Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ট্রান্সজেন্ডার ও মেডিক্যাল: নীরবে পাশ হয়ে যাওয়া দুটি বিল

রায়া দেবনাথ

 

আগস্ট মাসের এক প্যাচপ্যাচে গরমের সকাল। বৈদ্যুতিন মিডিয়ার কল্যাণে ‘আসমুদ্রহিমাচল’, থুড়ি কাশ্মির ব্যতীত বাকি ভারত, কেমন বাড়ি বসে, হঠাৎ করেই জেনে গেল কোনও রকম আলোচনা, বিতর্ক, মত বিনিময় ছাড়াই সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং ৩৫এ সেকশনটির অস্তিত্ব অবলুপ্ত হয়েছে। সংসদে প্রস্তাব পেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ‘ইচ্ছানুসারে’ জম্মু-কাশ্মিরকে ‘বিশেষ মর্যাদা’ ও ‘বিশেষ অধিকার’ প্রদানকারী (‘নিন্দুকে’ অবশ্য বলে জম্মু-কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির প্রাকশর্তের প্রাথমিক ভিত বা সেতুবন্ধনই ছিল এই ধারা, তা যাই হোক) ধারা ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেল! মাত্র কয়েকঘণ্টার মধ্যে সব্বাই জেনে গেল, রাজ্য নয় এ’বার থেকে জম্মু-কাশ্মির কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চল! অর্থাৎ, ‘বিশেষ মর্যাদা’ শুধু নয় জম্মু-কাশ্মিরের থেকে কেড়ে নেওয়া হল ‘রাজ্য’র মর্যাদাও! ভারতের মত ‘নেশন অফ স্টেটস’-এ একটি রাজ্যের যা যা অধিকার থাকে বা আছে জম্মু-কাশ্মিরের সেটুকুও রইল না। আপাতত পুরোটাই চলে গেল কেন্দ্র বা রাষ্ট্রশক্তির ইচ্ছা এবং মর্জি এবং ক্ষমতার অধীনে। আর সবটুকুই ঘটল মিথ্যে জঙ্গি হানার জিগির তুলে জম্মু কাশ্মিরকে সেনায় মুড়ে, সব রকম যোগাযোগ ছিন্ন করে, নেতা-নেত্রীদের গৃহবন্দি করে, কাশ্মিরের আমজনতার দিকে বন্দুক তাক করে! যদিও ৩৭০ ধারা, ৩৫এ, ইতিহাস ভূগোল গণতন্ত্র ইত্যাদি প্রভৃতিও আপাতত ব্যাক সিটে। আপাতত আমরা জেনে গেছি ডাল লেকের ধারে জমি বা ‘ফর্সা’ সুন্দরী কাশ্মিরী মেয়ে (নারীও যেহেতু জমির সমতুল্য, উভয়েরই অস্তিত্ব ‘অধিগ্রহণ’ নির্ভর) প্লেইন ল্যান্ডের পুরুষদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আর জানব নাই বা কেন, বিজেপির বিধায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী, সোচ্চারে কাশ্মিরী মেয়েদের ‘আমদানি’ করার আনন্দ প্রকাশ করে ফেলেছেন যে! উগ্র জাতীয়তাবাদের টনিক গিলিয়ে দিতে পারলে এ দেশের মানুষের ঘটমান বর্তমান সম্পর্কে যে বিশেষ হুঁশ থাকে না, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার দক্ষতার সঙ্গেই সে বিষয় উপলব্ধি করে ফেলেছে! ৪৫ বছরে বেকারত্বে শীর্ষস্থান, নারী ও শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনে ‘অনন্য’ নজির স্থাপন, ভ্রূণহত্যার নির্লজ্জ দলিল উত্তরকাশী, সেক্স রেশিওর কুৎসিত দশা, রেলে ঢালাও ছাঁটাই, পে কমিশন অবলুপ্তির প্রস্তাব, মোটর শিল্পের বেহাল দশা, মব লিঞ্চিং সংস্কৃতি, দলিত অপ্রেশন, রেল ও বিমান পরিষেবায় খুল্লামখুল্লা বেসরকারিকরণ, শিক্ষায় বাজেট হ্রাস, তীব্র জল সঙ্কট, উন্নাও… ওই এক কাশ্মির প্রসঙ্গে সব কেমন যেন আমাদের আলোচনার পরিসর থেকে হাওয়া হয়ে গেল, তাই না? যদিও সমস্যাগুলো রয়ে গেল, বেঁচে থাকল, পুষ্ট হল। শুধু কী এইগুলোই? উগ্রজাতীয়তাবাদের সুড়সুড়িতে সাড়া দেওয়া জনগণের নাকের ডগা দিয়েই কেমন বিনা হইচইয়েই, চুপচাপ পাশ হয়ে গেল এই নীচের বিল দুটি!

  1. ট্রান্সজেন্ডার পারসন্স (প্রোটেকশন অব রাইটস) বিল, ২০১৯
  2. ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন বিল

মজার বিষয়, এই দু’টি বিল যাঁদের জন্য অর্থাৎ প্রথমটির ক্ষেত্রে দেশের এলজিবিটিকিউ ক্ষেত্রের মানুষজন এবং দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে ডাক্তার ও ডাক্তারির পড়ুয়ারা প্রভূত আপত্তি জানিয়ে আসছেন বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু তাঁদের মতের বিশেষ তোয়াক্কা না করেই কেমন চুপিসারে রাষ্ট্র সুকৌশলে পাশ করিয়ে নিল এই দু’টো বিলকেই! নিজেদের ইচ্ছানুসারেই! তারজন্য বেছে নিল এমন একটা সময়, যখন এ নিয়ে আলোচনার কণামাত্র ‘ফুরসত’ আমজনতার নেই!

কেন সমস্যা এই বিল দু’টো নিয়ে, কীসের বিতর্ক? আসুন, খানিক চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

 

ট্রান্সজেন্ডার পারসন্স (প্রোটেকশন অব রাইটস) বিল, ২০১৯

নামটি মনোহরা হলেও ২০১৪ সালের প্রস্তাব লগ্ন থেকেই এই বিল এ দেশের রূপান্তরকামী, রূপান্তরগামী সহ সমস্ত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার এবং সুরক্ষা কতটা সংরক্ষিত করতে পারবে বিতর্ক, আপত্তি সব কিছুই ছিল কিন্তু তা নিয়েই। কারা আপত্তি তুলেছিলেন? যাদের নিয়ে, যাদের ‘জন্য’ এই বিল নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন তারাই! মূলত তাঁদের লাগাতার ওজর আপত্তি বিক্ষোভের জেরেই প্রস্তাবিত টিজি বিলে কিছু ‘সংশোধনী’ আনা হয়। সেই সংশোধিত বিলটিই সংসদের উভয় কক্ষেই পাশ হয়েছে সম্প্রতি। কিন্তু ‘সংশোধিত’ হওয়ার পরেও কী মিটল সমস্যা? না মিটল না।

বিলটি পাশ করার সময় মাননীয় মন্ত্রীমশাই জোর গলায় বলেছেন ট্রান্সজেন্ডাররা আমাদের সমাজে অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই বিল নাকি তাদের মঙ্গল সাধনাতেই। ঠিক কাশ্মিরের মত শোনাচ্ছে না? উভয় ক্ষেত্রেই ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’দের ‘মঙ্গল সাধনায়’ তাদের বিরোধ মতামতের তোয়াক্কা না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ক্ষমতাসীন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’র রাষ্ট্রশক্তি।

 

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন বিল

১৯৫৬-র ইন্ডিয়ন মেডিক্যাল কাউন্সিল অ্যাক্ট বদলে ফেলে চলে এল ন্যশনল মেডিক্যাল কমিশন বিল। ২০১০ সালে এমসিআই-র তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট কেতন দেশাইয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে সিবিআই। এর পরেই এমসিআই-এর পরিবর্তে এনএমসি বিলের প্রস্তাব আসে। কিন্তু, এই বিল প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধিতা শুরু হয় ডাক্তার এবং মেডিক্যাল পড়ুয়াদের পক্ষ থেকে। এই বিলটিও কেমন নিঃশব্দেই পেরিয়ে গেল সংসদের উভয়কক্ষই। যদিও বিলটি নিয়ে এখনও ডাক্তার ও ডাক্তারি পড়ুয়াদের বিরোধ অব্যাহত। কেন বিরোধ বিলটি নিয়ে?

কিন্তু আপাতত এ’দেশ ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ পর্যায়ে বিচরণ করছে। আপনার জানার অধিকার আরটিআই সঙ্কোচনের সঙ্গেই আদতে গত হয়েছে। ইউএপিএ-র জঘন্যতম রূপের কল্যাণে আজ স্টেটকে প্রশ্ন করলে কালকেই আপনি টেররিস্ট হয়ে যেতে পারেন। অবশ্য, এই সব নিয়ে যৌথ আওয়াজই বা তুলবে কে? আপাতত তো দেশ নেশায় মেতে,স্বপ্নে কাশ্মীরের ছটাক ছটাক জমি কিনে ফেলা হয়ে গেছে! শুধু আতঙ্ক একটাই, স্বপ্ন যখন ভাঙবে, বাস্তব ততদিনে দুঃস্বপ্নের অট্টালিকার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। সামাল দিতে পারব তো? সামাল দিতে পারবেন তো?