Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভিড়ের লেখক থেকে নির্জনতার পাঠক : নির্বাসিতের ডায়েরি

বই

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

গুগুলবাবার ম্যাপ অবতার বলল, ৫৪৯২ কিলোমিটার দূরে আছি। এটাই কলকাতা থেকে আদ্দিস আবাবার দূরত্ব। তা হোক। আপাতত শুক্রবার সন্ধেতে ত্রাতোরিয়া গুস্তো নামের অসামান্য রেস্তোরাঁ, আমার হোটেলের ঠিক তলাতেই যা, সেখানে চীৎকারের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। সান্ধ্য ফুর্তি, গান, হল্লা, উইকেন্ডের আনন্দ যাপনের। তরুণ তরুণীদের গলা। এই ত্রাত্তোরিয়া, যে কথাটার মানেই হল গে “ইতালিয়ান রেস্তরা” ফুলে ফেঁপে ওঠে লাঞ্চ টাইমে। এখানে ইউনাইটেড নেশন্স এর সব ছেলেপিলে কর্মরত কর্মরতাদের আড্ডা হয় লাঞ্চে। আবার রাতেও, কাছাকাছি নানা হোটেলে, অ্যাপার্টমেন্টে বাসা ভাড়া নেওয়া কর্মীদল এসে আড্ডা জমায়। নিঃসঙ্গ, পরিবারহীন, আফ্রিকা পোস্টিং-এর একমাত্র সুখ এইই। শুক্রবার আর শনিবার গান বাজনা করা। পার্টি করা। ত্রাত্তোরিয়ার পিৎসা চমৎকার। তেমনি চমৎকার হল এদের দ্বিপ্রাহরিক বুফে। সেখানে পাস্তা থাকে আবার চাইনিজ মাছের পদ থাকে। থাকে ইথিওপিয়ার ইনজেরা আর তার সঙ্গে আমাদের কালি দালের মত মুখরোচক ঘন লেনটিলস। বাঁধাকপির শুকনো তরকারি আর অসংখ্য রকমের স্যালাড।

ত্রাত্তোরিয়ার সামনেই আজ দেখলাম একটা চাকা লাগানো সরু ঠেলাগাড়িতে আমহারিক ভাষায় লেখা বই বিক্রি করছে এক কৃষ্ণবর্ণ কৃশকায় যুবক। সেদিন দেখেছি ট্রাফিক সিগনালে বই বিক্রি হচ্ছে। অক্ষরগুলো আমহারিক, কিন্তু বইগুলো পেপারব্যাক, সস্তা, একেবারে আমাদের উইলারে বিক্রি হওয়া বইয়ের মত। ট্রেনে বই বিক্রি হয় না? সেরকম। জাত্যাভিমান নেই, সাধারণ মানুষের ভালোবাসার ছাপ আছে।

আমাদের বেড়াতে নিয়ে গেল যে ড্রাইভারটি, সে বলল সে খুব বই পড়ে। কী কথায় বলল কে জানে। গাইড, ড্রাইভার, এখানে এরা অসম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ, হাসিমুখ, বিনয়ী। আর প্রচুর কথা বলে আমাদেরই মত। সিনেমায় শাহরুখ আর অক্ষয় কুমার প্রিয়। আর বইয়ের মধ্যে নভেল প্রিয়। লাভ স্টোরিজ।

আমহারিক ভাষায় কারা লেখেন? তাঁদের বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে নাম ওঠেনি হয়ত। তৃতীয় বিশ্বের লেখক ইংরেজিতে লিখলে পাত্তা পান। তাই নাম হয়েছে কানাডাবাসী নেগা মেজলেকিয়া অথবা আমেরিকাবাসী হাইলে গেরিমার। তবু অক্ষর আর বই আর সস্তা ছাপা পেপারব্যাকের গন্ধ আমাকে ভুলিয়ে দেয় এখন কলকাতায় চলছে অমুকতম কলকাতা বইমেলা।

এ বছর বইমেলা যাওয়া হল না। সারাজীবনে কতবার বইমেলা গেছি? হিসেব ত নেই কোনও। বেঁচে থাকার প্রায় শুরু থেকে। যখন বছর দশ, তখন থেকে, বইমেলা আমাদের জীবনের অঙ্গ। আমার বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বইমেলাও বড় হয়ে উঠল।

একেবারে ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, বইমেলায় যাওয়া আমার কাছে তীব্র এক চাপের বিষয় ছিল। বেড়ে ওঠার মুহূর্তে রাশি রাশি বইয়ের সঙ্গে কাটিয়েছি যা সব আমার নিজস্ব। হাতে ধরা ছোঁয়া প্রিয়, প্রতি পাতা নেড়ে দেখা। গন্ধ শোঁকা। পুরনো বই, নতুন বই, ইংরেজি বইয়ের গন্ধ, সব আলাদা আলাদা। সেই একান্ত ব্যক্তিগত অসামাজিক সম্পর্ক আমার বই নামক বিষয়টির সঙ্গে। আর বইমেলা মানে বিশাল লোকসমাগমের মধ্যে, পুরো সমাজের মধ্যে, বই এর পর বইকে দেখা। বই হঠাৎ তখন আমার কাছে হয়ে উঠছে নৈর্ব্যক্তিক। আমি বুঝতে পারছি আমার মায়ের নির্ধারিত, একটা আলমারির কয়েকটা তাকে “বাচ্চাদের বই” যেখানটায় আছে, যেখানে লীলা মজুমদারের কানভাঙা দিন দুপুরে আর সত্যজিতের মলাট খুলে আসা এক ডজন গপ্পো কেতরে শুয়ে আছে, আম আঁটির ভেঁপুর সবুজ কালো মলাটটা বা প্রাইজে পাওয়া বই দেশ বিদেশের উপকথা এ ওর ঘাড়ে হেলান দিয়ে বসে আছে, এই সব চেনা চেনা বন্ধু বইয়েদের বাইরেও আরো হাজার হাজার বই আছে। যেমন এ পৃথিবীতে আমি ছাড়া আরও হাজার হাজার পাঠক আছে।

এতদিন আমার ভুবনে আমি ও আমার ওইকটা বই ছিল। এক ছিলাম। বহু হলাম। তার কি চাপ কম? সেই রবীন্দ্র সদনের উল্টোদিকের বইমেলায় হঠাৎ যেন আমি হারিয়ে যাই, যেন আমার হঠাৎ বাথরুম পেতে থাকে। টেনশনে পেটের ভেতর মোচড় দেয়।

উল্টোটাও হয়, মাকে বললাম ওরিয়েন্ট লংম্যানে যাব, লাইন দিয়ে ঢুকলাম, কিন্তু প্রতি বই টানলেও বাজেটে যদি না কুলোয় ভয় পেলাম। দাম শুনে মা ভুর কুঁচকোলেন। তারপর বললেন পড়বি ত, তাহলে ঠিক আছে। কিনে দিলেন। হয়ত সে বই বুকে জড়িয়ে বেরিয়ে আসার মধ্যে এক ভয়ানক আনন্দের ঘনঘটা ছিল।

আরও বড় হবার পর, বই দেখতে দেখতে চেনা বেরনো, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবার অবাক আনন্দ ছিল। প্রেসিডেন্সির বন্ধু, কলেজ স্ট্রিটের বন্ধু, ইলেভেন টুয়েলভের বন্ধু ইশকুলের বন্ধু। চেনা বেরনোর আনন্দ, কফি হাউজে কফি আর পকোড়ার আনন্দ। ভাবলেই, বিশ্রী সেই চিলি সসের গন্ধটাও আসে আমার মাথায়, এখুনি এল।

এখন, শুধু চেনা আর চেনা। স্টল হপিং। লেখকদের দূর থেকে দেখার সুখ নেই। নিজেকে লেখক ভেবে মাথা ফুলে ঢোল। শুধু বন্ধুদের দেখা দেওয়া। আমি আসছি আজ, কে কে থাকছ, বলে ঘোষণা। সেলফি। হি হি হি। দাঁত চোয়াল সবকিছু ব্যথা।

বইয়ের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক নেই। পড়ার সঙ্গে তীব্র আশ্লেষ হারিয়েছে। শুধু “অমুক স্টলে গেছে? আমার বইটা দেখলে” বলব আদেখলার মত আর সই দিতে চাইব? এসব কতদিনের? ক বছরের? আদৌ এই সব ক্রিয়াকলাপের কোনও রিমঝিম মূর্ছনা কি আছে? গোঁ গোঁ করে উত্তেজনার ভেতর চলে যাচ্ছে জীবনের একটা বইমেলা থেকে আরেকটা বইমেলা, কটা বই বেরল এবার? বলতে বলতে?

এ বছর দূরে থাকা ভাল। টীকা নেওয়া ভাল। কাজে বাইরে যাওয়ার বাধ্যতা ভাল। অমুকদা আর তমুকদার সঙ্গে দেখা হলেই সেলফি নেওয়া আর পোস্ট করার প্রয়োজন নেই এ বছর। বাঁচা গেছে। অনেকের বই পাওয়া, আর তারপর সারা বছর সেগুলো পড়ে না পড়ে ফেলে রাখা, আর মাঝে মাঝে তাদের তাগাদা, আমার বইটা পড়লেন, দিদি, আমার বই নিয়ে একটা ফেসবুক পোস্ট দিন না… শোনার থেকে এক বছর বিরতি থাকা ভাল।

ফিরে গিয়ে বইমেলা পাব না, কলেজ স্ট্রিট ত থাকবে। পরিকল্পনা করে কেনা যাবে কটা বই। আর মনে করা যাবে, দূর কোন ইথিওপিয়ান গ্রামের ঝকঝকে শানবাঁধানো ইশকুলে গরিব ছেলেরা বই খুলে পড়ছে… এই দৃশ্যটার আলাদা করে মানে আছে। টাটা সুমো চালায় যে যুবক সে প্রেমের উপন্যাস পড়ছে আমহারিক ভাষায়। বই ও সে, দুজনে এক নিবিড় একান্ত নির্জন সম্পর্কে সম্পর্কিত থাকছে ত কোনওভাবে।

যেমন আমি থাকছি। প্রচুর কাজের মধ্যে মাথা ফেটে যাচ্ছিল যেদিন, সেদিন আমার লেখক বান্ধবী বলেছে, লীলা মজুমদার নিয়ে যাওনি? হঠাৎ মনে পড়ল ল্যাপটপে পিডিএফে বাংলা বলতে দু তিনটে বই আছে। শরদিন্দু অমনিবাস… আর, হ্যাঁ অনীশ দেব সম্পাদিত সেরা কল্পবিজ্ঞান। আশির দশকে প্রকাশ পেয়েছিল।

পড়তে বসে যাই। জগদীশচন্দ্র বসুর পলাতক তুফান… লীলা মজুমদারের ব্যাঘ্রবিজ্ঞান… আরও কত, কত, চেখে চেখে পড়ার মত লেখা। সিদ্ধার্থ ঘোষের মহাশূন্যের মণিমুক্তো। হাড়কাঁপান ডিসটোপিয়া।

এতদিনে বইটা আমার তন্ন তন্ন করে পড়া হল। এতদিনে!!!

নির্জনতা ভাল। পাঠকের। আবার সেই ছোট্টবেলার মত।