সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
আমাদের হোটেল থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে বাপ্পা রহস্য করে বলেছিল— “কাল আপনাদের জন্য একটা অন্যরকম মিষ্টি নিয়ে আসব। প্লেনে উড়তে উড়তে চেখে দেখবেন।” এককালে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অনেক মিষ্টি সাবড়েছি, এখন শর্করার শাসানিতে শরীর শঙ্কিত। চক্ষুলজ্জার খাতিরে প্রথাসিদ্ধ ভঙ্গিতে আপত্তি জানিয়ে বললাম— “আহা! আবার এসব কেন? শরীর এখন মধুমেহগ্রস্ত। তাই ওসব…।” বাপ্পা আমার থেকে দু-কাঠি ওপরে। আমার কথার রেশ টেনে সে হাসতে হাসতে বলল— “কী একটা প্রবচন আছে না? মধুরেণ সমাপয়েৎ, মনে করুন এটা তেমনই কিছু হবে।” নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এই দক্ষিণি মহানগরীটিতে এসে হাজির হওয়া ইস্তক বাপ্পা নামক ভক্তের হাতে পড়ে আমাদের একেবারে লবেজান দশা। আদরযত্নের ঠেলায় আমরা, বিশেষ করে আমি, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মোগলের হাতে না পড়েও আমরা হাড়ে হাড়ে তেমন খিদমতের বহর মাপতে পারছি। সবই খোদার খোদকারি!
যাইহোক, এয়ারপোর্টে পৌঁছেই বাপ্পা তাঁর বৌদির হাতে সেই প্রতীক্ষিত কাপড়ের ব্যাগটি সমর্পণ করে বলল— “এটা খেয়ে, সোয়াদ নিয়ে আমাকে রিভিউ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবেন। এটা অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার এক্সক্লুসিভ আইটেম। নাম পুথারেকু। অবশ্য চলতি নামে তার পরিচিতি পেপার সুইট বা কাগুজে মিষ্টি বলে।”
প্রশ্ন হল, এমন নামকরণ কেন? আসলে এখানেই লুকিয়ে আছে এই মিষ্টির যাবতীয় রহস্য। উড়ানযাত্রার সময় বাপ্পার দেওয়া সেই উপহার আর চেখে দেখার ফুরসত মেলেনি। বাড়িতে ফিরে গিন্নি রেকাবিতে করে সামনে এনে রাখতেই এক পরত বিস্ময়ের ঘোরে আচ্ছন্ন হলাম। গড়ন অনেকটাই আমাদের অতি পরিচিত পাটিসাপটা পিঠার মতো বটে, তবে তার বাইরের মোড়কখানি সেলোফেন পেপারের মতো স্বচ্ছ। আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম ওই কাগজের আবরণী খুলেই বোধহয় ভেতরের উপাচারের সোয়াদ নিতে হবে। সন্তর্পণে মোড়ক হরণের উদ্যোগ নিতেই পাশে বসা কন্যা রে রে করে তেড়ে ওঠে— “আরে! করো কী! খোলাখুলির কিছু নেই। এমনটাই হল এর বৈশিষ্ট্য।” অতঃপর আর কী! আলতো করে একটা কোণা আঙুলের ডগা দিয়ে ভেঙে মুখে পুরতেই তা বিগলিত রসনার পথ বেয়ে উদরে চালান হয়ে যায় নিমেষে। এমনই মহিমা! রেকাবিতে করে সামনে এনে হাজির করতেই যেটুকু সময় দেরি, উদরগর্ভে হারিয়ে যেতে সময় লাগে না। মনে মনে বহু পরিচিত এক বিজ্ঞাপনী ভাষ্য ভেসে ওঠে। সেটিকেই সামান্য বদলে নিয়ে মনে মনে বলে উঠি— মুখে দিলে গলে যায়, মনে জাগে তুষ্টি।
পুথারেকু বা পুথারেকুলু হল একান্তভাবেই তেলুগুভাষী মানুষজনের অস্মিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তেলুগুভাষী মানুষজনের কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পুথারেকু ছাড়া পূর্ণতা পায় না। তেলুগু ভাষায় পুথারেকু শব্দের অর্থ হল আবরণী বা coating-এ মোড়া মিষ্টি। আমাদের পাটিসাপটা পিঠা যেমন ময়দা বা চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি আবরণী দিয়ে মোড়ানো থাকে, পুথারেকু অনেকটা ঠিক তেমনই। তবে স্বাদের বিস্তর ফারাক আছে।
ঠিক কবে থেকে এমন সুস্বাদু অথচ আশ্চর্য মিষ্টির সৃষ্টি তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। একদলের মতে চতুর্দশ শতকে সুপ্রাচীন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজবংশের রসুইঘরে পুথারেকুর জন্ম। রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজকীয় রসুইঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে এই মিষ্টি ধীরে ধীরে আমজনতার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উপাদানের বাহুল্য নেই। একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থালি উপকরণের সমাহারে— চালের গুঁড়ো, সুগন্ধি ঘি, আখের গুড় বা গুঁড়ো চিনি দিয়েই তৈরি করা সম্ভব এই একদা রাজকীয় মিষ্টিটি, যা আজ দুই প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার রসুইকরদের গরিমা বহন করে। দক্ষতা আর ধৈর্যের এক আশ্চর্য সমন্বয়ে তৈরি আজকের পেপার সুইট।
রাজা-রাজড়াদের রসুইঘরের বাইরে একেবারে গ্রামীণ মহিলাদের গভীর ভালোবাসা আর উদ্ভাবনী দক্ষতাই পেপার সুইট বা পুথারেকু তৈরির মূল ক্ষেত্র— এমনটাই মনে করেন আর একদল মানুষ। রাজ্যের পূর্ব গোদাবরী জেলার আত্রেয়াপুরম গ্রামের গ্রামীণ মহিলারাই সর্বপ্রথম এই আশ্চর্য মিষ্টি উদ্ভাবন করেন আজ থেকে প্রায় তিন শতক আগে। বলা হয় ওই গ্রামের জনৈকা গৃহবধূ সর্বপ্রথম ভাতের স্টার্চের সঙ্গে গুড় আর ঘি মিশিয়ে এই মিষ্টি প্রস্তুত করেন। এমন উদ্ভাবনে উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্রেয়াপুরমের অন্যান্য মহিলাদের অনেকেই চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি পাতলা আবরণীর মধ্যে পুর ভরে পুথারেকু তৈরির কায়দা রপ্ত করে ফেলেন। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় সেগুলো বিপণনের ভাবনা মাথায় আসে। গ্রামের গৃহবধূদের তৈরি এমন মিষ্টি অচিরেই শহুরে মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের হাত ধরে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। লম্বায় প্রায় পাঁচ ইঞ্চির এই পেপার সুইট বা পুথারেকুকে নিয়ে শুরু হয় নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা। মূল আবরণীর স্বচ্ছতা অপরিবর্তিত রেখে ভেতরের উপাচারের রদবদল ঘটিয়ে তার মধ্যে নতুনত্ব আনার প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে দুই তেলুগুভাষী রাজ্যে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলির খাদ্যতালিকায় তণ্ডুল বা চালের প্রাধান্য আবহমানকাল। পুথারেকু তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় এক বিশেষ ধরনের চাল— জায়া বিয়্যাম (Jaya biyyam)। তেলুগু ভাষায় বিয়্যাম শব্দের অর্থ হল চাল। আমাদের রাজ্যে জয়নগরের সুগন্ধি মোয়া তৈরির জন্য যেমন কনকচূড় চালের খই ব্যবহার করা হয়, বিষয়টা অনেকটাই ঠিক তেমনি। আর প্রয়োজন হয় গুঁড়ো করা চিনি ও সুগন্ধি ঘৃত। কিন্তু শুধু উপকরণ জোগাড় করলেই হবে না। চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের লেই বা ঘোলাকে আগুনের ওপর উল্টো করে বসানো কড়াইতে ছড়িয়ে হালকা পাতলা আবরণী বা মোড়কগুলিকে বানানো হয়। ফিনফিনে পাতলা এই আবরণীর ভেতরে পছন্দমতো পুর বা স্টাফিং দিয়ে তাকে মুড়ে নেওয়া হয় বিশেষ আকারে। পুথারেকু তৈরির জন্য ভালো ঘি এবং গুঁড়ো চিনি অথবা গুড় লাগবেই। ইদানিং বিভিন্ন ধরনের শুকনো ফলের কুচি, চকোলেট ইত্যাদিকে স্টাফিং-এর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পুথারেকুকে নিত্যনতুন স্বাদের করে তোলার জন্য।
নিজামের শহর হায়দ্রাবাদ বিরিয়ানির জন্য যদি বিখ্যাত হয় তাহলে আমি বলব হায়দ্রাবাদের গরিমা পুথারেকুর জন্যও কিছু কম নয়। এরপর যদি কেউ দাবি করেন যে হায়দ্রাবাদের সেরা হল তার ঐতিহ্যবাহী বেকারিতে প্রস্তুত খুশবুদার মুচমুচে বিস্কুট, তাহলে আমি নাচার। সেই কথা শুনতে হলে আবার এক কিস্তি লেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত এখানেই ইতি টানছি।
পুনশ্চ: বাপ্পাকে ধন্যবাদ। শেষ মুহূর্তে অমন একখানা খাজানা আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য।
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া; দ্য হিন্দু পত্রিকা; তেলেঙ্গানা পর্যটন বিভাগের হ্যান্ডবুক।

