Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বিজ্ঞান ও দর্শন : যোগাযোগের হটস্পট

মানস প্রতিম দাস

 

একই কলেজের দ্বিতীয় বর্ষ। মনোজ আর মনীষা। দু’জনেই অনার্স। একজন পদার্থবিজ্ঞান আর অন্যজন দর্শনে। কলেজের গণ্ডি পেরোতে পারলে আর কোনও ক্যাম্পাসের মুখ দেখতে চায় না দু’জনের কেউই। দু’জনেই আগেভাগে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার। কোচিং ইনস্টিটিউটেও ভর্তি হয়েছে। একই সেশনে ক্লাস, নোট্‌স বিনিময় হয় প্রতিদিন। এমন একটা প্রসঙ্গে বিজ্ঞান আর দর্শনের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে না কারও! ফিক করে যদি হেসেও ফেলেন পাঠক তাহলেও স্বীকার না করে পারবেন না যে গুরুগম্ভীর দুটো বিষয়ের মধ্যে এর থেকে বেশি যোগাযোগ খুঁজতে রাজিও নয় আম আদমি।

আর একটা যোগের কথা অবশ্য শুনতাম ছোটবেলায়। বিজ্ঞান যেখানে শেষ হয় সেখানেই দর্শনের শুরু। খুব ধন্দে পড়তাম। বিজ্ঞান কি শেষ হয়ে গিয়েছে? শেষ না হলে দর্শন শুরু করাই তো অসম্ভব। আচ্ছা, তাহলে দর্শনের নামে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যা পড়ানো হয় তা কি বে-আইনি? বিজ্ঞান শেষ না হলে কি ‘আইনি’ হবে না? এসব প্রশ্ন করলে মাসি বলত, ছোটরা ছোটদের মত করে ভাববে, এসব গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী? শিশুসাহিত্য পড়ো, খেলাধুলো করো, এসবই তো ছোটদের মানায়। মুশকিল হল, ছোটসুলভ কাজগুলো করার পরেও প্রশ্নগুলো পেছন ছাড়ত না! এমন পরিস্থিতিতে যাঁরা আমাকে পেছন-পাকা অভিধায় ভূষিত করেছেন তাঁদের খুব দোষ দিতে পারি না।

যাই হোক, ব্যাপারটা তো আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিষয় নয়! কত লোকের জীবন গড়ে দিয়েছে মানে পিএইচডি পাকা করে দিয়েছে এই যোগাযোগ। আর্থিক বর্ষের শেষে, অর্থ শেষ করার সেমিনারে, বিষয়ের আকাল মেটায় এমন যোগাযোগ। ফলে গুরুত্ব দিতে হবে বৈকি! কিন্তু যোগাযোগ পাকা করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হল দুই শিবিরের বৈরিতা। মনান্তর হয়ত নয়, নেহাৎই মতান্তর, তবুও সেটা কড়া ধাঁচের। উড়োজাহাজ তৈরি থেকে পেটের ব্যামো সারানোর পথ দেখায় বিজ্ঞান। মানুষ মারা বোমা আর সে বোমা পাশের দেশে ফেলার জন্য যে ক্ষেপণাস্ত্র, তার ফর্মূলাও আসে বিজ্ঞানের হাত ধরে। রাষ্ট্র তাই চাইলেও অবহেলা করতে পারে না বিজ্ঞানকে। বিশাল তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিপুল তার বিনিয়োগ। সে শিবিরের সদস্যদের গুমোরটা তাই স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তেমনই এক সদস্য এক দর্শনের গবেষককে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবে দেখেছি, মানুষকে প্রয়োজনীয় সব জিনিসই দিয়েছে বিজ্ঞান। দর্শন কোনও কাজেই আসেনি।’ এতে সামান্য হেসে শ্রোতা বললেন, ‘তোমার এই বক্তব্যকে আমি গুরুত্ব দিতে পারি যদি তুমি স্বীকার করে নাও যে এটা তোমার নিজের দর্শন!’

যাক গিয়ে, এসব কথা অনেক হল, এবার কাজের কথা কিছু হোক। হুড়মুড় করে এগোচ্ছে বিজ্ঞান, সেই গ্রিকদের সময় থেকে। আমাদের তাই বলা হয়েছে। একালে জন্মালে এটা না শুনে উপায় নেই যে বিজ্ঞান মানে অগ্রগতি। প্রাচীনকালে ব্যাপারস্যাপার কিছু আলাদা ছিল। আজকের মতো পরিমাপের সাধন যে গ্রিকদের ছিল না তা আমরা সবাই জানি। বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের মতামতের (মানে দর্শন?) উপর নির্ভর করত প্রাচীন বিজ্ঞানের চর্চা, তাও অজানা নয়। এসবের মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল এমন সত্য যা সময়ের গণনা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ তৈরির প্রকৌশল এনে দিল মানুষের হাতের মুঠোয়। ইউরোপের অন্ধকার যুগ-টুগ যা ছিল থাকুক, বিজ্ঞান মোটের উপর এমনভাবেই অগ্রগতি করে গিয়েছে। আজও করছে! অগ্রগতি যাতে বজায় থাকে তার জন্য অর্থের প্রয়োজন, প্রশিক্ষিত গবেষকের প্রয়োজন। দর্শন দিয়ে তার কী প্রয়োজন মিটবে?

এই যে একটা কোল্ড শোল্ডার মার্কা মনোভাব, এটা নিয়েই চলাই বিজ্ঞানীদের কাছে স্মার্টনেসের নামান্তর। শিবিরে যাতে কোনও বিভীষণ না ঢুকে পড়তে পারে সে ব্যাপারে সদা সতর্ক তাঁরা। তবু কি আর সব ফাঁকফোকর আটকানো যায়! সেই অবশিষ্ট ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়েন বিজ্ঞানের দার্শনিক! জানি, হোঁচট খাওয়ার সমূহ সুযোগ এখানে। কোথায় মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকার কথা হচ্ছিল, হঠাৎ করে এসে পড়ল কিনা বিজ্ঞানের দার্শনিক! একেবারে আদায়-কাঁচকলায় মডেল থেকে হাতে-হাত-ধরি-ধরি কনসেপ্ট! বিপ্লব! তাই বটে। এমন বৈপ্লবিক কাজ যাঁরা করে গিয়েছেন তাঁদের সবার নাম ধরে ধরে কীর্তিকাহিনী বর্ণনা করার ইচ্ছে মোটেই নেই লেখকের। তবে হ্যাঁ, একজনের কথা বলার আগ্রহ রয়েছে পুরোমাত্রায়। সেই মার্কিন ভদ্রলোক মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করে বেশ লেখাপড়া করছিলেন, পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেটটাও করলেন নিয়মমাফিক। তারপরেই মতিগতি গেল পাল্টে। পদার্থবিদ্যার খুঁটিনাটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছে হল না তাঁর, বিজ্ঞানের গোটা কাঠামোটা ধরে টানাটানি শুরু করলেন। এ টান কিন্তু হীরক রাজার বিক্ষুব্ধ প্রজাদের দেওয়া টানের মত নয়! মূর্তিভাঙা iconoclast তিনি নন, তাঁর আগ্রহ ছিল চুলচেরা বিচার করে বিজ্ঞানের ‘অগ্রগতি’র স্বরূপটা সবাইকে দেখানো।

তবে বিপ্লবী হোন বা বশংবদ, একটা নাম পাওয়ার অধিকার থাকে সবার। আমাদের দার্শনিক এ জগতে পরিচিত টমাস কুন নামে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী নন যাঁরা, হাভার্ডের এমন পড়ুয়াদের কাছে বিজ্ঞানের বিবর্তনের কথা বলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন কুন। সেটা ১৯৪৯ সাল। তিনি ঠিক করলেন যে বিজ্ঞানের সূত্র বা তত্ত্বের ভার কমিয়ে ঐতিহাসিক এবং বৌদ্ধিক উপাদানগুলো আলোচনা করবেন ক্লাসে। তিনি উপলব্ধি করলেন, ছাপা অক্ষরেও জানালেন যে … though the technical scientific materials are essential, they scarcely begin to function until placed in a historical or philosophical framework where they illuminate the way in which science develops, the nature of science’s authority, and the manner in which science affects human life. দুটো জিনিস ছোটবেলায় শিখেছি আমরা। এক, সুযোগ পেলেই উদ্ধৃতি দেওয়া আর ইংরেজি বলা। সেই যে বিজ্ঞানের রচনা শুরু করতাম ‘দূরকে করেছ নিকট বন্ধু…’ বলে! স্বভাব যাবে কোথায়! কিন্তু এখানে কেউ দোষ দিতে পারবেন না বলে রাখছি কারণ মার্কিন সাহেব কুনের নিজের কথা বলতে হলে তাঁর এই বইখানা থেকে একটু-আধটু তুলে দিতেই হবে, না হলে মনটায় কেমন যেন শান্তি আসে না! ফেসবুকের সেই বুদ্ধিমান বন্ধুরা যাঁরা উদ্ধৃতি দেখলেই জিজ্ঞাসা করেন সূত্র কী আর পিডিএফ পাওয়া যাবে কিনা তাদের সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা রাখি আমি। বইয়ের নাম The Copernican Revolution : Planetary Astronomy in the Development of Western Thought. কী আশ্চর্য, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত বইটার অষ্টাদশ মুদ্রণের পিডিএফ সত্যিই পাওয়া যায়। ডাউনলোডের সময় একদম জিজ্ঞাসা করা হয় না যে আপনি সত্যি-সত্যি বইটা পড়বেন কিনা!

যাঁর উৎসাহে অবিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান পড়ানোর কাজে লেগেছিলেন কুন, লিখেছিলেন এই বই, সেই জেমস কোনান্ট মার্কিন মুলুকের বিজ্ঞান চর্চার নীতি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। তিনিই এই বইয়ের মুখবন্ধ লেখেন। ঠিক ধরেছেন, আবার ইংরেজি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার দিকে এগোচ্ছি। এক জায়গায় লিখছেন কোনান্ট সাহেব, … something more than a study of science as a body of organized knowledge, something more than an understanding of scientific theories is required to make educated people ready to accept the scientific tradition alongside that literary tradition which still underlies even the culture of United States. This is so because the difficulties of assimilating science into Western culture have increased with the centuries. কথাটা নেহাৎ মন্দ বলেননি সাহেব! বিজ্ঞান যত ছোট ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করছে ততই কঠিন হচ্ছে অবিজ্ঞানীদের পক্ষে সেটা বোঝা। বিশেষ করে সাহিত্যে মজে থাকা সংস্কৃতি যখন এমনিতেই বিজ্ঞানের সঙ্গে তেমন ভাবসাব রাখে না। ইউরোপের অবস্থা থেকে ব্যাপারটা যে খুব পৃথক না তা বোঝাতেই জোর দিয়ে সাহেব বলেছেন even the culture of United States.

সে না হয় হল। সমস্যাটা যে আমরা একেবারে বুঝি না তা তো নয়। বোঝানোর মতো লোকজন তো পরেও এসেছেন। ইংল্যান্ডের সেই যে জাঁদরেল ভদ্রলোক, নাম যাঁর সি পি স্নো, বিজ্ঞান-সাহিত্য-রাজনীতিতে যাঁর উল্লেখ করার মতো অধিকার, সেই তিনিই তো ১৯৫৯ সালে The Two Cultures লিখে বিজ্ঞান আর কলা বিভাগের মধ্যে প্রায় অনতিক্রম্য ব্যবধানের কথা বলে গিয়েছেন। কিছুটা বিলাপ যেমন করেছেন এ নিয়ে, তেমনি খোঁচাও দিয়ে গিয়েছেন অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজের সাহিত্য কিংবা দর্শন নিয়ে মজে থাকা পণ্ডিতদের, তাঁদের ছাত্রদের। কিন্তু এসব কথা নিয়ে মশগুল হলে পথভ্রষ্ট হব আমরা। লক্ষ্য তো যোগাযোগের হটস্পট খোঁজা, যেখানে বিজ্ঞান আর দর্শন এসে হাই-হ্যালো বলছে একে অপরকে। তা সে কাজটা কুন সাহেব কিছুটা সেরে রাখলেন কোপার্নিকাসের বিপ্লবকে কেন্দ্র করে। যেহেতু অবিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে এসব কথার অবতারণা, তাই ভাষাটাকে যতটা সম্ভব সহজ রাখলেন কুন। ধীরে ধীরে যে ছবিটা গড়ে তুললেন তাতে ফুটে উঠল যে আধুনিক বিজ্ঞান যতই নিজেকে বিন্দাস অশ্বারোহী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, যতই দেখানোর চেষ্টা করুক যে তার অগ্রগতি নৈর্ব্যক্তিক, আসলে তার শেকড় রয়ে গিয়েছে সমসময়ের বিশ্বাস আর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। এই বইতে তাঁর উপজীব্য জ্যোতির্বিজ্ঞান, সেটাকে ধরেই এগিয়েছেন তিনি, মাঝে মাঝে শুধু বলেছেন যে অন্যান্য বিজ্ঞানেও এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। কসমোলজি বা বিশ্বতত্ত্বের কথা বলতে গিয়ে ভারি সুন্দর বলেছেন, কোনও মানুষই বিশ্ব গঠনের একটা তত্ত্ব ছাড়া বেশিদিন স্বস্তিতে থাকতে পারে না। নিজেকে এবং তার কল্পিত দেবতাদের মনোমত জায়গায় স্থাপন করে তবে তার আরাম! অবশ্য হ্যাঁ, আজকের কসমোলজিতে দেবতারা দায়মুক্ত, যাবতীয় কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। যা চোখে দেখছি, যেভাবে দেখছি তার উপর আমাদের বিশ্বতত্ত্ব দাঁড়িয়ে থেকেছে চিরদিন। আজকের নাগরিক যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের ‘দেখা’কে, আসলে কিন্তু প্রত্যেকটা দেখা এবং তার ভিত্তিতে তৈরি তত্ত্ব সেই সময়ের বিচারে যথাযথ। মিশরের যে লোকগুলো নীলনদকেই গোটা জগৎ বলে ভাবত তারা মনে করত যে বিশ্বটা একটা লম্বাটে পাত্রের মতো। দৈর্ঘ্যটা তাদের চোখে ধরা পড়া নীলনদের সীমানার সমানুপাতিক। যে নদী উপত্যকার সঙ্গে তাদের অস্তিত্ব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, কল্পিত বিশ্বের নীচের চ্যাপ্টা অংশ সেই পলি জমা উপত্যকার আদলে তৈরি। সে পাত্রের কানা ঢেউ খেলানো, উঁচুনীচু। আসলে সেগুলো বিশ্বকে বেড় দিয়ে থাকা পাহাড়-পর্বতের প্রতিনিধিত্ব করে। পাত্রের উপরে রয়েছে বায়ু যে আসলে দেবতা, ধরে রেখেছে আকাশের গম্বুজটাকে। লম্বাটে পাত্রকে নীচ থেকে ধরে রেখেছে জল, সেও এক দেবতা। তারও নীচে রয়েছে আর একটা ধারক আবরণ। এই নিয়ে সম্পূর্ণ মিশরীয়দের এক জনগোষ্ঠীর বিশ্বতত্ত্ব। আজ এই দেখা যে যান ও যন্ত্রের সাহায্যে বহু ব্যাপ্ত হয়েছে শুধু তাই নয়, দেখাকে মিথমুক্ত করার নিয়মিত চেষ্টা করি আমরা। এই সময়ের বিশ্বাস আর ভাবনার সূত্র ধরে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে সাধারণের অধিকার গিয়েছে হারিয়ে, ‘বিশেষজ্ঞ’ নামের ব্যাক্তি ছাড়া বিশ্বতত্ত্ব গঠনের অধিকার নেই কারও।

কসমোলজি ঘিরে এখানেই একটা দর্শন গড়ে তুলেছেন কুন। তৈরি হয়ে গিয়েছে হটস্পট। তবে তাই বলে এখানেই তিনি কাজ শেষ করে দেননি চটপট। কোপার্নিকাসের বিপ্লব ঘিরে লেখা টমাস কুনের বইয়ের কথা বরং কম জানে বিশ্ববাসী। যে বই তাঁকে বিজ্ঞানের ইতিহাসকার তথা দার্শনিক হিসাবে খ্যাতি দিয়েছে সেখানেই কাঠামো নিয়ে আসল টানাটানি। বইয়ের নাম The Structure of Scientific Revolutions. যে দর্শন তিনি এখানে নিয়ে এলেন তাতে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ থাকুক আর না-থাকুক, ব্যাপারটা রীতিমত ‘হট’। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সরল ধারণাকে একেবারে এলোমেলো করে দিয়ে তিনি বললেন, রোজ-রোজ অমন অগ্রগতি হয় না। যেটা হয়, যার নাম তিনি দিলেন Normal Science, তাতে কিছুটা গা-জোয়ারি চলে বলে তাঁর অভিমত। একটা শব্দকে খুব গুরুত্ব দিয়ে তুলে আনলেন কুন– paradigm. সরাসরি বাংলায় কেউ এর অনুবাদ করেছেন কিনা জানা নেই কিন্তু এই শব্দ দিয়ে কুন যা নির্দেশ করতে চাইলেন তা আসলে বিজ্ঞানীদের সিংহভাগের অথবা অংশবিশেষের ক্ষমতার একটা বৃত্ত। এই বৃত্ত কেউ খড়ি দিয়ে এঁকে দেয়নি বা দড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়নি। বিজ্ঞানের কোনও ক্ষেত্রে কোনও একটা তাত্ত্বিক কাঠামো গৃহীত হয়ে গেলে তার অনুসারীদের নিয়ে তৈরি হয় এই বৃত্ত। সেখানে ওই paradigmকে রক্ষা করার চেষ্টা চলে নিয়মিত। কুন খুব স্পষ্ট করে বলেন যে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর কেরিয়ার ব্যয় হয়ে যায় এই কাঠামোর উপযোগিতা প্রমাণের খুচরো কাজ করে। একে তিনি বলেছেন mop up যা অত্যন্ত ম্যাড়মেড়ে এক কসরৎ। বিজ্ঞান যতই প্রশ্ন করার প্রবৃত্তিকে মহার্ঘ্য বলে তুলে ধরুক না কেন, Normal Scienceএর পর্বে বৈপ্লবিক প্রশ্ন পাত্তা পায় না। এমনকি তুলনায় পিছিয়ে পড়া অন্য একটা তত্ত্বকে এমনভাবে অবহেলা করা হয় যাতে তার প্রবক্তারা এই paradigmএ ঠাঁই না পায়। শিক্ষাদীক্ষাও চলে ক্ষমতাসীন তত্ত্বের কাঠামোকে বজায় রাখার শর্তে। এখন কুনকে যাঁরা চেটেপুটে পড়েছেন তাঁদের কাছে এ সব তো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামতা পড়ার মতো বালখিল্য মনে হবে। যাঁরা পড়েননি, এবং তাঁদের পাঠেই আমার লেখার সিদ্ধি, তাঁরা বলবেন, ‘এ কী শুনলাম! অগ্রগামী বিজ্ঞান কিনা এমন জোয়াল ঠ্যালা বলদের মতো আচরণে অভ্যস্ত!’ গণতান্ত্রিক(!) বিশ্ব ভাই, কারও কোনও দায় পড়েনি কুন পড়ে নিজের বিশ্বাসকে খুন করার। তবে হ্যাঁ, আপাতভাবে যা দেখা যায় তা ছাড়িয়ে একটু স্টিং মনোভাবাপন্ন মানে ওই যাকে বলে অনুসন্ধানী স্বভাবের হলে এমন বহু মতবাদের মুখোমুখি পড়তে হবে। তখন হয় পাশ কাটাও আর নয়ত খণ্ডন করো। আরও ভালো নিজের বা অন্যের কোনও মতবাদ দিয়ে তাকে ছাপিয়ে যাও। হয়, সবই হয়, তবে কুনের কথা আর একটু বলতে হবে এখানে।

বইয়ের নামের মধ্যেই রয়েছে ‘বিপ্লব’, revolution, তাহলে বাঁধা গতে চলাটা নিশ্চয়ই শেষ কথা হতে পারে না! না, তা একেবারেই নয়। কোপার্নিকাস হোন বা নিউটন, বহু ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁদের দেওয়া তত্ত্ব এক সময় যথেষ্ট শক্তিশালী বলে প্রমাণিত হয়নি। তখনই সেটাকে পাল্টাতে হল, paradigm পাল্টাতে হল। কুন বললেন, The resulting transition to a new paradigm is scientific revolution. এই তাহলে পেয়ে গেলাম বড় সাধের বিপ্লবকে! কিন্তু এই বিপ্লব কীভাবে আসবে, কীভাবে সঙ্কট দেখা দেবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা কোনও এক বৃত্তে, তার কোনও ধরাবাঁধা সূত্র নেই। নিউটনীয় বলবিদ্যায় যদি একভাবে সমস্যা ঘনীভূত হল তো অষ্টাদশ শতকের রসায়নে সঙ্কট সেঁধিয়ে গেল অন্যভাবে। নানা উদাহরণের সাহায্যে এটা বারবার বলেছেন কুন। বলতে গিয়ে অদ্ভুত সব পরিস্থিতি ফুটে উঠাছে তাঁর রচনায়। যেমন এক প্যারাডাইমের সঙ্গে অন্য প্যারাডাইমের সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রটা। বিপ্লবের মুহূর্তে দুটো দলই বোঝাতে চাইছে যে তারাই নির্ভুল। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তারা যে পথগুলো বা যে পরীক্ষাগুলো ব্যবহার করছে সেগুলো কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্যারাডাইমের মতই incompatible প্যারাডাইম প্রমাণের পদ্ধতিগুলো। তাহলে এখানে শ্রেষ্ঠত্বের বিচার হবে কী করে! কুন বলছেন, পদ্ধতি আলাদা হওয়া মানে যে কেউ কারও কথা বুঝতে পারছে না তা কখনওই নয়। সঙ্ঘাতের মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে আসে নতুন এক প্যারাডাইমের শীর্ষাসনে বসার মুহূর্ত। এই সব কিছুর মধ্যে দিয়ে যেটা বারবার প্রমাণ করতে চেয়েছেন কুন তা হল বিজ্ঞানকে কালের সরণের পথ ধরে পুঞ্জীভূত অগ্রগতি হিসাবে দেখাটা সঠিক দর্শন নয়। তাঁর হটস্পটে যে চলচ্চিত্র দেখানো হয় তার বেশিরভাগ সময়টা শান্ত, এক অর্থে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য শৃঙ্খলাপরায়ণ বিজ্ঞানীদের পরিশ্রম, মাঝে মাঝে শুধু ভুস্‌ করে উঠে আসে বৈপ্লবিক মুহূর্ত। কথাগুলো পড়তে পড়তে মনোযোগী পাঠক হয়ত খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাদৃশ্য। বাস্তবিকই তাই। কুন নিজেও উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক প্যারাডাইম বদলের সঙ্গে বিস্তারিত সাদৃশ্য দেখিয়েছেন বিজ্ঞানের কাঠামো বদলের। এভাবেও তিনি বিজ্ঞানের exclusive হওয়ার দাবিকে খানখান করেছেন।

এবার হল গিয়ে ক্লাইম্যাক্স। সেখানে একটু অন্যরকম কিছু না দিলে কি চলে! এতক্ষণ যা বলেছি তা একটা মতবাদ। বিজ্ঞানের বিবর্তন ঘিরে মতবাদ। সেটা শুনলে কোনও কোনও বিজ্ঞানীর বিরক্তি উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে ১৯৭০ সালে প্রকাশিত টমাস কুনের বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের একেবারে শুরুতেই পরামর্শদাতা সমিতির যে সদস্য তালিকা রয়েছে তাতে অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের ছড়াছড়ি। সেখানে যেমন রয়েছে নীলস বোরের নাম তেমনি আছে বার্ট্রান্ড রাসেলের নাম। অতএব বোঝা যাচ্ছে যে বিজ্ঞানী মহল কুনের বক্তব্য থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে থাকেনি। কিন্তু বৈপরীত্য এখানেই যে সামগ্রিক সমীক্ষা বলছে কুনের বক্তব্যে আকৃষ্ট হয়েছে মূলত সমাজবিজ্ঞানের গবেষকরা। কুন পড়ে এনারাই বিজ্ঞানের সেই কাঠামোর সমালোচনা করতে আগ্রহী হয়েছেন যে কাঠামো আপাতভাবে ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রম জাগায়। বিজ্ঞানের কাঠিন্য এড়িয়ে কুন বিজ্ঞানের কাছাকাছি যাওয়ার একটা পথ দেখিয়েছেন। এখন এসব শুনে আপনি যদি অঙ্ক কষতে বসেন যে কার এতে পৌষমাস হল আর কার সর্বনাশ, তাহলে গ্রে ম্যাটারের এত কসরৎ তো বৃথা যায়!