Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সাহিত্যহীন শিক্ষা ও বিবেকহীন প্রজন্ম

কৃশানু বিশ্বাস

 


যে ছাত্রটি তার অধ্যাপককে হুমকি দিচ্ছে তার আচরণই তার কল্পনাশক্তির এবং পরিমাণবোধের সবিশেষ অভাব বুঝিয়ে দেয়। এই সংকটের প্রতিকার অজানা নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাহিত্যপাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের এই প্রজন্মকে জানাতে হবে বৃত্তিগত শিক্ষার পাশাপাশি মননশীল শিক্ষাও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের পুনর্বিশ্লেষণের প্রয়োজন আজ— প্রয়োজন এমন কিছু পাঠ চয়ন যা তাদের মনের খিদেকে জাগিয়ে তোলে, তাদের ভাবতে শুধুমাত্র শেখায় না, বরং ভাবতে উন্মুখ করে তোলে। প্রতিটি ছাত্রকে দায়িত্ব নিতে হবে নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চা করার এবং শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাবনার এবং কল্পনার পরিধির বিকাশ প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে চলতে হবে। সুখের কথা এই যে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করলে এই দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা আপনা হতেই তৈরি হয়— তাই শুরুটা করতে হবে বাইরে থেকে, শিক্ষক ও অভিভাবকের হাত ধরে। একইভাবে অভিভাবকদেরও দায়িত্বসহকারে বুঝতে হবে সাহিত্যচর্চা কেবল শখের বস্তু নয়, তাঁদের সন্তানের মননশীল বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য এক অপরিহার্য বিষয় এবং এই কথা বোঝাতে হবে তাঁদের সন্তানদেরও

 

যতটুকু অত্যাবশ্যক কেবল তাহারই মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নহে।… অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত সাধন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না— বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেক পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার হেরফের (১২৯৯ পৌষ)

কিছুদিন আগের কথা। সেই অর্থে বিশেষ নতুন কিছু নয় তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে মনকে সচকিত করে তোলে। একটি সরকারি স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্র তার সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে তার এক বিষয় অধ্যাপককে ট্রোল করে একটি পোস্ট করে যেখানে সে সেই অধ্যাপকের বাড়ি ঢুকে তাকে মেরে আসার হুমকি দেয়। হুমকির ভাষা এতটাই কাঁচা যে তার পুনরুক্তি এখানে সম্ভব নয়।

সত্যি বলতে এ ঘটনা অভূতপূর্ব নয়, ছাত্রদের হাতে শিক্ষকের প্রহার অনভিপ্রেত হলেও একরকম নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে বহু যুগ আগে থেকেই। ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আতঙ্ক চলচ্চিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত মাস্টারমশাই চরিত্রটিকে যখন প্রতিপক্ষ শীতল গলায় হুমকি দিয়ে বলে ওঠে, “মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি,” তখন উপস্থিত দর্শকমাত্রেই স্তব্ধ হয়ে যায়। আজ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে তাই বিষয়টি নতুন না হলেও নতুন করে একবার ভাবায় বৈকি। ভাবনার বিষয়বস্তু শুধুমাত্র হুমকি, বা তার ভাষাই নয়— বরং তার এই নির্ভয় প্রকাশ্যতা, এই পরিণামহীনতার সংস্কৃতি, এবং সর্বোপরি, এই আচরণের পিছনে যে শিক্ষা একজন মানুষকে অন্য একজনের অবস্থানে নিজেকে কল্পনা করতে শেখায়নি।

আমাদের শিক্ষানীতি ক্রমাগতই স্মরণশক্তির পরিবর্তে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির প্রতি জোর দিয়ে চলেছে। বিষয়বস্তু ঢেলে সাজানো হয়েছে যার মাধ্যমে পুঁথিগত শিক্ষার বদলে হাতেকলমে শিক্ষা প্রাধান্য পায়। তবু এ-কথা অনস্বীকার্য যে আজকের ছাত্রসমাজ বহুক্ষেত্রেই এক অভূতপূর্ব মানসিক দৈন্যের শিকার। ব্যতিক্রম যে কোথাও নেই তা নয় তবে সমস্যা হল সে শুধুমাত্র ব্যতিক্রমই রয়ে গেছে, নিয়ম হয়ে উঠে খেলা উল্টে দিতে পারেনি। আমাদের বিদ্যালয়মুখী শিশুরা সাহিত্যরসে বঞ্চিত। তাদের পড়ার জন্য অনেক কিছু আছে— ইতিহাস, ভূগোল, গণিত— প্রায় সকল বিষয়েই কিছু গল্পকথা বলা হয়েছে, কিন্তু মূল গল্পের যে পাঠ্যপুস্তক, নীতিশিক্ষা, মূল্যবোধের শিক্ষা, ভাবশিক্ষা ও ভাবতে শেখার শিক্ষা তার বড় অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। নীতি এবং তার বাস্তবসম্মত প্রয়োগের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান আজ প্রকাশিত যা উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার সাহস বা দুঃসাহস কোনওটিই আমার নেই। এর পরিণতি? ওই সেই রবীন্দ্রচিন্তায় অর্ধপ্রস্ফুটিত মানবজীবন, অপরিপক্ক বুদ্ধিবৃত্তি, দায়িত্বজ্ঞানহীন এক পরিণামহীন অপসংস্কৃতির প্রাধান্য এবং সহানুভূতি ও পরানুভূতির ব্যাপক অভাব।

প্রশ্ন তুলতেই পারেন লেখক কেবল তাঁর সিদ্ধান্ত বলে চলেছেন, তার সমর্থনে যুক্তির বিশেষ অভাব। তাই বাকি কথা বলার আগে কিছু তথ্যের অবতারণা প্রয়োজন।

এক. ASER 2024-এর তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাগ ভারতীয় ছাত্রছাত্রী তাদের নির্দিষ্ট গ্রেড লেভেলে পড়তে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ২৩.৪ শতাংশ ছাত্র সরকারি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ পড়তে পারে। অর্থাৎ, তৃতীয় শ্রেণির চারজনের তিনজনই ইতিমধ্যে পিছিয়ে পড়েছে।

দুই. এই অন্ধকার কিন্তু শুধুমাত্র ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্টের ২০২৪ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ইংল্যান্ডে ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে বই পড়ার আনন্দ ২০০৫ সাল থেকে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে— মাত্র ৩৪.৬ শতাংশ পড়তে ভালোবাসে বলে জানিয়েছে। ২০১২ সালে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সিদের মধ্যে সপ্তাহে চার দিন বা তার বেশি পড়ত ৫৬ শতাংশ, সেটি ২০২৪-এ নেমে এসেছে ৩১ শতাংশে। কিশোর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই পতন আরও তীব্র: ২০২৪ সালে ১১ থেকে ১৪ এবং ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সি গোষ্ঠীতে পড়ার আনন্দ যথাক্রমে ৯.৭ শতাংশ এবং ১১.১ শতাংশ কমেছে— গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে। এই একই প্রবণতা ইউরোপ এবং আমেরিকার গবেষণাতেও নথিভুক্ত।

বিদেশে যেখানে পড়ার প্রতি ভালোবাসা ক্রমশই হ্রাসমান সেখানে স্বদেশে তো এখনও ছাত্রছাত্রীদের পড়তে পারাই হয়ে উঠল না, ভালোবাসা তো অনেক পরের কথা। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে— পাঠদক্ষতা বা পাঠাভ্যাসের সঙ্গে আমাদের মূল বিষয়ের সম্পর্ক কোথায়? এর উত্তরে একটি সাম্প্রতিক গবেষণার কথা বলা দরকার। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্র[1] ১৭ থেকে ২২ বছর বয়সি ১১০ জন তরুণ-তরুণীর উপর করা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে যে বাংলা কাল্পনিক সাহিত্যপাঠ তরুণ মনে কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। স্যাম্পেলের আয়তন ছোট সে কথা মেনে নিয়েও বলতে পারি যে প্রভাব বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সত্য, তা পৃথিবীর বাকি সকল ভাষায় রচিত সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবেই সত্য। ২০১৩ সালে Science পত্রিকায় প্রকাশিত Kidd ও Castano-র গবেষণা প্রমাণ করে যে literary fiction পাঠ মানুষের অন্যের মন বোঝার ক্ষমতা— যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Theory of Mind বলে— উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ গল্প পড়া কেবল আনন্দের বিষয় নয়— এটি পরানুভূতির বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত অনুশীলন।

এইবার আমরা মূল সমস্যার গভীরে বিচার করতে পারি। ASER-পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির তিনজনের মধ্যে দুজন দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ পড়তে পারে না। এই শিশুরাই কয়েক বছরের মধ্যে সেই কিশোর হয়ে উঠবে যাদের ৯০ শতাংশের হাতে স্মার্টফোন থাকবে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের পাঠদক্ষতা তলানিতে, কিন্তু স্ক্রিন-সময় শীর্ষে। একবার ভেবে দেখুন, যে মন ঠিকভাবে পড়তে শিখল না, গল্পের বই পড়তে পারল না অথবা পারলেও পড়ল না, সেই মন কি আদৌ অন্যের গল্প বোঝার ক্ষমতা রাখে? পরানুভূতির জায়গায় সেই মনে জন্ম নিয়েছে শুধুই নিজের অভিযোগ।

স্মার্টফোনের মধ্যে যে অনন্ত বিনোদনস্রোত তার থেকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন গ্রাহক মানসিকতা। শর্টস, বা রিলস যা ভালো লাগে তার জন্য ২ মিনিট আর যা ভালো লাগে না তা নিমেষে স্ক্রল করে যাওয়া, নেটফ্লিক্সে হাজার রকমের কনটেন্ট, এমনকি যা জানতাম না আমার ভালো লাগতে পারে, বা আদৌ দেখতে চাই, ভালো না লাগলে নিমেষে বদল, ইউটিউবে অপছন্দের বিষয় স্বচ্ছন্দে এড়িয়ে যাওয়া আজ আমাদের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক। আজকের যুবসমাজ সমস্যা সমাধান করতে শেখার আগে রাস্তা বদল করে নেওয়া শিখে যায়। রাস্তাও তাদের সামনে হাজার রকমের— তাকে প্রলোভিত করে ডাকার জন্য সবাই বসে আছে। স্বভাবতই তার মনে হয় এইসবে তার স্বাভাবিক অধিকার— তার মনোরঞ্জনের জন্যেই এত আয়োজন। দুর্ভাগ্য এই যে এই বদলে যাওয়া মানসিকতার জোয়ার এসে পড়েছে শিক্ষাক্ষেত্রেও। শিক্ষাব্যবস্থা বলছে শিক্ষানীতি হওয়া উচিত শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। ঠিক কথা। কিন্তু শিক্ষার্থীর যে শিক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা হওয়া উচিত এই কথা স্পষ্টভাবে কে জানাবে তাকে? আধুনিক শিক্ষাদর্শন শিক্ষকদের এক গুরুদায়িত্ব দিয়েছে— পথ প্রদর্শন করা, কিন্তু পথ অনুসরণ করতে হলে ছাত্রের নিজেরও একটি গন্তব্যের বোধ থাকা চাই। আর তাই শিক্ষকদের পথ প্রদর্শন করতে হবে সেই ছাত্রকে যে ছোটবেলা থেকে গল্পের বই পড়েনি, রামচন্দ্রের বিপদে কাঁদেনি, দ্রৌপদীর অপমানে ক্রুদ্ধ হয়নি— যার মন পরানুভূতি অর্জন করেনি। যে শুধু চিনেছে এই সসাগরা পৃথিবী কেবল তার মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে সেজেগুজে বসে আছে। যেখানে তার পছন্দ না হলে একটা গোটা শো ক্যান্সেল হয়ে যেতে পারে, তার লাইক বা ডিজলাইক নির্ধারণ করে পরবর্তী সিজন আসবে কিনা, ১০ সেকেন্ডের মধ্যে তার মনোরঞ্জন করতে না পারলে স্ক্রল করে এগিয়ে যাওয়া তার মৌলিক অধিকার। সেই ছাত্র এখন আর ছাত্র নেই— সে এখন “গ্রাহক”— অর্থের বিনিময়ে সে শিক্ষা কিনে নিচ্ছে, ঠিক যেভাবে সে কিনে নিয়েছে নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রিপশন। শিক্ষা এবং শিক্ষককে তাই হতে হবে তার রুচিসম্মত। শ্রেণিকক্ষে এসে সে একই প্রশ্ন করছে: আমার রেটিং কম হলে এই শিক্ষককে কি সরিয়ে দেওয়া যায় না? আর সেই আতঙ্কে ভীত শিক্ষকের কাজ শিক্ষাপ্রদান নয়, বরং সবার আগে “গ্রাহকের” মনে সন্তুষ্টিপ্রদান। তার বিরুদ্ধাচারণ করা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা, কারণ, পছন্দ না হলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার, এমনকি হুমকি দেওয়ার “অধিকার” আজকের ছাত্ররা নিজেরাই নিজেদের দিয়েছে।

আলোচনার এই পর্যায়ে একটি প্রয়োজনীয় স্বীকারোক্তি। পাঠক যেন এই ধারণা পোষণ না করেন যে লেখক বর্তমান সমাজের এই অবক্ষয়ের সম্পূর্ণ দায়ভার দেশের ছাত্রসমাজের কাঁধেই চাপিয়ে নিস্তার চান। সেটা করতে পারলে হয়তো একরকম পোয়েটিক জাস্টিস হত— এক কালে মাস্টারমশাইরা ছাত্রদের নির্বিচারে প্রহার করেছেন, আজ ছাত্ররা তাই শিক্ষকনিগ্রহকে নিত্যনৈমিত্তিক করে তুলেছে— যাকে বলে history repeats itself— কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে বিষয়টা এত সহজ নয়। এই পর্যায়ে এসে তাই একটু শিক্ষানীতি পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। প্রথমেই দেখে নিতে হবে মার্থা নসবাউম ঠিক কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে এই প্রসঙ্গে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করছেন:

…the goal of the nation should be economic growth. Never mind about distribution and social equality, never mind about the preconditions of stable democracy, never mind about the quality of race and gender relations, never mind about the improvement of other aspects of a human being’s quality of life that are not well linked to economic growth.

Martha Nussbaum, Not for Profit: Why Democracy Needs Humanities (2010)

নসবাউম তাঁর লেখার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে এই অদূরদর্শী মুনাফাযোগ্য দক্ষতার দিকে ঝোঁক কর্তৃত্বকে সমালোচনা করার ক্ষমতা ক্ষয় করেছে, প্রান্তিক ও ভিন্ন মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি কমিয়েছে, এবং জটিল বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলার যোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুর্ভাগ্য এই যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে আমরা যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি তার মধ্যেই তার ব্যর্থতার বীজ লুকিয়ে আছে।

NEP 2020 বিশেষ রূপে বলে যে দেশের ভবিষ্যতের জন্য গণিত, গাণিতিক ভাবনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই ভবিষ্যৎ যে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সেটা বুঝে নিতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। এই প্রেক্ষিতেই আমরা দেখতে পাই জাতীয় শিক্ষানীতিতে হাতেকলমে শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আমার সেখানে আপত্তি নেই। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য, দেশের উন্নতির জন্য, সমাজের উন্নতির জন্য এই বিভিন্ন পেশার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, কিন্তু প্রশ্ন হল এর পরে কী? Dead Poets Society-র Mr. Keating-এর কথাটি এখানে মনে পড়ে— বিজ্ঞান ও বাণিজ্য জীবনধারণ করায়, কিন্তু কবিতা ও সাহিত্য জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই তার ভাবনা, চেতনার প্রসারণের জন্য দরকার সাহিত্য— গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গান, চলচ্চিত্র। সাহিত্য তাকে ভিন্ন মানুষকেও মানুষ বলে চিনতে শেখায়, অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হতে, অন্যের দুঃখে চোখের জল ফেলতে এবং অন্যের আনন্দে মেতে ওঠার সেই যে আনন্দ তা কেবল সাহিত্য থেকেই আসে।

NEP 2020-র নথিতে Humanities ও সাহিত্যের কথা লেখা আছে— কিন্তু বাস্তব বরাদ্দ, পরীক্ষার কাঠামো, এবং অভিভাবকদের পছন্দ সবই STEM ও vocational training-এর দিকে। নীতি ও বাস্তবতার এই ফাঁকটিই সংকটের কাঠামোগত কারণ।

সাহিত্যপাঠের অর্থ কেবল কিছু গল্প-কবিতার নিছক সমাবেশ নয়, পাঠ্যপুস্তকের জন্যে নির্বাচিত সাহিত্য অনুপ্রেরণামূলক হওয়া উচিত, যা শুধু উত্তর দিয়ে যায় না, বরং প্রশ্ন তুলে ধরে, পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, উত্তর খুঁজতে স্বতঃপ্রণোদিত হতে শেখায়। নিজের থেকে ভিন্ন একজন মানুষের জুতোয় পা গলিয়ে দেখতে শেখা, অন্যের গল্পের একজন বুদ্ধিমান ও সহানুভূতিশীল পাঠক হতে শেখা তখনই সম্ভব যখন সাহিত্যপাঠ সঠিকভাবে শ্রেণিকক্ষে চালু হবে।

Our mind does not gain true freedom by acquiring materials for knowledge and possessing other people’s ideas but by forming its own standards of judgement and producing its own thoughts.

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিনিকেতনের পাঠ্যক্রম থেকে, Martha Nussbaum উদ্ধৃত, Not for Profit (2010)

বর্তমান সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, শিক্ষকনিগ্রহের কথা, ছাত্রদের মধ্যেই হেনস্থা, অভিযোগের মাত্রাবৃদ্ধি, অনলাইন ট্রোলিং ইত্যাদি যাবতীয় সামাজিক অবক্ষয়ের পিছনে সাহিত্যহীন শিক্ষাই একমাত্র কারণ নয় বটে— কিন্তু যে কারণগুলি আমাদের হাতে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে মৌলিক।

আজকের দিনে ছাত্ররা পড়তে ভুলে গেছে এই কথা অতিসরলীকরণ মাত্র। তারা পড়তে ভুলে যায়নি, তাদের পড়ার বিষয়বস্তু বদলে গেছে। পরিণত সাহিত্যের জায়গা দখল করেছে সোশাল মিডিয়ার (অপ)সাহিত্য, মিমশাস্ত্র এবং ক্যাপশন কালচার। এই অপাচ্য-কুপাচ্য আহারে যা হওয়ার তাই হয়েছে— মনের হজমশক্তি নাশ, গুরুপাকে অনীহা। একটু “কঠিন” বিষয়বস্তু, একটু “layered text” সামনে এলে মন থেকে তাই পড়ার ইচ্ছে চলে যায়। তাছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যখন “লেখকের বক্তব্য”, “পর্যালোচনা”, “শব্দ, ছন্দ, অর্থ” সব নখদর্পণে তখন পরীক্ষায় নম্বর আনার জন্য আলাদা করে সাহিত্যের রসাস্বাদনের প্রয়োজনই বা কী! কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা দিতে পারে না তা হল সেই অনুভব যা রামচন্দ্রের বিপদে বুকের মধ্যে ডেকে আনে এক চিনচিনে ব্যথা, দ্রৌপদীর অপমানে ক্রুদ্ধ করে তোলে মন, সুদামার প্রতি কৃষ্ণের বন্ধুত্বে আর্দ্র করে তোলে চোখ। অথচ এর নেতিবাচক প্রভাবই ছাত্রদের পরানুভূতির অভাবের মুখ্য কারণ। সাহিত্যরস হতে বঞ্চিত ছাত্রদের মনে কল্পনাশক্তির উন্মেষ হতে পারে না, তাদের মনে ভাবের অভাব করুণ রূপে প্রকট হয়।

বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা হয় এবং ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জীবনযাত্রা নিয়মিত হইতে থাকে, তবেই আমাদের সমস্ত জীবনের মধ্যে একটা যথার্থ সামঞ্জস্য হইতে পারে— আমরা বেশ সহজ মানুষের মতো হইতে পারি এবং সকল বিষয়ের একটা যথাযথ পরিমাণ ধরিতে পারি।

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার হেরফের (১২৯৯ পৌষ)

যে ছাত্রটি তার অধ্যাপককে হুমকি দিচ্ছে তার আচরণই তার কল্পনাশক্তির এবং পরিমাণবোধের সবিশেষ অভাব বুঝিয়ে দেয়। এই সংকটের প্রতিকার অজানা নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাহিত্যপাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের যুবসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলবে— এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ আমাদের জীবিকানির্বাহের উপায় অনায়াসেই করে দেবে। কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে পরিমিতি বোধ, মানবিক বোধ, বিদ্যা, বুদ্ধি, ও বিবেক জাগ্রত করার জন্য জাতীয় শিক্ষানীতিতে নথিবদ্ধ Humanities, লিবারাল আর্টসের উপযুক্ত দায়িত্বপূর্ণ বিকাশের প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের এই প্রজন্মকে জানাতে হবে বৃত্তিগত শিক্ষার পাশাপাশি মননশীল শিক্ষাও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের পুনর্বিশ্লেষণের প্রয়োজন আজ— প্রয়োজন এমন কিছু পাঠ চয়ন যা তাদের মনের খিদেকে জাগিয়ে তোলে, তাদের ভাবতে শুধুমাত্র শেখায় না, বরং ভাবতে উন্মুখ করে তোলে। রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনী বা ছুটি, শরৎচন্দ্রের মহেশ, বা বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী— এই ধরনের পাঠ শুধু সাহিত্যের ইতিহাস শেখায় না, বরং অন্য একটি জীবনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শেখায়। এই পাঠ নির্বাচনের দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রকের, কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। প্রতিটি ছাত্রকে দায়িত্ব নিতে হবে নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চা করার এবং শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাবনার এবং কল্পনার পরিধির বিকাশ প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে চলতে হবে। সুখের কথা এই যে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করলে এই দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা আপনা হতেই তৈরি হয়— তাই শুরুটা করতে হবে বাইরে থেকে, শিক্ষক ও অভিভাবকের হাত ধরে। একইভাবে অভিভাবকদেরও দায়িত্বসহকারে বুঝতে হবে সাহিত্যচর্চা কেবল শখের বস্তু নয়, তাঁদের সন্তানের মননশীল বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য এক অপরিহার্য বিষয় এবং এই কথা বোঝাতে হবে তাঁদের সন্তানদেরও।

এই আলোচনার শেষ পর্বে এসে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গল্প— তোতাকাহিনী। দেশের রাজা তার পোষা পাখিটিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে বদ্ধপরিকর। বিশাল তার আয়োজন, পণ্ডিতদের আনাগোনা, অগণিত পুঁথি, এবং শৃঙ্খলা ও অনুশাসনের জন্য একটি সোনার খাঁচা— প্রিয় পাখির শিক্ষার জন্যে রাজামশাই কোনও অভাব রাখেনি। কিন্তু এই সবের মাঝে অবোধ পাখিটিকে হাস্যকররকম গুরুত্বহীন দেখায়— এতটাই গুরুত্বহীন যে শিক্ষাব্যবস্থার বহরে সে যে শেষ নিঃশ্বাস অবধি ত্যাগ করেছে তার কোনও হদিস কেউ পেল না। তার নিঃসাড়, নিস্পন্দ দেহখানি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের চিহ্ন হয়ে ওঠে, তার শিক্ষা সম্পূর্ণ তখন হয় যখন তার পেটের ভিতরে ছেঁড়া পুঁথির পাতাগুলি কেবল খসখস করতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের তোতাপাখিটি মরেছিল নিঃশব্দে— ব্যবস্থার ব্যর্থতায়, নিজের এবং আর সকলের অজান্তে। দুর্ভাগ্য এই যে আজকের ছাত্রটি, যার প্রসঙ্গ থেকে এই আলোচনার সূত্রপাত, সে এবং তার মতো সমস্ত ছাত্ররাই মরছে— এই মৃত্যুতে তারা সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। তারা জানে না যে তারা মরছে, এবং সেটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

 


[1] Ghosh et al., IJAR 2025.

Exit mobile version