Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আগামী বছর নিট কি অনলাইনে?

শামীম হক মণ্ডল

 


কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সাল থেকে দেশজুড়ে অভিন্ন মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি-ইউজি) অনলাইনেই হবে। এতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে এই পরীক্ষাটি কাগজ-কলমেই হয়ে আসছে; এমনকি এ-বছরও হওয়ার কথা আছে। বছর দুয়েক আগে, প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কেন্দ্র সরকার সাত সদস্যের এক কমিটি গড়েছিলেন, যার মাথায় ছিলেন ইসরোর সাবেক প্রধান কে রাধাকৃষ্ণন। সেই কমিটি কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার সুপারিশ করে। শেষপর্যন্ত তাতেই সিলমোহর পড়তে চলেছে বলে ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

 

হ্যাঁ, তাই। অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সাল থেকে দেশজুড়ে অভিন্ন মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি-ইউজি) অনলাইনেই হবে। এতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে এই পরীক্ষাটি কাগজ-কলমেই হয়ে আসছে; এমনকি এ-বছরও হওয়ার কথা আছে। বছর দুয়েক আগে, প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কেন্দ্র সরকার সাত সদস্যের এক কমিটি গড়েছিলেন, যার মাথায় ছিলেন ইসরোর সাবেক প্রধান কে রাধাকৃষ্ণন। সেই কমিটি কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার সুপারিশ করে। শেষপর্যন্ত তাতেই সিলমোহর পড়তে চলেছে বলে ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিঃসন্দেহে সাধু উদ্যোগ, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নে দু-বছরের বেশি সময় লেগে গেল!

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ৩ মে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিট পরীক্ষা; ২২ লক্ষেরও বেশি প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন এই প্রবেশিকা পরীক্ষায়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে, আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ফলে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে হতাশা দেখা দেয়; যে পরীক্ষার জন্য দীর্ঘদিনের লড়াই, পরিশ্রম, বারবার তার দশা এমন হলে খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। তবে, ওএমআর শিটভিত্তিক পরীক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ছাপানো, সিরিজভিত্তিক প্যাকিং, সেগুলির পরিবহন এবং সর্বোপরি কাগজপত্র সংরক্ষণের কাজে একাধিক সংস্থা জড়িত থাকে। এমত পরিস্থিতিতে, নিটের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটি সুস্থ, এবং স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলা আয়োজক সংস্থাগুলির জন্য কষ্টকর। সেজন্যেই দেশে ও বিদেশে অধিকাংশ পরীক্ষাই এখন কম্পিউটারভিত্তিক, সিবিটি পদ্ধতিতে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে, পরীক্ষার্থীরা একটি কম্পিউটারে নির্দিষ্ট টার্মিনালে লগ ইন করে, কেবল মাউসের সাহায্যেই সঠিক বিকল্পটি বেছে নিতে পারে; এবং পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উত্তরগুলি সংশোধন করতে পারে। সব দিক থেকে পরীক্ষার্থীদের উপযোগী করেই এই পদ্ধতি তৈরি। শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে— সিবিটি যদি এতই ভালো হবে, তাহলে নিটের ক্ষেত্রে চালু করতে এতদিন লাগল কেন? এই প্রশ্নের সহজ স্বীকারোক্তি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গত শুক্রবার দিয়ে দিয়েছেন— আমরা এখনও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করে উঠতে পারিনি।

যদিও সরকারপক্ষের দাবি তারা অনেক বছর আগে থেকেই চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল; ২০১৮ সালে, তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর ঘোষণা করেছিলেন যে, আগামী বছর থেকে বছরে দুবার অনলাইনে নিট পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে, পরবর্তীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের বিরোধিতায় সেই প্রচেষ্টা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি ছিল নিটের মতো দেশের অন‍্যতম বৃহত্তম পরীক্ষা সিবিটি মোডে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে গেলে যে পরিমাণ প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো প্রয়োজন, বিশেষত যত সংখ্যক কম্পিউটারের দরকার পড়ত, তার বন্দোবস্ত করা সম্ভব ছিল না। শহরাঞ্চলে যদিও সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের পরীক্ষার্থীদের জন্য নিকটবর্তী পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা সরকারের জন্য কঠিন ছিল। এক কথায় দেশজুড়ে একই দিনে, একই সময়ে সিবিটি পদ্ধতিতে এই পরীক্ষার বন্দোবস্ত করা বেশ চাপের; গত দু-বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে, বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

এই সমস্যা এড়াতে, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) দেশ জুড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তির পরীক্ষা জেইই-কে দুটো পর্যায়ে নেওয়ার ব‍্যবস্থা করেছে; ২০২৬ সালে, প্রথমটি নিয়েছিল ৯ দিন ধরে ১০টি আলাদা আলাদা সময়সূচিতে, আর দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাটি হল ৭ দিন ধরে ৯টি পৃথক সময়সূচিতে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাত কম ছিল না— প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৩ লক্ষ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ১০ লক্ষ। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে সিবিটি পদ্ধতিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০১৯ সাল থেকেই এনটিএ এই পরীক্ষাটি অনলাইনে নিয়ে আসছে; কখনওই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনও অভিযোগ ওঠেনি।

শুধু জেইই নয়, এনটিএ গত কয়েক বছর ধরেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার যোগ্যতামাপক নেট পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছে; বছরে দুইবার করে এই পরীক্ষা নেওয়া হয়, এবং প্রায় ৯০টি বিষয়ের জন্য যোগ‍্য প্রার্থী বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রেও একাধিক আলাদা আলাদা সময়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল; চলতি বছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এই পরীক্ষা মোট ১০টি পৃথক সময়সূচিতে নেওয়া হয়েছিল; পরীক্ষা দিয়েছিলেন ১০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনেই সম্পন্ন হয়, দায়িত্বে ছিল এনটিএ; কোথাও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠেনি।

সেই একই সংস্থার অধীনে নিটের মতো সর্বভারতীয় পরীক্ষা পরিচালনার সময় একাধিকবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। সুতরাং, এটা সর্বজনবিদিত যে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে গেলে সিবিটি পদ্ধতির বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো কি এই পরিবর্তনের পক্ষে সহায়ক? সমীক্ষা বলছে বর্তমানে দেশে বিদ‍্যমান পরীক্ষাসহায়ক প্রযুক্তি-কাঠামোতে এনটিএ একসঙ্গে সর্বোচ্চ দেড় লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে, সেখানে, এবারেই মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২২ লক্ষেরও বেশি। অতএব, স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে গেলে জেইইর তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক সময়সূচির ব‍্যবস্থা করতে হবে; জেলায় জেলায় পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ২০২৪ সালে, কে রাধাকৃষ্ণন কমিটি প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিল। সেক্ষেত্রে, প্রয়োজনে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল‍্যাব ব‍্যাবহার করা যেতে পারে। নিটের সঙ্গে যুক্ত অনেক ছাত্রছাত্রী, ও অভিভাবকরা পৃথক সময়ে নেওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের তুলনামূলক মান ও পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের মূল্যায়ন নিয়ে চিন্তিত থাকেন। সেক্ষেত্রে আর পাঁচটা পরীক্ষায় যেমন পার্সেন্টাইল স্কোরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, এক্ষেত্রেও সেটাই হবে। পরিসংখ্যানভিত্তিক এই ব‍্যবস্থা নিয়ে কোনও অসন্তোষ থাকার কথা নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা নিলেই কি জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ হবে? বর্তমানে সাইবার জালিয়াতির যুগে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ইউজিসি নেটের কথা বলা যায়— পরীক্ষার একদিন পর, ডার্কনেটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। সুতরাং আগামী প্রজন্মকে একটা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পরীক্ষার পরিবেশ উপহার দিতে প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি, পর্যাপ্ত সাইবার সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা জরুরি।

দেরিতে হলেও আমরা যে সেই পথে পা বাড়িয়েছি, এটাই মঙ্গল।

 


*মতামত ব্যক্তিগত