Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

গুড ফ্রাইডে, শবে-বরাত এবং বাঙালি মধ্যবিত্তের অজ্ঞতা

সুমন সেনগুপ্ত

 

আমাদের বড় হওয়ার সময়ে একটা চালু রসিকতা ছিল এই জানিস এবছরের গুড ফ্রাইডে শুক্রবারে পড়েছে। তখন ভেবে দেখা হয়নি, কিন্তু আজকে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় এটার মধ্যে একটা সুপ্ত অহংবোধ ছিল। যে সুপ্ত অহংকার অন্যকে ছোট দেখায়, নিজের ধর্ম, নিজের সংস্কৃতিকে বড় করে দেখায়। অথচ সেদিন যদি আমরা একবারও আমাদের প্রতিবেশী ক্রিস্টান মানুষটির থেকে জানতে চাইতাম গুড ফ্রাইডে কী বা এর তাৎপর্য কী? তাহলে বোধহয় দেশের বিভিন্ন জায়গায় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষদের অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হত না আজকে। অথচ স্কুলে কলেজে অফিসে ছুটি থাকে। আমরা অনেকেই হয়তো জানতেও চাই না কিসের ছুটি? কেন ছুটি? প্রতিবেশী সংখ্যালঘু মানুষ সম্পর্কে মধ্যবিত্তের এই স্বেচ্ছাবৃত্ত অজ্ঞতা একজন মানুষকে অন্য মানুষকে দূরে ঠেলেছে এবং সেটা একদিনে হয়নি দীর্ঘদিন ধরে হয়েছে।

শোনা যায় যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার সময়ে যীশু নাকি বলেছিলেন ‘ঈশ্বর ওদের ক্ষমা করে দিও, ওরা জানে না ওরা কী ভুল করছে’। এই লেখাটা যদিও যীশুর বাণী বা খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারের জায়গা নয় কিন্তু তাও কিছু কথা প্রাসঙ্গিক ভাবেই উঠে আসতে চায়। শোনা যায়, যীশু বলেছিলেন ‘ঈশ্বরকে ভালবাসুন, মনপ্রাণ দিয়ে, সমস্ত শক্তি দিয়ে এবং এর পাশাপাশি নিজের প্রতিবেশীকে ভালবাসুন সমস্ত কিছু দিয়ে’। অপরকে ভালবাসার এই আর্তিটাই আসলে ঈশ্বরকে ভয় পাওয়ার বদলে মানুষকে একটা অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতেই পারে কিন্তু প্রতিবেশীকে ভালবাসার বিষয়টি নিয়ে আজকের এই অশান্ত সময়ে কারুর দ্বিমত থাকা উচিত নয়। আমরা এই অশান্ত সময়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি যে আমরা অন্য ধর্ম, জাতির আচার আচরণ সম্বন্ধে এতটাই অজ্ঞ যে আমরা জানার চেষ্টা অবধি করি না আমাদের প্রতিবেশী খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের অনুষ্ঠানগুলো কী বা কেন ওই মানুষেরা এই অনুষ্ঠান পালন করেন? সেই জায়গা থেকেই গুড ফ্রাইডে, ইস্টার সানডে বা শবে-বরাত আমাদের ছুঁতে পারে না বা বলা ভালো ছুঁতে চাই না।

হিজরি সনের শাবান মাসের ১৫ তারিখ রাতে পৃথিবীর সব মানুষের আগামী বছরের ভাগ্য লেখা হয় বলে মুসলমানেরা বিশ্বাস করে। পরের বছর কে পৃথিবীতে জন্মাবে আর কার মৃত্যু হবে তাও এই রাতেই লেখা হয় বলে মুসলমানদের বিশ্বাস। মানুষের রুজিও এই রাতেই নির্ধারিত হয় বলে তাঁরা মনে করেন। এই রাতে মুসলমান মানুষদের কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনদের কবরস্থান জিয়ারত করেন মানে ভক্তি ভরে ওই কবরস্থানে জড়ো হন। কবরে প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালানোর চলও রয়েছে। কোনও কোনও কবরস্থানে আলোকসজ্জাও করা হয়। বাড়িতে বাড়িতে হালুয়া রুটি তৈরি করাও হয়। অনেকটা আমাদের ‘হিন্দু’দের ভূতচতুর্দশীর মতো। আমাদের ১৪ প্রদীপ দেওয়ার সঙ্গে হয়তো মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, গ্রামের চোদ্দটা জায়গায় প্রদীপ জ্বালানোর যে রেওয়াজ আছে যা আজকে বাড়ির চোদ্দটা কোণায় এসে ঠেকেছে তার সঙ্গে এই রীতির বেশ কিছু মিল নেই? আমাদের পূর্বপুরুষদের আলো দেখানোর জন্য এই যে পদ্ধতি তার সঙ্গে মিল আছে কিছুটা মুসলমানদের শবেবরাতের কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা জানার চেষ্টা অবধি করিনি এই বিষয়ে। আমরা ছুটি উপভোগ করেছি কিন্তু জানার চেষ্টা করিনি ঈদুলফিতর এবং ঈদজ্জোহার তফাৎ কি? কোনটাতে কুরবানি হয় কোনটাতে হয় না? অথচ আমরা পাশাপাশি বাস করেছি দীর্ঘদিন ধরে। আমাদের কোনও খ্রিষ্টান কিংবা মুসলমান বন্ধু নেই। থাকলেও সেটা কম। আমরা চিরকাল আমাদের স্বেচ্ছাবৃত্ত অজ্ঞতা দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষদের দূরে সরিয়ে রেখেছি। সেখান থেকে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস আর তারপর বেড়েছে দূরত্ব। আর এই দূরত্বের ফোকর গলে ঢুকে পড়েছে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ হয়তো অন্তর্নিহিত ছিল কিন্তু এই অপরিচয় আমাদের মধ্যেকার পাঁচিলটাকে আরও পাকাপোক্ত করেছে, কেউ মনে করেন সমস্ত মুসলমান সন্ত্রাসবাদী, সমস্ত মুসলমান অন্তত ১৪টি সন্তানের পিতা। আবার কেউ মনে করেন সমস্ত খ্রিষ্টান ধর্মীয় ভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং সমস্ত মুসলমান একদিন দেশের সমস্ত কিছু দখল করে নেবে। তাও খ্রিস্টানদের সম্পর্কে অতটা বিদ্বেষ না থাকলেও মুসলমানদের মনেই করা হয় সন্ত্রাসবাদী অথচ মালেগাও বিস্ফোরণের মূল চক্রীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দিয়ে অন্য এক সন্ত্রাসবাদকে মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে যান তাঁরাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রবাসী’ গ্রন্থতে ‘হিন্দু মুসলমান’ ব’লে একটি প্রবন্ধতে লিখেছিলেন ‘ধর্মমত ও সমাজরীতির সম্বন্ধে শুধু প্রভেদ নয়, বিরুদ্ধতা আছে, এ কথা মানতেই হবে। অতএব আমাদের সাধনার বিষয় হচ্ছে, তৎসত্ত্বেও ভালো রকম করে মেলা চাই’। কিন্তু আমরা কি সত্যিকারের মিশতে পারি বা বলা ভালো মিশতে চাই? এই না মেলামেশার ফলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বেড়েছে দূরত্ব এবং সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে অভিমান। ব্যক্তিগত এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যায় যা থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে আমাদের এই না জানাটা কি আমাদের শিক্ষার অভাবে না এর মধ্যেও কোনও আধিপত্যবাদী চিন্তাও আছে। অন্য রাজ্যের কথা জানা নেই কিন্তু বাঙালি মধ্যবিত্তের বেশ কিছু ধারণা আছে। উদাহরণ দিতে গেলে হয়তো রাত পেরিয়ে যাবে। যেমন কেউ মনে করেন একজন মুসলমান যদি কোনও জলের বোতল থেকে জল খান তারপর নাকি সেই বোতলে জল খাওয়া উচিত নয় কারণ সেই বোতলে ওই মুসলমান মানুষটি তাঁর থুতু মিশিয়ে দেন। কেউ ভাবতেই পারেন এটা বাড়িয়ে বলা কিন্তু এটা আছে, কিন্তু কোথা থেকে এই ধারণার উৎপত্তি জানা নেই। একটা কারণ অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর এবং সংবাদমাধ্যমের ভুমিকা। এর সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে দেশের শাসক দলের তরফ থেকে পরিকল্পিত মিথ্যাচার যা রোজ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়ানো হয়। অনেকে ভাবেন মুসলমান মানেই তাঁরা পাকিস্তানের সমর্থক, তাঁদের শুধু তোষণ করা হয় এবং তাঁরা সুবিধা ভোগ করেন। অথচ বাঙালি মধ্যবিত্ত এটা কক্ষনও ভাবে না তাঁর এই ভুল ধারণা তাঁর পাশের মুসলমান মানুষটিকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। মুসলমান মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে বারবার দেখা গেছে যে তাঁরা কিন্তু চিরকাল বঞ্চনারই শিকার। যদি ৭০ বছর ধরে তোষণই হতো তাহলে কি আজও প্রতিবেশীকে চিনুন বা পড়শির সঙ্গে অনুষ্ঠানগুলো করতে হতো? এই মুহূর্তে দেশের যা অবস্থা সেখানে বড় বড় রাজনৈতিক সভা সমাবেশ কতটা হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টানদের কাছাকাছি আনতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার পাশাপাশি যদি এই ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ নেওয়া যায় তাহলে হয়তো দূরত্ব কিছুটা কমতে পারে।

উড়িষ্যার কেওনঝড়ে আদিবাসিদের মধ্যে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষদের সেবা করতেন, কাজ করতেন গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স। বজরং দলের কর্মীরা মনে করেছিলেন যে এই মানুষটি ধর্মান্তর করাচ্ছেন তাই তাঁকে তাঁর দুই নাবালক পুত্র সমেত জ্বালিয়ে দেওয়া হয় জীবন্ত। তারপর কবীর সুমনের কলমে বেরিয়েছিল একটি গান, যা আজকেও হয়তো সমান প্রাসঙ্গিক।

ওই তো মানুষ ধর্মের কথা বলছে
আগুনে তিনটি মানুষের দেহ জ্বলছে,
কেওনঝাড়ের আদিবাসীদের গ্রামে
বজরঙ্গদল মানুষ পোড়াতে নামে।

ওই তো কেমন ধর্মের ধ্বজা উড়ে
আগুনে তিনটি মানুষের দেহ পোড়ে,
হাতের সঙ্গে দুই নাবালক ছেলে
ঐ তো মানুষ ধর্মের কথা বলছে

বজরঙ্গদল দিয়েছে আগুন জ্বেলে।

ওই তো কেমন ধর্মের ভগ্নাংশ
গন্ধ ছড়ায় মানুষের পোড়া মাংস,
পুড়ছে ছেলেরা পুড়ছে তাদের বাপ
ধর্ম নিচ্ছে বেধর্মীদের মাপ।

ওই তো কেমন ধর্মের খাঁটি দর্শন
সহজেই হয় ধর্মযাজিকা ধর্ষণ,
কে ছিল হিন্দু কে হল খ্রিষ্টান
কে হল বৌদ্ধ কে হল মুসলমান।

ওই তো কেমন ঘৃণার ঘৃণ্য আইন
শহীদ হলেন গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স,
থেকেছেন তিনি কুষ্ঠ রোগীর পাশে
তাঁর ধর্মটা মানুষকে ভালোবাসে।

আমার ধর্ম তোমায় জানিয়ে যাই
গানের দিব্যি আমি প্রতিশোধ চাই,

আমার বোধের হাতিয়ারে শান দিয়ে
পুড়ছি আমিও তোমায় সঙ্গে নিয়ে।

এই লেখাটা যখন প্রায় শেষের পর্যায়ে, তখন আমার কন্যা আমার সঙ্গে কথা বলতে এল। তারপর কী কথা প্রসঙ্গে বলল – ‘বাবা, আমার স্কুলের এক বন্ধু ওয়ালিউল্লা, ও তো বাংলাদেশি।’ আমি বললাম ‘বাংলাদেশি কেন হবে? ও তো ভারতীয়, ও তো তোমার সঙ্গে পড়ে।’ বলল -‘না ও কিরকম ভাবে কথা বলে জানো? ও বলে মিস আমার টয়লেট লেগেছে।’ আমি বললাম ‘তাতে কী, ও যেভাবে বাড়িতে কথা শোনে সেভাবেই বলে, এর মানে কি ও বাংলাদেশি হয়ে গেল?’

আমার মেয়ের বয়স ৭, ওর দেশ সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই। ও কাঁটাতার জানে না, ও ভারতীয়, বাংলাদেশির তফাৎ বোঝে না কিন্তু এই ধারণা কোথা থেকে পেল? নিশ্চিত ওর অন্য কোনও বন্ধু বলেছে, যে তাঁর বাড়িতে শুনেছে। যে বাবা কিংবা মায়েরা এই কাজটা জেনে হোক বা না জেনে হোক, এই কাজটা করলেন তাঁরা কি অজান্তে দেশের পরিবর্তে দ্বেষ ঢেলে দিলেন না?