Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মুদি দোকানের গপ্পো

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

 





লেখক গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

 

 

প্রথম দফায় একুশ দিনের লকডাউনের খবর প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে বেরনো মাত্র যে তুমুল লাইনটা পড়তে শুরু করেছিল আমার পাড়ার শান্তি ভাণ্ডার কিংবা শীতলা স্টোর্সের মতো দোকানগুলোতে, তা দেখে মুচকি হেসে ভেবেছিলাম, হায় রে! স্মার্ট ওয়ার্ক কাকে বলে, এই লোকগুলো শিখল না। চিরটাকাল হার্ড ওয়ার্ক করে, বোকা বনে গেল। বাড়িতে এসে আরাম করে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। অনলাইন গ্রোসারির দুটো অ্যাপ আছে। যেটা ইচ্ছে হল, খুললাম। গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি কি লাগবে জলদি বলো। বাড়ি থেকে বলাও শেষ হল, একই সঙ্গে শেষ হল শর্ট হ্যান্ড টাইপিংয়ের মতো করে আমার অর্ডার দেওয়াটাও। অভ্রভেদী রথের ধ্বজার মতো মোবাইলের স্ক্রিনটা মেলে ধরে বললাম, এই দ্যাখো অর্ডার নম্বর। বাইরে ওরা লাইন দিক যত খুশি, কুস্তি করুক। আমাদের অর্ডার নিজে চলে আসবে দরজার সামনে।

গোল বাঁধল তার দিন দুয়েক পর। ওই অনলাইন স্টোর থেকে আমাকে ইমেল করে বলা হল, বড্ড লোড তো। দিনদুয়েক দেরি হবে। এখনও অবধি ঠিক ছিল। তার দিন তিনেক পরে আবার ইমেল এবং এসএমএস। দুঃখিত। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনিবার্য কারণে আপনার অর্ডারটি বাতিল করা হল। এই নিন টাকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইলে এসএমএস। বেরিয়ে যাওয়া টাকা অ্যাকাউন্টে এসে গেছে ফের।

যে অনলাইন শপিংয়ের উপরে ভরসা করে এসেছি বেশ কিছু বছর, জরুরি প্রয়োজনে তাদের উপর ভরসা করা গেল না। এতে তাঁদের কোনও দোষ নেই। ওই সংস্থাগুলিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাও মানুষ। সংক্রমণ তাঁদেরও হয়। পাঁচশো টাকার অর্ডার দেব আর তাঁরা কুড়ি পঁচিশ কিলোমিটার দূর থেকে টেম্পো উজিয়ে বাড়িতে ফ্রি ডেলিভারি দিয়ে যাবেন, তাও এই করোনা প্রলয়কালে, এটা ভাবাও উচিত নয়। ভাবছিও না। তবে পাড়ার যে মুদি দোকানগুলোকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে আসছিলাম বড় হওয়া ইস্তক, গত কয়েক সপ্তাহের লকডাউন তাদের জন্য অনেক আশা উজাড় করে দিল। ভরসা আর বিশ্বাসও।

প্যানিক বাইং বলে একটা কথা আছে। কিছু আসন্ন অঘটন আশঙ্কা করে প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশি জিনিস গচ্ছিত করে রাখারই এই পোশাকি নাম। সুপারমার্কেট, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো এই প্যানিক বাইং পরখ করার ষোল কলা পূর্ণ করেছে লকডাউনের ঘোষণার শুরুর দিকে। আমাদের বাড়ির কাছে যে সর্বভারতীয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের চেইনের আউটলেটটা আছে, তাতে তৃতীয় দিনের লকডাউনের সন্ধেবেলা ঢুকে হতাশ হয়েছিলাম। চালের ড্রাম, ডালের ড্রাম খালি। সমস্ত শেল্ফে সাজানো ছিল শুধু হাহাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই ছিল না। সব শেষ। ইউনিফর্ম পরা স্টোরের ছেলেমেয়েদের কবে আবার জিনিস আসবে জিজ্ঞেস করায় কোনও উত্তর মেলেনি। ওঁদের পক্ষে উত্তর দেওয়াটা যে বেশ কঠিন, তা আন্দাজ করতে পারি। অধিকাংশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেরই জিনিস আসে একটা সেন্ট্রাল ওয়্যারহাউস বা গুদাম থেকে। টালবাহানার বাজারে সেই গাড়ি ফের আসবে কবে, তা ওঁদের জানা শক্ত। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শপিংয়ের মায়া ভুলে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলাম পাড়ায় রাস্তার মোড়ের এক দোকানে, যেখানে পা রাখিনি হত এক বছরে। বিশ্বাস করতাম, আমার সঙ্গে বাজার করে আমার ইগো-ও। ফলে আড়াইশো চিনি কেনার জন্যেও মাঞ্জা দিয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢোকা আমির সঙ্গে পাড়ার ওই দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা আমি-টাকে সেদিন ঠিক মেলাতে পারছিলাম না। তবে টুকরো টুকরো যে কথোপকথনগুলো উড়ে আসছিল আমার সামনে থাকা কাস্টমার আর দোকানির মধ্যে তা হল অনেকটা এই রকম।

চারটে বড় পাউরুটি দিয়ে দাও গোপালদা।

চারটে কি হবে বিমানবাবু, বাড়িতে লোক তো মোটে দুজন। ছেলে তো ফিরতে পারেনি বললেন।

আর বলবেন না। বলল বম্বে থেকে ভাড়া করে দিয়েছে তেরো হাজার টাকা। এত টাকা দিয়ে আসা যায়। পাউরুটিগুলো দাও গো।

একটা নেন বিমানবাবু। বাজার ভাল না। বাকিগুলো অন্যদের জন্য রাখি। কবে আসবেন আবার বলুন। আমি রেখে দেব আপনার জন্য।

তা হলে দুধ দিয়ে দাও তিনটে।

দুটোর বেশি কিছুতেই দিতে পারব না। আজ সাপ্লাই কম। অলকেশদার বাচ্চাটা রাত্তিরে দুধ না হলে খাবে না কিছুতেই। ওর জন্য একটা রাখি। তিনটেই আছে এখন।

অথবা,

ও দাদা। আটটা ছাতুর প্যাকেট। জলদি। পাঁচশো টাকা রাখলাম।

অন্য দোকানে যান। ছাতুটা সবার লাগে। এটা হোলসেল নয়।

অথবা,

পঁচিশ কেজি চাল দিয়ে দাও গোপালদা। রিক্সা দাঁড় করিয়ে রেখেছি।

মাফ করবেন। পাঁচের বেশি দিতে পারব না। সবাই মিলে একসঙ্গে না খেলে চলবে এখন? ভুল বললাম?

কর্পোরেটের আঁশ লাগানো গায়ে এই কথাবার্তাগুলো অত্যন্ত আনপ্রফেশনাল মনে হত অন্য সময়, যদি লকডাউন না থাকত। গ্রাম্য মনে হত যদি পরিস্থিতির ফাঁসে আমি বিপন্ন না হতাম। পাড়ার কিছু দোকান অস্থির সময়ে আমার চোখ খুলে দিল। আমার বলছি কেন, আমাদের। দোকানিরা যেভাবে খরিদ্দারদের চাহিদার ফিতেটা ক্রমাগত কাঁচি দিয়ে কেটে ছোট করে দিচ্ছিলেন, তাতে আস্ফালন নয়, ঝরে পড়ছিল আন্তরিকতা। এমন দোকানের হয়তো লয়্যালটি কার্ড নেই, ক্যাশব্যাকের সম্মোহন নেই, বারকোড স্ক্যান করে ঝড়ের গতিতে বিল করার পরিকাঠামো নেই, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ছড়ানো প্রতাপ নেই, কিন্তু যা আছে তা হল সবাই মিলে বাঁচার একটা প্রয়াস। এক আশ্চর্য দক্ষতায় তাঁরা এই পরিস্থিতি সামলে নিলেন, নিচ্ছেন প্রতিদিন। পাশের পাড়ারই অন্য এক দোকানদারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল সেদিন। অশীতিপর পিতা ও তাঁর বছর পঁয়তাল্লিশের পুত্র মিলে দোকান চালান। পুত্রের মুখে তিন চারদিনের না কাটা দাড়ি। ঘুম না হওয়া চোখের তলায় লেপ্টে রয়েছে কালি। পিতা ধুঁকছেন। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, এমন লাগছে কেন চেহারা? উনি বলেছিলেন, রাত দেড়টা অবধি দোকান খোলা রাখছি। বাড়িতে ফিরে কোনওরকমে মুখে কিছু গুঁজে দিয়ে আবার দোকান খুলছি সকাল সাতটায়। বললাম, এত রাত অবধি লোক হচ্ছে? উনি বলেছিলেন, এমন কয়েকটা অর্ডার পেয়েছিলাম যা আমার দোকানের স্টক শেষ করে দিত দুঘণ্টায়। দিইনি। কেন দেব? সবাইকে দিচ্ছি, অল্প অল্প করে। এতে আমার খাটনি বেড়েছে বহুগুণ। ঘুম গিয়েছে। তখন ভাবি, যদি আমি কাস্টমার হতাম? ক্লান্তি উধাও হয়ে যায়।

এটা ভেবে খুব তৃপ্তি হয়, অধিকাংশ দোকানদারই হয়ত এ ভাবেই ভাবছেন আজকাল। এ ভাবে ভেবেছেন বলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আমরা প্রতিদিন পেয়ে আসছি এই দুরূহ সময়েও। তাঁদের শোকেসে স্তব্ধতা ছিল না। পরিসংখ্যান বলে, ভারতের মতো বিশাল দেশে সংগঠিত খুচরো ব্যবসার ভাগ মোট ব্যবসার ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ১০০ টাকার জিনিস বিক্রি হলে তার ৭ টাকা বিক্রি হয় সংগঠিত খুচরো বিপণি (অর্থাৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোর) থেকে। আর বাকি ৯৩ টাকার জিনিসই বিক্রি করে অন্যান্য দোকান, যাকে আমরা কিরানা স্টোর বলে জানি। বাংলায় মুদি দোকান। ওয়াকিবহাল মহলের বিশেষজ্ঞরা এত দিন পর্যন্ত আশা করেছিলেন, এ দেশে ২০২১ সালের মধ্যে সংগঠিত খুচরো ব্যবসার ভাগ বেড়ে হতে পারে ১৮ শতাংশ। আশা করেছিলেন, ব্যবসার বৃদ্ধির শতাংশের কথা যদি ধরা যায়, অনেক বেশি বাড়বে অনলাইন বিপণির ব্যবসা। এই বিপণির ওয়েবসাইটগুলো ঝকঝক করছে, সবই আগের মতো। আলপনার মতো স্ক্রিনে ভাসছে, স্টে হোম, স্টে সেফ। তবে পছন্দের জিনিসগুলো কার্টে ভরার পরই অবধারিতভাবে দেখিয়ে চলেছে, আউট অফ স্টক। আজও।

অন্য সব কিছুর মতো করোনা ভাইরাস কাণ্ড খুব সম্ভবত এই বাড়বাড়ন্তের হিসেবটাও উল্টোপাল্টা করে দিল। বন্দিদশায় যে দোকানিরা আমাদের পরমাত্মীয় হয়ে উঠলেন, বব ডিলানের গানের মতো ‘শেল্টার ইন দ্য স্টর্ম’ যোগালেন, মুক্ত হয়ে তাঁদের ভুলি কী করে..। প্রিন্টার দিয়ে তড়িৎগতির বিল নয়, তাঁদের হাতে চিরকুটে লেখা বিলের মধ্যেই তো জীবন খুঁজে পেলাম বেশ কিছু দিন।