দিলীপ ঘোষ
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সরকারি বক্তব্য, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পর্যালোচনাগুলি একত্রে পড়লে মনে হয় জেজেএম-কে কার্যকর করে তোলার সমস্যাটি বহুস্তরীয়। কোথাও কেন্দ্রীয় অর্থছাড়ে বিলম্ব, কোথাও স্থানীয় স্তরে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, কোথাও জটিল ভৌগোলিক পরিস্থিতি, আবার কোথাও আর্সেনিক, লবণাক্ততা বা স্থায়ী জলের উৎসের অভাব— সব মিলিয়েই প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইন তৈরি হলেও নিয়মিত জল পৌঁছচ্ছে না; আবার কোথাও নিরাপদ জলের উৎস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক, প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক নানা সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবই “সব ঘরে জল”-এর লক্ষ্যপূরণের পথকে দীর্ঘতর করে তুলছে
প্রবল গরমে সারা রাজ্যে জলকষ্ট তীব্র দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে তার প্রধান সমাধান জল জীবন মিশন। সম্প্রতি কেন্দ্র এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন করেছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এতে আশা জাগারই কথা। কিন্তু বাস্তব এই যে, এ-রাজ্যে এই কর্মসূচিটি এক গভীর বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে বড় অঙ্কের ব্যয়, অন্যদিকে যৎসামান্য পরিকাঠামো নির্মাণ, অসম্পূর্ণ পরিষেবা। এই মিশন এখন শুধু উন্নয়নের গল্প নয়; এটি প্রশাসনিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি।
রাজ্যের বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিক বা লোহার সমস্যা রয়ে গিয়েছে। কোথাও বাড়ির কাছের টিউবওয়েল অকেজো, বা তার জল ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় মহিলাদের দূর থেকে জল বয়ে আনতে হয়। জল জীবন মিশন (২০১৯) শুরু হয়েছিল প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারের ঘরে কার্যকর নলবাহী জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এখানে “কার্যকর” শব্দটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শুধু বাড়িতে একটি কল বসানো নয়, সেই কলের মাধ্যমে নিয়মিত, পর্যাপ্ত এবং নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছনো এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রান্তিক, জলসংকটে আক্রান্ত এলাকাগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। প্রতি দিন মাথাপিছু অন্তত ৫৫ লিটার ‘নিরাপদ’ পানীয় জল (যা ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস নির্ধারিত নিরাপত্তার শর্ত মেটাতে পারে) সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ এবং জল উৎসের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এ-কাজে গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ রাখতে গ্রামের ‘জল ও স্বাস্থ্যবিধান সমিতি’ বা ‘পানি সমিতি’-কে পরিকল্পনা, নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। কেন্দ্রের ম্যাক্রো ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী রাজ্যে গ্রামীণ পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১.৭৫ কোটি। কিন্তু প্রকল্প পরিকল্পনায় ধরা হয়েছে ২.২৫ কোটি পরিবার। ভবিষ্যতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বসতি বা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই এই বাড়তি সংখ্যা ধরা হয়েছে বলে অনুমান করা যেতে পারে।
কিন্তু এই প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বোঝার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বুঝতে হবে— ‘কমিশনিং’। ‘কমিশনিং’ মানে একটি প্রকল্পকে বাস্তবে কার্যকর জনপরিষেবায় রূপান্তর করা। এর চারটি ধাপ রয়েছে।
এক, সমস্ত সিভিল ও বৈদ্যুতিক কাজ সম্পূর্ণ হওয়া।
দুই, প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে জলের চাপ, প্রবাহ ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই।
তিন, অন্তত ১৫ দিন পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্প চালানো (ট্রায়াল রান), যেখানে নিয়মিত জল সরবরাহ ও জলের গুণমান পরীক্ষা করা হয়।
এবং শেষ ধাপ, গ্রামসভার অনুমোদন ও গ্রাম পঞ্চায়েতের হাতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হস্তান্তর।
অর্থাৎ, ‘কমিশনিং’ মানে শুধু নির্মাণ শেষ হওয়া নয়; মানুষের ঘরে বাস্তবে নিয়মিত জল পৌঁছনো শুরু হওয়া।
জেজেএম ড্যাশবোর্ডের পিএম-১৮ ফরম্যাটের ২০২৬ সালের ১০ জুনের তথ্যে দেখতে পাচ্ছি ভারতের ৩২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে জল জীবন মিশনের ৬,৩৮,৫৫০টি পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পের মধ্যে ৩,৫৭,৮৪৬টি প্রকল্পের পরিকাঠামোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ২,১৮,৩৩৮টি— অর্থাৎ চলমান ও সম্পন্ন সমস্ত জেজেএম প্রকল্পের ৩৪.১৯ শতাংশ— আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। আরও ৮৬,৭৩১টি প্রকল্প আর্থিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে, এবং ২,৮০,৭০৪টি প্রকল্পের পরিকাঠামোর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে।
তথ্যটি অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক চিত্রও তুলে ধরে। অসম্পূর্ণ পরিকাঠামোর ২,৮০,৭০৪টি প্রকল্পের মধ্যে ২,৩৪,১৪৪টিতে এখনও নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি, ৭,০৩৪টিতে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও বিদ্যুৎ সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে, ১৫,০২৭টিতে নির্মাণ ও বিদ্যুৎ সংযোগ দুটোই সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু ট্রায়াল রান বাকি, এবং ২৪,৪৯৯টি প্রকল্প তিনটি ধাপই পেরিয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। কর্নাটক এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— সেখানে ১০,৭১৫টি প্রকল্প নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ট্রায়াল রান সম্পন্ন করেও আনুষ্ঠানিক চালুকরণের অপেক্ষায় রয়েছে, যা কোনও প্রশাসনিক বাধার ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ (৪,৮৬০) ও মহারাষ্ট্র (৩,৩৬০)-তেও এই চূড়ান্ত পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প আটকে রয়েছে।
এবার পশ্চিমবঙ্গের প্রকল্পগুলির গভীরে দেখা যাক। এ রাজ্যের জেলাগুলিতে অনুমোদিত ১০,১২৪টি জল সরবরাহ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৩৬৫টি কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছে এবং বাস্তবে কার্যকর বলে যাচাই করা হয়েছে। অর্থাৎ কমিশনিংয়ের হার মাত্র ৩.৬ শতাংশ। এর অর্থ, বহু ক্ষেত্রে পরিকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়ে প্রকল্পকে ভৌতভাবে সম্পন্ন বলে ঘোষণা করা হলেও সেগুলির অধিকাংশ এখনও চালু হয়নি এবং গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য কার্যকর করা যায়নি।
রাজ্যস্তরে প্রায় ৯.৩৫ মিলিয়ন বা ৯৩.৫ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারের নামে নথিভুক্ত কলের জলসংযোগ রয়েছে, যা মোট পরিবারের প্রায় ৫৩ শতাংশ। কিন্তু এত অল্প সংখ্যক প্রকল্প কমিশনপ্রাপ্ত হওয়ায়, এই সংযোগগুলির একটি বড় অংশের পিছনে এখনও নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত জল সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে নদিয়া নিঃসন্দেহে সবচেয়ে এগিয়ে। জেলার মোট ৭৬৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৮২টি কমিশনপ্রাপ্ত ও যাচাইকৃত, অর্থাৎ কমিশনিংয়ের হার প্রায় ২৪ শতাংশ। সেই সঙ্গে ৮৮ শতাংশ পরিবারে কলের জলসংযোগ পৌঁছে দিয়ে নদিয়া রাজ্যের শীর্ষস্থানও অধিকার করেছে। উত্তর দিনাজপুর ৪৩টি কমিশনপ্রাপ্ত প্রকল্প নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, যা জেলার মোট প্রকল্পের প্রায় ১১ শতাংশ। তবে সেখানে গৃহস্থালি কভারেজ মাত্র ৪০ শতাংশ, যা রাজ্যের গড়ের তুলনায় অনেক কম। দক্ষিণ দিনাজপুরে ১৮টি কমিশনপ্রাপ্ত প্রকল্প রয়েছে (মোটের ৫.৬ শতাংশ) এবং সেখানে ৫০ শতাংশ পরিবারের কাছে জলসংযোগ পৌঁছেছে, যা রাজ্যের গড়ের কাছাকাছি। পূর্ব মেদিনীপুরে ৫৬টি কমিশনপ্রাপ্ত প্রকল্প রয়েছে— সংখ্যার বিচারে যা রাজ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ— এবং জেলার কমিশনিং হার ৭.২ শতাংশ, গৃহস্থালি কভারেজ ৫৫ শতাংশ। হাওড়া ও দার্জিলিংয়ে ৯ থেকে ১১টি কমিশনপ্রাপ্ত প্রকল্প রয়েছে; উভয় জেলার কমিশনিং হার ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে।
রেখচিত্র ১: পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে কমিশন করা জেজেএম প্রকল্পগুলির শতকরা হার
বাকি জেলাগুলির চিত্র অনেক বেশি উদ্বেগজনক। ১৩টি জেলায় ১ শতাংশ প্রকল্পও কমিশনপ্রাপ্ত হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে জনবহুল ও বৃহৎ জেলা যেমন বাঁকুড়া, বীরভূম, কোচবিহার, হুগলি, মুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান। এই জেলাগুলিতে যে জলসংযোগগুলি বর্তমানে রয়েছে, সেগুলি হয় পুরনো পরিকাঠামোর মাধ্যমে চলছে, নয়তো এমন প্রকল্পের উপর নির্ভর করছে যেগুলি কাগজে-কলমে সম্পন্ন হলেও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনপ্রাপ্ত হয়নি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা, যেখানে মোট ব্যয় ৪,৫৫০ কোটিরও বেশি— রাজ্যের সর্বোচ্চ— সেখানে ৫০ শতাংশ পরিবারের কাছে সংযোগ পৌঁছলেও একটি প্রকল্পও কমিশনপ্রাপ্ত হয়নি। এটি ব্যয় এবং বাস্তব পরিষেবা প্রদানের মধ্যে একটি বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।
সামগ্রিকভাবে চিত্রটি স্পষ্ট করে যে কমিশনিং— অর্থাৎ প্রকল্পকে বাস্তবে চালু করে কার্যকর পরিষেবায় রূপান্তরিত করার শেষ ধাপ— এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। নির্মাণ কমিশনিংয়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ এগিয়ে রয়েছে (৯৬৫টি পরিকাঠামো সম্পন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ৩৬৫টি কমিশনপ্রাপ্ত প্রকল্প)। তদুপরি, ভৌতভাবে সম্পন্ন প্রকল্পের সংখ্যাও মোট প্রকল্পের ১০ শতাংশের কম।
ফলে কমিশনিংয়ের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়া পর্যন্ত ৫৩ শতাংশ গৃহস্থালি কভারেজের সরকারি পরিসংখ্যানটি মূলত সংযোগ প্রদানের হিসাব তুলে ধরে, নির্ভরযোগ্যভাবে জলপ্রবাহের নিশ্চয়তা নয়।
নিচের রেখচিত্র ২ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জল জীবন মিশন (JJM)-এর সম্পন্ন ও চলমান প্রকল্পগুলির মধ্যে কতগুলি চালু করা হয়েছে তার শতাংশ দেখাচ্ছে।
রেখচিত্র ২: ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জল জীবন মিশন (JJM)-এর সম্পন্ন ও চলমান প্রকল্পগুলির মধ্যে কতগুলি চালু করা হয়েছে তার শতাংশ
ভারতের জাতীয় গড় ৩৪.১৯ শতাংশ। বিহার ৯৮.৬৮ শতাংশ নিয়ে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে, তারপরেই রয়েছে গোয়া (৯৫.৩১ শতাংশ) ও পাঞ্জাব (৯১.২০ শতাংশ)। অন্যদিকে, মণিপুর (১.০৩ শতাংশ), পশ্চিমবঙ্গ (৩.৫৭ শতাংশ) ও উত্তরপ্রদেশ (৪.৫৯ শতাংশ) তালিকার একেবারে নিচে অবস্থান করছে। প্রায় অর্ধেক রাজ্য জাতীয় গড়ের নিচে রয়েছে, এবং সেরা ও সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া রাজ্যের মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধান সারা দেশে এই মিশন বাস্তবায়নে গভীর অসমতার চিত্র তুলে ধরে।
নিচের রেখচিত্র ৩-এ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জল জীবন মিশন (JJM)-এর চলমান প্রকল্পগুলির মধ্যে যেগুলির পরিকাঠামো সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়নি, তার শতাংশ তুলে ধরা হয়েছে।
রেখচিত্র ৩: ভারতের রাজ্যগুলিতে জল জীবন মিশন (JJM)-এর সম্পন্ন কিন্তু এখনও চালু না হওয়া প্রকল্পের শতাংশ (২০২৬ সালের ১০ জুন পর্যন্ত)
জাতীয় গড় ২১.৮৫ শতাংশ। মেঘালয় (৫২.৮৬ শতাংশ) ও সিকিম (৪৬.৪৫ শতাংশ) তালিকার শীর্ষে রয়েছে, অর্থাৎ এই রাজ্যগুলিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রকল্প সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও চালু হয়নি। এরপরেই রয়েছে উত্তরপ্রদেশ (৪১.২২ শতাংশ), লাক্ষাদ্বীপ (৪০.০০ শতাংশ) ও মণিপুর (৩৯.৯৭ শতাংশ)। অন্যদিকে, বিহার (০.৬৬ শতাংশ), আন্দামান ও নিকোবর (২.৫০ শতাংশ) এবং পাঞ্জাব (৪.৩৮ শতাংশ) এই তালিকার একেবারে নিচে, যা ইঙ্গিত করে যে এই রাজ্যগুলিতে সম্পন্ন প্রকল্পগুলি দ্রুত চালু করা হয়েছে। জাতীয় গড়ের উপরে থাকা রাজ্যের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, এবং শীর্ষ ও তলানির রাজ্যগুলির মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান দেশজুড়ে প্রকল্প চালুকরণের গতিতে বড় তারতম্যের ছবি তুলে ধরে।
মানতেই হবে, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা উ্দ্বেগজনক। সমস্যা অর্থের না প্রকল্প ব্যবস্থাপনার, আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের না বিদ্যুৎ সংযোগের, ঠিকাদারি কাঠামোর না স্থানীয় প্রশাসনিক সক্ষমতার, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। না হলে বাড়তি টাকা ঢেলেও লাভ হবে না।
জল জীবন মিশন-এর জল সরবরাহ শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থাটি পঞ্চায়েতকে হস্তান্তর করার কথা। পঞ্চায়েত এই জল সরবরাহের তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্রামভিত্তিক দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরি করবে। পশ্চিমবঙ্গের তিন হাজারেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েতের কয়েক হাজার কাজ তৈরি হতে পারে— পাম্প অপারেটর, কলের মিস্ত্রি, পাইপলাইন মেরামত কর্মী, জলমান পরীক্ষক, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী, ডিজিটাল রিপোর্টিং সহায়ক ও গ্রামভিত্তিক পরিষেবা সমন্বয়কারী। এ ছাড়া থাকবেন প্রশিক্ষক, ব্লকস্তরের প্রযুক্তিগত সহায়ক, পর্যবেক্ষক (মনিটরিং) কর্মী। এই কর্মসূচি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেয়, তাই এটি মেয়েদের কাজ তৈরি করতে পারে। কার্যসূচি বলছে, জলের জন্য গ্রামবাসীদের থেকে সামান্য কিছু মূল্য নিয়মিত নেওয়া হবে, এবং তার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ বাবাদ প্রাপ্য গ্রান্ট থেকেই এই কর্মীদের টাকা দেওয়া হবে। প্রকল্পের ড্যাশবোর্ড থেকে এটা বোঝার উপায় নেই যে কমিশন হওয়া প্রকল্পগুলি সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতকে হস্তান্তরিত করা হয়েছে কি না, এবং সেগুলো চালানোর জন্য কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে কি না।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই প্রকল্পের পরিসর বিশাল। ২০১৯ সাল থেকে এতাবৎ পশ্চিমবঙ্গে জল জীবন মিশনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮,৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রের অংশ ১৩,৩১৩ কোটি এবং রাজ্যের ব্যয় ১৫,১০১ কোটি। বিশেষত ২০২২-২৩ সালের পর থেকে ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়েছে; বছরে ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ খরচ হয়েছে (সারণী ১ দ্রষ্টব্য)।
সারণী ১: পশ্চিমবঙ্গে জল জীবন মিশনের জন্য ব্যয় (টাকা লক্ষে; জেজেএম ড্যাশবোর্ডের ফরম্যাট C33 অনুযায়ী
| Format C33 of JJM Dashboard : Expenditure (In Rs. Lakhs) for Piped Water Schemes _WB | |||
| আর্থিক বর্ষ | কেন্দ্র | রাজ্য | মোট |
| 2019-20 | 58,471.444 | 43,619.056 | 1,02,090.497 |
| 2020-21 | 1,16,038.215 | 61,491.295 | 1,77,529.510 |
| 2021-22 | 1,48,077.600 | 68,987.969 | 2,17,065.567 |
| 2022-23 | 1,80,200.447 | 3,06,396.382 | 4,86,596.828 |
| 2023-24 | 4,87,144.907 | 5,00,162.795 | 9,87,307.702 |
| 2024-25 | 2,92,772.407 | 4,81,856.341 | 7,74,628.746 |
| Total | 12,82,705.02 | 14,62,513.84 | 27,45,218.85 |
| 2025-26 | Nil | Nil | |
| 2026-27 | Nil | Nil | |
কিন্তু এত বিপুল বিনিয়োগের পরেও গত দেড় বছরে বাস্তব অগ্রগতি কার্যত থমকে রয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সরকারি বক্তব্য, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পর্যালোচনাগুলি একত্রে পড়লে মনে হয় জেজেএম-কে কার্যকর করে তোলার সমস্যাটি বহুস্তরীয়। কোথাও কেন্দ্রীয় অর্থছাড়ে বিলম্ব, কোথাও স্থানীয় স্তরে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, কোথাও জটিল ভৌগোলিক পরিস্থিতি, আবার কোথাও আর্সেনিক, লবণাক্ততা বা স্থায়ী জলের উৎসের অভাব— সব মিলিয়েই প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইন তৈরি হলেও নিয়মিত জল পৌঁছচ্ছে না; আবার কোথাও নিরাপদ জলের উৎস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক, প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক নানা সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবই “সব ঘরে জল”-এর লক্ষ্যপূরণের পথকে দীর্ঘতর করে তুলছে। এই কারণেই হয়তো এখন কেবল নতুন প্রকল্প ঘোষণা বা ব্যয় বাড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে এমন এক বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তগ্রহণ ব্যবস্থা, যা প্রতিটি অঞ্চলের বাস্তব সমস্যাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তার উপযোগী সমাধান তৈরি করতে পারে।

