ লক্ষ) নাম বাদ গেছে গরমিলের কারণে, যার সঠিকতা সময়াভাবে যাচাই করা যায়নি। আরও মনে রাখতে হবে ৭ জন (মানে ৭ লক্ষ) নতুন নাম তালিকায় যোগ হয়েছে। এইভাবে পাওয়া গেছে উপরোক্ত মোট ভোটারের সংখ্যা: নতুন (২০২৬) ভোটার তালিকায় ৭৬৫ (SIR-এর আগের) – ৬৩ (নেই-ভোটার) – ২৭ (গরমিল) + ৭ (নতুন) = ৬৮২ (সংশোধিত)।
এখন ধরা যাক যদি ২০২১ সালের মতোই ভোট হত, অর্থাৎ যদি গত পাঁচ বছরে মানুষের পছন্দ আদৌ না পাল্টাত, SIR না হত (যেমন মমতা ব্যানার্জি চেয়েছিলেন) আর নির্বাচন কমিশন আইন-শৃঙ্খলার প্রতি কড়া নজর না দিত, তাহলে ২০২১ সালের প্রাপ্ত শতাংশের হিসাবে ২০২৬-এ মোট ভোট পড়ত ৭৭২ (৭৬৫ আগের + ৭ নতুন নাম)-এর ৮২ শতাংশ = ৬৩৩টি।[1] ২০২১-এর শতাংশের হিসাবে ভোট পেত—
তৃণমূল: ৬৩৩-এর ৪৮ শতাংশ = ৩০৩টি।
বিজেপি: ৬৩৩-এর ৩৮ শতাংশ = ২৪০টি।
অন্যেরা (NOTA সহ): বাকি ৯০ টি।
অর্থাৎ তৃণমূল বিজেপি থেকে ৬৩ ভোট বেশি পেত। কিন্তু পাঁচ বছর পর, এবার ভোট তো ২০২১-এর মতো হয়নি। অনেক পার্থক্য; কমিশনের প্রথম পদক্ষেপে ৬৩ নেই-ভোটার ধরা পড়েছে। বিজেপি গোড়া থেকে বলছে এই ভোটগুলি জাল ভোট হয়ে তৃণমূলের পক্ষে পড়ত। জাল বা ভূতুড়ে ভোট যে পড়ত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, এবং তা বলতে গেলে পুরোটা শাসক দলই দিত। আর এইসব ভোট শুধু যে নেই-ভোটারদের নামেই পড়ত তা নয়, অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হতেন বা গিয়ে দেখতেন তাঁদের ভোট পড়ে গেছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শোনা কাহিনি ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে তা বহুসমর্থিত। যেখানে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ভোট হত সেখানেও দুপুর বা বিকেলের দিকে ভোটারদের থামিয়ে দিয়ে ও বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দিয়ে জাল ভোট পড়ে যেতে শুনেছি। সিভিক পুলিশ ও অনুগত রাজ্য পুলিশ এই কাজের সহায়ক ছিল। অনেক জায়গায় তারা নিজেরাই উদ্যোগী হত, না হলেও ঢাল হিসাবে (দরকার হলে) কাজ করতে তারা বাধ্য ছিল; পাঠকমাত্রেই একথা জানেন।
এবার, বড় পার্থক্য, পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় দুষ্কৃতিদেরও কমিশন তার দ্বিতীয় পদক্ষেপে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। তার ফলটা হয়েছে গভীর; আমরা চারটি স্তরে ভাগ করে তার আলোচনা করব। এক: নেই-ভোটারদের ভোট বা ভূতুড়ে ভোট। দুই: জোর করে ভোটারকে আটকে দেওয়া— যে ভোট পড়ত না, আমরা একে বলব আটক ভোট। তিন: জোর করে আটকে দিয়ে নিজেরা সে ভোট দেওয়া, একে বলব ছদ্ম ভোট। চার: মানুষকে ভয় দেখিয়ে শাসক দলকে ভোট দিতে বাধ্য করা, যাকে বলব ভয়ের ভোট। এই দুষ্কর্মগুলো এবার প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে ধরে নিলে (এর মধ্যেও ফলতার উদাহরণ পাশে সরিয়ে রেখে) সম্ভবত বড় ভুল হবে না।
এখন প্রশ্ন থেকে যায় এই দুষ্কৃতি-মুক্তির পরিমাণগত ফল কী? নিশ্চয় বেশ বড়, কিন্তু সঠিকভাবে কেউ জানে না। সংখ্যাটা আন্দাজসাপেক্ষ, কিন্তু আন্দাজের ভিত্তিই বা কী? নেই-ভোটারের সংখ্যাটা আগে আমাদের জানা ছিল না, এখন জানা গেছে। সেসব নেই-ভোটারকে মূর্ত করে ভোটজালের বিষয়টায় আগে আসা যাক। আমাদের কাছে এই ৬৩ (লক্ষ) সংখ্যাটার একটা অনুপাত ধরা ছাড়া, যদিও অনুপাতটাও হবে একেবারেই ব্যক্তিগত আন্দাজ, এগোনোর রাস্তা নেই। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন এই সংখ্যক ভোট তৃণমূলের পক্ষে যেত। আমরা ধরছি নেই-ভোটারের মোটামুটি চার ভাগের এক ভাগ, সংখ্যাটা ধরা যাক ১৬, তৃণমূল ভূতুড়ে ভোট সৃষ্টি করত। এবং সমসংখ্যক ভোট তারা বিদ্যমান ভোটারদের নানাভাবে বাধা দিয়ে নিজেরা দিত (ছদ্ম ভোট), এবার তা দিতে পারেনি; কিন্তু সে ভোট যাদের তারাই দিয়েছে, বুঝতে অসুবিধা নেই তৃণমূলেরই বিরুদ্ধে। বিরোধী ভোট বলেই তো তৃণমূল কেড়ে নিত। এই দুই অংশ মিলে দাঁড়ায় ৩২ (মোট ভোটের পাঁচ শতাংশ) কপট ভোট, যা থেকে তৃণমুল এবার বঞ্চিত হয়েছে। এতদিন তারা নির্বাচনটা নিজেদের কব্জায় নিয়ে করত, এবার অন্য দলের মতো তারা শুধু অংশগ্রহণ করেছে। এটাই তাদের বিমর্ষ প্রতিবাদের কারণ। আটক ভোট ও ভয়ের ভোট আলোচনায় পরে আসবে।
এরপর SIR-এর ফলে থেকে যাচ্ছে ২৭টা তথাকথিত গরমিলের বিষয়, যারা সবাই প্রায় উপস্থিত, কিন্তু ভোট থেকে বাদ। ধরা যাক এদের ২৫ জন ভোট দিতেন এবং সিংহভাগ, ধরা যাক ১৫টা, তৃণমূলের দিকে যেত (তৃণমূলের অভিযোগ বুঝে-শুনে তাদের সমর্থকদের বাদ দেওয়া হয়েছে); আর ৮টা বিজেপির ঝুলিতে পড়ত, বাকি ২টো অন্যেরা পেত; এবার এই ভোটগুলো পড়েনি। তাহলে এই হিসাবে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপে (SIR ও সুষ্ঠু নির্বাচন) তৃণমূলের ভোট কমেছে ১৬ + ১৬ (ভূতুড়ে এবং ছদ্ম) + ১৫ (গরমিল) = ৪৭। আর বিজেপির বাদ পড়েছে ৮ (গরমিল) কিন্তু যোগ হয়েছে ১৬ (আগে তৃণমূলের দেওয়া ছদ্ম ভোট)। অতএব, ২০২১-এর মাপকাঠিতে SIR করে আর শৃঙ্খলা স্থাপন করে এই হিসাবে প্রাপ্য ভোটের মান দাঁড়াল[2]:
তৃণমূল: ৩০৩ – ৪৭ = ২৫৬
বিজেপি: ২৪০ – ৮ + ১৬ = ২৪৮, তৃণমূলের সঙ্গে পার্থক্য কমে ৮ (লক্ষ)।
অন্যেরা (NOTA সহ): ৯০ – ২ (গরমিল) = ৮৮
মোট প্রদত্ত ভোট: ৫৯২
অর্থাৎ প্রদত্ত ভোটের অনুপাত ৫৯২/৬৮২ = ৮৭ শতাংশ (প্রায়)।
স্পষ্টতই ২০২১ সালের ৮২ শতাংশ থেকে ২০২৬-এ বহু ভোটার বাদ যাওয়ার পরও ভোটের অনুপাত প্রায় ৮৭ শতাংশ হয়ে যাওয়াটা SIR প্রক্রিয়ার ফলে বিভাজকটা (denominator) বিভাজ্যের তুলনায় বেশি ছোট হওয়ার কারণে।
বাস্তবে ২০২৬-এ ভোট পড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ (উপরের হিসাবের থেকে ৪১টি বেশি), যা বলে দিচ্ছে এবার ভোটে অংশগ্রহণ ২০২১-এর চেয়ে অনেক বেশি। SIR প্রক্রিয়ার ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি, এমনকি সৃষ্ট একটা চাপ, এবং ভোটদানেরে উপযুক্ত পরিবেশ এই অংশগ্রহণ সম্ভব করেছে। আমরা জানি অনেকেই এসেছেন অন্য রাজ্যের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে; তাঁরা উন্নয়ন দেখেছেন যা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে সীমাবদ্ধ নেই। অনেকেই, যাঁরা কিছুটা উদাসীন এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতেই অভ্যস্ত কিন্তু এবার আশ্বস্ত ছিলেন (এই আশ্বাসটাই একটা ক্ষমতাবিরোধী হওয়া)। এমনকি অনেক বেশি সংখ্যক অশক্ত মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবার ভোট দিতে এসেছেন। সর্বপরি যাঁদের ভোট আগে পড়েনি আটকে দেওয়ার কারণে (আটক ভোট), এঁরা সবাই অতিরিক্ত এই ৪১ লক্ষ ভোটার। এঁদের ভোট ২০২১-এর শতাংশে প্রতিভাত হয়নি আর এঁদের পছন্দও ২০২১-এর মতো হওয়ার কথা নয়। এঁরাই দুই যুযুধান দলের ৮ (লক্ষ) ভোটের ব্যবধান মুছে দিতে পারেন। তাহলে এ-পর্যন্ত হিসাবে দুই দলের ভোট সমান হয়ে যায় (এমনকি পাল্লাটা উল্টেও গিয়ে থাকতে পারে কিন্তু হিসাবের সঠিকতা নিয়ে আমরা সংযত থাকব)।
২০২৬-এর উল্টো ব্যবধানটা হল কী করে?
এখানে আর একটা বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া কাম্য। ভোটার তালিকা প্রায় প্রতি বছরই সংশোধিত হয়। আমরা আগের বছরের তুলনায় ৭ লাখ নতুন ভোটার ধরেছি যেমনটা কমিশনের তথ্যে দেখানো হচ্ছে। ২০২১ সালের পর বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পাঁচ বছরে তালিকায় যুক্ত নতুন ভোটারের সংখ্যাটা আনুমানিক প্রায় ৩৫ লাখ। এই প্রথমবারের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটাররা ২০২১ সালের নিরিখে ভোট দেবে এটা অযৌক্তিক ধারণা, যদিও আমাদের উপরের হিসাবে তেমনটাই ধরা হয়েছে। এই তরুণ ভোটাররা শিক্ষাদুর্নীতি ও বেকারির শিকার, আর এরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে সরাসরি লাভবান নয়। এ-কথা বোঝার জন্য হিন্দু-মুসলমান বিবেচনার কোনও দরকার নেই। আমরা সম্প্রতি নেপালে দেখেছি, আর এই নির্বাচনেই তামিনলাড়ুতে, তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তনকামী।
তথ্য বলছে ২০২৬-এ বিজেপি তৃণমূলের থেকে ৩২ (লক্ষ) ভোট বেশি পেয়েছে। আমরা কপট ভোটের কথা বলেছি, কিন্তু তার বাইরেও তো হিসাব আছে। মানুষকে তো মনে করানো হত সমস্ত অনুদান স্থানীয় নেতাদের হতে বাঁধা, ‘নির্বাচন কমিশন দুইদিন কিন্তু তৃণমূল চিরদিন’। বহু অঞ্চলে ভোটদানের উপর তীক্ষ্ণ নজরদারি ছিল। নেতাদের উপর দলের প্রচণ্ড চাপ ছিল কোন অঞ্চলে কত ভোটে এগিয়ে থাকতে হবে সে ব্যাপারে আর নেতারা মানুষের ঘরে ঢুকে বুঝিয়ে আসত বিরোধী ভোটের কর্মফল। সামগ্রিকভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল একটা চাপা ভয়ের বাতাবরণ। এইসব ব্যাভিচার এবার হয়নি। মানুষ বিশ্বাস করেছে ক্ষমতা বদলে গেলেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থাকবে, হয়তো বা আরও কিছু সুরাহা হবে। ১০টা অসহায় ভীত মানুষ আশ্বাস পেয়ে যদি তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে ঘুরে যায় তাহলেই ব্যবধান ২০টা কমে যায়। গুন্ডাদমনের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস এই ফলটা আনতে পারে। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকায় সে আশ্বাস দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে। ভয় কাটিয়ে ভোট ঘুরে যেতেই পারে। তারুণ্যের দাবি এবং ভয়মুক্তি, দুইয়ে মিলে খুব সহজেই ১৬ ভোট (২.৫ শতাংশ) ঘুরে গিয়ে ৩২ ভোটের উল্টো ব্যবধান তৈরি করতে পারে। কোনও হিন্দুজাগরণের দরকার নেই।
এত বড় একটা বহুমাত্রিক রাজ্যে আরও ছোট ছোট অনেক স্রোত বইতে পারে, তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আমরা এখানে মূল স্রোতটাই খুঁজেছি। মনে রাখতে হবে, মমতা ব্যানার্জির পরাজয় আর মুসলমান ভোটের কিছুটা বিক্ষেপ সত্ত্বেও তৃণমূল ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা অনেক রাজ্যে ক্ষমতায় এসেও বিজেপি পায়নি।
[1] বস্তুত ২০২৬-এ এই সংখ্যক ভোটই পড়েছে, মিলটি নৈমিত্তিক।
[2] অনেকেই আমার আন্দাজের সঙ্গে একমত হবেন না। তবুও আমার আন্দাজের সঙ্গে কতটা যোগ বা বিয়োগ করতে হবে ধরে এগোতে পারবেন।
*মতামত ব্যক্তিগত

