Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভোটব্যাঙ্ক: ব্যালট বাক্সের সমীকরণ ও নাগরিক সত্তা— দশম বর্ষ, প্রথম যাত্রা

স্টেশনমাস্টারের কলাম

 

…ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির গভীরতম সংকট সম্ভবত এখানেই— প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের নামে তা গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাঠামোগত বঞ্চনার শিকড়ে হাত দেয় না। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত গণপরিষদের দীর্ঘ বিতর্কে আম্বেদকর, প্যাটেল বা নেহরুর মতো রাষ্ট্রনির্মাতারা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমতাকেই ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত নির্যাস বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আম্বেদকরের সতর্কবাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সামাজিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই সংখ্যার প্রবন্ধগুলি… সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই নানা দিক উন্মোচন করেছে: নাগরিককে জাত, ধর্ম বা লিঙ্গের আবরণে একটি নিষ্ক্রিয় সংখ্যায় গুটিয়ে না রেখে কীভাবে এক স্বাধীন, সচেতন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা সম্ভব। সেই উত্তর খোঁজার ভার আমরা পাঠকের হাতেই তুলে দিচ্ছি।…

 

দেখতে দেখতে ‘চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম’ দশ বছরে পা দিল। এই দশ বছরের রাস্তা পার করা যে খুব কঠিন ছিল তা নয়, তবু এখনও পর্যন্ত এর চেহারাটা যেহেতু অবাণিজ্যিক, সেই কারণে কিছু অবধারিত সমস্যা তার নিজের নিয়মেই এসেছে। আবার চলেও গেছে। যার শুরু হয়েছিল আট-নয়জনের হাত ধরে, সে এখন স্বাবলম্বী হয়ে তিনজনার হাত ধরে আছে। এই পত্রিকাই এক অর্থে এর সম্পাদকদের আশ্রয় দিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই এই দেশ আর বিদেশের অসংখ্য পণ্ডিত ও মহানুভব মানুষকে, যাঁরা বারংবার নিজেদের মূল্যবান লেখা আমাদের প্রকাশ করতে দিয়ে অসীম কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মনে করি প্রয়াত মহাপণ্ডিত রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে, যিনি একটি বিষয়ে চারনম্বর প্ল্যাটফর্মে লিখবেন কথা দিয়েছেন বলে বঙ্গসংস্কৃতির বিশালতম গোলায়াথকে বিফলমনোরথ করেছিলেন। আমাদের সকলের জন্য আনন্দের কথা এই, যে এমন ঘটনা মাত্র একটি ঘটেনি।

এসব ভাবগম্ভীর ব্যাপার বাদ দিয়ে বরং এই সংখ্যার দিকেই তাকানো যাক। বয়স তো ‘সংখ্যা’ বই কিছু নয়, আর তা কাগজের ক্ষেত্রে আক্ষরিকভাবে সত্যি।

আমাদের এই সংখ্যার অন্বেষণ আবর্তিত হয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি পরিচিত অথচ অস্বস্তিকর বিষয়কে ঘিরে, যার নাম ‘ভোটব্যাঙ্ক’। জানলাম— ১৯৫৫ সালে সমাজতাত্ত্বিক এমএন শ্রীনিবাস তাঁর দ্য সোশ্যাল সিস্টেম অফ আ মাইসোর ভিলেজ প্রবন্ধে গ্রামীণ সমাজে পৃষ্ঠপোষক ও অনুগামীর পারস্পরিক নির্ভরতা বোঝাতে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। সাত দশক পেরিয়ে সেই নিরীহ সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ আজ এক রাজনৈতিক কৌশলের নাম, যেখানে ভোটারকে দেখা হয় জাত, ধর্ম, ভাষা বা লিঙ্গের নিরিখে সাজানো কতকগুলি অনুমানযোগ্য সংখ্যা হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যাটি কাঠামোগত। এই সমস্যা এতটাই সমস্যাজনক, যে তা গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তরকে, অর্থাৎ স্বাধীন ও বিচারক্ষম নাগরিকসত্তাকেই কার্যত অস্বীকার করে বসে। যে মুহূর্তে কোনও জনগোষ্ঠী নিছক ভোটের সংখ্যায় পরিণত হয়, সেই মুহূর্তেই সম্পদের বণ্টন, অর্থনৈতিক অসাম্য বা সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নগুলি আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে পরিচয়ের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়।

নারী ভোটারদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এই প্রবণতার একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নারীদের ভোটদানের হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১৪.৩৪ শতাংশ কম ছিল। ২০১১ সালে এই ব্যবধান কার্যত মুছে গিয়ে নারীরা বরং তাঁদের অধমার্ধ্বের তুলনায় ০.২৩ শতাংশ এগিয়ে যান, আর ২০২৬-এর নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ পুরুষদের চেয়ে দাঁড়ায় ১.৫ শতাংশ বেশি। অথচ এই রূপান্তরকে রাজনৈতিক ভাষ্যে প্রায়ই গুটিয়ে আনা হয় মাসিক নগদ হস্তান্তরের একটি সরল লেনদেনে। এর পিছনে কাজ করে এক পিতৃতান্ত্রিক অনুমান— যেন নারীর রাজনৈতিক পছন্দ কেবল অনুদানেই কিনে নেওয়া যায়— আর আড়ালে চলে যায় কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়নের গভীরতর প্রশ্নগুলি। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে: ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের অর্থ বহু প্রান্তিক পরিবারে নারীর হাতে আসা প্রথম স্বীকৃতি, তাঁর অদৃশ্য গৃহশ্রমের একটি সামাজিক মূল্য। কিন্তু সেই স্বীকৃতিকে যদি একরৈখিক আনুগত্যের সমীকরণে বেঁধে ফেলা হয়, তবে তা নারীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিকাশকেই রুদ্ধ করে। নিরাপত্তার প্রশ্নে সাম্প্রতিককালের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদগুলি মনে করিয়ে দেয়, যে তাঁরা নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী নন, সচেতন রাজনৈতিক নাগরিক।

একই কাঠামোগত উপেক্ষা চোখে পড়ে দেশের আদিবাসী সমাজের ক্ষেত্রে, যাঁরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় ১০ কোটি ৪২ লক্ষ। মূলধারার রাজনীতি যখন তাঁদের একটি ভোটের ব্লক হিসেবে ধরে নেয়, তখন তাঁদের ‘জল, জঙ্গল, জমি’র প্রথাগত অধিকারের লড়াই আলোচনার পরিসরের বাইরে থেকে যায়। ২০০৬ সালের বনাধিকার আইন কিংবা ১৯৯৬ সালের পেসা আইনের মতো সুরক্ষাকবচ সত্ত্বেও ছত্তিশগড়ের হাসদেও অরণ্য বা ঝাড়খণ্ডের জাদুগোড়ার মতো অঞ্চলে উন্নয়ন ও প্রথাগত জীবিকার ভারসাম্য আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন, যার ভার মূলত বহন করতে হয় অরণ্যনির্ভর মানুষকেই। ভোটব্যাঙ্কের অঙ্ক এই কাঠামোগত বঞ্চনার সমাধান দেয় না; বরং বহু ক্ষেত্রে পরিচয় ও আবেগকে সামনে রেখে আসল প্রশ্নটিকেই আড়াল করে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব পরিসরে এই সমীকরণ আরও স্তরায়িত। রাজ্যের আদিবাসী জনসংখ্যার (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫ শতাংশ) বড় অংশই সাঁওতাল, যাঁদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি জনগণনায় স্বতন্ত্র ‘সারনা’ বা ‘সারি’ ধর্মকোডের স্বীকৃতি; ২০২৩ সালে রাজ্য বিধানসভায় সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব পাশের পর পরবর্তী নির্বাচনে তার রাজনৈতিক অভিঘাত স্পষ্ট হয়েছে। জঙ্গলমহলের ছবিটি আবার আলাদা। সেখানে কুড়মি সম্প্রদায়ের তফসিলি জনজাতি মর্যাদার দাবি এবং তাকে ঘিরে সাঁওতাল সমাজের সঙ্গে টানাপোড়েন একটি নতুন সামাজিক জটিলতার জন্ম দিয়েছে। আর তফসিলি শংসাপত্র যাচাইয়ের দাবিতে বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে আদিবাসী তরুণদের উদ্যোগে রেকর্ড ৯২.৪৭ শতাংশ ভোটদানের যে নজির, তা নিছক উৎসাহ নয়, বরং আত্মপরিচয় ও অধিকার রক্ষার এক মরিয়া সচেতনতার প্রকাশ। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী-অধ্যুষিত আসনগুলিতে সমর্থন ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও এই একই পরিচিতিকেন্দ্রিক রাজনীতিরই অঙ্গ।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম ভোটারদের ঘিরেও একই কৌশল সক্রিয়, কেবল বিপরীত দিক থেকে। কখনও তাঁদের ‘তোষণ’-এর একটি অখণ্ড আনুগত্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয়, কখনও আবার একটি ‘নেতিবাচক ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে উপস্থাপন করে বৃহত্তর সমাজের মনে এক অমূলক নিরাপত্তাহীনতা সঞ্চারিত হয়। দুই ক্ষেত্রেই একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনা হয় একটি অনুমানযোগ্য, চিন্তাহীন ভোটযন্ত্রে। অথচ নির্বাচন-ভিত্তিক গবেষণা, যেমন সিএসডিএস-লোকনীতির ধারাবাহিক সমীক্ষা, বারবার দেখিয়েছে যে সংখ্যালঘু ভোটের ধরন অঞ্চল, অর্থনীতি ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে বদলে যায়; কোনও একক, সর্বভারতীয় ছাঁচ সেখানে খাটে না।

ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির গভীরতম সংকট সম্ভবত এখানেই— প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের নামে তা গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাঠামোগত বঞ্চনার শিকড়ে হাত দেয় না। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত গণপরিষদের দীর্ঘ বিতর্কে আম্বেদকর, প্যাটেল বা নেহরুর মতো রাষ্ট্রনির্মাতারা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমতাকেই ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত নির্যাস বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আম্বেদকরের সতর্কবাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সামাজিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই সংখ্যার প্রবন্ধগুলি— লিখেছেন শুভাশিস মৈত্র, শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়, আইরিন শবনম, অপর্ণা ঘোষ, মৌমিতা আলন, অনুক্তা মজুমদার ও ইপিল বাস্কি— সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই নানা দিক উন্মোচন করেছে: নাগরিককে জাত, ধর্ম বা লিঙ্গের আবরণে একটি নিষ্ক্রিয় সংখ্যায় গুটিয়ে না রেখে কীভাবে এক স্বাধীন, সচেতন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা সম্ভব। সেই উত্তর খোঁজার ভার আমরা পাঠকের হাতেই তুলে দিচ্ছি।

অলমিতি…

 

Exit mobile version