Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মুসলমানের আন্দোলন আর অর্ধেক আকাশ

প্রতিভা সরকার

 




লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী।

 

 

 

হ্যাঁ, হিন্দুত্ববাদীরা খ্যা খ্যা করে খুব হাসছে, যখনই কেউ দেশজোড়া এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে ডাকছে। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ফিরিয়ে দেবার দাবি শুনে বলছে, শালা মোল্লাদের আন্দোলন, ওরা এনে দেবে দ্বিতীয় স্বাধীনতা! দ্যাখ না দুদিন বাদে হুড়কো মেরে তাড়াই কেমন ওদের এ দেশ থেকে!

ওদের প্রথম আপত্তি এনার্সি-সিএএ বিরোধী আন্দোলন নিয়েই, তারপরেই আপত্তির দ্বিতীয় কারণ, এত মুসলমান কেন এই আন্দোলনে। বিশেষ করে মুসলমান মেয়েরা। কারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্ত মেয়েই নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবরোধবাসিনী এইরকম সরলীকরণ করতে পারলে ওদের তিন তালাককে ফৌজদারি আইন করা নৈতিক বৈধতা পায় যে! সেই মেয়েরাই স্বেচ্ছায় ঘরসংসার ছেড়ে দিনের পর দিন রাস্তায় জাগছে ছেলেপুলে নিয়ে, এটা সাধুসাধ্বী নির্বিশেষে হজম করা খুব শক্ত।

সাধারণ স্বাভাবিক বুদ্ধিকে আইটি সেলের কাছে বাঁধা রাখলে যা হয় আর কি! এই আইনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে যাদের, তারাই যে সবচেয়ে বেশি মুখর হবে এই কার্যকারণ সম্পর্কও বুঝিয়ে বলতে হয়! যে আন্দোলন হচ্ছে তাতে তো আর অনুপ্রবেশকারীরা নেই। সবাই ভারতীয় নাগরিক, যারা সাত পুরুষ ধরে এই দেশকে নিজের দেশ বলে জেনেছেন। কলমের এক খোঁচায় তাদের ভিটেমাটি ছাড়া করে দেব, এটা চলে যাওয়া বছরের সবচেয়ে বাজে ঠাট্টা।

ভারতীয় মুসলমানদের অসীম ধৈর্য। এই উপমহাদেশে শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলির মধ্যে তারা আছেন। তামিল-সন্ত্রাস পরবর্তী শ্রীলঙ্কা, রোহিঙ্গা-তাড়ানো মায়ানমার, মদেশিয়া বিক্ষোভের পরের নেপালের দিকে তাকালে এ কথা বোঝা যায়। বোঝা যায় গুজরাট গণহত্যা, কাশ্মির পরিস্থিতি, বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং পরবর্তীতে সেই জমি সংখ্যাগুরুকে দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি একশো অন্যায়ের পরও তাঁদের অপেক্ষাকৃত নীরবতা দেখে। সরকার এবং সংখ্যাগুরুর চাপিয়ে দেওয়া জোয়ালই ভবিতব্য, হিন্দুত্ববাদের উত্থানের পর তাদের এইরকম মনে হয়েছে কিনা, জানা নেই। হতে পারে মূলত সুফিবাদের প্রভাবে বিপুল সংখ্যায় ধর্মান্তরিত হবার সময় তাঁরা এক নির্বেদ, এক শান্ত ভাগ্যবাদের সুরকেই ঐতিহাসিকভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। ফলে ভারতীয় মুসলমান কখনোই আগ্রাসী ও হিংস্র হয়ে উঠতে পারেননি। বৈদেশিক মদতপুষ্ট আতঙ্কবাদ এসেছে, গেছে, মূলত রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বৈষম্যমূলক নীতির ফলে আবার এসেছে, কিন্তু তাতে ক’জনই বা অংশ নিয়েছে ! আর এখন তো দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রপোষিত আতঙ্কবাদেরই রমরমা, এবছরের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সৈন্যবাহিনির উচ্চপদস্থ নিজের গাড়িতে করে খোদ রাজধানীতে আতঙ্কবাদ সাপ্লাই করায় ব্যস্ত ছিল।

ভারতীয় মুসলমানের এই নির্বেদ কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে দেখা যায়নি। যারা স্বাধীনতা সংগ্রামীর কজন মুসলমান– বিশেষ কারণে এই তথ্য খোঁজে, তাদের জন্য অন্তর্জালে লম্বা নামের লিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে নিলেই হল। সঙ্গে অবশ্য এটাও দেখতে হবে সঙ্ঘীদের নাম আদৌ সেই তালিকায় আছে কিনা। অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষের নামতালিকা কোনও দেশের কোনও আন্দোলনেই থাকে না। এ দেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেরও নেই, তেভাগাতেও না। তবে সার্বিক ইতিহাস তো আছে।

সেই ইতিহাস বলছে, মিও মুসলমানদের আত্মোৎসর্গের কাহিনি আমরা ভুলে গেছি। তাই মুসলমানের আন্দোলন বলে নাক সিঁটকোবার সাহস পাই। ঐতিহাসিক মেওয়াত প্রদেশের কিছু অংশ জুড়ে তৈরি আধুনিক হরিয়ানা, যার মূল অধিবাসী এই মেওয়াতি বা মিও মুসলমানরা। এরা অসাম্প্রদায়িক বীরের জাত। বাবরের বিরুদ্ধে রাণা সঙ্গের ডানহাত ছিলেন মিও শাসক হাসান খান। খানওয়ারের যুদ্ধে তাদের চুরমার করে তবেই ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন বাবর। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে ছ হাজারের বেশি মিও মুসলমান প্রাণ দেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলো শাসক, যে ইংরেজ কালেক্টর ক্লিফোর্ড ঘোড়ার পিঠে বসে ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে জ্বালিয়ে দেন মিওদের গ্রামের পর গ্রাম। এই ক্ষতি, এই অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করবার প্রশ্নই ওঠে না। মিও নেতা খৈরাতি ক্লিফোর্ডকে হত্যা করেন। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সরকার বাহাদুর খৈরাতিকে তারই গ্রামের এক বটগাছ থেকে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেয়। এখনো হরিয়ানায় নুহ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে এক বিশাল কুয়োর ধারে সেই বুড়ো বটের সন্ততি শাখার আন্দোলনে মিওবীরদের গাথা শোনায়।

দেশ ছাড়তে অনাগ্রহী অথচ সংখ্যাগুরুর হাতে অত্যাচারিত মিওদের পার্টিশনের সময় ভরসা যুগিয়েছিলেন গান্ধিজি আর জওহরলাল নেহরু।

অধুনা পহেলু খান ঘটনায় কলঙ্কিত এবং গোরক্ষা বাহিনীর বাড়বাড়ন্তের সাক্ষী নুহ জেলায় একের পর এক মিও গ্রাম উন্নয়ন কবলিত হতে হতে গড়ে উঠেছে আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র গুঁরগাও, বিজেপি আমলে যা গুরুগ্রাম। যেখানে ছ লাখ মুসলমানের জন্য বরাদ্দ ১৩/১৪ টি মসজিদ। ১২০০টি নির্মাণস্থলে কর্মরত মানুষেরা মাঠে ময়দানে নমাজ পড়ার জন্য একত্রিত হলে তাদের তুড়ি মেরে উঠিয়ে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি– যা তেরা গাঁও মে নমাজ পড়নেকে লিয়ে। ধর্ম দেখেই তাদের গায়ে বাংলাদেশি অথবা রোহিঙ্গার ছাপ্পা মেরে দেওয়া হচ্ছে। অত্যাচারীরা কি জানে ওদের পেছনে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন স্বাধীনতা সংগ্রামী খৈরাতি স্বয়ং?

এমনিই কী বলেছি যে এদেশের সংখ্যালঘুর ধৈর্য এবং সহনশক্তি ঈর্ষণীয়!

ভারতীয় মুসলমান জানে এবং বোঝে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর এই সংগ্রাম তার জান এবং মানের সংগ্রাম। তাই সে সচেতনভাবে যে কোনও ধর্মীয় এবং দলীয় চিহ্নকে এখন অব্দি আন্দোলনের সঙ্গে জুড়তে দেয়নি। বরং আজাদির স্লোগানকে সংহত আবেগে জুড়ে দিয়েছে সংবিধানের প্রিএম্বলের সঙ্গে– বেরোজগারি সে আজাদি, কর্মের অধিকা! ভুখমারিসে আজাদি, খাদ্যের অধিকার! সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের মালা গাঁথা হয়েছে আজাদির শ্লোগানে শ্লোগানে!

এই আন্দোলনে জাতীয় পতাকা ছাড়া আর কোনও পতাকা আন্দোলিত হয়নি দেশের কোথাও। স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু সংহত এই আন্দোলন জীবন্ত এবং সতেজ বৃক্ষশাখার মতোই বর্ধমান। দিল্লির শাহিনবাগ থেকে কলকাতার পার্ক সার্কাস, কাল ভোপালে তো আজ পাটনা। রক্তবীজের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে আজাদির আকুল প্রার্থনা ।

আসমাত। পার্ক সার্কাসের অন্যতম সংগঠক।

এই আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছেন মেয়েরা। ঘরের টান যাদের সবচেয়ে বেশি, বে-ঘর হবার ভয়ও তাদের চূড়ান্ত। স্বাভাবিক যে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরে আর কোনও আন্দোলন মহিলাদের এত অংশগ্রহণ দেখেনি। শুধু অংশগ্রহণ নয়, জমায়েতের মুখপাত্র তারাই! চোখ যদি জমায়েতে দৌড়ে বেড়ানো বাচ্চার দিকে, তো গলায় আজাদির শ্লোগান। এই নারী সত্যি যেন দশভুজা! টিভি সাংবাদিককে বাইট দেওয়া, মাইক পাকড়ে নারা লাগানো কোনওটাতেই সে কম যায় না। পুরুষ সঙ্গী ছাড়া যদি কারও রাস্তায় বেরনো মানা থেকে থাকে, তাহলে শাসন থেকে ছাড়া পেয়ে সে দেখিয়ে দিচ্ছে পুরুষের চেয়ে সে কম নয়, বরং কোন রাস্তায় যেতে হবে সেইই জানে ভালো।

জানা নেই এরপর কী, তবে মুসলমানের আন্দোলন বলে দূরে সরে থাকলে খুব মূর্খামি করব আমরা। অসমের বারো লাখ “বিদেশি” হিন্দুতে যদি আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে আশেপাশে, নিজের মহল্লায় সংখ্যাগুরু মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করতে পারি কতজনের কাগজ ঠিকঠাক আছে। যত শহর থেকে দূরে সরবে সমীক্ষার এলাকা, তত নেই-কাগজদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। কাগজ ঠিক থাকলেও লিস্টে নাম ওঠেনি এমন মানুষ কি কম পড়িয়াছে? বিজেপি বিরোধী বলে পরিচিত প্রত্যেকটি মানুষের এনার্সি এবং সিএএ নিয়ে উদ্বেগ থাকা উচিত।

যদি হাতে হাত মেলাবার এই মাহেন্দ্রক্ষণে মুখ ফিরিয়ে থাকি তাহলে আর কখনওই আমরা মিলতে পারব না। অথচ মিলে যাওয়া এবং মেলানো এই দুইই এখন সময়ের দাবি। জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক ভারতভাগ্যবিধাতার দাবী। বিভেদকামী কুচক্রীর ষড়যন্ত্র হটাতে এ ছাড়া আর রাস্তা নেই।