Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সদ্য সরকারিকৃত কলেজের অনার্স শিক্ষকদের চোখের জল কেউ দেখছে না

মুজাহিদ আহমদ

 

রাষ্ট্র, রাষ্ট্রচালক, রাষ্ট্র চালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারি, সংস্থা-সংগঠন সবার মাথায় এখন একটাই বিষয়, একটাই চিন্তা খেলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত—সেটি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি। এর বাইরে আর কিছু ভাববার সময় নেই, সুযোগও নেই কারো হাতে। যত সময় চোখ দু’টো খোলা থাকে তত সময় এই একই চিন্তা। ঘুম তো নেই। সকলেই এখন মহাব্যস্ত—কেমনে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, নিষ্কৃতি পাওয়া যায় এই করোনার ভয়ঙ্কর থাবা থেকে। বিনিদ্র রাত ল্যাবেই কাটাচ্ছেন অগণিত মানুষ—যদি একটা কিছু করা যায়! এমন একটা পথের সন্ধানে; মুক্তির সন্ধানে। রাষ্ট্র সর্ব শক্তি নিয়োগ করে চাচ্ছেন—কতো কম মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে, কেমনে রক্ষা পাওয়া যায়? কত কম সময়ে বাঁচা যাবে এই আপদ থেকে? যে যেখানে আছেন সেখান থেকেই যার যার মতো চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন। দেখা যাচ্ছে—দেশের জেলা প্রশাসকগণ খুবই ছাপে একই সাখে রয়েছেন ঝুঁকিতেও। তারা তো জনগণ আর সরকারের প্রথম সংযোগমুখ। তাদের কে ছুটতে হচ্ছে—হাওড়ে। ওখানে কেমন আছেন কৃষক। ছুটতে হচ্ছে—গ্রামে, পাড়ায়-মহল্লায়। ওখানে কেমন আছেন খেটে খাওয়া মানুষজন। ছুটতে হচ্ছে—বাজারে। ওখানে কেমন আছেন ভোক্তারা। প্রতিদিনের রুটিনকর্ম। ত্রাণের চাল-ডাল আবার খোয়া যাচ্ছে কী না সে খেয়ালও রাখতে হচ্ছে।—আসলে তারা খুব কঠিন অবস্থায় আছেন। তারা কোন দিক রেখে কোন দিকে খেয়াল দেবেন। অনেক কিছুই খেয়ালে আসছে না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে যাচ্ছে খেয়ালের বেইরে। তারপরও তারা ‘ফাইট’ করে যাচ্ছেন। আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ জ্ঞানী মানুষদের সাথে আমরাও বিশ্বাস করছি, আশায় বুক বাঁধছি—করোনার বিরুদ্ধে এই ‘ফাইট’, এই মহামারি একদিন শেষ হবে। সব কিছু শান্ত হবে। নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে করোনাভাইরাসের ভয়ে সৃষ্ট হুলুস্থুল, দৌড়ঝাঁপ, অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে। কারণ, সব কিছুরই তো একটা শেষ বলতে কিছু থাকে। আমরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সময় শেষ হওয়ার অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি। কঠিনতর দুর্যোগটির সমাপ্তি হোক। নিয়ন্ত্রণে আসুক প্রতিদিনকার মৃত্যুবহর; মানুষের কান্না। শেষ হোক দেশ-দুনিয়ার অচলাবস্থা। মানুষ মুক্তি পাক এই প্রার্থনায় এখন সময় কাটাই।

দুনিয়ার সমস্ত মানুষের কান্নার সাথে বাংলাদেশের মানুষেরও কান্নার আওয়াজ আজ বাতাসে বাতাসে ভাসছে—আহাজারি করছেন করোনার কামড় থেকে অন্তত শেষ রক্ষা যদি হয়, যদি বেঁচে যাওয়া যায় এই যাত্রায়—তবে ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে সামনে বাড়বে মানুষ, সামনে এগুবে সভ্যতা, সামনের দিকে চলবে সব। ঠিক এরকম একটা শপথ যখন ঘরে ঘরে মানুষজন নিচ্ছে, তখন আরো কিছু মানুষ কাঁদছে। খুব গোপনে। তাঁদের চোখের জল কেউ দেখছে না। তারা ভেতরে ভেতরে আর্তনাদ করছে এই বলে যে—‘করোনার ছোবলের আগে আগে আমরা মরে যাচ্ছি পেটের ক্ষুধায়, মানষিক যন্ত্রণায়। সরকারের এতো এতো ত্রাণ, এতো এতো সহযোগিতা পাচ্ছে মানুষজন। দিনমুজুর, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, সরকারি চাকুরে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—কোনো তালিকায় তো আমাদের নাম নেই। আমরা তো লাইনেও দাঁড়াতে পারছি না। আমরা তো মুখ খুলে বলতেও পারছি না, আমরা উপোস, আমাদের সন্তানদের খাবার দিতে পারছিনা। ঘরে চাল নেই, পেটে ভাত নেই, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার পরিজন নিয়ে কতো দিনের না খাওয়া। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে দিতে পারছিনা।’ তারা কারা? তারা হলেন—শিক্ষক গোষ্ঠীর একটা ক্ষুদ্র অংশ। জাতি গঠনের কারিগর এরা। সদ্য সরকারি হওয়া তিনশ দুটি কলেজের চার হাজারের মতো ননএমপিও শিক্ষক। এই করোনাকালে তারা—না গলা ছেড়ে কান্না করতে পারছেন, না মুখবুজে সহ্য করতে পারছেন। এরা সদ্য সরকারি হওয়া বিভিন্ন কলেজের প্রভাষক। সরকারি কলেজের বে-সরকারি অনার্স শিক্ষক। এমপিও পাননা, সরকারি বেতনও পাননা। পান সম্মানী। আর যে সম্মানী পান তা হলো—মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তাও দুই-তিন মাস পরে একমাসের। কোনো কোনো কলেজ এটুকুও দেয় না।

সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের মানুষও আজ করোনা ভাইরাসের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। পৃথিবীর সর্বোচ্চ গতি সম্পন্ন দেশগুলো চোখের পলকেই যেনো স্থির দাঁড়িয়ে পড়লো। চোখের সামনেই বন্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীর মানুষের নিয়মিত কাজ-কর্ম। অফিস-আদালত, কল-কারখানা। থমকে গেছে সব। কবে স্বাভাবিক হবে এর সঠিক উত্তর এখন পর্যন্ত কারো জানা নেই। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রধানরা আজ ধপ্ করে বসে পড়েছেন।স্থির করতে পারছেন না এই মুহূর্তে করণীয় কী? আয়-রোজগারহীন এই সময়টা কতটুকু দীর্ঘ হবে কেউ জানে না। এদিকে, আমাদের দেশের সদ্য সরকারি হওয়া কলেজের বেসরকারি শিক্ষকদের এসবে কোনো আগ্রহ নেই, করোনাভাইরাসের কোনো আতঙ্ক নেই তাদের মনে; চোখে-মুখে। তাদের বুক কাঁপছে না। মানুষ যখন করোনা ভাইরাস নিয়ে আলোচনা করছে, তাদের চেহারায় ভয়রেখা ভেসে উঠছে। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে, তখন ঐসব প্রভাষকরা চিন্তা করছেন-দুমুঠো ডাল-ভাত কেমনে পাওয়া যায়? পরনের কাপড়ের বন্দোবস্ত কেমনে করা যায়? তাদের চাকরিটা কবে সরকারি হবে? তাদের পদসৃজন আদৌ কি হবে? গত তিন বছরে যত ঋণ-ধার করেছেন তা কী পরিশোধ করে দায় মুক্ত হওয়া যাবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশি অধিদপ্তর তাদের কথা মনে রাখবে? কবে বলতে পারবেন তারা—‘আমরা সরকারি কলেজের সরকারি শিক্ষক, আমরা বেতন পাই, পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো আছি। এসব যদি না হয় তাহলে বেচেঁ থেকে কি হবে? এর চেয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরে গেলেই তো ভালো।’—এমনটাই কামনা করছেন ঐসব প্রভাষকের অনেকেই। দেখুন, ভাবনার মধ্যে কত পার্থক্য? সারা পৃথিবীর মানুষ কী ভাবছেন, আর প্রভাষকরা কী ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন? কতটুকু অস্বস্তিতে পড়লে একজন উচ্চ শিক্ষিত লোকের ভাবনা এমন হতে পারে? একজন শিক্ষকের ভাবনা এমন হতে পারে? জীবনটা কতটুকু বিষিয়ে উঠলে পরে একজন মানুষ তৈরির কারিগর এমন অভিমান করতে পারেন?

গত ১৯ এপ্রিল অনলাইন ট্যাবোলেট দৈনিক শিক্ষা ডটকম-এ লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার আদিতমারী সরকারি কলেজ-এর হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন তাঁর ‘কলেজ সরকারি, শিক্ষক বেসরকারি’ শিরোনামের নিবন্ধটি আমার সামনে আসে। পুরো লেখাটি পড়তে গিয়ে আমাকে বেশ কয়েক বার থামতে হয়েছে, ভাবতে হয়েছে।—এসব প্রভাষকের কথা তো এমন করে কখনো চিন্তাই করিনি! এই লেখাটি তৈরিতে ‘কলেজ সরকারি, শিক্ষক বেসরকারি’ শিরোনামের নিবন্ধটি আমাকে তাড়িত করেছে। দেখুন, একজন প্রভাষকের কষ্টের কথাগুলো কেমন শোনায়, আর কতটুকুই বা যৌক্তিক। কিছু অংশ হুবহু উদ্ধৃতি করছি- “করোনা আতঙ্কে আমার বন্ধুরা (যারা চাকরিজীবী অথবা অন্য যে কোনো পেশার সাথে জড়িত) যখন বাড়ির জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য চাল, ডাল, তেল আটা ময়দা ইত্যাদি কিনে বাড়িতে মজুদ করছে, যেন ১৫-২০ দিন ঘর থেকে বের হতে না হয়। তখন আমি ভাবছি পদসৃজন হলে আমিও কিনতে পারতাম। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে চাকরিতে যোগদান করেছি। আজ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। প্রায় ৬ বছর এই আশায় ১২টা ঈদ পার করেছি, ৬ টা ১লা বৈশাখ পালন করেছি। আশা পূরণ হয়নি। কলেজ সরকারিকরণ না হয়ে যদি বে-সরকারি থাকতো তা হলে অনার্স শিক্ষক হিসেবে প্রতি বছর ১ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি পেয়ে এখন বেতন হতো প্রায় ১১ হাজার টাকা। তাতে হয়তো এই বিপদের দিনগুলোতে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারতাম। ২ কেজি তেল, ২ কেজি চিনি, এক কেজি ডাল, ১ কেজি পেয়াজ, ২০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু কিনে রাখতাম। কিন্তু সরকারিকরণ হওয়ার পর থেকে বেতন বন্ধ। সরকারিকরণ হওয়ার আগে স্বপ্ন ছিল-বেতন প্রতি বছর ১ হাজার টাকা করে বাড়বে। শুরুতে ৬ হাজার টাকা, বছর বছর ১ হাজার করে বাড়লে ৫ বছর পর হবে ১১ হাজার। ১০ বছর পর হবে ১৬ হাজার। যেটা অন্যান্য বেরকারি অনার্স কলেজে হয়ে থাকে। (বি.দ্র. : আমার জানামতে অনেক বেসরকারি কলেজে অনার্স শিক্ষক ২০ হাজার টাকাও বেতন পেয়ে থাকেন।) তখন স্বপ্ন ছিল ছোট, আশা ছিল কম। তাই অনার্স শিক্ষক হিসেবে কলেজে যোগদানের পর ভালোই লাগছিল। কিন্তু ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে সরকারিকরণের ঘোষণা এবং ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে জিও জারি সব স্বপ্ন, আশা শেষ করে দিলো। সরকারি কলেজ, সরকার বেতন দেবে, কলেজ থেকে বেতন বন্ধ। সরকারিকরণ হওয়ার কারণে কমিটি না থাকায় বলতে গেলে আমাদের দেখার কেউ নেই। বেতন নেই সে কথা বলতে গেলেও বিপদ। শাঁখের করাত যাকে বলে আরকি।”—এ রকম আরো অনেক আহাজারি, কষ্টের কথা, খোলা চিঠি বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় শুকনো পাতার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে; উড়ে বেড়াচ্ছে। আমরা কয়জনই বা তার খোঁজ রাখছি?

প্রভাষকগণ বিগত দিনে কলেজ থেকে যে পরিমাণের সম্মানী পেয়েছেন—কলেজে যাওয়া আসা আর টিফিন খরচের পেছনে তার চেয়ে বেশি খরচ হওয়ার কথা! তাদের হাতে তো কোনো টাকা জমা থাকার কথা না। যা এই দুর্দিনে কাজে লাগবে। বর্তমানে পানি, বিদ্যুৎ গ্যাস ও বাড়ি ভাড়াসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সকল কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে নিম্ন ও মধ্য আয়ের লোকজন যেখানে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে বৈশ্বয়িক এই মহামারির সময়ে বেতনবিহীন চাকরি করে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকা যায়? আর থাকাই বা কতটা কষ্টের—যারা ভুক্তভোগী কেবল তারাই বুঝবেন—এমন কথা না বলে অন্তত এই আপদকালীন সময়ে কেমনে তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়, তাদের কে মানষিকভাবে একটু শক্ত রাখা যায়, আশ্বস্ত করে মনোবল দৃঢ় করা যায়, সেই বিষটি জেলা প্রশাসকগণসহ সংশ্লিষ্টরা একটু ভাবতেই পারেন। শত-সহস্র ভালো কাজের মতো এইখানেও আপনাদের আরো একটি ভালো কাজের সুযোগ রয়েছে। যা—অন্তত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আজীবন মনে রাখবে। প্রার্থনা করবে। কারণ, তারাও তো দেশের উন্নয়নের অংশীদার। তারাও শ্রম-ঘাম-রক্ত নিবেদন করছেন দেশ মাতৃকার উন্নয়নে। তাছাড়া, আগামি সুন্দর রাষ্ট্রের হয়ে, রাষ্ট্র বিনির্মাণে যারা কাজ করবেন, তারা তো তাদের হাত দিয়েই বেরিয়ে আসতে হবে। তারা তৈরি করবেন। কারণ—এরা শিক্ষক।

ভবিষ্যতে প্রাপ্য সরকারি বেতন ভাতা ও আর্থিক সুবিধা থেকে কর্তন করে নেয়া বা কোনো কারণে দুর্ভাগ্যবশত কেউ আত্তীকরণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে তার কলেজ হতে গৃহীত বেতন-ভাতাদি কলেজ ফান্ডে ফেরত দেবার শর্ত মেনে সই সাক্ষর করেও কোনো লাভ হয়নি—দুর্ভাগা প্রভাষকের সংখ্যা কম নয়। অনেক কলেজই এমন হাস্যকর কাজটি করেছে তার প্রভাষকের সাথে। ঐসব প্রভাষকরা এখন আর কোনো উপায় দেখছে না। এই আপদকালীন সময়ে উপরের বিশাল আকাশটাই এখন তাদের সঙ্গী। যে আকাশটা কখনো রৌদ্রকরোজ্জ্বল, কখনো ঘন কালো মেঘে ঢাকা! যতটুকু জানা গেছে—জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পদাধিকার বলে সরকারিকৃত ঐসব কলেজের সভাপতি। মহোদয়গণ—আপনারা অনেক ব্যস্ত। শত সহস্র কাজ নিয়ে ঘুম থেকে উঠেন। সারাদিন সেই কাজের পেছনেই ছুটেন। আবার রাত হলে অসমাপ্ত কাজের ছাপ নিয়ে ঘুমোতে যান। আপনাদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। শত ব্যস্ততার কারণে ঐসকল প্রভাষকগণের খোঁজ-খবর নেওয়ার মতো সময় আপনাদের হয়না। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা সব বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন কষ্টের কথা-গল্প শুনছেন। ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। আপনাদের দায়িত্ব পালন ও মহানুভবতা আমরা লক্ষ করছি—সেই জায়গা থেকেই একটু সুপারিশ—দেশের সদ্য সরকারি হওয়া কলেজের [ননএমপিও] অনার্স শিক্ষকদের একটু খোঁজ-খবর নেন। তাঁরা কেমন আছেন, একটু দেখেন, একটু আশ্বস্ত করেন। এই করোনা পরিস্থিতিতে তাঁদের অবস্থা খুবই খারাপ। এরা ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে পারছেন না। তারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। হয়তো তাদের অবস্থা এতোই করুণ হতনা—যদি কলেজ তাদের প্রতি সদয় ও সহযোগি মনোভাব দেখাতো। তিন শত দুইটি কলেজের বেশির ভাগ অধ্যক্ষের মাঝে রয়েছে সেই কলোনীযুগের মানসিকতা ও অত্যাচারী মনোভাব। শিক্ষকরা কলেজ প্রধানদের কাছে অকপটে বলে আসছেন—তাদের অর্থকষ্টের কথা, দুঃখ-দুর্দশার কথা। উল্টো—তাচ্ছিল্য, উপহাস মানিব্যাগে নিয়ে ফিরতে হয়েছে। ফলে সরকারি কলেজের ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা রয়েছেন সবচাইতে অর্থ কষ্টে। তারা না পান সরকারি বেতন না পান প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন। আবার এসব বিষয় নিয়ে কথা বললে—অখুশী হন অধ্যক্ষরা। বর্তমানে করোনার মহামারিতে এই শিক্ষকদের কষ্ট আরো কয়েক গুণ বেড়েছে। তাদের পাশে কাউকে না কাউকে দাঁড়ানো উচিৎ।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারি কলেজবিহীন উপজেলা সদরে একটি করে কলেজ সরকারি ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি হলেও সরকারিকরণের সুবিধা পাচ্ছেন না কেউই। কলেজ সরকারি হলেও শিক্ষকরা বেসরকারি। পদসৃজন ও অ্যাডহক নিয়োগ আটকে রেখেছে শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তা। তারা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে কৌশলে আটকে রেখেছেন বছরের পর বছর এমন কথাও পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে। শিক্ষকদের পদ সৃজনের ও অ্যাডহক নিয়োগের কার্যক্রম এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় তাদের বেতন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে চলছে ভীষণ রকমের অনিয়ম ও আজব পদ্ধতি। সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে সরকারিকৃত কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এমপিও পাচ্ছেন। কিন্তু সরকারিকৃত কলেজের ননএমপিও শিক্ষকদের বেলায় পরিলক্ষিত হচ্ছে—ভীষণ অব্যবস্থাপনা। নিয়োগের শর্তানুসারে ননএমপিও অনার্স শিক্ষকদের কলেজ ফান্ড থেকে শতভাগ বেতন ভাতা প্রদানের কথা। কলেজে পর্যাপ্ত ফান্ড থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চালু রাখলেও অনেক প্রতিষ্ঠান ননএমপিও শিক্ষকদের বেতন ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে।যা—উর্ধ্বতনের কারো কোনো তদারকিতে আছে বলে আপাত দৃষ্টিতে প্রতিয়মান হচ্ছে না। তিনশ দুটি কলেজ যদি তার ননএমপিও শিক্ষকদের সাথে সমান আচরণ পোষন ও কলেজ থেকে শর্ত-সাপেক্ষে গঠনমূলক সুবিধা প্রদান করে আসত তাহলে আজকে প্রভাষকদের বেকায়দায় পড়তে হতো না। যা কলেজ প্রধানদের অসহযোগিতাটাই মোটা দাগে দায়ী বলে মনে হচ্ছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের নানামুখি কার্যকর উদ্যোগ রয়েছে। যা বাস্তবায়ন করতে সরকারের তরফ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে মাঠে-ময়দানে কাজ করে যাচ্ছেন। মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এই বৈশ্বয়িক বিপদের দিনে চরম বিপাকে পড়া প্রভাষকগণের একটু খবর নিবেন। জানতে চাইবেন—কেমন আছেন তাঁরা। যাঁরা তৈরি করে দিবেন আপনার-আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের সোনালী মানুষ হিসেবে।