অন্তরা মুখার্জী
মনখারাপের একটি দিন সপ্তাহে বদলাতে বদলাতে কখন যে একটি মাসে বদলে যায় তার হিসেবে কে রাখে! পেরিয়ে যাবে বছরও।
অস্থির সময়ের ভিজে রাস্তায় সত্যিই ফিকে হয় কষ্ট?
কিছু বন্ধু, কিছু প্রিয়জন ছাড়া স্মৃতিরা তাহলে অস্পষ্ট!
অবশ্য নিয়মমাফিক দিনে মনে পড়ে বিশেষ মুহূর্ত। তখন সত্যি ‘মুহূর্তরা মুহূর্তের কাছে ঋণী’! কখনও ঝাপসা চোখ, কখনও চওড়া ঠোঁট— এভাবেই চলে জীবন। বহমান জীবন-নদীর পাশে বসা ছাড়া খুব কি কিছু করার থাকে আমাদের? তবু এই মেনে নেওয়া অথবা মানিয়ে চলার মাঝে যখন বিরতি ঘটে তখন বিপ্লবে কিংবা কৃতজ্ঞতায় জীবন স্বাদ পাল্টায়। যে রাস্তায় সচরাচর লেখা থাকে না দিনযাপনের একঘেয়েমি, সেই পথে সার্থকতার বাস্তব খানিক বর্জন করে, দু-দণ্ড জিরিয়ে নিতে গিয়ে দেখা মেলে সুপ্ত শক্তির সঞ্চারবিন্দুর…
বিগত আয়নায় ছায়া পরে এক সাধারণ মেয়ের জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়…
***
বাবা-অন্ত প্রাণ ছিল তার। যুক্তি-তর্কে সে যতই বহুদূর হোক না কেন, জীবনের সব সিদ্ধান্ত যেন বাবাই নেবে। যে একটা সিদ্ধান্ত সে নিজে নিয়েছিল— কাকে বিয়ে করবে— সেই সিদ্ধান্তও বাবার মেনে নেওয়া একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল। পড়াশোনা, বেড়াতে যাওয়া, বই কেনা, রাতভর কলকাতার রাস্তায় ঠাকুর দেখা, আইকনিক এবং সস্তা খাবার দোকান চেনানো, মনপসন্দ সাইকেল কিনে দেওয়া, না চাইতেই স্কুটি, এমনকি চাকরি-বাকরি করার পর যাবতীয় ইনভেস্টমেন্ট, বিয়ের পরও বেশ কিছু ব্যাপারে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার নাম বাবা। এক কথায় মেয়ের জীবনের মুশকিল আসান! কর্মব্যস্ততা বা সামাজিক দায়বদ্ধতা কোনও কিছুই বাবাকে মেয়ের চিন্তা অথবা আবদার মেটাতে আটকাতে পারেনি।
একদিন বাবার মাথায় এক ব্যাধি হল। কাবু হল সে। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে মাল্টিপল সেরিব্রাল স্ট্রোক এবং পার্সিয়াল ডিমেনশিয়া। ধীরে ধীরে চারদিকটা ঝাপসা হল মেয়ের। এক মা হয়ে যাওয়া মেয়ে অনুভব করল তার মুশকিল-আসান বাবা নিজেই মুশকিলে। তার দুটো বছর পর বাবার সব মুশকিলের চিরতরে অবসান হল। আকুল সমুদ্রে ডিঙিনৌকায় অসুস্থ মা, ৯ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে শুরু হয় মেয়ের এক অসম্ভব যাত্রা। কিচ্ছু জানে না সে, কোথায় কী কাগজ, দলিল, দস্তাবেজ, নথি, সব সব তার বাবার হেফাজতেই ছিল। দুই দাদা বিদেশে। অর্ধেক কিছু বলে যেতে পারেনি বাবা। ভুলে যেতে আরম্ভ করেছিল। মনে ছিল মেয়ের জন্মদিন। মেয়ের ফোন নম্বর। এদিকে মায়ের চলে ডায়ালিসিস। সে কী করবে ভাবতে ভাবতে দেখে তার একমাত্র সাথী, তার স্বামীও, খানিক দিশেহারা। প্রায় ৬ মাস সে পাগলের মতন বাড়ির বাথরুম, বাবার শোওয়ার খাট, ছবি, জামাকাপড় এবং আরও যা যা হয় সব বদলে দিতে লাগল। অনেক পরে মেয়ে জেনেছিল ডিপ্রেশনের নাকি নানান ভাব হয়!
লকডাউনের মাঝপথে ডিজিটাল ডিভাইড কোনওমতে সামলে নিয়ে কুস্তি লড়ে যাচ্ছিল। খোলা হওয়ার মতন ছিল মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানো, বইপড়া, টিভি এবং কিছু সিনেমা দেখা। একদিন আনমনে টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে আটকে গেল চোখ এক শর্টফিল্মে, স্টাক। একটি মানুষ আটকে পড়েছে। কিছুতেই বেরোতে পারছে না। করোনাকালে সবাই তখন আটকে। মেয়ে ভাবল, তাহলে তো সে একা নয়, অনেকেই তার মতন আটকে। পথে, ঘাটে, অজানা সন্ধানে। নিজের সংকীর্ণ দুঃখলাভ ভুলে সে সেদিন প্রথমবার পেরেছিল অন্যদের জন্য ভাবতে— যা তার বাবা প্রায়শই করে থাকত। এরপর খোঁজ শুরু, কে এই অভিনেতা, কী কী কাজ করেছে। জানতে গিয়ে আবিষ্কার করল এমন একজন মানুষকে যে পর্দার ওপারে বসে আশ্চর্যভাবে এক অচল হয়ে যাওয়া মাথাকে দম দিল। ছবির নাম পিউপা। বাবা হারানোর গল্প। আর তার ঠিক পর পর যে পেন চলা বন্ধ ছিল, সেই পেনের ধুলো ঝেড়ে সে লিখতে পেরেছিল এক যান্ত্রিক চিঠি:
“একটি কথা না বললে মিথ্যে কথা বলা হবে যে আমি আশা করিনি আপনি অভিনয়ে এতটা ধাক্কা দিতে পারেন! বুঝতেই পারছেন, আমি আপনার বিশেষ কিছুই দেখিনি এবং সেই প্রথমবার নিজের অজ্ঞতায় বেশ খারাপ লাগল। বাবা বলত “যা জানিস না, তা স্বীকার করতে কোনওদিন লজ্জা পাবি না। যদি পাস, তাহলে শিখতে পারবি না।”
ক্যাথার্সিস কখন মাইমেসিস হল সে নিজেও জানতে পারেনি। কষ্টকল্পনাতেও ভাবেনি যে উত্তর পাবে। কারণ নিজের কথা লেখার তাগিদ থেকে চিঠি লেখা, ভেবেছিল তিনি উত্তরই দেবেন না, এসব তো ফ্যান গার্ল মোমেন্ট! তবু রিপ্লাই দেখে সে বুঝেছিল যে মানুষটি তাকে আর যাই হোক ফ্যান গার্ল ভাবেননি। একজন ডিপ্রেসড মানুষ সেদিন অচেনা এক তারার থেকে শক্তি পেয়েছিল। প্রায় ২০ বছর পর সে আবার শুরু করে বাংলায় প্রবন্ধ লিখতে। জীবনভর তার ইংরেজি লেখা। বাংলাতে যে এক সময়ে লিখত সে তো সে ভুলেই গিয়েছিল। আত্মজীবনীমূলক সেই প্রবন্ধ উৎসর্গ করে পিউপা-কেও।
এর পর শুরু হয় এক যাত্রা— অভিনেতার লেখাগুলো আরও মনোযোগী হয়ে পড়া। এমন একটা বাংলায় লেখা যা পড়ে সে তাজ্জব বনে গেছিল। সাবলীল, নির্মেদ, ‘সুই জেনেরিস’, পড়াশোনার ছাপ সুস্পষ্ট। গোগ্রাসে পড়ে ফেলা হল প্রায় সব কটা বই। অপেক্ষা করা হত রচনাশৈলী শেখার, প্রতি রবিবার, প্রতিদিনই। তারপর তো নদী চলে আপন বেগে— লেখাপড়া, সিনেমা দেখা, আলোচনা করা, প্রতিক্রিয়া জানানো ইত্যাদি… কখনও তারা নেমে আসে মাটিতে, কখনও আবার দূরে, দ্বীপে জ্বলতে থাকে। কিছু কিছু বাক্য, শব্দ, উপমা, মনে ঘর করে থেকে যায়। যেমন গুগল দর্পণ-এর একটি অংশ মনে দাগ কেটেছিল:
পৃথিবী থেকে একটা গোটা মানুষ হারিয়ে গিয়েছে, কে জানে হয়তো মুছেও গিয়েছে। আমিও কি হারিয়ে যাব এভাবে একদিন? ও মা, আমাকে আরও আঁকড়ে ধরে রাখো না। আচ্ছা, যারা সত্যিই একদিন হারিয়ে গিয়েছিল স্বেচ্ছায়, তাদেরকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে? সম্ভব? গুগল পেরেছে তাদের খুঁজে বের করতে?
***
নাহ, কোনও সার্চ ইঞ্জিন পারবে না পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে। নতুন খবরে চাপা পড়তে পড়তে আমাদের ক্ষোভ, বিহ্বলতা, বিস্ময়ে একদিন পলি পড়বে। এটাই হয়তো বাস্তব; অস্বীকার করি কীভাবে যে আমরা তো শুধুই দর্শক অথবা সার্চ ইঞ্জিনের পাঠক। আমরা স্ক্রোল করি, অনবরত। মুখরোচক ঝালমুড়ি মগজে গুঁজে স্নায়ুর কারফিউ ঘোষণা করছি আজকাল। ব্যাখ্যা দিচ্ছি— জগতে অকাল প্রয়াণ কি এই প্রথমবার? অকাল প্রয়াণ নিয়ে লিখতে বসেও তাঁর মতন লিখতেও তো পারি না! মনে আছে তাঁর এক লেখাতে দিব্যা ভারতীর আকস্মিক চলে যাওয়ার অসামান্য প্রকাশ:
মরে গেল? এত সুন্দর কেউ এইভাবে মরতে পারে? ইস্ আমি যদি পাণ্ডব গোয়েন্দার বাবলু হতাম! ঠিক খুঁজে বের করতাম কী করে মারা গেল দিব্যা ভারতী।
এহেন অসংখ্য বাক্যের দ্যুতি থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম! তাই এমন অনুভূতির মালিক যে লেখক-তারকা আচমকা খসে গেলে পাঠকের আফসোস হওয়া কোনও বাতুলতা নয়। কত না-লেখা, অর্ধ-লেখা ভাবনা পড়া বাকি রয়ে গেল! আর সেই সাধারণ মেয়ে, যার গল্প হচ্ছিল, তার মতন করে হয়তো আরও অনেকেই লেখক-তারকার শিল্প-সৃষ্টিতে আবার খুঁজে পেতেই পারত জীবনীশক্তি! আসলে কে যে কাকে কীভাবে সারিয়ে তোলে, মিটিয়ে দেয়, গড়ে দেয়, ভেঙে দেয়, তার কোনও পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। এই সব প্রশ্নের টেস্টপেপার তৈরি হয়নি আজও। যদি কখনও অচিকিৎসনীয় মনের অসুখ হয়, যেখানে মানসিক কষ্ট চাইলেও ভাগ দেওয়া যায় না, সেখানে সাহিত্যের অথবা শিল্পের সাহচর্য ঠিক দরজায় কড়া নাড়তে শেখায়; যাদের হয়তো টিকে থাকার কথা ছিল না কিন্তু লেখকের ভাষার উপশম তাদেরকে ময়দানের কুয়াশায় ঠিক খুঁজে দেয় এক চিলতে রোদ্দুর! কেউ কেউ পারেন তাঁদের সৃষ্টি দিয়ে অন্যদের মনখারাপের আস্তাবলে সাহস গচ্ছিত রেখে যেতে— রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

