শুভাশিস দে
SIR শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর একটি পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তিনি বলেছিলেন, যদি জয়ের ব্যবধান ২ শতাংশ হয় এবং ১৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে না পারেন, তাহলে আদালতকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে। এই পর্যবেক্ষণই আসলে পশ্চিমবঙ্গের বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নটিকে সামনে আনে— বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা নির্বাচনী ফলাফলের ভেতরে কতটা প্রবেশ করেছিল?
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছিল ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা SIR। সাধারণভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনকে প্রশাসনিক রুটিন বলেই মনে করা হয়। কিন্তু এবারের সংশোধনের ব্যাপ্তি, বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা, এবং নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে তার সম্ভাব্য সম্পর্ক এমন এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, যা আর নিছক প্রশাসনিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটা হল— ভোটার তালিকার অঙ্ক কি শেষপর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ফলাফলেও প্রভাব ফেলল?
ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানও ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে। তামিলনাড়ুতে শিবগঙ্গা জেলার তিরুপাত্তুর সিটে এক ভোটে ফল নির্ধারিত হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুম্বই উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪৮ ভোট। অর্থাৎ গণতন্ত্রের বাস্তব অঙ্কে প্রতিটি ভোট গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রতিটি নামও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়ায় মোট ৯০.৮২ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে। এর মধ্যে ৫৮.১৮ লক্ষ ASDD (Absent, Shifted, Dead, Duplicate), ২৭.১৬ লক্ষ বিচারাধীন বা Under Adjudication বা UA, এবং ৫.৪৬ লক্ষ খসড়া তালিকা বাদ বা Draft Roll Deletion (DRD)-এর আওতায় বাদ যান। অন্যদিকে এই বিপুল বাদের পাশাপাশি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় ১.৮৮ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও থামেনি এই ঝাড়াই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া— এপ্রিলের মাঝামাঝি, প্রথম দফা ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে, মোট সংযোজন বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৯৬ লক্ষে। অর্থাৎ এক মাসের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৭ লক্ষ নতুন ভোটার নথিভুক্ত হয়েছেন। ৯০.৮২ লক্ষ বাদ পড়া ভোটারদের ক্ষেত্রে বিধানসভা-ভিত্তিক বিশদ তথ্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করলেও এপ্রিল মাসে যুক্ত হওয়া প্রায় ৫ লক্ষ নতুন ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কতজন প্রথমবার ভোটার, কতজন সদ্য ১৮ বছরে পা দিয়েছেন, বয়স বা লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন কী— সেই তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি নিয়ে আবেদনও হয়েছিল, কিন্তু আদালত হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।
SIR শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর একটি পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তিনি বলেছিলেন, যদি জয়ের ব্যবধান ২ শতাংশ হয় এবং ১৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে না পারেন, তাহলে আদালতকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে। এই পর্যবেক্ষণই আসলে পশ্চিমবঙ্গের বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নটিকে সামনে আনে— বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা নির্বাচনী ফলাফলের ভেতরে কতটা প্রবেশ করেছিল?
১৬০টি আসনে বাদ পড়া ভোটার জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি
তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের ৫৪.৪২ শতাংশ আসনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ফলাফল বদলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড়। এই ১৬০টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ১০৫টিতে। অথচ ২০২১ সালে এই একই আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল মাত্র ২০টিতে, আর তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল ১৪০টি আসন।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদে। উত্তর ২৪ পরগনায় ২০২১ সালে তৃণমূল যে ২৭টি প্রভাবিত আসনের (প্রভাবিত মানে, যে যে আসনগুলিতে মোট ‘বাদ ভোটার’-সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গেছে) মধ্যে ২৪টিতে জিতেছিল, ২০২৬ সালে বিজেপি সেখানে জেতে ২১টিতে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের দখলে থাকা ১৯টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে বিজেপি দখল করে ১০টি। মুর্শিদাবাদেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২১ সালে তৃণমূল যে ১৬টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে ১৪টিতে জিতেছিল, ২০২৬ সালে তা নেমে আসে ৭-এ। পূর্ব বর্ধমানে তৃণমূলের আগে থেকে ধরে রাখা ১৩টির মধ্যে ১১টি গেছে বিজেপির ঘরে। হাওড়া ও হুগলিতে যৌথভাবে প্রভাবিত ২৫টি কেন্দ্র— ২০২১ সালে সবগুলোই তৃণমূলের ছিল— তার মধ্যে ১৫টি ২০২৬-এ গেছে বিজেপিতে।
এই পরিবর্তন শুধু গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে ১১টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে বিজেপি জেতে ৬টিতে। এর মধ্যে ছিল ভবানীপুরও, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। ভবানীপুরে জয়ের ব্যবধান ১৫১০৫ ভোট আর বাদ যাওয়া মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫১০২২, যা ২০২৫ সালের মোট ভোটারের ২৪.৭৩ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে, ভৌগোলিক বিন্যাস এটাই প্রমাণ করে যে তালিকা সঙ্কোচন প্রক্রিয়াটি দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়নি— বরং একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। তথ্যই দেখাচ্ছে এটি ২০২১ সালে তৃণমূলের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিগুলিকেই বেশি আঘাত করেছে, ফলে বিজেপি এই ১৬০টির মধ্যে ১০৫টি দখল করতে পেরেছে। কয়েকটি আসনের উদাহরণ এই ছবিটিকে আরও স্পষ্ট করে। সাতগাছিয়ায় বিজেপির জয়ের ব্যবধান মাত্র ৪০১ ভোট, অথচ মোট বাদ ২৭,০৮৭। রাজারহাট-নিউটাউনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ৩১৬, মোট বাদ ৬৪,৯৮০। রায়নায় বিজেপির জয়ের ব্যবধান ৮৩৪, মোট বাদ ২৩,৩১২। জাঙ্গিপাড়ায় বিজেপির জয়ের ব্যবধান ৮৬২, মোট বাদ ১৭,৫৪১। অর্থাৎ বহু আসনে প্রশাসনিক সংশোধনের পরিমাণ নির্বাচনী ব্যবধানের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বড় ছিল।
শুধুমাত্র “ASDD” বিভাগের বাদ প্রক্রিয়াতেও বিজেপির বড় সুবিধা
যদি বিচারাধীন (বা UA) বিভাগের বাদকে সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র ASDD বিভাগের বাদকে বিবেচনা করা হয়, তাহলেও একই রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যায়। ১০৯টি আসনে শুধুমাত্র ASDD বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যাই জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই আসনগুলির মধ্যে বিজেপি জিতেছে ৭১টিতে, তৃণমূল ৩৬টিতে এবং কংগ্রেস ২টিতে। অথচ ২০২১ সালে এই একই ১০৯টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১০১টিতে এবং বিজেপি মাত্র ৮টিতে।
২০২১ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে, এই ১০৯টি আসনের মধ্যে ৬৬ টি আসনে হাতবদল হয়েছে এবং সবগুলোই তৃণমূল হারিয়েছে— এর মধ্যে বিজেপি ৬৪টি এবং কংগ্রেস বাকি দুটি দখল করেছে। তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে ASDD বাদ তৃণমূলের আগে জেতা আসনগুলিতে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং যেখানে বাদ যাওয়া ভোটার জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়েছে, ফলত সেখানে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের আধিপত্য কার্যত ভেঙে পড়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনায় ২০২১-এ তৃণমূল ১৮টির মধ্যে ১৭টি জিতেছিল; ২০২৬-এ বিজেপি সেখান থেকে ১৪টি নিয়ে তৃণমূলকে মাত্র চারটিতে ঠেলে দিয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২০২১-এর ১৬-০ সুইপ ভেঙে পড়েছে— সংশোধন-পরবর্তী নির্বাচনে বিজেপি আটটি কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে।
হাওড়া ও হুগলি মিলিয়ে ২০২১-এ ASDD-প্রভাবিত মোট ২০টি কেন্দ্র সবগুলোই তৃণমূলের ছিল; ২০২৬-এ বিজেপি সেখান থেকে ১৩টি নিয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মুর্শিদাবাদেও তৃণমূলের ২০২১-এর ১০টির মধ্যে ৯টির হিসাব ২০২৬-এ নেমে এসেছে মাত্র ২-এ— বিজেপি ৬টি এবং কংগ্রেস ২টি নিয়েছে।
মুসলিম-অধ্যুষিত আসনে বিচারাধীন/UA বিভাগে বাদ যাওয়া ভোটারের চিত্র
সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিচারাধীন বা Under Adjudication (UA) বিভাগকে ঘিরে। ৪৯টি আসনে UA-র আওতায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। এই আসনগুলির গড় মুসলিম জনসংখ্যা ৩৮ শতাংশেরও বেশি, যা রাজ্যের গড়ের (২৭ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। ২০২১ সালে এই ৪৯টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ৪৮টিতে। ২০২৬ সালে বিজেপি সেখানে জেতে ২৬টিতে।
সর্বাধিক প্রভাবিত মুর্শিদাবাদ, যেখানে ৮টি কেন্দ্রে বিচারাধীন বিভাগে মোট বাদ জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গেছে। অন্যান্য প্রভাবিত জেলা উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান ও এবং হুগলি।
কেন্দ্রভিত্তিক উদাহরণগুলি চমকে দেওয়ার মতো। সামশেরগঞ্জে বিচারাধীন বিভাগে মোট বাদ ৭৪,৭৭৫, তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান মাত্র ৭,৫৮৭। রানিনগরে কংগ্রেস জিতেছে ২,৭০১ ভোটে, বিচারাধীন বিভাগে মোট বাদ ১৭,১৪০। জঙ্গিপুরে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ১০,৫৪২, ৫৭ শতাংশেরও বেশি মুসলিম-জনসংখ্যার এই কেন্দ্রে বিচারাধীন বিভাগে মোট বাদ ৩৬,৫৮১। পূর্ব বর্ধমানের রায়নায় বিজেপির জয়ের ব্যবধান ৮৩৪, বিচারাধীন বাদ ১১,২৮৪— ব্যবধান ও বাদের মধ্যে এই ফারাক চোখ খুলে দেওয়ার মতো।
বিচারাধীন বিভাগে বাদ পড়া ভোটারদের পরিচয় এখনও প্রকাশ্যে জানা যায়নি। কিন্তু কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য থেকে স্পষ্ট যে যেসব কেন্দ্রে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি সেখানে বিচারাধীন বাদও বেশি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা নিচের দুটি স্ক্যাটার চার্ট থেকে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। বাঁদিকের চার্ট: মুসলিম জনসংখ্যা বাড়লে ASDD বিভাগে বাদ কমছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ Roll ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এই বাদ হয়েছিল, যা স্বাভাবিক জনসংখ্যাগত গতির সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ডানদিকের চার্টটি সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি: মুসলিম জনসংখ্যা বাড়লে, বিচারাধীন বা UA বিভাগে ভোটার বাদের সংখ্যাও বাড়ছে।
SABAR Institute-এর মাইক্রো-স্তরের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নন্দীগ্রামে UA-র আওতায় বাদ পড়া ভোটারদের ৯৫.৫ শতাংশ মুসলিম, যদিও ওই আসনে জনসংখ্যার শুধুমাত্র ২৩ শতাংশ মুসলিম। ভবানীপুরে বিচারাধীন বিভাগে বাদের ৪০.১ শতাংশ মুসলিম, যদিও মোট জনসংখ্যায় মুসলিম ভাগ মাত্র ২০ শতাংশ। এই বৈপরীত্য কাকতালীয় নয়, কাঠামোগত। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি সেখানে ASDD বাদ তুলনামূলকভাবে কমেছে, কিন্তু UA বাদ বেড়েছে। অর্থাৎ রুটিন প্রশাসনিক বাদ এবং বিচারাধীন বাদ— এই দুইয়ের মধ্যে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। এখান থেকেই রাজনৈতিক প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
অবশ্যই বলা প্রয়োজন, কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষণই ধরে নিতে পারে না যে বাদ পড়া সমস্ত ভোটার একটি নির্দিষ্ট দলকেই ভোট দিতেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২১-এর পর বাস্তবিকই রাজনৈতিক পরিবর্তনও ঘটেছে। বেকারত্ব, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, দুর্নীতি, স্থানীয় সংগঠনের শক্তি, হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ— সবকিছুই নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। ফলে SIR-ই একমাত্র কারণ— এমন দাবি অতিসরলীকরণ হবে। কিন্তু যখন বাদ পড়ার সংখ্যা এত বড়, যখন বহু আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কয়েকশো বা কয়েক হাজার ভোট, এবং যখন সেই বাদ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অঞ্চলে বেশি দৃশ্যমান— তখন প্রশ্ন উঠবেই, এই ভোটাররা তালিকায় থাকলে ফলাফল কি অন্যরকম হতে পারত? এই প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে তথাকথিত ‘No-SIR’ কাল্পনিক বিশ্লেষণ। এই কাল্পনিক বিশ্লেষণে ফলাফল কেমন হত, তা বোঝার জন্য আমি দুটি গাণিতিক অনুমানভিত্তিক মডেল তৈরি করেছি।
SIR না হলে ফলাফল কতটা ভিন্ন হতে পারত?
এসআইআর-এর সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য আমি দুটি ‘No-SIR’ বা এসআইআর-বিহীন কাল্পনিক দৃশ্যপট বা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছি। এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কোনও নির্দিষ্ট ভোটারের আচরণ পুনর্গঠন করা নয়। বরং লক্ষ্য হল একটি মৌলিক প্রশ্ন পরীক্ষা করা— ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ও নতুন ভোটার সংযোজনের মাত্রা কতটা নির্বাচনী ফলাফলের ভেতরে প্রবেশ করেছিল?
এই বিশ্লেষণে ASDD, UA এবং DRD— এই তিন ধরনের মোট ৯০.৮২ লক্ষ বাদকে একত্রিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮.১৮ লক্ষ ASDD (Absent, Shifted, Dead, Duplicate), ২৭.১৬ লক্ষ বিচারাধীন বা Under Adjudication বা UA, এবং ৫.৪৬ লক্ষ খসড়া তালিকা বাদ বা Draft Roll Deletion (DRD)-এর আওতায় বাদ যান। পাশাপাশি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্ত হওয়া ১.৮৮ লক্ষ নতুন ভোটারকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি আসনে এই পরিবর্তনের পরিমাণকে প্রকৃত জয়ের ব্যবধানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তবে এপ্রিল ২০২৬-এ যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত প্রায় ৫ লক্ষ ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশ না করায় সেই অংশটি এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখতে হয়েছে।
প্রথম দৃশ্যপট: সবচেয়ে প্রতিকূল সম্ভাবনা ধরে নিয়ে
প্রথম মডেলে বিজয়ী দলের পক্ষে সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি ধরা হয়েছে। এখানে ধরে নেওয়া হয়েছে, বাদ পড়া প্রতিটি ভোটার রানার-আপ প্রার্থীকে ভোট দিতেন। একই সঙ্গে ধরে নেওয়া হয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নতুন যুক্ত হওয়া কেন্দ্রভিত্তিক ভোটাররা সকলেই ওই কেন্দ্রের জয়ী প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ SIR না হলে, এক, কেন্দ্রভিত্তিক সব বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ওই কেন্দ্রের রানার আপ প্রার্থীকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। দুই, যদি SIR না হত, তবে নতুন যুক্ত হওয়া ভোটাররা কেউই ভোট দিতে পারতেন না। তাই এই অনুমানের ভিত্তিতে, প্রতি কেন্দ্র থেকে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ভোটারসংখ্যা জয়ী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মোট ১৩৬টি আসনে দলবদল হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছে ১৩১টি আসন। দেখা যাচ্ছে, এই দলবদল হওয়া আসনের মধ্যে ৮৮টিতে জয়ের ব্যবধান মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম ছিল। আর ৪টি আসনে জয়ের ব্যবধান ফেব্রুয়ারিতে যুক্ত হওয়া নতুন ভোটারের সংখ্যার চেয়েও কম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ৯২টি আসনই ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে বিজেপি তার মধ্যে ৯০টি এবং কংগ্রেস ২টি আসন জিতে নেয়।
যদি এসআইআর না হত এবং উপরের দৃশ্যপট ১-এর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি ধরা হয়, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে এই ৯২টি আসন তৃণমূল ধরে রাখতে পারত। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের আসনসংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারত ৮০+৯২=১৭২-এ। অন্যদিকে বিজেপির আসনসংখ্যা কমে প্রায় ২০৭-৯০=১১৭-এ নেমে আসত। অর্থাৎ এই দৃশ্যপট ১-এর সম্ভাবনায় সরকার গঠনের সমীকরণই সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারত।
কেন্দ্রভিত্তিক SIR-এর অভিঘাত
নির্বাচনী ফলাফলের উপর এসআইআর-এর সম্ভাব্য প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তা বোঝার জন্য আমি প্রতিটি কেন্দ্রে একটি সূচক ব্যবহার করেছি, যাকে এখানে ‘এসআইআর প্রভাব (SIR-Impact)’ বলা হয়েছে। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনও কেন্দ্রে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে যতটা অতিক্রম করেছে, সেই অতিরিক্ত অংশকেই এসআইআর প্রভাব হিসেবে ধরা হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, ৬৩টি কেন্দ্রে এসআইআর প্রভাব ছিল ১০ হাজার বা তার বেশি। ৩৯টি কেন্দ্রে তা ২০ হাজারের উপরে, এবং ২১টি কেন্দ্রে ৩০ হাজারেরও বেশি। কয়েকটি কেন্দ্রে এই ব্যবধান এতটাই বড় ছিল যে তা নিছক প্রশাসনিক সংশোধনের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে। নিচের সারণিতে এমন পাঁচটি কেন্দ্রের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে এসআইআর প্রভাব ৪৫ হাজারেরও বেশি ছিল।
| ক্রমিক নং | বিধানসভা কেন্দ্র নং | বিধানসভা কেন্দ্রের নাম | ২০২১-এ জয়ী দল | ২০২৬-এ জয়ী দল | ২০২৬-এ জয়ের ব্যবধান | মোট বাদ পড়া ভোটার | এসআইআর প্রভাব |
| ১ | ১১৫ | রাজারহাট নিউ টাউন | তৃণমূল | বিজেপি | ৩১৬ | ৬৪,৯৮০ | ৬৪,৬৬৪ |
| ২ | ১৬৮ | কাশীপুর-বেলগাছিয়া | তৃণমূল | বিজেপি | ১,৬৫১ | ৫৭,৫৪২ | ৫৫,৮৯১ |
| ৩ | ১৬৫ | জোড়াসাঁকো | তৃণমূল | বিজেপি | ৫,৭৯৭ | ৭৭,৯৯৩ | ৭২,১৯৬ |
| ৪ | ১৭০ | হাওড়া উত্তর | তৃণমূল | বিজেপি | ১১,২৫০ | ৭৫,০৩৩ | ৬৩,৭৮৩ |
| ৫ | ২৮১ | আসানসোল উত্তর | তৃণমূল | বিজেপি | ১১,৬১৫ | ৫৭,৩৮৭ | ৪৫,৭৭২ |
এসআইআর প্রভাবের কিছু ঝলক
এই বিশ্লেষণকে বাস্তব ভোটাভ্যাসের সরাসরি প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত একটি কাল্পনিক বিশ্লেষণ, যার উদ্দেশ্য হল নির্বাচনী ফলাফল কতটা ভোটার তালিকার পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল ছিল তা বোঝা। কিন্তু এই হিসাব অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে— এসআইআর শুধুমাত্র প্রশাসনিক ‘তালিকা সংশোধন’ ছিল না। বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে এর পরিমাণ এমন ছিল যে তা বাস্তবিক অর্থেই চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলের সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট: ২০২১ সালের ভোটের ধারা ধরে পুনর্বিন্যাস
দ্বিতীয় বিশ্লেষণটি তুলনামূলকভাবে বেশি সংযত এবং বাস্তবসম্মত অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে। এখানে ধরে নেওয়া হয়নি যে বাদ পড়া সমস্ত ভোটারই বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতেন, বা নতুন যুক্ত হওয়া সমস্ত ভোটারই বিজয়ী দলের পক্ষে যেতেন। বরং এই মডেলে প্রতিটি কেন্দ্রের ২০২১ সালের নির্বাচনী ভোটাভ্যাসকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ তিনটি ধাপে করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া মোট ৯০.৮২ লক্ষ ভোটার— অর্থাৎ ASDD, UA এবং DRD-র আওতায় বাদ যাওয়া ভোটারদের— পুনরায় ভোটার তালিকায় কেন্দ্র অনুযায়ী ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে, এই পুনরায় ফিরিয়ে আনা ভোটারদের প্রতিটি কেন্দ্রে ২০২১ সালের দলভিত্তিক ভোটের অনুপাত অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয়েছে, বাদ পড়া ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ মোটামুটি ২০২১ সালের ভোটাভ্যাসের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
তৃতীয় ধাপে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নতুন যুক্ত হওয়া ১.৮৮ লক্ষ ভোটারের প্রভাব আলাদা করে বোঝার জন্য ২০২৬ সালের দলীয় ভোটের অনুপাত ব্যবহার করে এবং কেন্দ্রভিত্তিক ২০২৬-এর ভোটদানের অনুপাতকে মাথায় রেখে এই সংযোজনের হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত প্রায় ৫ লক্ষ ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেনি। ফলে সেই অংশটি এই বিশ্লেষণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি, যদিও এই তথ্য প্রকাশের জন্য একাধিক আবেদন করা হয়েছিল।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৯৩টি বৈধ আসনের মধ্যে বিজেপির আসনসংখ্যা দাঁড়াত ১৬৬, তৃণমূল কংগ্রেসের ১২১ এবং অন্যান্যদের ৬। অর্থাৎ এই মডেলেও বিজেপিই সরকার গঠন করত, কিন্তু তাদের আসনসংখ্যা বর্তমান ২০৭ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত ১৬৬।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। এই হিসাব কোনও নির্দিষ্ট ভোটারের আচরণের পূর্বাভাস নয়। বরং এটি একটি কেন্দ্রভিত্তিক সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, যার উদ্দেশ্য হল— ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার মাত্রা এবং তার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রীভবন কতটা নির্বাচনী ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারত।
এই মডেল অনুযায়ী মোট ৭৭টি আসনের ফল উল্টে যেতে পারত। তার মধ্যে ৫৯টি আসন বিজেপি থেকে তৃণমূলের দিকে এবং ১৮টি আসন তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে সরে যেত। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বিজেপি নিট ৪১টি আসন হারাত। সেই পরিস্থিতিতে বিজেপির আসনসংখ্যা দাঁড়াত ১৬৬, তৃণমূল কংগ্রেসের ১২১ এবং অন্যান্যদের ৬। তবে এই হিসাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ শেষ মুহূর্তে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত প্রায় ৫ লক্ষ ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেনি। ফলে সেই অংশটি এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যদি ওই ৫ লক্ষ নতুন ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য পাওয়া যেত, তাহলে বিজেপির চূড়ান্ত আসনসংখ্যা আরও কমে আসার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
উপসংহার: ভোটার তালিকার অঙ্ক যখন নির্বাচনের সমীকরণের অংশ
আমার এই দুটি ‘No-SIR’ কাল্পনিক বিশ্লেষণ, দুটি আলাদা সম্ভাবনার ছবি তুলে ধরছে। প্রথম দৃশ্যপটে বিজয়ী দলের প্রতি সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি ধরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে— বাদ পড়া ভোটাররা রানার-আপ প্রার্থীকে এবং নতুন যুক্ত হওয়া ভোটাররা বিজয়ী দলকে সমর্থন করেছেন। সেই হিসাব অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ১৭২টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারত, আর বিজেপির আসনসংখ্যা নেমে আসত প্রায় ১১৭-এ।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সংযত। সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের ২০২১ সালের কেন্দ্র-পিছু পার্টিভিত্তিক ভোটপ্রাপ্তির অনুপাতে যুক্ত করা হয়েছে এবং নতুন যুক্ত হওয়া ১.৮৮ লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের কেন্দ্র-পিছু পার্টিভিত্তিক ভোটপ্রাপ্তির অনুপাতে বিযুক্ত করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিজেপি সরকার গঠন করত ঠিকই, কিন্তু তাদের আসনসংখ্যা কমে দাঁড়াত ১৬৬-এ। তৃণমূল পেত ১২১টি আসন এবং অন্যান্য দল মিলিয়ে পেত ৬টি।
অর্থাৎ প্রথম বিশ্লেষণে বিজেপি সরকার বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, আর দ্বিতীয় বিশ্লেষণে সামগ্রিক ফলাফল একই থাকলেও বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে। দুটি মডেলের ফল আলাদা হলেও, উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট— এসআইআর নিছক প্রশাসনিক তালিকা সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তব অঙ্কের ভেতরে প্রবেশ করেছিল।
তথ্য আরও অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে।
প্রথমত, ASDD বাদ সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল তৃণমূলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলিতে। এবং বহু ক্ষেত্রে যেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গিয়েছে, সেখানেই রাজনৈতিক ফলাফলেও নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে।
দ্বিতীয়ত, UA বাদ একটি স্পষ্ট জনতাত্ত্বিক প্রবণতা অনুসরণ করেছে। মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত যত বেড়েছে, বহু ক্ষেত্রে UA বাদও তত বেড়েছে। ফলে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলিতে এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, এসআইআর-পরবর্তী প্রায় ৭ লক্ষ নতুন ভোটার সংযোজনকে ঘিরে তথ্যের অস্বচ্ছতা এখনও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল ২০২৬-এ শেষ মুহূর্তে যুক্ত হওয়া প্রায় ৫ লক্ষ ভোটারের কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে বহু আসনে জয়-পরাজয় কয়েকশো বা কয়েক হাজার ভোটে নির্ধারিত হয়, সেখানে ৯০.৮২ লক্ষ ভোটার বাদ এবং প্রায় ৭ লক্ষ নতুন ভোটার সংযোজনকে নিছক প্রশাসনিক রুটিন ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ বলে দেখার সুযোগ খুব কম। বিশেষত যখন গোটা রাজ্যে বিজেপি ও তৃণমূলের মোট ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩২ লক্ষ, সেখানে প্রায় ৯৮ লক্ষ (৯০.৮২+৭) ভোটারকে ঘিরে এই বিশাল তালিকা সংশোধন যে নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে— সেই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই যদি নির্বাচনী ফলাফলের উপর নির্ণায়ক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে ভারতের গণতন্ত্র কতটা মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক থাকবে— সেই প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
16th May 2026, Warwickshire, UK
*মতামত ব্যক্তিগত

