Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সন্তোষ পাল — পাঁচ

মৃণাল চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

গোপন হানিমুন সেরে আমরা ১৩ জানুয়ারি কোলকাতা ফিরেছিলাম। দার্জিলিং মেল-এর কুপেতে। এখন বোধ হয় আর সেসব নেই। ফার্স্ট ক্লাসই নেই মনে হয়। আমি এ-সি টু টিয়রে যাতায়াত করি এখন। কত বছর আগে সেই রাতে আমরা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। গেজিং-এর প্রথম রাতের পর থেকে আমরা বার বারই শরীর মেলাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, একই সঙ্গে শিখছি একটা নতুন খেলা। তার মধ্যে যেই কোনও নতুন মোচড় আসত, আমরা দুজনেই প্রথমে অবাক আর তার পরেই খুব খুশি হয়ে যেতাম। হাসতাম একে-অন্যের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ছুটন্ত ট্রেনের সিটে অসুবিধে হচ্ছিল। আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ হড়হড় করে প্রায় গড়িয়ে পড়ছিল নিচে। অন্যজন আটকে দিচ্ছিল। তখন আবার হাসি। আবার নতুন করে শুরু। মালদা স্টেশনে খুব অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল। জানলা খোলা ছিল আমাদের। অত রাতেও দু-একটা হকার ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমরা কিচ্ছু না-পরে শুয়েছিলাম একই সিটে। হঠাৎ অণু বলল। ট্রেন থামছে। জানলা খোলা। আমি কোনও রকমে উঠে জানলা বন্ধ করে দিয়ে এসে শুয়েছিলাম। অণু হেসেছিল। তারপর আবার আমরা মজা করতে শুরু করেছিলাম।

আমি অনেকগুলো দিনরাত্রি ভাবি ওকে নিয়ে। এটা তারই মধ্যে সবচেয়ে ফিরে ফিরে আসা স্বপ্ন। আমাদের হানিমুন। কখনও গেজিং, কখনও ভীমতাল, আরও কত জায়গা। কিন্তু ট্রেন স্টেশনে থামার পর অণুকে কখনও খুঁজে পেতাম না। শেষে বিয়ের আগের অণু আমাকে একটা স্বপ্ন দিয়ে চলে গেল। আর সেদিন সন্তোষ পাল চলে গেলেন কোচবিহার। ওখানে আমার যাওয়ার কথা ছিল। সেলুনের আয়নায় আমি। চুল-দাড়ি কামানো অবস্থায় আমাকে এখন অত খারাপ লাগছে না। এখন আমি রাইয়ের কথা শুনতে যেতে পারি।

পাহাড়ি রাস্তায় দু-পকেটে হাত দিয়ে হাঁটতে ভাল লাগে। নাকি এষা বলেছিল বলে? বলেছিল প্যান্টের দু-পকেটে হাত দিয়ে ছেলেরা হেঁটে গেলে তাদের খুব স্মার্ট দেখায়। তাই কি আমি বছর পনের আগে এই অভ্যেস রপ্ত করি? এক ফ্রয়েডিয়ান একবগগা বাছুরের মত কেন মনে হয় বিয়ে হল না বলে আমার সব বিগড়ে গেছে? এষা কোথায় গেল যেন? হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিউটের পথে হাঁটতে গেল কি তিন্নিকে সঙ্গে নিয়ে? তিন্নি টুপি পরেছে কিনা ভেবে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।

না, মনে পড়ল, এষা গুরগাঁওয়ে থাকে আর খুব বড় চাকরি করে। এত বড় যে একবার আমি খবরের কাগজে ওর ছবিও দেখেছিলাম। এই মনে পড়ছিল না, আবার এক্ষুনি সব ফিরে এল। কিন্তু মুখটা মনে পড়ছে না। তার মানে স্বপ্নে আসবে না এষা।

রাই সামনে এসে দাঁড়াল। গান শুনছে এখনও। আমি এত অন্যমনস্ক হয়ে এষার কথা ভাবছিলাম যে রাইকে ভুলে গিয়েছিলাম।

–একী, আপনি দাড়িটা কেটে ফেললেন কেন? দারুণ লাগছিল!— আমাকে মাপতে মাপতে মুখে অপছন্দের ছাই মেখে রাই বলল।– ছাল ছাড়ানো চিকেনের মত লাগছে!

আমি খুব কষ্ট পেলাম। যার জন্যে আমি এত উদ্যোগ নিয়ে দাড়ি কেটে, চুল ছেঁটে বেরোলাম, সে এভাবে আঘাত করবে বুঝতে পারিনি। আমার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। কিন্তু আগে হাঁচি এল।

–দেখলেন, দাড়ি আপনাকে প্রোটেক্ট করছিল ঠান্ডা থেকে। আপনি কি ড্রিঙ্ক করেছেন? গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
–আপনি ড্রিঙ্ক করা পছন্দ করেন না?

আমি খুব মিহি গলায় কথাটা বললাম আর একটা হাঁচি আটকাতে আটকাতে। বললে আমি আর মদ খাব না। এমনকি আমি বড় চুল রাখব, দাড়ি রাখব। সব করব, শুধু রাই সেই কথাটা একবার বলুক। রাই বলো রাই বলো রাই।

ওপরে উঠতে উঠতে আমার হাঁফ ধরছিল, সেটাকে চেপে আমি দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে স্মার্ট হচ্ছিলাম।

–আপনি বৌদিকে ওই সব আটভাট কথা কেন বললেন?

কান থেকে ছিপি খুলে ফেলেছে রাই। আমি বুঝতে পারলাম কেন।

–আপনার কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তাই না? কেমন একটা মাছির ঝাঁক সঙ্গে সঙ্গে চলেছে মনে হচ্ছিল?
–ঠিক বলেছেন।

রাইয়ের চুল খুলে গিয়েছিল। একটা ক্লিপ দিয়ে সেটাকে মাথার ওপর পটাপট লাগিয়ে নিয়ে কথাটা বলল। একটা নেভিনীল টপের ওপর ছাই রঙের আধহাতা জ্যাকেটে ওকে ভাল দেখাচ্ছিল। আমরা যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখোমুখি হলাম, তখন সে একবার আড়চোখে রাইকে ঝাড়ি মেরে অন্যমনস্ক মুখ সরিয়ে নিল। রাই-এর জিনস-টা ফাটা ফাটা। সেখান দিয়ে হাওয়া ঢুকে ওকে কষ্ট দিচ্ছে না? আমি কথাটা বলেই ফেললাম। একটু চমকে গিয়ে নিজের প্যান্টের ফাটা জায়গাগুলো দেখে নিল। মনে হল একটু নাড়া খেল আত্মবিশ্বাস। আমার খুব খারাপ লাগল। কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে ওকে আমি দুঃখ দিতে চাই না।

–না না, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি বলুন দিদিকে ওইসব বাজে কথা কেন বলেছেন।
–দেখুন, আমি যা বলেছি তা সেভাবে মিথ্যেও নয়।
–আপনি না, তুমি। মন তুমি।
–মন আমি।

আমার মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কথাগুলো। রাই একটু চমকে গিয়েই হেসে উঠল। ঝকঝকে সাদা দাঁতের মধ্যে দিয়ে চলকে পড়ল একটা কমবয়েসি সুন্দর সহজ মেয়ের হাসি। পুল্টুশ এই মুহূর্তে গতলানি দিল।

–আগে বলি, আমি তোমার বৌদি অণুকে মনে রাখিনি, কারণ অন্য অণু আমার সঙ্গেই ছিল। তুমি তোমার মন থেকে আগে ওই চিন্তাটা মুছে দাও। বরং এই অণুকে দেখে আমার একটা গোলমেলে আইডিয়া মাথায় এল। আমি যদি এখন এই অণুর থেকে ফ্ল্যাশব্যাকে আগের অণুতে ফিরে যাই, তাহলে মাঝখানের কিছু হারানো ক্লিপ বা ট্রাঞ্জিশন না পেলে আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় কী করে সেই অনু এই অণু হয়। আমি একটা তেইশ বছর বয়েসের মেয়েকে মনে রেখেছিলাম। সে বিয়ের পরে বাড়ি ফেরার সময় আমি তাকে এক ঝলক দেখেছিলাম। তার দু-বছর বাদে আমি শিলিগুড়িতে তারই সঙ্গে দেখা করতে এসে জানতে পারি অণুর দ্বিতীয় বাচ্চা হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম বলে এসেছিলাম। কিন্তু তখন আমি মোহানাকে বিয়ের প্রোপোজাল দিয়ে এসেছিলাম।

–চলুন, কফি খাই।

আমার কথায় বাধা দেওয়ায় আমি আহত হলাম।

–মদের পরে আমি কফি খাই না।
–আমি খাব। আপনি আমাকে কম্পানি দেবেন। আপনার কথাগুলো খুব ইন্টারেস্টিং।

আমরা কেভেন্টারস-এর লাউঞ্জে বসলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে চোখ রেখে। আমার উল্টোদিকে দুটো সাহেব ছেলে ছিল ভয়ঙ্কর ভাল দেখতে। রাই একবার তাদের ঝড়াং করে দেখে নেওয়ায় আমার খুব রাগ হল। রাগ নয়, অভিমান। মনে হল এক্ষুনি চলে যাব সব ছেড়ে। কিন্তু তাহলে পুল্টুশ জিতে যাবে। ও এখন ঘাপটি মেরে সব শুনছে। জেতার অপেক্ষায় আছে। আমার সব হেরে-যাওয়া সময়ের সবচেয়ে বিরক্তিকর সঙ্গী চায় যে আমি আবার হেরে যাই। ও জানে না আমার রাইকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে না। এবার হারবে পুল্টুশ।

–আমি মোহানাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে, সব কিছু বলে, শিলিগুড়ি এসেছিলাম। কলকাতায় ফিরে জানলাম ও আমার চলে আসায় এত আপসেট হয়ে পড়েছিল যে রুকুর সঙ্গে এনগেজড হয়ে যায়। এর পরে কয়েক দিন আমি মাথাধরায় ভুগতে থাকি। তো এই সব কারণে আমি তোমাকে বলছি যে অণুর জন্যে আমি বিয়ে করিনি কথাটা সত্যি নয়।

জানি না রাই সবটা শুনল কিনা। কারণ এর মধ্যে ও কানে ছিপি ঢুকিয়ে নিয়েছিল। কফি শেষ করে ও হয়ত দেখেছিল আমার ঠোঁট নড়ছে না। তাই বলল—

–আপনার একটা বিয়ে হওয়া খুব দরকার ছিল।

আমি শব্দ না করে বললাম—

–একদম ঠিক বলেছ, রাই। বিয়ে আমার কপালে নাই।

রাই ছিপিগুলো খুলে বলল—

–শব্দ করছেন না কেন? আমি তো গান শুনছিলাম না। কানে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল বলে ইয়ারফোন লাগিয়ে রেখেছিলাম।

তার মানে রাই আমার কথা শুনেছে। পুল্টুশের কানের গোড়ায় পড়েছে একেবারে।

–তাছাড়া আপনি আমাকে কী একটা নামে ডাকলেন, রাই মনে হয়। সেটা ভাল লাগল। আমরা কাল চলে যাব এখান থেকে। গ্যাংটক, গেজিং, পেলিং। আপনি কী করবেন?

আমি কী করব? কোচবিহার চলে যাব। সেখানে যদি সন্তোষ পালের দেখা পাই তবে ওঁকে নিয়ে চলে যাব শিলিগুড়িতে, যদি এখন সেই মেলাটা হয় যেখানে পুরনো সময়ের মানুষেরা আসে। নাহলে আমি কী করব?

রাই সেই কথাটা বলল না। ভালই হয়েছে। আমি ওকে বিয়ে করব না। আমার অনেক কাজ আছে। কোচবিহার ত আগে যাই আমি।

কাঞ্চনজঙ্ঘা একটা কালো মেঘের চাদরে মাথা ঢাকল।

 

আমি একটা ব্র্যান্ডির বোতল কিনে হোটেলে ফিরেছিলাম। আর একটা চার্জার কিনেছিলাম। কর্মা বসে ছিল লাউঞ্জে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। আমি ওকে টাকা দিয়ে খেয়ে আসতে বললাম।

–আজ কি কোথাও যাবেন স্যর?
–ঠিক নেই, ঠিক নেই কর্মা। তুমি এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াও। আমি ডেকে নেব তোমাকে।

ব্যালকনিতে বসে আমি গরম জলে ব্র্যান্ডি খেতে গিয়ে দেখলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা হাওয়া। একটা বাজে প্রায়। মেঘলা আলোয় দার্জিলিং ঘরে ফেরার তাড়া করছে। ভেতরে আমার মোবাইল গরম হচ্ছে। পুল্টুশ নড়েচড়ে বসল—

–জানলা বন্ধ করে দাও। এরপর বালিশ-বিছানা ভিজে যাবে।

কথাটা মনে ধরল। আমি উঠে ঘরের ভেতরে গিয়ে জানলা বন্ধ করলাম। ব্যালকনির দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিলাম।

–ঠান্ডা বড্ড বেশি ইন্দ্রজিৎ। তাছাড়া স্নান-খাওয়া হয়নি। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে নাও একটু। সন্ধেবেলা মল-এ সিনেমা দেখবে?

কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। পুল্টুশ এখন বকে যাবে। আসলে ওর ঠান্ডা লাগছে, ওর স্নান পেয়েছে, ওরই খিদে পেয়েছে। আমার মাথার মধ্যে এখন এখান-ওখান থেকে উড়ে আসা মেঘগুলো জল হয়ে ঢুকে যাচ্ছে। ব্র্যান্ডির জন্যে বরাদ্দ গরম জল মরে যাওয়া প্রেমের মত ঠান্ডা। সামনের সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে। বাড়ি না, ঘরে। রাইকে আমি বিয়ে করব না জেনেও খুব অভিমান হচ্ছে আমার। ও তো এখন চলে আসতে পারে। আমায় ফোন তো করতে পারে একবার। কিন্তু আমার ফোন অনন্ত চার্জে।

–তোমার ফিলিং-টা আমি বুঝতে পারছি ইন্দ্র। কিন্তু বাস্তবকে মেনে নেবার সময় এসেছে।

গোঁগোঁ করে যাচ্ছে পুল্টুশ। আমার কিছু ভাল লাগছে না। পাশের ব্যালকনির পরিবার ফিরে আসছে, মাথা তুলে দেখছে আমাকে। ভদ্র গোছের নির্লিপ্ততায় চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। শুধু বাচ্চা ছেলেটা আমায় দেখে হাত নাড়ল। আমিও নাড়লাম। দরজার বেল বাজল। নানারকমের খাবার নিয়ে বেয়ারা ঢুকেছে। পুল্টুশ আবার গোঁতলান মারল। বেয়ারা বেরিয়ে যেতেই বলল—

–আমি যাব না, বুঝলে? তখন মাথাটা ঝট করে গরম হয়ে গিয়েছিল, তাই… ভয় নেই, আমি আছি।
–আমি ভয় পাইনি। তুমি জানো সেটা। কথা বাড়িও না।
–আরেব্বাবা, এমনিতে তো আমরা গল্প টল্প করতে পারি, নাকি? এক সময় করতাম না?
–সে কোন সময়ের কথা বলছ পুল্টুশ?— ব্র্যান্ডি আমাকে ঘপ করে ধরেছিল, যা মুখে আসছিল বলে যাচ্ছিলাম— তখন তুমি একটা মানুষ ছিলে। আমার অক্ষম, এবং স্বভাবতই ইডিয়টিক, ‌বিবেক হয়ে যাওনি। আমি কোনও বন্ধু পেলাম না পুল্টুশ, আমার কোনও প্রেম হল না, একটা বিয়ে হল না। ঠিক সেই সময় তুমি বিবেক সেজে এই যাবতীয় ঝামেলার মধ্যে আমাকে ফেলে পালিয়ে গেলে!
–চেঁচিও না। সবাই শুনতে পাবে। তোমাকে পাগল ভাববে।
–কে পাগল নয়, দেখাবি আমাকে? তুই কী রে? কেন আমার আরশিনগরের পড়শি হলি না তুই? কেন একটা রিটায়ার্ড বিবেকের ফালতু রোল করে আমার ভেতরের রক্ত চুষে, আমার চেতনার রক্ত চুষে, সারা জীবন আমার ভুলগুলো দেখিয়ে গেলি? আজ ব্র্যান্ডি কথা বলবে পুল্টুশ। ক্ষমতা থাকলে শোন আর তা না থাকলে পড়ে থাক জোঁকের মত। আমার আরশিনগরের পড়শি হলি না পুল্টুশ, শুধু আমার ফেলিওরের ফসল হয়ে রয়ে গেলি!
–আমি স্নানে যাব। বেলা হয়েছে।
–গেট লস্ট! বাইরে বেরিয়ে দেখা তুই বেঁচে আছিস। প্রমাণ কর তুই নিজে বাঁচতে পারিস। আজ রাত আটটার পর তোর কোনও শব্দ শুনব না আমি। আউট আউট!

যদিও রাত আটটা পর্যন্ত ওকে সময় দেবার কোনও যুক্তি ছিল না।

আমি হুহু করে কাঁদছিলাম। ব্র্যান্ডি আমার পুল্টুশের গুষ্টি খতম করছিল। স্নান না করেই খেতে বসলাম। যা ইচ্ছে খেলাম। মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ার সময় মনে হল, রাই চলে যাবে। হয়ত চলে গেছে। শেষ কথাটা শোনা হল না। অথবা হয়ত কাল সকালে চলে যাবে রাই। আমার ফোন নম্বর নিয়ে গেছে। ফোন করতে পারে। না-ও করতে পারে। আমি ওকে ফোন করতে পারব না। নম্বর নিইনি। এই সব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

মর্গের মত ঠান্ডা দার্জিলিং-এ জেগে উঠল পঞ্চাশ বছরের ইন্দ্রজিৎ। অনেক সময় লাগল বিছানা ছেড়ে উঠতে। প্রথমেই ঘড়ি দেখতে হয়। ছটা বাজে। গলা পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে অ্যাসিডিটিতে। এদিকে চা খেতে ইচ্ছে করছে। আবার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু উঠে মুখ ধুলাম। গলায় আঙুল দিয়ে বমি করলাম। আবার মুখ ধুলাম। এত ঠান্ডা লাগল যে হেঁচে ফেললাম। মোবাইল বেজে উঠল। প্রথমে চমকে গিয়েছিলাম। অনেক সময় কথা বলিনি ফোনে। বাজতে বাজতে থেমে গেল। অচেনা নম্বর। তবু মনে হল রাই ফোন করেছে। অনেক ফোন এসেছে ওই নম্বর থেকে। আরও কত কত নম্বর থেকে। একটা নম্বর সন্তোষ পালের। আমার গা শিরশির করে উঠল। সবার আগে ওই নম্বরে ফোন করলাম। প্রথমে শূন্যতা। কিচ্ছু নেই। ফাঁপা শূন্যতা। আমি কল কাটতে যাচ্ছিলাম কিন্ত সন্তোষ পালের ফোন বাজতে লাগল। একটা অদ্ভুত গান বেজে চলল মনে হয় বিহুর মত। অথচ আমার এমন কোনও রিং-টোন নেই। কেউ যেন ফোন ধরল। তারপর সব থেমে গেল। কেউ কাটল না নম্বর। এমনি থেমে গেল ফোন। আবার সেই ফাঁপা চুপচাপ। আমি ফোন রেখে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। চা খাব। অ্যান্টাসিড কিনতে হবে।

ওষুধ কিনে দোকান থেকে জল নিয়ে দুটো ট্যাবলেট খেয়ে ফেললাম। ছুঁচের মত হাওয়া বইছে। রাস্তায় কমে আসছে লোকজন। টুকটাক দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চারপাশে। আজ রাতে যদি বরফ পড়ে খুব ভাল হয়। আমি হোটেলে ফিরতে ফিরতে সিমলায় সেই কোন কালে একবার বরফ পড়ার কথা ভাবছিলাম । কর্মা অন্ধকার থেকে এগিয়ে এল।

–কাল কি যাবেন কোথাও স্যর? নাহলে আমাকে ছেড়ে দিবেন, বাড়ি যাব।

মদ খেয়েছে কর্মা। চোখগুলো চকচক করছে। বাড়ির কথা মনে পড়েছে ওর। ওর বাড়িতে কে কে আছে জানতে ইচ্ছে করল।

–বাড়িতে কে কে আছে কর্মা?
–ওয়াইফ আছে স্যর, একটা বাচ্চা আছে।

কখন কুয়াশা অন্ধকার করে দিয়েছে চারপাশ। এখান থেকে পথ চিনে আমি হোটেলে ফিরতে পারব না। ভয় করছিল আমার।

–আমাকে একটু হোটেল নিয়ে চলো কর্মা।
–চলুন স্যর, আমি তো ওখানেই যাব।

কর্মা বাড়ি ফিরবে। ওর বৌ গরম খাবার করে দেবে ওকে। বাচ্চাকে জড়িয়ে শুয়ে মোবাইলে হিন্দি সিনেমার গান শুনবে কর্মা। বাইরে ঠান্ডা আর অন্ধকার। ঘরের মধ্যে লেপের পেটের মত গরম। বৌ-এর সঙ্গে চোখাচোখি হবে। রাতের ব্যাপারটা তখনই ঠিক হয়ে যাবে। বেশি রাতে বাচ্চাকে একপাশে শুইয়ে গায়ে পাইনের গন্ধ নিয়ে কর্মা বৌ-এর সঙ্গে উথাল-পাথাল শোবে। অনেক দিনের তৃষ্ণা দুজনের শরীরের এখানে-ওখানে ঝিলিক দিয়ে উঠবে। বাচ্চা যাতে না জাগে তাই কর্মাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ওর কানের মধ্যে গভীর শীৎকার করবে মালা। ওরই প্রভাবে রাতের মত কর্মা শেষ হবে।

আমি একটু একটু যৌন উত্তেজনা বুঝতে পারছিলাম। এটা বুঝতে পারলে বেশ একটা গড়গড়ে অনুভূতি হয় তলপেটে।

–কাল আমি নেমে যাব। শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ি চলে যাব।
–ঠিক স্যর। কটায় বাইর হবেন?

শিলিগুড়িতে ওপার বাংলার অনেক লোক থাকে বলে এখানকার হিন্দিভাষীরা ওখানকার মত করে কথা বলে দু-একটা। বীর্য পড়ার সময় কী ভাষায় হাহাকার করে পাহাড়ি মানুষ? আবার মালা আর কর্মার দৃশ্যটা ভেসে উঠল।

–দশটা নাগাদ। রেডি থেকো। ডেকে নেব।

এখন আমার ঘরে আমি শুয়ে আছি। একটা ফোন আসবে, রাইয়ের। আসবেই। ফোনটাও একটু দূরের টেবিল থেকে দেখছে আমাকে। কাল সকালে আমি এই যে চলে যাচ্ছি, আর ফিরব না কোনওদিন। আমার বিয়েও হবে না। আচ্ছা, পুল্টুশ কি আছে? আটটা তো বেজে গেছে। আমি ওকে দু-একবার ডাকলাম, সাড়া দিল না। হয়ত চলে গেছে। ঠিক দুঃখ না হলেও কেমন-একটা চিনচিনে ফাঁকা লাগার অনুভূতি হল। আর ফোন বাজল তখনই। আমি উঠেই শুনতে পেলাম বরফ পড়ার শব্দ। সব জুড়িয়ে যাচ্ছিল। এই শব্দ আমাকে যে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ফোন অন করে হ্যালো বললাম। উল্টোদিকে কোন শব্দ নেই। আমি জানি ওধারে কেউ আছে। আমি অপেক্ষা করে থাকব। এছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।

 

আবার আগামী সংখ্যায়