Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সামন্তবাদের এক অকৃত্রিম প্রতিভূ ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ

সৌমিত্র দস্তিদার

 

একদিকে অসাধারণ বাগ্মী, অন্যদিকে প্রবল সাম্প্রদায়িক।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে এক লাইনের পরিচিতি দিতে হলে এটুকু বলাই যথেষ্ট। ভারতের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে জড়িয়ে আছেন তিনি। দেশভাগের সময় তাঁর সেই বিখ্যাত বয়ান, যা ইংরেজদেরও অবাক করে দিয়েছিল— ‘ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ করতেই হবে’ আজও পার্টিশনের সব আলোচনা, বিতর্কে ফিরে ফিরে আসে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখতে বসে আচমকাই কেন জানি না বেলাউরকে মনে পড়ে গেল। কেউ কি কখনও গেছেন সেখানে? বিহারের আপাত অখ্যাত জনপদ এই বেলাউর। ভোজপুরের সদর আরা থেকে ঘণ্টাতিনেকের পথ, বাবা রনবীর চৌধুরির গ্রাম এই বেলাউর। রনবীর চৌধুরি ছিলেন উনিশ শতকের ভূমিহারদের নেতা, রাজপুতদের যুদ্ধে হারিয়ে বীরের সম্মান অর্জন করেছিলেন। উচ্চবর্গের এই আইকনের নামেই ভূমিহারদের প্রাইভেট আর্মির নাম রনবীর সেনা।

ধান ভানতে শীবের গীতের মতো শ্যামাপ্রসাদ প্রসঙ্গে বেলাউর কোথা থেকে ঢুকে পড়ল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, বিষয়টি আপাতভাবে দুই মেরুর হলেও সাদৃশ্য একটা আছেই। বহুদিন আগে আমার কৌতূহল ছিল বিহারের ফিউডাল সিস্টেম নিয়ে। ধারণা ছিল, জমির আয়তনের মাপজোক ভালোভাবে দেখেই এখানে সামন্তব্যবস্থার স্বরূপ নির্ণয় করা যাবে। এ একেবারে বই পড়ে ধ্রুপদী সামন্তবাদী সংজ্ঞা নির্ণয় করতে চাওয়া। ভুল করেছিলাম। মাইলের পর মাইল কোথাও সাবেক জমিদারতন্ত্রের রেশটুকুও খুঁজে না পেয়ে বেশ হতাশ হচ্ছি বুঝতে পেরে সঙ্গের প্রবীণ কৃষক নেতা হাসতে হাসতে জানিয়ে দিলেন সারা ভোজপুরে পুরনো জমিব্যবস্থা বা সামন্তবাদ কোথাও নেই। কিন্তু ফিউডাল সিস্টেম এখনও এখানে, এমনকি পুরো বিহারেই বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। তারপর উনি সেই অভিনব সামন্ততন্ত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, ‘মনমে, দিলমে সামন্তবাদ। দিখনেমে নেহি’। অর্থাৎ সামন্ততন্ত্র যাপনে আছে। সংস্কৃতিতেও। তা বাইরে থেকে হঠাৎ বোঝা মুস্কিল।

বেলাউরে গিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে গেছিল। গ্রামের বাইরে দলিতদের বাস। গাঁয়ের ভেতরে উঁচু উঁচু বেঢপ দেখতে সব হাভেলি। ওইরকম অজ গাঁয়ে কাছাকাছি যেখানে এতসংখ্যক হতদরিদ্র মানুষের বাস সেখানে এই ছিরিছাঁদহীন বৈভব-দেখানো প্রাসাদগুলো প্রথম দেখাতেই কুৎসিত অশ্লীল লেগেছিল। তখনই বুঝে গেছিলাম মানসিক সামন্তবাদ কী বস্তু। সত্যিই এ এক বিশেষ ধরনের মানসিকতা, মানসিক অসুখও বলা যায়। নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতাধর ভাবা ও অন্তত অবচেতনে অন্যকে ছোট করে দেখা, তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করা ও অশালীনভাবে নিজের বিত্তপ্রদর্শন— এসব নিঃসন্দেহে সামন্ত মানসিকতা। এই দীর্ঘ প্রেক্ষিত আলোচনা করলাম এই কারণে যে আমার মনে হয়েছে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে যতই আলোচনা করি না কেন, উনি আদতে আদ্যন্ত ফিউডাল চরিত্রের মানুষ। ওঁকে বাগ্মী বা চরম সাম্প্রদায়িক যা-ই বলি না কেন, এসব তো নিতান্ত বাহ্যিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা ওপর থেকেই বোঝা যায়। যা সহজে বোঝা যায় না তা হল ওই ব্যক্তির চেতনায় বিঁধে থাকা প্রবল সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা।

১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় বিপুল দুর্ভিক্ষের কথা আমাদের কমবেশি সবারই জানা। ব্রিটিশ-সৃষ্ট এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ লোক প্রাণ দিয়েছিলেন। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ‘ফ্যান দাও, মা’ শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলেন এই শহরের বাসিন্দারা। সেই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার স্কেচ করছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী চিত্তপ্রসাদ। তখন তিনি সদ্যতরুণ। অত বিখ্যাত হননি। এই বয়সে সারা বাংলা জুড়ে মরণ-হাহাকার ওঁকে পাগলপ্রায় করে তুলেছিল। ঘুরতে ঘুরতেই চিত্তপ্রসাদ গেলেন হুগলির জিরাটে। জিরাট তখন গ্রাম-ই। গরীবস্য গরীবের পাড়ায় আচমকা চোখে এল বিপুল বিশাল এক প্রাসাদ। বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন সংবেদী শিল্পী। ওই পরিবেশে ওরকম বৈভবের প্রদর্শন বিসদৃশ ও অশ্লীল লেগেছিল তরুণ চিত্তপ্রসাদের। খোঁজ নিয়ে জানলেন এ হাভেলি কলকাতার ভবানীপুরের সম্ভ্রান্ত মুখোপাধ্যায় পরিবারের। এখানে প্রায়-ই আসেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। জিরোতে, শহরের টেনশন থেকে মুক্ত হতে। অজ গাঁয়ে প্রাসাদটি নির্মাণ করিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ স্বয়ং।

এই একটা সামান্য চিত্রকল্পই মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয় জিরাট আর বেলাউরের। বেআব্রু হয়ে যায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সামন্ত মানসিকতা। এই মানসিকতাই পরে দেশভাগের সময় বড় ভূমিকা নেবে। ‘পশ্চিমবঙ্গের জনক’ বলে সঙ্ঘ পরিবার পরবর্তীকালে শ্যামাপ্রসাদের যে মহান ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা শুরু করে, তা নিতান্তই সঙ্ঘীসুলভ প্রপাগান্ডা, সম্পুর্ণ মিথ্যে।

কেন এই ‘জনক’ অভিধা ভুল? বাঙালি মুসলমানের কথা না হয় বাদই দিলাম, তিনি কি সত্যি আপামর হিন্দু বাঙালির পরিত্রাতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন? নাকি তাঁর হৃদয়বেদনা সংরক্ষিত ছিল শুধুমাত্র উচ্চবর্ণ হিন্দু বাঙালির জন্য?

ক্রমশ প্রকাশ্য।

 

(চলবে)