Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সেকুলারিজম… আমরা সেকুলার ছিলাম… সেটা আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে

জীজা ঘোষ

 

জীজা ঘোষ সম্পর্কে নতুন করে কিছু পরিচয় দেওয়ার নেই। খবর একটা, সেটাও পুরনো, যে জীজা এই চলমান লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়েছেন। সে নিয়ে, এবং সামগ্রিকভাবে বর্তমান সময়, আমাদের দেশ, এবং বর্তমান নির্বাচন নিয়ে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন সৌমিত দেব

বর্তমান পরিস্থিতিতে ধর্ম বা জাতপাতের নামে আমাদের দেশে যেভাবে ক্রমাগত বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, বা এই ধরনের ঘটনাগুলো যে সামনে আসছে, সেই বিষয়টা নিয়ে আপনার কী মনে হয়? কী করা উচিৎ?

পৃথিবী জুড়েই জাতির নামে, ধর্মের নামে, যে যেভাবে পারছে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে কেন, এই কদিন আগেই আমাদের পাশের দেশে, শ্রীলঙ্কায়, কত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, I don’t know, মানে আমরা দিনদিন এগিয়ে যাচ্ছি না পিছিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মেন্টালিটিটা কী হচ্ছে? আমরা ডাইভার্সিটিটা মেনে নিতে পারছি না, যেটা আমাদের ভারতবর্ষের একটা অন্যতম গুণ ছিল যে আমরা সবাইকে নিয়ে থাকি। সেটা কিন্তু আর থাকছে না।

আচ্ছা গোটা পৃথিবী জুড়েই এই যে একটা পোলারাইজড অবস্থা চলছে, সর্বক্ষেত্রেই এক্সট্ট্রিমিস্ট রাইট উইং-এর একটা উত্থান, সেটা নিয়ে আপনার কী মনে হয়?

আমার মনে হয় পুরোটা একটা পলিটিকাল গেম। ধর্মকে একটা পলিটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই আমরা ধর্মের নামে আমাদের যে পলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা বা আমাদের যে পাওয়ার অ্যাজেন্ডা আছে, সেগুলোকে চ্যানেলাইজ করছি।

মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে?

হ্যাঁ! অবশ্যই প্রোপাগান্ডা! ধর্মের যদি আমরা মূলে যাই তাহলে কোনো ধর্মই কিন্তু হিংসার কথা বলে না। তারা শান্তির কথা বলে। ইসলামে যা আছে, সেটা ওরা মিসইন্টারপ্রেট করছে। এটা একটা পলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা।

এর থেকে বেরুনোর উপায় কী? আপনার কী মনে হয়?

এটা না ঠিক জানি না। ক্ষমতা পাওয়ার জন্য, যেটা আমাদের ছিল, সেকুলারিজম, আমরা সেকুলার ছিলাম, সেটা আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে।

আচ্ছা এই যে বিভিন্ন নেতানেত্রীরা ভোটের জিতলে প্রতিশ্রুতি হিসেবে বলছে কোনও একটা নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে তাড়িয়ে দেব, বা ঢুকতে দেব না, বা তাড়াব না বলে যাদের যাদের কথা বলছে বাকি আর একই পড়ে থাকছে যাদের তাড়ানো হবে। সেটাও প্রকাশ্যে। এটা একটা দেশ কোন অবস্থায় গেলে সম্ভব?

একটা জিনিস আমার মনে হয়, মার্ক্স যেটা বলেছিলেন, “রিলিজিয়ন ইজ আ ওপিয়াম ফর দা পিপল”, আমার মনে হয় সেটা খানিকটা সত্যি। কারণ ধর্মের নামে মানুষকে যাই বলা হোক তারা সেটা বিশ্বাস করবে। একটা সেন্টিমেন্ট। রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট, যেটাকে পলিটিকাল পার্টিরা ইউজ করে চলেছে। আমি বুঝতে পারি না, এই যে এত হিংসা, এই যে সামান্য গরু মারা নিয়ে, এত হিংসা, এটা বিদ্বেষ এটা কেন?

এই যে এক্সট্রিম রাইট উইংয়ের উত্থানটা, গোটা পৃথিবী জুড়ে, সাধারণ মানুষের ওপরও তো তার একটা দায়িত্ব বর্তায়? সাধরণ মানুষ তো এটাকে বিপুলভাবে সমর্থন করছে। সেখানে আমাদের কোথায় ল্যাগ হচ্ছে, সাধারণ মানুষ হিসেবে?

ওটা আমাদের শিক্ষা এবং বোধের ক্ষেত্রে ল্যাগ হচ্ছে। যেটা মেজরিটি চাইবে, সেটাই তো আমরা ফলো করি। আমি ঠিক জানি না, কারণটা কী? ইয়াং জেনারেশনের সাথে আমার ঠিক কানেকশন নেই, কিন্তু আমরা যখন ওই এজে ছিলাম আমাদের একটা আইডিওলজি ছিল, একটা ভিশন ছিল, এখন কি সেটা কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে? একটা ভিশন… একটা আইডিওলজি…

আচ্ছা আপনি কি মনে করেন অ্যাপলিটিক্যাল হওয়া সম্ভব?

নাহ। টোটালি অ্যাপলিটিক্যাল হওয়া কোনও মতেই যায় না।

ভারতবর্ষে লোকসভা নির্বাচন চলছে। এইবার আপনাকে যদি একেবারে নন-বায়াসডভাবে জিজ্ঞাসা করা হয় যে আপনি কী চাইছেন? কারা জিতুক?

(হাসি) আমি নিজেই কনফিউজড। কোনও লিডারকেই আমি দেখতে পাচ্ছি না যে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মোদির কোয়ালিটি আছে, কিন্তু মোদির তো সবচাইতে বড় ল্যাগ কম্যুনালিজম। কম্যুনালিজম দিয়ে, রাইট উইং দিয়ে, দেশ চলে না।

হিটলারের নাজি পার্টি যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে তখন তারা সাংঘাতিক পপুলার ছিল। এইবার কথা হচ্ছে এই যে কোনও কাজ না করে একটা অন্তঃসারশূন্য পপুলিস্ট রাজনীতি, এটা পপুলার কেন হচ্ছে? সেই শিক্ষা এবং বোধের অভাব?

শিক্ষাও আছে আর মানুষের তো অল্টারনেট নেই। অল্টারনেট কে আছে? যাকে আমরা লিডারশিপের ওই জায়গাটায় বসাতে পারব। দিস ইজ ভেরি স্যাড…

মিডিয়ার জায়গাটা কেমন? এই যে প্রতিটি দলেরই কোনও না কোনও মিডিয়ার সাপোর্ট রয়েছে?

মিডিয়া আর কিছু নেই, মিডিয়া এখন পলিটিক্যাল পার্টির মুখপত্র!

এইবারে কোনও লিডার বা কোনও ব্যাক্তির ওপর কী আপনার কোনও আশা আছে?

এইবারে আমার কোনও আশাই নেই। মানে এত নিরাশ।

এই যে ধরুন কানহাইয়া কুমার, ২০১৪-র পর থেকে ছাত্রাবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়ে বর্তমানে লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। আপনার কী মনে হয়, এমন আরও লিডার আসা দরকার?

নিশ্চয়ই দরকার। উই নিড লিডারস। ভালো লিডার পেলে আমাদের দেশটা দাঁড়াত। যেমন ধরা যাক, কেজরিওয়াল। ও যখন এসেছিল আমাদের আশা জেগেছিল। আমাদের লিডার চাই। লিডার তৈরি হচ্ছে না।

কেজরিওয়াল শিক্ষার ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেছেন। বা ধরা যাক এই রিসেন্টলি এতগুলো গাড়ি দেওয়া হল যাতে করে নালার ভেতর না নামতে হয়। কিন্তু এই কাজগুলোর চাইতেও কেন মানুষ বেশি প্রভাবিত হচ্ছে যখন আমরা ন্যাশনালিজমের কথা বলছি? এটা কী শুধুমাত্র শিক্ষা না কী আমাদের ছোট থেকে বড় হওয়াটার একটা প্রভাব রয়েছে? মানে যেটাকে ধরা যাক আমি ছোট থেকে ভালো বলে চিনেছি। এই ভালো আর মন্দ চিনিয়ে দেওয়ার যে প্রচেষ্টাটা এটাকে আপনি কী ভাবে দেখছেন?

এটা না জানি না গো! দেখো, আমরা টোটালি একটা অন্য পলিটিক্যাল রেজিমে বড় হয়েছি। একটা কম্যুনিস্ট রেজিমে বড় হয়েছি। ওটাকে নিয়ে আমরা এগিয়েছি। কিন্তু আজকাল আর জেনারেশনের সাথে আমার কোনও টাচ নেই। আমি জানি না তারা কতটা পলিটিক্যালি কনশাস। আমদের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট আইডিওলজি ছিল, একটা পলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা ছিল…

আপনার কী মনে হয়, মার্ক্সিজম কী একটা ইউটোপিয়া না এটাকে কার্যকর করা সম্ভব?

যেটা দেখা গেল যে সব জায়গায় মার্ক্সিস্ট রেজিম আসবার পর একটা সময়ে সেটা ফল করছে, কিন্তু কী করে বলি এটাই রিয়ালিটি…

আপনার কী মনে হয় ল্যাগটা কোথায়? যেটা পরিবর্তন হচ্ছে না বলে? বিভিন্ন সময়ে এই যে আমরা শুনতে পাই নিও কম্যুনিজম, নিও মার্ক্সিজম। সাম্প্রতিক সময়ে মার্ক্সের দুশো বছর নিয়ে এত সভা, ইত্যাদি হল। লেভার কোঅপারেটিভের কথা সেখানে কেন হচ্ছে না?

যেটা বললেন, মার্ক্সের দুশো বছর হল, নিও মার্ক্সিজম, নিও কম্যুনিজম… এখন আমাদেরও তো প্রচুর চেঞ্জ হয়েছে, সব দিক দিয়ে। আমাদের সেটা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের লিডার চাই। সেটাই তো নেই। মার্ক্সিজম ইজ আ থিওরি। ইটস নট না আল্টিমেট যে এটাকে পালটানো যাবে না। এটা মাথায় রাখতে হবে, কন্টেমপরারি এনভায়নমেন্টটা।

আচ্ছা এইবারের নির্বাচনেও যদি প্রো-রাইট উইং শক্তি জেতে, তাহলে আপনার কী মনে হয়, আমাদের অবস্থা কী হতে পারে?

(হেসে) তাহলে আমরা যাব, ফ্রাইংপ্যান টু ফায়ার। এখন ফ্রাইং প্যানে আছি, এবার সোজা ফায়ারে যাব। আর তো কোনও উপায় দেখছি না।

এই যে একটা হাওয়া উঠছে, নোটায় ভোট দেওয়ার বা ভোট না দেওয়ার, আপনার কী মনে হয়, সেটা এত বেশি করে কেন হচ্ছে?

কারণ মানুষ ফ্রাস্ট্রেটেড। তার কাছে আর কোনও অপশন বাকি নেই! আমাদের যারা বন্ধুবান্ধব সবারই এই এক হতাশা, যে কী হবে? আমরা কোনদিকে যাচ্ছি…

এই নির্বাচনে তো আপনি একটা বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

আমাদের যেটা মেইন অ্যাজেন্ডা, এই প্রতিবন্ধকতা যুক্ত মানুষরা যাতে ভোট দিতে পারে, তাদের যে সব সুযোগ সুবিধে লাগবে, এটা নিয়ে সারা দেশে মুভমেন্ট চলছে। যাতে তারা সুষ্ঠুভাবে ভোটটা দিতে পারে।

এই যে ক্যাম্পেনটা আপনারা করলেন সেটার কার্যকারিতার ব্যাপারে আপনি কতটা আশাপ্রদ?

আমাদের কনসেন্টটা ছিল মূলত যারা প্রতিবন্ধকতা যুক্ত মানুষ তাদের ভোটাধিকার নিয়ে। তারা যাতে নিজের অধিকার, ডিগনিফায়েড ওয়েতে নিজের ভোটটা দিতে পারে সেটাই আমাদের কনসেন্ট। যেন দোতলায় ভোটগ্রহণ না হয়। যাতে তাদের ভোট কেউ না দিয়ে দেয়। যদি এখন চেয়ারে করে আমায় নিয়ে যেতে হয় সেটা আমার পক্ষে সম্মানজনক নয়। আমাদের এইটাই কনসার্ন ছিল যে এই মানুষেরা যাতে করে নিজের ভোটটা স-সমম্মানে দিতে পারে। এইটুকুই।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

(হাসি) ধন্যবাদ।