Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আদালত ও একটি মেয়ে (পর্ব-২): উত্তরকাণ্ড

কৌশিক দত্ত

 

আদিকাণ্ড দ্রষ্টব্য

শীর্ষ আদালতের শীর্ষ কর্তার বিষয়ে রায় শোনালেন শীর্ষ আদালত। প্রত্যাশিতভাবেই ক্লিনচিট পেলেন প্রধান বিচারপতি, যা তাঁর প্রাপ্য ছিল অধস্তনদের কাছ থেকে সম্মানের স্মারক স্বরূপ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে একবাক্যে জানিয়ে দেওয়া হল, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনও সারবত্তা নেই, যে সিদ্ধান্ত আগে থেকেই আদালতের সকলের মনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কথাগুলো এভাবে পড়তে অস্বস্তি হচ্ছে, না? একরকম গণতন্ত্রহীনতা, আইনশূন্যতার অনুভূতি হচ্ছে না? লিখতে গিয়ে আমার তো হচ্ছে তেমন অনুভূতি।

তবে কি জনগণকে খুশি করার জন্য প্রধান বিচারপতিকে জোর করে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত ছিল? তিনি কি সত্যিই নির্দোষ হতে পারেন না? ক্ষমতাবান ব্যক্তি মাত্রেই কি প্রতি ক্ষেত্রে অন্যায়কারী? তাঁরা কেউ কখনও কোনও ভালো কাজ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারেন না? তাঁদের বিরুদ্ধে কি অন্যায় হতে পারে না?

না, ব্যাপারটা সেরকম নয়। অভিযুক্ত প্রধান বিচারপতি প্রকৃতই দোষী, এমন ধরে নেবার কোনও কারণ নেই। তিনি নির্দোষ হতেই পারেন। নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়ে সম্মান ফিরে পাবার অধিকারও তাঁর আছে। এসব নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই। শুধু এই “প্রত্যাশিত” ব্যাপারটা না থাকলে ভালো হত। এই যে আমরা সকলেই প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম যে আভ্যন্তরীণ তদন্তের রিপোর্ট প্রধান বিচারপতির অনুকূলেই যাবে, অভিযোগকারিণী বিশেষ কল্কে পাবেন না, এমন আগাম ধারণা তৈরি না হলে ভালো হত। এই যে একটা নির্দিষ্ট প্রত্যাশা বিচারের আগে থেকে তৈরি হয়ে গেল অভিযোগকারিণী থেকে সাধারণ মানুষ সবার মনে, যেন এমনটা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না, এটা খারাপ হল। বিচারের আগেই যখন রায় আন্দাজ করা যায় এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে, তখন বুঝতে হবে কোথাও যেন বিচার প্রক্রিয়ার চোখবাঁধা নিরপেক্ষতার প্রতি আমাদের আস্থা টলে গেছে। আমরা যেন পুরো প্রক্রিয়াকে এক আবশ্যিক নাটক ভেবে নিয়েছি। যেন ধরেই নিয়েছি, এ তো ঘরোয়া ব্যাপার। বন্ধুরা কি বন্ধুকে বিপদে ফেলতে পারে? তার ওপর প্রধান বিচারপতি যৌন হেনস্থাকারী সাব্যস্ত হওয়া মানে তো স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টেরই অপমান। অতএব নিজেদের মান রক্ষার খাতিরে সবাই মিলে প্রধান বিচারপতিকে নির্দোষ সাব্যস্ত করবে। এর ফলে হল কী, যদি চিফ জাস্টিস মহাশয় সত্যই নির্দোষ হন, তাও সাধারণ মানুষ ভাববে, উনি অন্যায় করেও নিজের ক্ষমতাবলে মুক্তি পেলেন।

অথচ এমনটা তো হবার কথা ছিল না। সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের যাঁরা বিচারক, কর্মক্ষেত্রে বিচারকের আসনে বসে তাঁদের তো কারো অধস্তন বা বন্ধু বা শত্রু হবার কথা নয়। তাঁরা তখন শুধুমাত্র সত্যের পূজারি। তাঁদের ওপর এই ভরসাটা বজায় থাকা জরুরি বিভিন্ন কারণে। আমি বলছি না যে তাঁরা নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়েই তদন্ত করেছেন বা রায় দিয়েছেন, কিন্তু ঘটনার স্রোত যে খাতে প্রবাহিত হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে এই জাতীয় সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। সেটাই যথেষ্ট ক্ষতিকর। এই পরিণতি কিন্তু সহজেই এড়ানো যেত সমগ্র তথ্যানুসন্ধান ও বিচারপদ্ধতির মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখলে।

এই কেস সংক্রান্ত প্রথমদিকের ঘটনাবলি এবং তদন্ত কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়ে “আদালত ও একটি মেয়ে” প্রথম পর্বে লিখেছিলাম। সেসবের পুনরাবৃত্তি না করে এবার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এক ঝলক দেখা যাক। যেহেতু তদন্ত কমিটি নিজেদের রিপোর্টের কপি প্রধান বিচারপতি ছাড়া কাউকে দেবেন না এবং প্রকাশ্যে আনবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাই আমাদের অনেকাংশে নির্ভর করতে হবে অভিযোগকারিণীর বয়ানে তাঁর নিজ অভিজ্ঞতার বিবরণের ওপর। তদন্তের বিস্তারিত রিপোর্ট বাইরে না প্রকাশ করার একটি সঙ্গত কারণ আছে। ২০০৩ সালের ইন্দিরা জয়সিং বনাম সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়া (5 SCC 494) মামলার রায়ে বলা হয়েছিল যে কোর্টের আভ্যন্তরীণ (in house) তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসমক্ষে আনা হবে না৷ সেই রিপোর্ট প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া হবে, যাতে তিনি তদনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সুতরাং রিপোর্টটি সংবাদপত্রের হাতে তুলে দিতে বা বুলেটিনে প্রকাশ করতে তাঁরা বাধ্য নন, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতেই রিপোর্ট তুলে দিয়ে তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে বলা সাধারণ বুদ্ধিকে ধাক্কা দেয় না কি? প্রশ্ন জাগে, প্রধান বিচারপতিকে দোষী সাব্যস্ত করা কি আদৌ সম্ভব ছিল এই পদ্ধতিতে? তাঁর হাতে রিপোর্ট দিয়ে কী বলা হত? “ধর্মাবতার, তদন্তানুসারে আপনাকেই দোষী মনে হচ্ছে। এবার অনুগ্রহ করে আপনি নিজেকে শাস্তি দিন।” এরকম কিছু? এক্ষেত্রে রিপোর্টের কপি শ্রী রঞ্জন গগৈ পেতেই পারেন অভিযুক্ত হিসেবে, কারণ এই তথ্য জানার অধিকার অভিযুক্তের আছে। সেই একই যুক্তিতে অভিযোগকারিণীও তো রিপোর্টের কপি পাবার অধিকার রাখেন। তাঁকে কিন্তু কিছুই দেওয়া হয়নি।

এছাড়াও শীর্ষ আদালত এমন বেশ কিছু কাজ করেছেন, যা অভিপ্রেত ছিল না।

১) মাননীয় শ্রী গগৈ প্রথমেই জরুরি অধিবেশন ডেকে নিজেই নিজের বিচারক হয়ে বসলেন।

২) শ্রী গগৈ বেঞ্চে উপস্থিত থেকেও রায়ে সই করলেন না।

৩) কোনো তথ্যানুসন্ধান বা বিচার শুরু হবার আগেই অভিযোগটিকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করা হল এবং ষড়যন্ত্র আখ্যা দেওয়া হল। এই আশ্চর্যজনক কাজটি করলেন তিনজন বরিষ্ঠ বিচারপতি এবং ভারত সরকারের আইন সংক্রান্ত বিভাগের সবচেয়ে বড় দুই আধিকারিক।

৪) যৌন হেনস্থার অভিযোগ সংক্রান্ত বিচারপ্রক্রিয়ার যাবতীয় নীতি বিসর্জন দিয়ে একদম শুরুতেই অভিযোগকারিণীর অনুপস্থিতিতে তাঁর চরিত্রহনন করা হল শীর্ষ আদালতের মতো স্থানে। সাদা ভাষায় একে “victim blaming” বলা হয়। এই গর্হিত কাজে জড়িত সেই বরিষ্ঠ বিচারপতি ও আইনজ্ঞরাই৷ সুপ্রিম কোর্ট এই কাজ করেছেন, সেই অজুহাতে এবার অনেকেই এই কর্মটি করবেন এবং পার পেয়ে যাবেন, এ অতি দুর্ভাগ্যের কথা।

৫) এই ঘটনার পর যখন একটি আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠিত হল বর্ষীয়ান বিচারপতি এস. এ. বোবডের নেতৃত্বে, তখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির একটি সুপারিশও শোনা হল না। নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে জাস্টিস ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল সহ অনেকেই লিখিতভাবে জানান যে প্যানেলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের (অর্থাৎ বর্তমান প্রধান বিচারপতির অধীনে কাজ করেন না এমন বাইরের কাউকে) রাখা হোক। এই যুক্তিসঙ্গত দাবিটি সহজেই মেনে নেওয়া যেত, যদি সত্যিই লুকনোর কিছু না থাকে। এই পর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকাও অদ্ভুত। তাঁরা শ্রী বেণুগোপালকে চাপ দেন ঘোষণা করতে যে এই সুপারিশ তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত, সরকারের বক্তব্য নয়। সম্ভবত “বিজেপি সরকার প্রধান বিচারপতিকে তাড়াতে চায়” জাতীয় সন্দেহের ঊর্ধ্বে নিজেদের রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছিলেন।

৬) এই মামলার সূচনা হবার পর ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নিয়ে পাল্টা হলফনামা দাখিল করেন আইনজীবী উৎসব বাইন্স। তাঁর কথাবার্তা যতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়েছে, ততটা গুরুত্ব মূল অভিযোগকারিণীকে দেওয়া হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে প্রধান বিচারপতি তথা শীর্ষ আদালতের মান-সম্মান নিয়ে যতটা চিন্তিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিচারকেরা, একজন মহিলা কর্মীর সম্মান নিয়ে ততটা ছিলেন না। এই মনোভাব অভিযোগকারিণীর বিরুদ্ধে গেছে।

৭) জাস্টিস এস এ বোবডে, জাস্টিস ইন্দিরা ব্যানার্জি ও জাস্টিস ইন্দু মালহোত্রার আদালতে অভিযোগ সংক্রান্ত শুনানির শুরুতেই অভিযোগকারিণীকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এটি কোনও ইন-হাউজ তদন্ত কমিটি নয় বা যৌন নির্যাতন নিরোধক কমিটিও নয়। এটি নাকি একটি “informal” কমিটি। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে এই কমিটির চরিত্র কী? তাঁদের রিপোর্টের গুরুত্বই বা কী?

৮) এই কমিটি বিশাখা গাইডলাইন বা ২০১৩ সালের POSH আইনের সুপারিশ মেনে কাজ করেননি। এমনকি অভিযোগকারিণীর অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁকে আইনজীবীর সাহায্য নিতে দেওয়া হয়নি এবং সঠিক রেকর্ড রাখা নিশ্চিত করতে শুনানির ভিডিও রেকর্ড করতেও তাঁরা রাজি হননি।

৯) শুনানি চলাকালীন অভিযোগকারিণীকে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়। এমনকি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়। ভদ্রমহিলার বয়ান অনুযায়ী আদালত আইনজীবীদের সম্বন্ধে বলেন, “ওরা ওরকমই”। এই কথার মানে বোঝা দুষ্কর। আদালত কি আইনজীবীদের বিশ্বাস করেন না? তা যদি হয়, তবে আইনজীবীরা আদালতে কী করছেন? আর তা যদি না হয়, তবে কেন ইনি আইনজীবীর সাহায্য নিতে পারবেন না?

১০) শুনানির মাঝপথে অভিযোগকারিণী স্পষ্ট জানান যে তিনি এই কমিটির ওপর আস্থা হারিয়েছেন এবং সুবিচার পাবার আশা রাখছেন না। একথা জানিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান। এই অনাস্থা জ্ঞাপনের পর একটু থেমে, অনাস্থার কারণ জেনে, আস্থা অর্জন করে এগোলে ন্যায়ের ধারণার সঙ্গে কাজের মিল থাকত। বদলে জাস্টিস বোবডে কমিটি অভিযোগকারিণীর অনুপস্থিতিতে (ex parte) তদন্ত সমাপ্ত করে অভিযোগটি খারিজ করে অভিযুক্তকে তদন্ত রিপোর্ট পাঠিয়ে দেন এবং অভিযোগকারিণীকে তা দিতে অস্বীকার করেন। প্রকারান্তরে অভিযোগকারিণীই দোষী সাব্যস্ত হলেন মিথ্যা অভিযোগ এবং ষড়যন্ত্রের দায়ে। এইরকম বিচারসভা নিয়ে এক কবি তাঁর ছোটগল্পে লিখেছিলেন, “অপরাধী জানিল না কী তাহার অপরাধ কিন্তু বিচার হইয়া গেল।” গত বৃহস্পতিবার তাঁর জন্মদিনে আমরা গান-টান গাইলাম, কিন্তু বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেই চলল।

এসবের পরে এমনটা ভাবা খুবই কঠিন ছিল যে তদন্ত কমিটি আদৌ সবদিক খতিয়ে দেখতে, সত্য জানতে আগ্রহী বা প্রয়োজনে তাঁরা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেবেন। এত অস্বচ্ছতার পর একথা ভাবাও মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক যে নিশ্চয় ধামাচাপা দেবার মতো বেড়াল একটা ছিল, নইলে এত গোপনীয়তা, এত নিয়মভঙ্গ কেন?

তদন্ত কমিটির কাজের বাইরেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে এই কদিনে, যা দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়।

১) বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া সরাসরি প্রধান বিচারপতিকে সমর্থন জানিয়েছেন। তা তাঁরা জানাতেই পারেন, কিন্তু তাঁরা এই অভিযোগকে “নোংরা খেলা” (dirty game) আখ্যা দিয়েছেন, অভিযোগটিকে ন্যায়ালয়ের সম্মানহানির চক্রান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং অভিযোগকারিণীর পিছনে শক্তিশালী মদতদাতার (very strong backing) উল্লেখ করেছেন। এই অনুসিদ্ধান্তগুলো এখনও প্রমাণিত হয়েছে বলে জানি না। সেক্ষেত্রে এই ধরনের মন্তব্য কি আইনজ্ঞদের কাছে প্রত্যাশিত? যদি সত্যিই পিছনে বড় চক্রান্ত থাকে, তবে অবশ্যই তা উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। এটুকুই আশা করব যে প্রবল ক্ষমতাশালী সুপ্রিম কোর্ট ও সর্বভারতীয় বার কাউন্সিল একজন সামান্য মহিলাকে কোণঠাসা না করে মূল ষড়যন্ত্রী কর্পোরেট শক্তিগুলির বিরুদ্ধে নিজেদের যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করবেন। আশা করি আগামী এক বছরের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মতো ঘৃণ্য অপরাধের দায়ে কিছু বড় মাপের কর্পোরেট আধিকারিক ও ব্যবসায়ী শাস্তি পাবেন। এই ব্যাপারে সবিশেষ উদ্যোগ না দেখালে মনে হবে বাস্তবে বার কাউন্সিল এসব ষড়যন্ত্র নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নন, এক অভিযোক্তা মহিলাকে আক্রমণ করাই তাঁদের লক্ষ্য ছিল।

২) সবচেয়ে উগ্রভাবে অভিযোগকারিণীকে আক্রমণ করেছেন তামিলনাড়ু অ্যাডভোকেটস অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থার সভাপতি এস প্রভাকরণের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, “… the complainant first refused to take part in the proceedings and she started flinging mud at the institution. Now, after the Bench delivered Judgment, She expresses dissatisfaction and distrust at the proceedings. Her’s is an unadulted act of contempt of court, as she has indulged in mud-slinging and defamation, bordering character assassination of the Chief Justice of India, other Judge who heard the case… besides the very dignity and majesty of Hon’ble Supreme Court of India itself…. Her actions have to be deprecated in no uncertain terms, as, otherwise, they would bring disrepute to the highest court of the land and lower its authority and independence.” সরাসরি অভিযোগকারিণীর শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। কিছু আইনজীবী শীর্ষ আদালতের সম্মান নিয়ে চিন্তিত, এ বেশ ভালো কথা, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাঁরা অতি সামান্য তথ্য থেকে অভিযোগকারিণীর চরিত্র বুঝে ফেলেছেন খুব তাড়াহুড়ো করে এবং বিচারের পদ্ধতি নিয়ে যারপরনাই সন্তুষ্ট। তাঁরা স্পষ্টাক্ষরে লিখেছেন, “A fair and due process of law have been afforded in her case though her complaint was reckless. She sought to bring in external forces and extraneous factors to bring pressure on the Honb’le Supreme Court to head her complaint. Now… she is using the same external factors to tar the very institution. This can never be permitted.” ভাবটা এমন যে অভিযোগকারিণীর প্রতি আদালত দয়া দেখিয়েছেন, আদতে ন্যায়বিচার তাঁর প্রাপ্য ছিল না কারণ তদন্ত ও বিচারের আগে থেকেই জানা ছিল যে অভিযোগটি “reckless”! বহিরাগতদের (external forces and extraneous factors) অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টার দায়ে তাঁরা ভদ্রমহিলাকে দোষী সাব্যস্ত করলেন, কিন্তু ভুলে গেলেন যে জাস্টিস চন্দ্রচূড় এবং অ্যাটর্নি জেনারেল বেণুগোপাল একই দাবি জানিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টকে সম্মান করা খুবই ভালো কিন্তু দেশের আইনকে অপমান করে কোর্টকে সম্মান জানানো যায় না। অন্তত আইনজীবীদের সংস্থার পক্ষে সেই অপচেষ্টা বেমানান।

৩) লইয়ারস ভয়েস নামক একটি অসরকারি সংস্থা (NGO) শ্রীমতী ইন্দিরা জয়সিং, শ্রী আনন্দ গ্রোভার ও তাঁদের সংস্থা লইয়ারস কালেক্টিভের শাস্তি দাবি করে একটি মামলা ঠুকে দিলেন। বিদেশি অনুদান কীভাবে ব্যয় করছে লইয়ারস কালেক্টিভ, তাতে সন্তুষ্ট না হতে পেরে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৬ সাল থেকে সংস্থাটির বিদেশি অনুদান নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। সেই পুরনো ইতিহাস টেনে এতদিন পর হঠাৎ একটি মামলা এবং সেটির শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের তরফে দেখা গেল লক্ষণীয় তাড়াহুড়ো। ৬মে মামলার নথি জমা পড়ে এবং ৭মে তার ভ্রান্তিগুলি “কিওর” করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১০মের আগে ওই মামলাটি তালিকাভুক্ত হতে পারে না। অথচ সেই নির্ঘণ্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই মামলাটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হল। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটির “টাইমিং” নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল। “এতদিন পরে”, “আম্বানিদের বিরুদ্ধে রায় দেবার পরে”, “নির্বাচনের সময়”, “রাফাল শুনানির মুখে” ইত্যাদি নানা যুক্তিতে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেইরকম যুক্তিতে “লইয়ারস ভয়েস”-এর আনা মামলাটির টাইমিং নিয়ে খানিক চর্চা হোক। ষড়যন্ত্র নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকে কি? ইন্দিরা জয়সিং-এর মনে সন্দেহ নেই। তিনি জানিয়েছেন যে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগকারিণীকে সাহায্য করার ফলে তাঁকে “ভিক্টিমাইজ” করা হচ্ছে। এই ভিক্টিমাইজেশনের কথা যখন অভিযোগকারিণী বলছিলেন, আমরা তাঁকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখিনি। হয়ত আমরা বিশ্বাস করতে চাইছিলাম যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁর যাই হয়ে থাকুক না কেন, চাকরি খোয়ানো, হাজতে যাওয়া এবং পরিবারের অন্যদের হেনস্থার সঙ্গে সেই ঘটনার এবং সুপ্রিম কোর্টের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এখন আর সেই বিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছি না। এই বিশেষ মামলাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রতিশোধস্পৃহা সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের অথবা সেখানকার পদাধিকারী ব্যক্তিবিশেষের মনে আছে।

৪) অভিযোগকারিণী মহিলা জানিয়েছেন যে নানাভাবে তাঁকে ভয় দেখানো হচ্ছে। আদালত থেকে ফেরার সময় কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মোটরসাইকেলে তাঁদের পিছু নিত। সেই বিষয়ে তদন্ত কমিটিকে জানিয়ে নিরাপত্তা চেয়েও তিনি পাননি। উল্টে তাঁকে বলা হয়েছে, যেহেতু তাঁর পরিবারের অনেকে পুলিশ কর্মচারী, তাই নিরাপত্তার ব্যবস্থা তাঁদেরই করতে পারা উচিত। এই অভিযোগ সত্যি হলে অতি ভয়ঙ্কর। পাড়ার গুণ্ডা থেকে বড় অপরাধী চক্র এভাবে ভয় দেখায়। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাও এই কাজ করিয়ে থাকেন পোষ্যদের দ্বারা। এসবের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছেও সুরাহা না পেলে মানুষ আদালতের দরজায় কড়া নাড়ে। আদালত স্বয়ং এভাবে ভয় দেখানোর পথে হাঁটলে গণতন্ত্রের শেষ ভরসাটিও শেষ বলেই ধরে নিতে হবে।

ইতোমধ্যে নানা স্তরে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। তদন্ত কমিটির রায় দেবার দিনেই সুপ্রিম কোর্টের বাইরে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। দেশের তরুণ আইনজীবীরা অনেকেই ক্ষুব্ধ। তাঁরা শুরু করেছেন “May It Plesse Your Lordships” নামের একটি আন্দোলন। খামে ভরে ডাকযোগে তাঁরা যৌন হেনস্থার বিচার সংক্রান্ত আইনের [Sexual Harassment of Women at Workplace (Prevention, Prohibition and Redressal) Act 2013] অজস্র কপি সর্বোচ্চ আদালতে পাঠাচ্ছেন। এই নতুন গাঁধিগিরিতে আদালত অপমানিত বোধ করছেন, অর্থাৎ শীর্ষ আদালতের সম্মান রক্ষার নামে যে মরিয়া প্রচেষ্টা চালানো হল প্রধান বিচারপতিকে আড়াল করার, তাতে প্রধান বিচারপতি বাঁচলেও আদালতের মর্যাদা শেষ অব্দি বাঁচল না।

দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ স্পষ্ট ভাষায় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন এই কেসটির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের কর্মপন্থা নিয়ে। এই ঘটনাটি ভারতের বিচারব্যবস্থাকে বহু বছর পীড়া দেবে বলে তিনি মনে করেন। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল, যিনি প্রথম শুনানিতে জাস্টিস গগৈয়ের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বলা চলে, তিনিও পরবর্তী সময়ের স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নিজের অস্বস্তি ব্যক্ত করেছেন। তিনি নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিতে পারেন, এমন সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে। এমন ঘটলে তাও শীর্ষ আদালতের সম্মান বৃদ্ধি করবে না।

অভিযোগকারিণী কি এখন কিছু করতে পারেন? বস্তুত আদালতের আভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুন এমন যে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দোষী সাব্যস্ত হলেও প্রধান বিচারপতির বিরাট শাস্তি হওয়া কঠিন ছিল, কারণ তেমন বিধান নেই। ইমপিচমেন্ট হতে পারত, কিন্তু তার প্রক্রিয়া এত জটিল যে তেমন কিছু হবার আগেই শ্রী গগৈয়ের অবসর গ্রহণের সময় এসে যেত। আভ্যন্তরীণ কমিটিতে প্রবীণ তিনজন বিচারক ছিলেন। এই কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা অভিযোগকারিণীর পক্ষে খুবই কঠিন। আইনত তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হতে পারেন যদি তাঁর হাতে অতি শক্তিশালী প্রমাণ থাকে, যদিও এখন পর্যন্ত দিল্লি পুলিশ তাঁর প্রতি ভালো ব্যবহার করেনি। এছাড়াও একটি বড় সমস্যা আছে। ১৯৯১ সালের একটি মামলার (K Veeraswami versus Union of India) রায় অনুসারে হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারকের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে। এক্ষেত্রে অনুমতি ভিক্ষার বয়ান খানিকটা এরকম হতে পারে, “প্রভু (Your Lordship), আমি কি আপনার বিরুদ্ধে পুলিশে নালিশ করতে পারি?” বর্তমান প্রভু সেক্ষেত্রে কী উত্তর দিতেন, তা সহজেই অনুমেয়।

কী ক্ষতি হত সঠিক পদ্ধতিতে স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারের আয়োজন করলে? প্রধান বিচারপতি নির্দোষ হলে তা অচিরেই প্রমাণিত হত এবং জনগণের মনেও তাঁর সম্মানিত অবস্থানটি অনাহত থাকত। নেহাত যদি তিনি দোষ করেও থাকেন এবং দোষী সাব্যস্তও হতেন, তাহলেই বা কী হত? একজন ব্যক্তি বিচারপতি যৌন হেনস্থাকারী হিসেবে চিহ্নিত হতেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ আদালতের সম্মান সর্বোচ্চই থাকত নিজেদের শীর্ষ কর্তাকেও আইনের আওতায় আনতে পারলে। এমনকি ব্যক্তি শ্রী রঞ্জন গগৈয়ের অসম্মানও কম হত। হয়ত পুরুষ হিসেবে তাঁর যৌন চরিত্র নিয়ে কথা হত, কিন্তু বিচারপতি হিসেবে তাঁর ন্যায়বোধ নিয়ে এত বড় প্রশ্ন উঠত না।

বাস্তবে যেভাবে তদন্ত ও বিচার সারা হল, তাতে ক্ষতি হল বিভিন্ন রকম।

১) দীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করার বিষয়ে ভারত কয়েক কদম এগোতে পেরেছিল। আশা করা যাচ্ছিল ভবিষ্যতে কাজের জায়গাগুলো মেয়েদের পক্ষে আরও নিরাপদ হবে এবং মহিলারা নির্ভয়ে সবরকম পরিবেশে কাজ করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্ট এই একটি মামলায় ভুল পদক্ষেপ করে দেশকে দুই দশক পিছিয়ে দিলেন। বিশাখা গাইডলাইন ছিল একটি মাইলফলক, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে আইন এগিয়েছে। স্বয়ং শীর্ষ আদালতই যদি দুই দশকের পুরনো সেই নির্দেশটুকু না মানেন, তবে বাকিরা কি মানবেন?

২) ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় করে তোলা হল। প্রধান বিচারপতিকে বাঁচাতে গিয়ে সর্বোচ্চ আদালত ও সংবিধানের অবমাননা করা হল। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আঘাত করা, এরকম একটা অদ্ভুত কথা শোনা গেল ঠিক সেই সময়ে যখন আমরা শুনতে অভ্যস্ত হচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে দেশদ্রোহিতা। এ বড় শুভ লক্ষণ নয়। প্রতিষ্ঠান যেখানে ব্যক্তির ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়, সেখানে গণতন্ত্র শেষ হয়ে স্বৈরাচার শুরু হয়।

৩) আদালতের সর্বোচ্চ সম্মান বজায় থাকে এই ধারণার ভিত্তিতে, যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। শীর্ষ আদালত যদি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে বলে ঘোষণা করেন, তবে আইনের সর্বময়তার ধারণাটিই ধ্বংস হবে। সেটা একবার হলে আদালতের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে সময় লাগবে না। একজন ব্যক্তির স্বার্থে এত বড় ঝুঁকি নেওয়া কি সঠিক হচ্ছে?

৪) মানুষ প্রতারিত বা অত্যাচারিত হলে পুলিশ প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়। সেখানে কিছু সাহায্য না পেলে যায় আদালতে। নিম্ন আদালতে সুরাহা না হলে ক্রমশ উচ্চ ন্যায়ালয় ও সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের দ্বারপ্রান্তে হাত জোড় করে দাঁড়াই আমরা। বর্তমানে পুলিশ থেকে রাজনেতা সকলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা যখন তলানিতে, তখন প্রশাসন তথা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর নাগরিকদের আস্থা কোনওমতে টিকে আছে আদালত, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভরসায়। এইসব প্রতিষ্ঠানেও নানারকম অনিয়ম বাসা বেঁধেছে, তা আমরা জানি। এখন যদি শীর্ষ আদালত নিজেকে স্বৈরাচারী বলে প্রমাণ করেন, তাহলে সমগ্র ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়বে। সব প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাস হারানো মানুষ যদি নিজেদের বাঁচানোর জন্য আইন বহির্ভূত ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন, তবে অ্যানার্কি অথবা হিংসাত্মক বিদ্রোহ জাতীয় কোনও পরিণতিই হয়ত আমাদের ভবিষ্যত। সেই ভবিষ্যৎ কি আদালত বা সরকার চান? না চাইলে বিচারবিভাগের প্রতি মানুষের আস্থাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগ নিন এখনই।

Appendices or appendages অথবা উপসংহার বা কিছু একটা।

১) (অ)প্রাসঙ্গিক পুনশ্চ: [এই মামলার সঙ্গে সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই]

৯ মে ২০১৯ একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে শীর্ষ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কুরিয়ন জোসেফ বলেন, আদালতের স্বাধীনতা হল কুমারীর কুমারিত্বের (chastity of a virgin) সঙ্গে তুলনীয়। (অস্যার্থ “রক্ষণীয়”)।

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। বিচারব্যবস্থা এই পিতৃতান্ত্রিক সসমাজব্যবস্থার একটি অংশ, এ কথা কি আমরা নতুন জানলাম? কিন্তু আশার কী হবে? প্রত্যাশা! এখনও?

২) পুরাতন একখান প্রশ্ন।

“Quis custodiet ipsos custodes?” পাহারাদাররে পাহারা দিব কেডা?

[জুভেনাল নামের এক রোমান কবি প্রশ্ন করেছিলেন খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে। ভারতবাসী এখনও সেই কথা ভেবে চলেছেন চৌকিদার থেকে বিচারকর্তা সকলের সম্বন্ধে।]

৩) প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের একটি গানের কলি।

“আমাদের যেতে হবে দূরে… বহু দূরে…”