Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যাঁর কবিতার প্রাণ এক মহাজাগতিক স্পন্দন

এরনেস্তো কার্দেনাল | বিপ্লবী ও কবি

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

 




লেখক কবি ও স্পেনীয় ভাষা-সাহিত্যের অধ্যাপক।

 

 

 

কে ছিলেন এরনেস্তো কার্দেনাল? উত্তর একটাই, পৃথিবীর শেষ গণমানুষের কবি। যাঁর কবিতা আপামর মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে ইস্পানো-ভাষী দুনিয়ায়। তাঁর কবিতা তাঁরই মত। ভানহীন। স্পষ্টভাষী। যে কোনও গণমানুষের কবি সাধারণত মতাদর্শাস্থিত। কার্দেনালও। তবে তাঁর মতাদর্শ প্রচারযন্ত্রের অংশ নয়। তিনি সেই শেষ আধুনিক কবি যাঁর তন্ত্রীতে বেজেছে মহাজাগতিক স্পন্দন।

কার্দেনালের এই মহাজাগতিক স্পন্দন কিন্তু একদিনের ব্যাপার নয়। তিনি সেই ১৬/১৭ বছর বয়স থেকেই শুনতে পেয়েছেন সেই ধ্বনি। একের পর এক প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তাঁর বয়সের কিশোররা যখন গান লেখে বা কবিতা লেখে, এমনকি কব্জিতে ব্লেড, তিনি তখন খুঁজে পাচ্ছেন তাঁর আধ্যাত্মিক পথ। তাঁর তিন খণ্ডের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডের নাম হারানো জীবন (La vida perdida), সেখানেই স্পষ্ট হয় কীভাবে তিনি সেই সব প্রেমে বা আরও স্পষ্টত নারীসঙ্গে ব্যর্থ হওয়াকে মনে করছেন ঈশ্বরের ইশারা। আর সেই ইশারাই তাঁকে নিয়ে যাবে খ্রিস্টধর্মের এক কঠিনতম শাখায়। ত্রাপেন্সে (Trapense বা Trappist) । তবে তার আগে তিনি পড়বেন লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয় মেহিকোর উনাম-এ (Universidad Nacional Autónoma de México), সেখান থেকে যাবেন নিউ ইয়র্ক এর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে যাবেন ইউরোপ। ১৯৫০ সালে ফিরবেন নিকারাগুয়াতে। অংশ নেবেন প্রথম বিপ্লবে। স্বৈরাচারী সোমোসার বিরুদ্ধে। ব্যর্থতা। বহু বন্ধুমৃত্যু।  শেষ পর্যন্ত মেনে নিচ্ছেন তাঁর ঈশ্বরের ডাক। চলে গেলেন কেন্টাকির ত্রাপেন্সে মঠে। এই পথ কঠিনতমের একটি। এখানে বই পড়া চলে না। সঙ্গীতহীন। এখানে তাঁর শিক্ষক টমাস ম্যর্টন। কবি ও দার্শনিক। এই ভদ্রলোকই কার্দেনালের আধ্যাত্মিক পিতা। পরে ইনিই মার্কিন কবিতার সঙ্গে সম্যক পরিচয় ঘটান কার্দেনালের।

এই প্রাথমিক পাঠের পর কার্দেনাল বহু রকমের নিরীক্ষা করেন। খুঁজে পান মার্ক্স ও যিশুর মিল। জন্ম হয় লিবারেশান থিওলজির (Teología de la liberación)। যা পৃথিবীর প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র ধর্ম ও মার্ক্সবাদের মিলন। (অবাধ্য কৈশোরে সিপিএম বাবাকে প্রশ্ন করতাম হরকিষেণ সিং সুরজিত কেন পাগড়ি পরেন, উত্তর ছিল ইহার নামই কন্ট্রাডিকশান, দুঃখ হয় এখন, সিপিএম জাতিবাদ অস্বীকার করে নিজেদের কবর না খুঁড়ে, সোভিয়েত না দেখে যদি নিজেদের মত সমাজব্যবস্থার আমেরিকা মহাদেশে তাকাত!) এক পরিত্যক্ত দ্বীপ সোলেন্তিনামেতে পত্তন করলেন নিজস্ব ধর্ম। স্বয়ং পোপ এসে তাঁকে বহিষ্কার করলেন। কিন্তু তিনি অটল। এই পুরো সময়ের ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে তাঁর আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড বিচিত্র দ্বীপপুঞ্জতে (Las ínsulas extrañas)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সেই ষোড়শ শতকের গোড়াতে যখন ঔপনিবেশিক স্পেনীরা গোটা আমেরিকাকে (মানে তাঁদের কল্পনার ভারতকে) ভাবছেন দ্বীপপুঞ্জ, কারণ তাঁরা কোথাও শক্ত জমি (Tierra firme) খুঁজে পাচ্ছেন না, নিকারাগুয়া দেশটির মাঝখানে আছে এক বিরাট হ্রদ, তাকে স্পেনীরা ভাবল সমুদ্রের অংশ, তার ফলেই মধ্য আমেরিকাকে তাঁরা নাম দিলেন Las ínsulas extrañas বা বিচিত্র দ্বীপপুঞ্জ।

পরে কার্দেনাল আবারও যোগ দিলেন সান্দিনিস্তা বিপ্লবে। সফল। দানিয়েল ওর্তেগা ক্ষমতায়। তিনি হলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী। কিন্তু যেকোনও বিপ্লবই তার সন্তানদের ভক্ষণ করে। উগো চাবেস ও এবো মোরালেসের আগে অব্দি যে কোনও মার্ক্সবাদী সরকারই স্বৈরাচারী। কার্দেনালসহ সমস্ত কবি সাহিত্যিকদের সরে আসা। কার্দেনাল লিখলেন তাঁর আত্মজীবনীর শেষ খণ্ড হারানো বিপ্লব।

এর পরে তিনি কখনওই আর সরকারি কোনও কাজে থাকেননি। সরকারও তাঁকে বিশেষ ঘাঁটায়নি। এই নানাবিধ কর্মকাণ্ডে এরনেস্তো কার্দেনাল হয়ে উঠেছেন মানুষের কবি। অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ কবিতা সম্মান- পাবলো নেরুদা পুরস্কার, ও স্পেনের সর্বোচ্চ কবিতা শিরোপা রেইনা সোফিয়া পুরস্কার।  যে শতকে কবিতা ক্রমাগত হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের বা উচ্চমধ্যবিত্তের সম্পত্তি, সেখানে কার্দেনাল সেই শেষ ডাইনোসর যিনি কবিতা পড়লে ক্রীড়াঙ্গন ভরে যেত। যাঁর কবিতার প্রাণ এক মহাজাগতিক স্পন্দন। পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগ।