Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আধার : গণতন্ত্র এবং মৌলিক অধিকারের উপর একটি চূড়ান্ত আঘাত

আধার কার্ড

সুমন সেনগুপ্ত

 

‘আধার’ সংযুক্তিকরণ নিয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক বাড়াবাড়ি সাধারণ মানুষকে যে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে যা থেকে কোনও উদ্ধারের পথ আপাতত চোখে পড়ছে না। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কাঁচকলা দেখিয়ে আধার নিয়ে একটা অর্ডিন্যান্স পাশ হল, যাতে বলা হল বেসরকারি কোম্পানিরা আবার জনগণের আধার চাইতে পারবে। যদিও তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগে প্রচুর শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে এই অর্ডিন্যান্সে, কিন্তু কখনও কি শুনেছেন এই ধরনের কোনও কোম্পানির মালিক শাস্তি পেয়েছেন? কিছুদিন আগে হাফিনটন পোস্টের একটি খবরে প্রকাশ হয়েছে যে এক ব্যাঙ্ক অফিসারের হাতের ছাপ নকল করে মধ্যপ্রদেশে প্রচুর জাল আধার নম্বর তৈরি হয়েছে। এবার সেই অফিসারকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে এবং তাঁকে ৩৩ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তাহলে ঘটনাটা কি দাঁড়াল, কে অভিযুক্ত হল? আসল অপরাধীদের বদলে একজন সাধারণ সরকারি কর্মী! তবে হ্যাঁ, পথের সন্ধান চলছে। প্রতিবাদও হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই সে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আধার আস‌লে বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে এক ফ্যাসিবাদী উপকরণ। দেশবাসীকে কব্জায় রাখার এক অমোঘ কৌশল। আধার নিয়ে জেরবার সাধারণ মানুষজন যে কী পরিমাণ উদ্বিগ্ন তার খবর আমরা প্রতিদিন পাচ্ছি।

এবার প্রশ্ন, আধার প্রকল্পটি তো মোদি জমানায় শুরু হয়নি। ঠিক তাই। ২০০৯ সালে কংগ্রেস সরকার এই আধার প্রকল্পের সূচনা করে। মহারাষ্ট্রের একটি গ্রামে ভারতের ৩ জন মহিলা, সোনিয়া গান্ধি এবং মনমোহন সিং-এর উপস্থিতিতে আধার পায়। বলা হয়েছিল যাদের কোনও পরিচয়পত্র নেই, তারা একটি পরিচয়পত্র পাবে। কিন্তু আদপে কী হল? আধার-কে আমরা কেন-ই বা বলব ফ্যাসিবাদী চক্রান্ত? আসুন, উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।

 

আধার একটি চক্রান্ত

প্রথমত, UIDAI কোনও সরকারি সংস্থা নয়। এটি একটি বেসরকারি কোম্পানি, যার সঙ্গে ভারত সরকারের যোগ নেই, যদি থাকত তাহলে আধার কার্ডে সরকারি কোনও আধিকারিকের সই নেই কেন? প্যান (PAN) কার্ড বা ভোটার কার্ডে যেমন থাকে। UIDAI আসলে একটা স্ট‍্যাটুটরি বডি, যা ২০১৬ সালে আধার আ্যক্ট অনুযায়ী তৈরি হয়েছে। এদের সাংগঠনিক স্ট্রাকচার দেখলেই বোঝা যায় যে এই সংগঠনে কোনও স্থায়ী সদস‍্য নেই, সবাই অস্থায়ী সদস্য, আসা যাওয়া করেন, এবং সেই অর্থে নির্দিষ্ট কারও ওপরেই খুব কিছু দায় বর্তায় না। সরকারি সিলমোহর ব‍্যবহার করলেই সেটি সরকারি হয়ে যায় কি?

দ্বিতীয়ত, UIDAI-কে যদি প্রশ্ন করা হয়, কোনও মানুষ কি আধার না করে থাকতে পারবেন? তারা উত্তর দেবেন, হ্যাঁ অবশ্যই পারবেন। কারণ আধার কেবল কিছু পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কেউ যদি আধার ব্যবহার করতে না চায়, তাহলেও তাকে জোর করে করার কিছু নেই। কারণ আধার আইনত বাধ্যতামূলক নয়।

 

তাহলে আধার কেন?

পৃথিবীর বৃহৎ কিছু কোম্পানি মানুষকে রোবট হিসেবে দেখতে চায়, যাদের ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে স্রেফ কিছু তথ্যের মাধ্যমে। বুঝলেন না তো? ধরুন আপনি ফেসবুক করেন। তার মধ্যে দিয়ে আপনি কী পছন্দ করেন সেটা বহু মানুষ যেমন বুঝতে পারে, তেমন ফেসবুকের মালিক জুকেরবার্গও বুঝতে পারেন আপনি অনলাইনে কী কী কিনছেন। কিংবা অ্যামাজন থেকে বা গুগলে কী খুঁজছেন সেটা যদি বোঝা যায় তাহলে আপনাকে বা আমাকে সেদিকে চালনা করা আরও সহজ হয়ে যায়। এর প্রমাণও আছে, আপনি কোনওদিন ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে কিছু একটা পণ্য কয়েকবার দেখলেন, পরদিন থেকে সেগুলোর আরও বেশি করে বিজ্ঞাপন আসতে থাকে। ওই কোম্পানিগুলো চায় আমি আপনি ওদের হাতের পুতুল হয়ে উঠুন। সেই জন্যই মোদি সরকার চাইছে সমস্ত কিছুর সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ করতে। যাতে সমস্ত তথ্য এই বড় কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যায়। যার মাধ্যমে আমাকে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজ হয়ে যাবে।

মোদি সরকারের প্রয়োজন একটা পুলিশি রাষ্ট্র, যা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করবে, যার মাধ্যমে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করবে সেই মানুষরূপী বিপুল সংখ্যক রোবটদের। এবং ধীরে ধীরে আমরা ক্রীতদাসে পরিণত হব, এবং আমাদের নিজেদেরও কোনও সরকার থাকবে না, থাকবে একটা বাছাই করা শক্তি যার মাধ্যমে এই কাজটা করা হবে। যদি আধারযুক্ত ভোট দেওয়ার যন্ত্র চালু করা যায় তাহলে তাহলে সহজেই বোঝা যাবে আপনি কাকে দিতে পারেন বা কাকে ভোট দিলেন। আবার আপনাকে ভোট ব্যবস্থা থেকে বাতিল করে দেওয়াও তাদের পক্ষে সহজ হবে। আপনি তো এখন শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। আপনাকে মুছে ফেলা তো এখন একটা ছোট্ট কাজ।

 

বাদ দেওয়ার উপকরণ

আপাতত বাদ পড়ার তালিকার সিংহভাগ গ্রামীণ নিরক্ষর মহিলা এবং বয়স্ক মানুষেরা। এরপর এই তালিকায় যুক্ত হবেন শহরের বয়স্করা, বিশেষত মহিলারা। গ্রামের গরিব নিরক্ষর মহিলারা প্রথমেই আধারের শিকার হচ্ছেন। যাঁদের কম্পিউটার বিষয়ে কোনও ধারণা নেই, আধুনিক ফোন ব্যবহার করেন না বা করতে অভ্যস্ত নন, তারাই সর্বাগ্রে এর কোপে পড়ছেন। ওই নিরিখে ৬৮% মহিলা আজও অশিক্ষিত, যারা কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না বা করতে পারেন না। অথচ UIDAI বলছে, প্রবীণ, বিধবা এবং প্রতিবন্ধীদের কাছে আধারের মাধ্যমে পেনশন বা অন্যান্য অনুদান পৌঁছে দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তাহলে কোনটা বিশ্বাস করব, আধারের গণ্ডগোলে মানুষ প্রাপ্য রেশন বা পেনশন পাচ্ছেন না, সেটা নাকি UIDAI-এর বক্তব্য?

 

রাওয়ান্ডার গণহত্যা এবং আধার

আফ্রিকার একটা ছোট্ট দেশ রাওয়ান্ডা, দু-ধরনের উপজাতির বাস। মূলত হুতুসরা সংখ্যাগুরু এবং টুটসিরা সংখ্যালঘু। তারা একই ভাষায় কথা বলে, প্রায় একই রকম জামাকাপড় পরে, খাওয়াদাওয়া ও প্রায় একইরকম। ১৯১৬ সালে বেলজিয়ান শাসকরা রাওয়ান্ডাতে এক ধরনের পরিচয়পত্র চালু করে, যাতে দু-ধরনের জনজাতিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয় বিরোধ। ১৯৫৯ সালে দেশ জুড়ে বেশ কিছু ছোটখাটো দাঙ্গা হয়। ১৯৬২ সালে হুতুসরা টুটসিদের সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে। তারপর তুষের আগুনের মতো ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে এই দুই জনগোষ্ঠীর বিরোধ। তারপর ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে রকেট হামলায় মেরে ফেলা হয়, অনেকেই তারপর নতুন প্রেসিডেন্ট পল কাগামেকে এই হত্যার জন্য দায়ী করেছেন। সেই বিমানহানার পরপরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রচার চালানো হয় টুটসিদের বিরুদ্ধে, ভয়ংকরভাবে। তার ফলশ্রুতিতে এপ্রিল থেকে জুন, ৯৪ এর মধ্যে ৮ লক্ষ টুটসি মানুষকে হত্যা করা হয়, ১০০ দিনের মধ্যে।

সংগঠিত সরকারি সেনা এবং মিলিশিয়া, অস্ত্রসহকারে মিছিল করে টুটসি জনজাতির যেখানে বসবাস, হত্যা করে নৃশংসভাবে টুটসিদের কারণ সেই অঞ্চল এবং মানুষরা আগে থেকেই ঐ পরিচয়পত্র দ্বারা চিহ্নিত। হতুসরা মনে করত ক্ষমতায় থাকতে গেলে টুটসিদের শেষ করতেই হবে। এর পিছনে আর এক রকম প্রচার করা হয়েছিল রাওয়ান্ডার রেডিওর মাধ্যমে, যে টুটসিদের মারতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে, এবং তাদের সব জমিজায়গার মালিক হবে হুতুসরা।

 

রক্তকরবী

এবার আসি আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। ধীরে ধীরে একটা সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গুজরাট, মুজফফরনগর, ভাগলপুর, কাসগঞ্জ, বসিরহাট, কালিয়াচক– এরকম নানা জায়গায় ছোট ছোট দাঙ্গার খবর আমরা ইতিমধ্যেই শুনে নিয়েছি, যদিও এর মধ্যে গুজরাট ছিল সবচেয়ে বড়, যাতে প্রায় ২০০০ জন মুসলমান নাগরিককে চিহ্নিত করে মারা হয়। শুনেছি আফরাজুল, জুনেইদ, পেহেলু খান বা উমর খানদের মতো ঘটনা, মানে ধর্ম চিহ্নিত করে মারার ঘটনাও আমাদের দেশ ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছে। এর সাথে সাথেই চলেছে আধার-এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে চিহ্নিতকরণের কাজ। আপনি কোথায় থাকেন, অঞ্চলটা মিশ্র কি না? আপনার বয়স কত? ফেসবুক বা টুইটারে কী পোস্ট করেন, আপনার রাজনৈতিক মত কি সরকারবিরোধী? খেয়াল করে দেখুন অর্থনীতি মোটামুটি তলানিতে, চাকরি নেই, লোকের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে বিমুদ্রাকরণ এবং জিএসটি র জন্য। এখন একটাই কাজ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাও, তারপর গণহত্যা কর। রাওয়ান্ডার রেডিও আর আজকের মোদির ‘মন কি বাত’ প্রায় সমান। আধার এখন প্রায় সবকিছুর সাথে যুক্ত করার কাজ চলছে, এরপর শুধু বাকি আছে ভোটার কার্ড-এর সাথে আধার যুক্ত করার কাজ। এই কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন যে যাদের কাছে ভোটার কার্ড নেই, তারা আধারকেও অন্যান্য ১০টা পরিচয়পত্রের মতো ব্যবহার করতে পারবেন। অথচ আধার কি নাগরিকত্বের প্রমাণ? আধার থাকলেই একজন নাগরিক তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে? জৈশ-এ-মহম্মদের সন্ত্রাসবাদীর কাছেও তো আধার পাওয়া গেল। আধার কি তাহলে গোপনীয়তার বিষয় না জাতীয় সুরক্ষার বিষয়? আচ্ছা, এই প্রকল্প পুরোদমে চালু হলে কী হতে পারে? আমি আপনি কোনওদিনই আর এই মোদির মত সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সরাতে পারব না, কারণ আমার আপনার সমস্ত তথ্য আজ ওদের হাতের মুঠোতে, আমি আপনি এখন শুধুমাত্র একটা সংখ্যা, আমাকে বা আপনাকে মুছে দেওয়া আজ ওদের এক ইশারাতেই হয়ে যাবে। এরপর শুরু হবে চিহ্নিত করে মারার কাজ, সাবির থাকে মমিনপুর-এ, রিয়াজ থাকে খিদিরপুর-এ, এটা তো ওদের জানা হয়ে গেছে, কিংবা অমিত, মৃণালরা যে কমিউনিস্ট সেটা তো তার আধার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার চলাফেরা দেখেই বোঝা সম্ভব। সুতরাং চিহ্নিত করে মারা হবে এবার, হতে পারে এতবড় গণহত্যা যা সারা পৃথিবী আগে কোনওদিনও দেখেনি। যারা ভাবছেন এখনও যে আধার একটা সারা দেশের একমাত্র পরিচয়পত্র, তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। দাভোস-এ বিশ্বের বড় বড় পুঁজিপতিদের কাছে গিয়ে মোদি কথা দিয়ে এসেছেন যে ভারতের জনসংখ্যা কমাব, কারণ তা না কমালে যে এই পুঁজিপতিদের অসুবিধা হচ্ছে। এত দান খয়রাতি আর তারা করতে পারছেন না, পেনশন, ১০০ দিনের কাজ, এই ভাতা, ঐ ভাতা আর দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রথমে আধারের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হবে, তারপর নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর গণহত্যা হতে পারে সংগঠিতভাবে।

আর এটাই ওদের টার্গেট। সুতরাং আজ যারা ভাবছেন আমার কিছু হবে না, বা আমার সন্তান দুধেভাতে থাকবে, তা বোধহয় হবে না… কারণ এরপর টার্গেট আপনি!!

 

আপনিই ঠিক করুন

আধার গণতন্ত্র এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের উপর একটি চূড়ান্ত আঘাত। সেটা আপনি মেনে নিয়ে নিজে একটি সংখ্যায় পরিণত হয়ে যাবেন কিনা সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। নাকি সামিল হবেন রাস্তার লড়াইয়ে যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী এক ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছে। সেটাও আপনাকেই ঠিক করতে হবে।