Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যা আমার কেউ নয়, যা আমার সবটুকু ছিল

শিলাবতী

শুভদীপ চক্রবর্তী

 

নদীর নাম শিলাবতী

ট্রেন চলেছে সারা রাত। সকালে ট্রেন থেকে নেমেই কেঁপে গেলাম প্রায়। এটা কেমন ঠান্ডা! বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে গরম চা’য়ের কাপ চেপে ধরে আছি হাতে। তাও সাড় নেই বিশেষ। পুরুলিয়া। এ কেমন জনপদ! এ কেমন ভাষা! “দাদা, মানবাজার-পুঞ্চার বাস?” দিকনির্দেশ হয়ে যায়। টিকিট কেটে বলি, জানালা দেখে দিও! বরাবর উইন্ডো সিটের লোভ আমার। তাই দেয়। টাউন থেকে আরও প্রায় ৫০ বা ৫৫ কিলোমিটার দূর। শহর পেরোতেই বিজাতীয় বাসের হর্নের শব্দে কেটে কেটে যায় সামনের কুয়াশা। জানুয়ারির সকাল। সবুজ জমির উপর থিকথিকে মেঘ। সারা রাতের জার্নি, চোখ টেনে ধরে কখন যেন। তারপর যেখানে নামাল বাস, কে জানত এখানেই একলা অগোছালো সংসার তৈরি হয়ে যাবে বেশ কয়েক বছরের জন্য? কেই বা জানত, শিকড় গেঁথে যাবে এইভাবে?

ছোট করে বললে, কাজটার নাম ‘রুরাল মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট’। যাঁদের নিয়ে কাজ, যাঁদের সঙ্গে কাজ, তাঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে সোশ্যাল ম্যাপিং করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কারণ আমি তো কিছুই জানি না। তো সেটা করতে গিয়ে তক্ষুণি যেটা চোখ টানল, সেটা হল শিলাই নদী আর পাকবিড়রার জৈন মন্দির। শিলাই নদী, যার ভাল নাম শিলাবতী। সেই শিলাবতী-র উৎস এই এলাকাতেই! অঞ্জনদা’র বাইকে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। মিনিট দশেকের পথ। একটা নদী কোথা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে সেটা দেখব, এরকম অভিজ্ঞতার সাধ বা সৌভাগ্য তো আগে হয়নি কখনও!

কিন্তু হতাশ হলাম। জল কই? এ তো রুক্ষ এক পাথুরে গর্ত! ফোঁটা ফোঁটা জল যেটা পড়ছে, তার রং আবার কালো। কাদা কাদা প্রান্তর। কোথায় নদীর জন্মমুহূর্তের সেই উচ্ছ্বলতা? ভুল ভাঙাল অঞ্জন দা। ওখানে বর্ষা ছাড়া সারা বছরই এইভাবে ধারাস্নান হয়ে যায়। এরকম ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তেই থাকে সারা বছর। আর ফল্গু ধারাটা বইতে থাকে ভিতরে ভিতরে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বইতে বইতে শিলাবতী পৌঁছে গিয়েছে তারপর বাঁকুড়া হয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর। এবড়ো-খেবড়ো রাঢ়ভূমি পেরিয়ে শেষে স্থিতি পেয়েছে সমতলে এসে।

প্রকৃতিই ঈশ্বর এই সব অঞ্চলগুলিতে। নদীর উৎস থেকে খানিক পিছিয়ে এসে রাস্তার ধারেই বিস্তৃত সবুজ মাঠে শিলাবতী মায়ের মন্দির। আড়ম্বর নেই। তবে ভক্তি আছে। এই মন্দিরে কিছু চাইলে নাকি সেই চাওয়া বিফলে যায় না। এই নদীর নামেই প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে বসে মেলা এখানেই। নাম শিলাই মেলা। কৃষিজীবী মানুষগুলোর হপ্তাখানেকের জন্য আনন্দে মেতে থাকার মেলা। …যেখানে আমি আগের বছরও গিয়েছি। …যেখানে আমার আর যাওয়া হবে কি না, জানা নেই আমার।

যাই হোক, ফেরা যাক ফ্ল্যাশব্যাকে। বাঁকুড়া জেলায় শিলাবতী-র অন্যতম প্রধান উপনদী হল জয়পান্ডা। এই নিয়ে গল্প শোনা গেল চা’য়ের দোকানে। ওই যে, লোভী মন। কিছুতেই ওঠা গেল না এইসব গল্প ছেড়ে।

প্রাচীন এক তপোবন। মহাজ্ঞানী এক ঋষির আশ্রমও সেখানে। সেই ঋষিরই কন্যা শিলাবতী। অপরূপ রূপসী। অসামান্যা মেধাবী। কিন্তু অকালে মাতৃহীনা কন্যাটির সব দায়-দায়িত্ব এসে পড়ে ঋষির কাঁধে। এদিকে টোলে পাঠ দান আছে। আছে শয়ে শয়ে শিষ্য। অগত্যা কন্যাকেও নিজ টোলেই বাকিদের সঙ্গে শিক্ষা দিতে লাগলেন ঋষি। দিন যেতে লাগল। বড় হতে লাগল শিলাবতী। এর মধ্যেই একদিন ঋষি উদাত্ত কণ্ঠে ব্যাখ্যা করছেন শাস্ত্র, দরজায় এসে দাঁড়াল এক সৌম্য দর্শন যুবক। পাঠে ছেদ পড়ল। কী যেন একটা হল শিলাবতী-র মধ্যেও। কে এই যুবক?

ঋষির পাঠে মুগ্ধ হয়ে সুদূর মিথিলা থেকে ছুটে এসেছে যুবক জয়পান্ডা। তারপর থেকে গিয়েছে ওই আশ্রমেই বাকি শিষ্যদের সঙ্গে। বছর ঘুরেছে। শিলাবতী-র সেদিনের মুগ্ধতা দৃঢ় হয়েছে আরও। একে অপরের প্রেমে পাগল জয় ও শিলাবতী। কিন্তু তাও কিছুতেই জয়ের ডাকে কেন যেন সাড়া দেয় না শিলা! কেন যেন আসতে চায় না তার সঙ্গে মিথিলায়। কিন্তু জয়কেও যে ফিরতে হবে। অবশেষে শিলাবতী কান্নায় ভেঙে পড়ে জয়ের সামনে। এই বৃদ্ধ পিতাকে ছেড়ে কী করে যাবে সে? জয় নিরুপায়। শিলাকে ছাড়া ফেরা সম্ভব নয়। গুরুর পা’য়ে গিয়ে পড়ে। শিলাবতী শুনতে পায় বাবা বলছেন, “তুমি যোগ্য পাত্র। নিয়ে যাও ওকে। তবে আর আমার সামনে এনো না। হৃদয় স্নেহের কাঙাল।” আচমকা চরাচর ভেঙে যায় নিক্কনের শব্দে। শিলাবতী শুনে ফেলেছে সব! শিলাবতী দৌড়চ্ছে পিতার কথা শুনে। শিলাবতী-র খুব অভিমান জয়ের প্রতি।

জয়ও দৌড়তে থাকে শিলাবতী-র পিছনে। অবশেষে যখন শিলাবতী প্রায় হাতের নাগালে, তখনই হঠাৎ জলের স্রোত হয়ে ভেসে যায় শিলাবতী। চিৎকার করে ওঠে জয়পান্ডা। শিলাকে ছাড়া যে সেও অন্ধ! নিজেও সে একটা স্রোত হয়ে যায় অতঃপর। কিন্তু একি! এত বালি! এত বালি কেন আসছে জয়ের সামনে! আটকে দিচ্ছে ওকে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না ও! কোথাও পৌঁছতে পারছে না!

সেই থেকেই পাশাপাশি শুয়ে আছে শিলাবতী ও জয়পান্ডা। শুধু বর্ষার সময়েই আর কোনও বাঁধা আটকাতে পারে না ওকে। সব বাঁধা ভাসিয়ে দেয় জয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে শিলাবতী-র বুকে। শাঁখ বাজে দুই পাড়ে। রব ওঠে, ‘সামাল সামাল’।

ফোঁটা ফোঁটা জল প্রায় দেখাই যাচ্ছে না চোখে। অথচ এটাই শিলাই নদীর উৎস স্থল!

শিলাই নদীর উৎস স্থান সংলগ্ন অঞ্চলে শিলাবতী মায়ের মন্দির

 

পাকবিড়রা

বেলা পড়ে আসছে। গরম হাওয়াটা মরে গিয়ে কেমন একটা হালকা আরাম উষ্ণতা ভেসে আসছে রাস্তা পেরিয়ে ওপাশের জঙ্গলটা থেকে। প্লাস্টিকের ফুটবলটায় লাথি মেরেই তার পিছনে দৌড়োচ্ছে নিচু চালের বাড়িটার ঝুঁটি বাঁধা বাচ্চা দু’টো। চা’য়ের দোকানে বেশ জমজমাট ভিড়। আর পেটের ভিতর মাথার উপর মানুষ ভরে নিয়ে বাসটা ধুলো উড়িয়ে চলে যেতেই অঞ্জনদা’র দেখা পাওয়া গেল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। পাকবিড়রা যাব!

এ এক অদ্ভুত জায়গা। ধর্ম ধর্ম নিয়ে এতকিছু হচ্ছে চারপাশে। হয়েই চলেছে কত কত যুগ ধরে। অথচ এখানে যেন সেই সবকিছু অন্য কোনও পৃথিবীর ঘটনা। শুনেছিলাম, মানভূম-এ একসময় জৈন ধর্মের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তাই বর্তমান পুরুলিয়া জেলার বেশ কিছু জায়গায় নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তার। পাকবিড়রাও সেরকম একটা গ্রাম। কাঁকড়মাখা লাল মাটির পথে ধুলো উড়িয়ে চলেছে বাইক। পিছনে বসে চশমাটা তুলে দিলাম কপালের উপরে। বেশ কয়েক কিলোমিটারের রাস্তা। অবাক হলাম যে পাকবিড়রা গ্রাম থেকে পুঞ্চা ব্লক বা বাজার অবধি এই এতটা দূরত্ব প্রায় দিনই পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করেন বেশ কিছু মানুষ! যাই হোক, কী যে হয় মাঝে মধ্যে, ধর্মস্থানের কথা লিখতে গিয়েও, সেই মানুষের কথাই উঠে আসে। …পৌঁছনোর বেশ আগে থেকেই মন্দিরগুলোর মাথা দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত একটা স্থাপত্য। তবে অবাক হওয়ার বাকি ছিল আরও!

যাওয়ার আগে শুনেছিলাম, পাকবিড়রাকে বলা হয় ‘পুরুলিয়ার জাদুঘর’। গিয়ে বুঝলাম তার কারণটা। ওই মন্দিরগুলোর আসল নাম, দেউল। একসময় অন্যতম প্রধান জৈন তীর্থক্ষেত্র ছিল এই পাকবিড়রা। তবে এখন সাকুল্যে তিনটি দেউল অবশিষ্ট আছে আর। তবে প্রাকৃতিক কারণে তা নষ্ট হয়েছে, সেটা মানতে পারা কষ্টকর। কারণ বাকীগুলোও তাহলে অবশিষ্ট থাকত না। জাতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটা দায়সারা সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। কিন্তু তাতে যে গুরুত্ব দেওয়ার কথা লেখা আছে, তা ওই দফতরের লোকেরাই বিশ্বাস করলে, নিদেনপক্ষে প্রাথমিকস্তরের কিছু সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হত নিশ্চই। নইলে মানুষের লোভ থেকে ধর্মও যে নিস্তার পায় না, তা খালি চোখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে!

কত পুরনো হবে এই সব দেউল? কোনও সিমেন্ট নেই। শুধু পাথরগুলো একের উপর এক বসানো। কী ভাবে বসানো হল এগুলো? কী জানি। এইসব বিজ্ঞান আশ্চর্যই করে। পরে খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, দেউলগুলি কম করে হলেও ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো! ৫০০ বছরেরও পুরনো ইতিহাস এমন অবহেলায় রুক্ষতায় পড়ে আছে! আলতো হাত রাখি পাথরগুলোর গায়ে। হু হু হাওয়া দিচ্ছে একটা। জুতোটা খুলে রেখেছি গাছের নীচে। কোনও ভয় নেই। কেউ নেবে না। দেউলগুলোর ভিতরটা অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের থেকেও কালো পাথরে তৈরি দেউলগুলির ভিতরে রাখা জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি। অঞ্জনদা বলল, “বাইরের বড় মূর্তিটা দেখলে?” বাইরে বেরিয়ে পিছন দিকে গিয়েই চমকে গেলাম আরও। এই মূর্তিও কি অতটাই পুরনো? কী করে সম্ভব! প্রায় সাত ফুটেরও বেশি দীর্ঘ মূর্তি। বস্ত্রহীন। দিগম্বর। খোলা আকাশের নীচে রাখা। রোদ-জলের দৈনন্দিন আঘাত সয়েও একটুও টাল খায়নি কৃষ্ণবর্ণ। একটুও ক্ষয় ধরেনি শরীরে। অদ্ভুত একটা জ্যোতি বের হচ্ছে যেন কালো পাথরের শরীর থেকে। জানা গেল, জৈন তীর্থঙ্কর শীতলনাথের মূর্তি এটি। কেউ আবার বলে মূর্তিটি জৈন দেবতা মহাবাহুবলি বা পদমপ্রভুর। এদিক ওদিক ছড়ানো কলস, সতীস্তম্ভ বা চৈত্য। এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে বেরনো যায় না সহজে। যেন শিস দিয়ে বলতে চায়, এত এত বছরের ইতিহাস, এই এক ঘণ্টায় জেনে ফেলবে হে!

কিন্তু বিকেল পেরিয়ে সন্ধে তখন। শাঁখ বাজছে বাড়িতে বাড়িতে। বাড়ির কথা মনে পড়ছে হঠাৎ। মা’য়ের কথা। অঞ্জনদা’র পিছন পিছন বেরিয়ে আসছি। ঠিক তখনই দেখলাম ঘোমটা মাথায় দু’জন মহিলা হাতে মোমবাতি-ধুপকাঠি নিয়ে ঢুকছেন দেউল স্থানে। অবাক হলাম। ব্যাপারটা কী জিজ্ঞেস করতেই অন্ধকার গাছ তলায় বসে থাকা এক বৃদ্ধ মানুষ বললেন, “বাবার থানে পুজো দিতে গেল ওরা।”

…হায় রে ধর্ম! মিছেই এত মারামারি, কাটাকাটি তোকে নিয়ে! নইলে এখানে কালের নিয়মে জৈন তীর্থঙ্কর কবে যেন হয়ে গিয়েছেন লোকায়ত দেবতা কালভৈরব! দেবাদিদেবের আরেক রূপ। নিত্য গ্রামবাসীদের থেকে পুজো পান তাঁরা! মনে পড়ে সাত ফুট লম্বা তীর্থঙ্কর মূর্তির পায়ের সিঁদুরের দাগ। রোদে-জলে ভিজতে ভিজতে কবে যেন গ্রামবাসীদেরই একজন হয়ে গিয়েছেন ঈশ্বর। মানুষের এত কাছাকাছি থাকার কারণেই বুঝি, ঈশ্বরের শরীরের ঔজ্জ্বল্যও কমে না এতটুকুও।

বাইক চলতে শুরু করলে অঞ্জনদা’কে বলি, “একটু পুঞ্চা বাজারে যাব অঞ্জন দা। দেখি কালকের ট্রেনের কোনও টিকিট পাই কিনা। অনেকদিন বাড়ি যাই না।”

পাকবিড়রার অবশিষ্ট তিনটি দেউল

জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি, যা এখন গ্রামবাসীদের কাছে ‘বাবার থান’

 

গঙ্গা মুদি (…যে মেয়েটার আসল নামটা লেখা গেল না)

মাঝে মাঝে কী যে হয় রাত গুলোতে, বই পেয়ে বসে; কিংবা ছাদ। যে ঘরটায় থাকি তার পিছনে লম্বা ফাঁকা একটা মাঠ। তার পরে একটা টিমটিমে পাহাড়। ঘুম না আসা রাতগুলোতে নেটওয়ার্ক থাকে না মোবাইলেরও। অগত্যা বই আর ছাদ আর ধোঁয়াদের মাঝে যাতায়াত চলে অবিরাম। তারপর কখন যে ঘুম, খেয়াল থাকে না। চোখ লেগে আসবার সময় গুণাদা’দের মোরগটা ডেকে উঠেছিল কি?

ঘুম ভেঙে উঠেই সামনের চা’য়ের দোকান। বেশ বেলা। কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে জানতে চাইব, তখনই শ্যামলীদি। আমাদের কমিউনিটি রেডিয়ো স্টেশনের কর্মী। স্বামী নেই। একার হাতে টানছেন সংসার। বয়স্কা শাশুড়ি, দুই মেয়ের পড়াশোনা।

–দাদা, এতদিন ধরে গাঁয়ে-মাঠে অনেক কাজ করেছি। কিন্তু এতদিনে নিজের গ্রামে কিছু করতে পারলাম।

শ্যামলীদি’র মেয়ে গুলোও ‘দাদা’ বলে আমাকে। চা হাতে উঠে এলাম। “কী হল?”

–একটা মেয়ে। বাপ-মা বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা কী করে বিয়েটা আটকাল সেটা না শুনলে বিশ্বাসই করবেন না আপনি।
–কী করল? কোন মেয়ে?
–ওই আমাদের গ্রামের পিছনে মুদিডি গ্রাম। ওই গ্রামেরই, গঙ্গা মুদি।

তারপরের গল্পটা লড়াইয়ের। একটা গ্রাম্য মেয়ের বাঁধা-বিপত্তি ঠেলে এগিয়ে আসবার। নিজের কথা জোর গলায় বলতে পারবার। পরিবারকে সম্মান করেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবার। যে জোর দেখলে তথাকথিত ‘এগিয়ে থাকা’ বা ‘উন্নত’ শহুরে আমাদেরও থমকে দাঁড়াতে হয় খানিক।

গঙ্গার বয়স তেরো কি চোদ্দ তখন। গ্রামেরই মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বাবা-মাকে সাহায্য করা ক্ষেতের কাজে, ঘরের কাজে। কিন্তু গ্রামবাংলার সেই চিরাচরিত রীতি মেনেই মেয়ে একটু বড় হলেই বিয়ে দেওয়ার তাড়না যেন কুড়ে কুড়ে খায় অভাবের সংসারগুলোকে। অগত্যা গঙ্গার বাবা গঙ্গার জন্যেও দেখেশুনে খুঁজে আনল পাত্র। কিন্তু বেঁকে বসল গঙ্গা নিজে। গ্রামে রেডিয়োর দিদিদের বলতে শুনেছে ও, আঠেরোর আগে বিয়ে নয়। বলতে শুনেছে কী কী ক্ষতি হতে পারে এই কম বয়সে বিয়ের জন্য। শুনেছে তো ওর বাবা-মায়েরাও! তাহলে… হিসাব মেলে না গঙ্গার। বাবার জামার পকেট থেকে কাগজপত্র ঘেঁটে বের করে ছেলের বাড়ির মোবাইল নাম্বার। তারপর বাবার গার্ডার দিয়ে বাঁধা রং ওঠা মোবাইলটা নিয়ে চলে যায় ক্ষেতে। ছেলের বাড়িতে ফোন করে বলে যে, বিয়ে করবে না সে। ওদের বাড়িতে যেন না আসেন ওনারা। কিন্তু বালিকার ‘চঞ্চলমতি’ ভেবে সেই কথায় পাত্তা দেয় না ছেলের বাড়ির লোক। ঘটনা জানতে পেরে ফুঁসে ওঠে গঙ্গার বাড়ির লোকও। সেই রাতেই বাড়ি ছাড়ে গঙ্গা। স্থানীয় মেয়েদের হোস্টেলে গিয়ে ওঠে। সবকিছু খুলে বলে। তারপর পঞ্চায়েত। ব্লক অফিস। বড়বাবুরা আসেন সব গঙ্গার পরিবারকে বোঝাতে। আবার বাড়ি ফিরে আসে গঙ্গা। পড়াশোনা শুরু করে। ধীরে ধীরে গঙ্গার এই নাছোড়বান্দা জেদের গল্প ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলায়। প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে নিজের গল্প বলতে শুরু করে গঙ্গাও।

সেই গল্পটাই ডকুমেন্ট করতে শ্যামলীদি আর মঞ্জুরকে নিয়ে ক্যামেরা-ট্রাইপড ঝুলিয়ে যাওয়া গেল মুদিডির দিকে। বেশ শীত। হু হু হিমেল ভিতর অবধি ছুঁয়ে যাচ্ছে হাওয়া দিলেই। কিন্তু প্রথম দিন পাওয়া গেল না বাড়িতে। দ্বিতীয় দিন গিয়ে জানা গেল ধান ঝাড়াইয়ের কাজ করছে পাশের কোনও গ্রামে। গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখা গেল সাড়ে চার ফুটের একটা মেয়ে এক নাগাড়ে ধান ঝেড়ে চলেছে মেশিনে। দেখে কী মনে হল, বললাম, “আমি একটু করব?” গ্রামের লোক অবাক। এ বলে কী! “আপনি পারবেন না।” ইগোতে লাগল। বললাম, “আমার বাবা গ্রামে লাঙল দিয়ে চাষ করতো গো! দাও করে দেখাচ্ছি!” একগাছি ধান হাতে ধরে গঙ্গার মেশিনেই শুরু করা গেল ধান ঝাড়াই। তখনই এই ছবিটা তুলে দিয়েছিল মঞ্জুর। সেটাই রয়ে গেছে। কারণ একটুও খারাপ লাগেনি আমার কাজটা করতে গিয়ে। পরে আরও কয়েকবার করেছিলাম।

আর হ্যাঁ, ভালই করেছিলাম। … যে ভাবে গঙ্গার থেকেও শিখেছিলাম যে, সব ইনহিবিশন ঝেড়ে ফেললে, লড়াইটা সহজ হয়ে যায় অনেক।

ধান ঝাড়াই

 

সরস্বতী পুজো — ২০১৭

স্মৃতি হওয়ার পর থেকে সেই বছরই প্রথম সরস্বতী পুজোর দিনে আমার বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহরটার বাইরে। নাম-না-জানা অকারণ মনখারাপগুলোর যেমন কোনও যুক্তি থাকে না কোনও কোনও দিন, সেরকমই একটা দিন যেন। শীত চলে গেলেও বাতাসে একটা শিরশিরে ভাব। বসন্তের পঞ্চমী! কেন জানি না, বড় হয়ে ওঠবার দিনগুলোর কথা মনে পড়তে শুরু করল হঠাৎ; মনে পড়তে শুরু করল আমার ছোটবেলার স্কুল, আমার গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবী, কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ানো এদিক-সেদিক, সেই বড় হয়ে ওঠবার সময়টার বন্ধুরা কিংবা আড়চোখে তাকানো কোনও সদ্য পাট ভাঙা বাসন্তী রঙের শাড়ি— স্মৃতির ডানাগুলো যেন সেই বাচ্চা ছেলেটার মতো, যে মাথা নিচু করে হাঁটতে দেখলে, পকেটে ঢুকিয়ে রাখা হাত বের করে নিয়ে আঙুল ধরে হাঁটতে থাকে সঙ্গে।

অসহ্য মাথা ব্যাথাটা শুরু হল তারপর, দুপুরের পরে; যেটা খানিকক্ষনের জন্য সব কাজ ফেলে রেখে ট্যাবলেট গিলিয়ে, মাথায় রুমাল বাঁধিয়ে চোখ বুজিয়ে ফেলে রাখল এখানে আমার ঘরটায়। আমি চোখ বুজে দেখতে পেলাম যেন আমার ছোট্ট শহরটার দু’পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের সারির মাঝখানের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কত কত ছেলে-মেয়ে, যাদের হাতের ভিতর একে অন্যের হাত। কত কত প্রতিশ্রুতি তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য, আবার ভেঙেও যাচ্ছে কত কিছু। মনে পড়ল সরস্বতী পুজোর একটা গোটা সন্ধে মন্টিদের বাড়িতে বসেছিলাম শুধু আলো নিভিয়ে; কী কথা হয়েছিল তা স্মৃতিতে নেই যদিও আজ আর।

বিকেলের পরে তারপর অগত্যা বেরোতেই হলো বাইরে। ‘বয়স বেড়ে যাওয়া মানে, দায়িত্ব’, বাবা বলে। …কাজগুলো শেষ করে একটা চা’য়ের গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়, তখনই দেখলাম সকাল ন’টায় কিংবা হয়তো তারও আগে বাড়ি থেকে বেরনো একটা মেয়ে খুব সাধারণ একটা বইয়ের ব্যাগ পিঠে নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে বাড়ির পথে। চোখে চোখ পড়তেই লাজুক হাসি।

–আজকেও পড়া?
–আজকে তো পুজো; বাড়িতে কাজ নেই তেমন। তাই ম্যাডামকে বললাম…

ওর চোখে ক্লান্তি; মুখে আলতো হাসি তবুও। আমিও হেসে বললাম, “আচ্ছা, সাবধানে এসো।” এগিয়ে গেল সে। আর আমি অবাক হয়ে হঠাৎ দেখতে পেলাম যেন, সাইকেলের চাকায় তার প্রতিটা ক্লান্ত প্যাডেলের সাথে সাথে উপর থেকে চোখ মেলে তাকাচ্ছেন একজন; আলতো হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন আশীর্বাদ। দেখতে পেলাম যেন, আশেপাশে বেজে চলা উদ্দাম ডি.জে-র শব্দ অগ্রাহ্য করে পুরুলিয়ার চড়াই-উৎরাই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সেই মেয়ের সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে যেন এক সময় এক আকাশ অভয় নিয়ে এসে বসলেন, হ্যাঁ, আমাদের সরস্বতী ঠাকুর—

মন খারাপটা কেটে গেল।

যে পথে দেবী হেঁটে গিয়েছেন কিছুক্ষণ আগেই

 

মায়াদের অপলক

খুব নির্জন না হলে চারপাশ, নিজের সঙ্গে কথা বলা যায় না তেমন ভাবে। অন্তত শব্দের বাহুল্যটা কমাতেই হয় খানিক। নইলে শহরের ফুটপাথে একটু লালের ছোঁয়া দেখে যে চোখ বড় হয়েছে এতদিন, মোবাইল বের করে জুম করেছে ক্যামেরা, ফেসবুকে আপলোডিয়ে লাইক কুড়িয়েছে, সেই চোখ হঠাৎ তাকিয়ে দেখছে এত এত লাল! গোটা একটা জঙ্গলের নাম, পলাশ! ভূমিপুত্রেরা শহুরে চোখের আদেখলাপনা দেখে হাসছে মিটিমিটি। “সাইকেল নিয়ে মাঠের থেকে নেমে ওই পাশের গেরামটায় চলি যাও, ওখানে আরও বেশি পলাশ”। আমি হাসি। বসে পড়ি মাঠেই। তাড়া নেই কোনও। পৌঁছনোর নেই কোথাও। কী করে বোঝাই ওদের! সারাদিনে ফ‌োন ধরি প্রায় ১০০টা। এটা-সেটা কাজ। আসলে ‘জুগাড়ু’। অ্যারেঞ্জ করো, বা ম্যানেজ। সেই সব সামলে বিকালের ওই হাওয়াটা কমিউনিটি রেডিয়োর স্টুডিয়োতে ঢুকে এলেই, আর বসে থাকা যায়না ভিতরে। মঞ্জুরকে বলি, “আমি একটা ব্রেক নিলাম”। সেখ মঞ্জুর আলি। ওই কমিউনিটি রেডিয়োর স্টেশন ম্যানেজার। যে অনেক রাতে আমাকে তুলে নিয়ে যায় ওদের গ্রামে ছো-নাচ দেখাতে। মঞ্জুর হাসে। ভাবখানা এমন যে, ‘আমাকে বলারই বা কী আছে!’ শ্রীমন্তিদি, সহদেবদা, মিতনদা, কালীদা’দের আড্ডা জমে উঠেছে শেষবেলায় স্টুডিয়োর বাইরে। আকাশ কিছু বলতে আসছে। আমি বলছি, ‘আসছি দাঁড়াও’। বলেই হেঁটে যাচ্ছি মাঠের দিকে। পদ্ম-শালুক ফুটে থাকা পুকুরটার পাশ দিয়ে হাঁটছি। ঝাঁকড়া দু’টো আমগাছ যেখানে মাথা ঘসছে, তার নীচ দিয়ে হাঁটছি। বোল ধরে গেছে। নেশা নেশা গন্ধ। আর সেটা পেরিয়ে গেলেই পাথর-খোদানো চেহারাগুলো ফুটবল পেটাচ্ছে দিগন্তহীন মাঠটায়। আমি ডানদিক নিয়ে নিই। আরেকটা পুকুরের পাশ দিয়ে একটু হেঁটে গেলেই সেই জঙ্গলটা! আহা, উপরে-নীচে ফুটে থাকা, ঝরে পড়া লালের সঙ্গে মিশে গেছে নির্বিকার খয়েরি রুক্ষতা। ওই অপার্থিব সৌন্দর্যে ঢুকি না। বরং খানিকটা পা চালিয়ে এগিয়ে যাই মাঠের ধারের দিকে। মাঠটা শেষ, আর ঢালু হয়ে নেমে গেছে নীচে। একটা ধান ক্ষেত। ফসল কাটা হয়ে গেছে সব। এবার বর্ষার আগে আর কোনও চাষবাস হবে না। তবুও যেন কোনও উৎসবের প্রতীক্ষা আকাশে-বাতাসে। কদিন পরেই ‘বাহা পরব’। ফুলের উৎসব! দুপুরের গরমের হলকা কেটে গিয়ে বাতাসে কেমন একটা শিরশিরে ভাব। কাছেই কোথাও কোকিল ডাকছে একটা। কেন কী জানি, ‘মা নিষাদ’ মনে পড়ে হঠাৎ। এই সব মনে পড়ারা, সিগারেট ধরাতে বলে। ধোঁয়া ছেড়ে মাঠের ধারে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসি। তারপরেই সামনে তাকাতে, হঠাৎ একটা ম্যাজিক। চিরন্তন এই ছবিটা। … ফসল কেটে নেবার পরে মাঠের আলের উপর দাঁড়িয়ে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। নিবিষ্ট মনে চেয়ে আছেন ক্ষেতের দিকে। আর পুরো দৃশ্যটার ব্যাকগ্রাউন্ডে সার সার পলাশের গাছ। আসলে যেন আগত সন্তানের জন্য প্রতীক্ষা। কিংবা সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে ভবিষ্যতের ভাবনায় আকুল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে ধীরে ধীরে ওই হাল্কা সবুজ ঘাসের আলপথ ধরে হেঁটে ফিরে যাওয়া। একটা অনন্ত লং শট। শেষ আলোটুকু মুছে যাবার ঠিক আগে, একটা অনন্ত ফ্রেম আউট। …যে সকল দৃশ্য আমরা লিখে উঠতে পারি না কোনওদিন। যে সকল দৃশ্য আমাদের ক্যামেরার লেন্সে ধরা দেবে না জীবনেও। শুধু মনে করিয়ে দেবে বারবার, স্মৃতি লিখতে গিয়ে বারবার কী ভীষণ, কী ভীষণ অসহায় হয়ে পড়েছি আমরা…

মায়াদের অপলক

ভগবান’দা

রুখা জমিতে হঠাৎ বৃষ্টি এসে পড়লে, মাটিও তাকে মেনে নিতে পারে না সবসময়। সব দেওয়াল পেরিয়ে গিয়ে কোনও কোনও দরজা খোলা কঠিন হয়ে পড়ে ভীষণ। অমূলক পৃথিবীর এই আড়ি-ভাবের অকারণগুলো আছে বলেই হয়তো, আমরাও বেঁচে আছি এখনও; বেঁচে যাচ্ছি রোজ। …তবু সুখা জমিতে ফসল ফলে না আর; হঠাৎ অবান্তর বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে সেই মাটি মেনে নিতে শেখে না কোনওদিন।

…এত অবধি লিখে থামতে হল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। আর শব্দ নেই কোনও। মেঘ ডাকছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরেই। এখন শাল গাছগুলোর পাতায় পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে একটা। এত জোর বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া যে, বারান্দাতেও দাঁড়ানো গেল না। ঘরে চলে এলাম। ভাবতেই কেমন একটা লাগছে যে, এই এত এত বৃষ্টির মধ্যেও কী ভীষণ একা যেন আমি! আর এই একা থাকাটা আমার খারাপও লাগছে না আর। বই পড়তে ইচ্ছা করল না, গান শুনতে বা সিনেমা দেখতেও না। শুধু চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি। হঠাৎ লোডশেডিং। তাও উঠে মোমবাতি জ্বালাতে ইচ্ছা করল না। বরং মনে হতে লাগল এই বৃষ্টিটা এদের চাষের জন্য ভাল হবে, নাকি খারাপ? তখুনি ভাবলাম ফোন করে জিজ্ঞেস করি কাউকে একটা। কিন্তু এত বৃষ্টিতে এখানে নেটওয়ার্কের আশা করাটা বৃথা। অগত্যা…

মনে পড়ল এখানে জমির প্রকৃতি সাধারনত তিন ধরনের হয়। নিচু আর চাষের জন্য সব থেকে উর্বর জমি হল বহাল। তার থেকে একটু উঁচু জমি হল কানালি। আর তার থেকেও উঁচু জমি হল বাইদ। চাষের পক্ষে সবথেকে খারাপ প্রকৃতির জমি হল ট্যাঁইড়। জল দাঁড়ায় না একদম। খুব ভাল বৃষ্টি না হলে টাঁড় জমিতে ফসল ফলানো খুবই কষ্টকর। আঃ, এমন বৃষ্টিতে একটাই অসুবিধা এখানে। এক কাপ চা যদি পাওয়া যেত…

এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যেন লেগে এসেছে চোখটা। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। কে ডাকছে এই সময়? বাইরে মেঘ ডাকছে, এমন বৃষ্টি! উঠে দরজা খুলে দেখি, রাতের খাবার এসেছে।

–আলো জ্বালাওনি কেন?
–ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আসলে…
–মোমবাতি আছে? নাকি আমার টর্চটা রাখবে? তোমরা শহর থেকে এসেছো, এই অন্ধকারে ভয় লাগছে না তো? আমি কি একটু বসবো?

আমি হাসলাম। বললাম, “একদমই না। কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। মোমবাতি জ্বালাবো এবার…” বলতে না বলতেই কারেন্ট চলে এল। বললেন, “গরম গরম খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি।”

টর্চ জ্বালিয়ে তিনি চলে যাচ্ছেন। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে চুপচুপে ভিজে তিনি চলে যাচ্ছেন। আর আমি তাকিয়ে দেখছি, এই তুমুল দুর্যোগ মাথায় নিয়ে, শরীর-মাথা সব ভিজিয়ে, আমায় রাতের খাবার পৌঁছে দিয়ে যিনি ফিরে যাচ্ছেন, কাকতালীয় হলেও তাঁর নাম, ভগবান।

ভগবান’দা ও ভগবান’দা-র চা’য়ের দোকান

 

রাবণ পোড়া

…বেশ কিছুদিন পর আবার সেই জঘন্য মাথা ব‍্যাথাটা তাড়াতাড়ি ঘরের পথ ধরিয়ে দিল। ইমনের সাথে বাইকে ফিরছি, হঠাৎ একটা পুকুরের পাড়ে নেমে যাওয়া ঢালের ঘাস জমিতে এদের সঙ্গে দেখা। এক ঝাঁক কচিকাচা। বেশ কোলাহল। কিন্তু উন্নয়ন বা প্রযুক্তির গতিবেগ ছোটদের আনন্দের উ‌‌ৎসগুলো কবেই বা ধরতে পেরেছে! অগত্যা বাইকের থেকে নেমে আবার কিছুটা হেঁটে গেলাম পিছনের দিকে।

আয়োজনের কমতিতে উ‌‌ৎসাহে ভাঁটা নেই যদিও। খানিক গল্প করা গেল।

— এটা কী বঠে রে?
— রাবণ!
— তা রাবণের বাকি মাথাগুলো ক‌ই?
— ছাড়াইন গেছে।
— হ্যাঁ?
— বাকি মাথা গুলহ্ ঘুচাইন গেছে গ!
— ওহ হো! তা, এটা কী হবে এরপর?
— আগুন দিব! আর পটকা জ্বালাব! ছ’টা বাইজলে চলি আসবে।

জীবনের এইসব ছোট ছোট আবিষ্কারের মধ্যে অনাবিল আনন্দ আছে। প্রচণ্ড বেঁচে থাকা আছে। আর চারপাশের এই ভীষণ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা অসহিষ্ণুতার মধ্যেও শিখিয়ে দেওয়া আছে যে, জীবনে আসলে সত্যিই সারল্যের থেকে বেশি আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। যেমন রাবণেরও আর দশটা মাথার প্রয়োজন হচ্ছে না; এই তিনটে মাথাতেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে বেশ।

এই টুকরো টুকরো মুহূর্তের হাত ধরে ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করে খুব। কয়েক মুহূর্ত বসে থাকতে ইচ্ছা করে নিজের শৈশবের পাশে। প্রিয় গানের কথা মনে আসে এর মধ্যেই, ‘মন সে রাবণ যো নিকালে, রাম উসকে মন মে হ্যায়’।

যাই হোক…

(মানভূম অঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় কালীপুজোর রাতে রাবণ পোড়ানোর চল আছে। সাধারণত মানভূমের বুক চিরে এগিয়ে চলা পাথুরে নদীগুলোর উপরেই রাবণের মূর্তি দাঁড় করিয়ে আগুন ছোঁড়া হয় তার মধ্যে। রাবণের মধ্যে ভরা থাকে নানারকম আতসবাজি। রাবণ পোড়া কখন যেন হয়ে ওঠে আতসবাজি প্রদর্শনী। নদীর পাড়ের বালিতে নানারকম জিনিসের পসরা। ছোটখাট মেলা। কাতারে কাতারে লোক। দেশি নেশার গন্ধ। টলোমলো পা। সেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্যরকম ভাবে চিনতে থাকি দেশ। দেশের মানুষগুলোকে। উৎসবকে চিনতে শিখি। প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে আবার সেই ৫ কিলোমিটার হেঁটে ফেরা। তবু ক্লান্তি লাগে না। শুধু মনে হয়, এই সব হেঁটে চলা তো চিরন্তন হতে পারত আমার। এই সব হেঁটে চলা তো চিরন্তন হতে পারত, আমাদেরও…)

রাবণ বধ