Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

শিবঠাকুরের আপন দেশে আইনকানুন সর্বনেশে

অর্ক দেব

 


লেখক সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

 

আমাদের দেশে সুস্থ কর্মসংস্কৃতি বিষয়টা সোনার পাথরবাটির মতো। সরকারি হোক বা অসরকারি, ক্ষমতার দাঁতনখ বেরিয়ে রয়েছে সর্বত্র। পরিষেবা প্রদানকারীর বিপ্রতীপে দাঁড়ানো ক্ষমতার থেকে চার-পাঁচ ইঞ্চি খাটো মানুষ বিষয়টি অহরহ টের পান। লড়তে হয় শুকতলা ক্ষইয়ে। আর এই বিপদে উল্টোদিকে যদি স্বয়ং সরকার থাকে? তবে সমস্ত পাটিগণিতই উল্টে যাবে, সব আশার কফিনে জাঁকিয়ে বসবে এক কালোপাহাড়ি ব্যবস্থা, সেই বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে হচ্ছে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে।

হ্যাঁ, কথা বলছি সরকারি-বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে গত কয়েক দিনে কেন্দ্রীয় নিদানকে নিয়ে। খবরের কাগজের পাতায় নিদানগুলি একটি দূরত্ব থেকে পড়লে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি আদতে তা নয়। বরং ভেবেচিন্তে সুস্থ মস্তিষ্কে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যা একে অপরের পরিপূরক, যা ভারত রাষ্ট্রের কর্মসংস্কৃতিতে যেটুকু যা খোলা হাওয়া অবশিষ্ট তাকে ধ্বংস করবে। আমরা আলোচনার স্বার্থে এখানে মাত্র দু সপ্তাহের ব্যবধানে সামনে আসা দুটি কেন্দ্রীয় নিদানে চোখ বোলাব প্রথমে।

আগস্ট মাসের শেষে কর্মীবর্গমন্ত্রক একটি অ্যাডভাইসরি জারি করে জানায় প্রতিটি কেন্দ্রীয় দফতরে এই সার্ভিস রেকর্ড রিভিউ চালু হতে চলেছে। সরকারি বেতনভুক কর্মীর কর্মদক্ষতা বিচার করা হবে মৌলিক বিধি ৫৬ (জে) এবং ৫৬ (আই), এছাড়া সেন্ট্রাল সিভিল রুল ১৯৭২-এর ৪৮ (১) ধারার আওতায়। এই ধারা অনুযায়ী, জনস্বার্থে যে কোনও সরকারি কর্মচারীকে অবসর গ্রহণে বাধ্য করার এক্তিয়ার থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় সপ্তাহেই এল নতুন শর্ত। সমস্ত কেন্দ্রীয় সরকারি কাজের জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে ইউনিয়ন কথাটি। কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আইন অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন করারই কথা নয়।

জোর গলায় বলছি, এই দুই নিদান একে অন্যের পরিপূরক। একটি সোজা আঙুলে ঘি ওঠানো, অন্যটি আঙুল বাঁকানোর সঙ্কেত। আসলে পরিস্থিতির সঙ্গে সরকার পক্ষের সম্পর্কটা ক্রমেই আড়াআড়ি হয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে পারছেন ভদ্রমহোদয়রা। পরিখা রচনা চলছে আগেভাগে। এপ্রিল থেকে জুন, অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের জিডিপি-র সঙ্কোচন হল ২৩.৯ শতাংশ। নতুন লগ্নি ৪৭ শতাংশ কমেছে। অনেকেই বলবেন করোনা পরিস্থিতিই কারণ। কিন্তু তথ্যের কারবারি মাত্রেই জানেন, হাতের কাছে আছে গুগল। আসল কথা হল, এমন আর্থিক পরিস্থিতি একদিনে আসেনি। এমন পরিস্থিতি একদিনে আসেও না যেখানে সরকারকে সবার আগে ছাঁটাইয়ের নানামাত্রিক পথ মসৃণ রাখতে হবে। আর ছাঁটাই করতে লাগবে শুধু একটা কলমের আঁচড়। কর্তৃপক্ষ ‘আন্ডারপারফরমার’ দাগিয়ে দিলেই কর্মে ইতি।

কিন্তু রেল বা ডাকব্যবস্থায় ছাঁটাই হলে তো কর্মীরা মুখ বুজে মেনে নেবে না, ধর্মঘটের পথ বেছে নিতে পারেন তাঁরা। তাই আগেভাগেই ভাঙতে হবে ইউনিয়ন নামক যুথবদ্ধতার ব্যাকরণকেও। আবার যদি উল্টোভাবে ভাবি, দীর্ঘকাল ধরে সংগঠন করে আসা একজন সরকারি কর্মীর মনেও ভয় থাকবে, সংগঠন করলে এবার ছাঁটাই হতে পারি। কোনও ক্রমে সিঁটিয়ে থেকে কর্মজীবনের উপান্তে পৌঁছতে চাইবেন তাঁরা। ফলে শুরুতেই যা বলছিলাম, এটি একটি মেকানিজম, রণকৌশল। তা বুঝতে চাণক্য হতে হয় না, তবে না বুঝতে চাইলে হাতের সামনেই রয়েছে চিন যুদ্ধ বা অভিনেতার আত্মহত্যার মতো বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল। এখানে দক্ষতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। প্রশ্ন তুলছি পরিস্থিতির সাপেক্ষে সিদ্ধান্তের তৎপরতা ও তার পশ্চাৎপট  নিয়ে।

প্ৰশ্ন করার সুযোগ করে দিল সরকারের তৎপরতা। ‘সংসদীয়’ কার্যকলাপ। গণতন্ত্রের পক্ষে ফাঁকা সংসদকক্ষে বিল পাশের থেকে লজ্জাকর আর কী হতে পারে! তাইই হল আমাদের এখানে। দু দিনে ১৫টি বিল পাশ করাল কেন্দ্র, বিরোধী নেই, বিরোধিতাও নেই, ফলে যা পেশ তাইই পাশ। কেউ যদি এই বিলগুলিও খুঁটিয়ে পড়েন তবে আরও একবার বুঝতে পারবেন এই বিলগুলিতেও প্রতিটিতে রয়েছে সেই অশনিসঙ্কেত। এবং কোনও সিদ্ধান্তই বিচ্ছিন্ন নয়, একটি গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের অংশমাত্র। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, যে সরকার মৃত শ্রমিকের সংখ্যার হিসেব রাখে না, সেই বর্গের জন্যই কোড তৈরি করতে এত তাড়া কেন? তাড়াটা ঠিক কীসের? জোর যার মুলুক তার— এই প্রবাদ প্রমাণের নাকি অন্য কোনও গভীর ক্ষত ঢাকার ব্যবস্থাপনা?

নতুন শ্রমবিধি বলছে, এবার থেকে ১০০ জন নয়, ৩০০ জন রয়েছে এমন কারখানা যখন তখন বন্ধ করতে পারবে কোনও সংস্থা। সরকারের যুক্তি, এতে নাকি বিদেশি লগ্নি আসবে। এই যুক্তির নিগড়টি বোঝা সাধারণ মানুষের কাজ নয়, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলা লগ্নি টানার কৌশল হতে পারে কোনও হিতকারী রাষ্ট্রের?

পাশাপাশি বলা হচ্ছে, সরকারি নিয়োগ এবং ঠিকা নিয়োগ মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। পাঠক একটি সরল ধাঁধার  সমাধান করুন, কর্তৃপক্ষ কথিত আন্ডারপারফরমার বাতিল হলে শূন্যপদে নিযুক্ত হবেন কারা, আন্ডারপারফরমেন্সের মানদণ্ড ঠিক কী হবে, আন্ডারপারফরমেন্স অপ্রমাণের জায়গা কতটুকু। সর্বোপরি শূন্যপদে নতুন নিয়োগে দরপত্র হাঁকাবে কোন সংস্থাগুলি?

গণস্মৃতি ক্ষয়িষ্ণু তবু কেউই হয়তো ভোলেনি ২০১৮ সালে, এই সরকারের আমলেই কৃষক লংমার্চ হয়েছে। কোন তাড়নায় ১৮০ কিলোমিটার হাঁটে চাষি? তা বোঝার সময়টুকুও পাইনি আমরা। দু বছরের মধ্যেই ফের দেশজোড়া কৃষক বিদ্রোহ হচ্ছে। অন্য দিকে, করোনার সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের যে বিপুল দুর্দশার মধ্যে পড়তে হয়েছে ব্যবস্থাপনার অভাবের জন্য তাও সহজে বিস্মৃত হওয়া যাবে না। আগুন সময়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে প্রান্তজন। আমরা যেন ফিরে যাচ্ছি ১৯৪০-এর দশকে। শুধু পেশিশক্তিতেই উঠে যাচ্ছে পণ্যমজুতের ঊর্ধ্বসীমা। নয়া নিয়মে দেশি-বিদেশি নানা সংস্থাই কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে। যুদ্ধ-মহামারি সবসময়েই চাল, ডাল, আলু মজুত করে রাখবে। নয়া নিয়মে কৃষক চান বা না চান তাঁকে দাদন ব্যবস্থার অংশ হতে হবে। এই পূর্বাপরগুলি স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছে, এই সরকার মধ্যবিত্তের-উচ্চবিত্তের-কর্পোরেটের। খুব ছোট মানুষের নয়।

কিন্তু এই অবস্থানটিও আর থাকছে না। উপরে বর্ণিত ঘটনাপরম্পরা প্রমাণ করছে এবার সরকার এক অন্য আগুনে হাত দিচ্ছে। সমাজের সবচেয়ে সুরক্ষিত শ্রেণির স্বার্থে হাত দিচ্ছে, তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে একটু একটু করে, কাজের জায়গায় ভয়ের আবহ তৈরি হচ্ছে। কর্মসংস্কৃতি এমনিতেই দমচাপা, সেখানে কথাবার্তার অবকাশকে জেনেবুঝেই খুন করা হচ্ছে। এখন ভাবতে হবে, এই শ্রেণিই দুর্দশার পৃথিবী থেকে দূরে রবিবার রামায়ণ-মহাভারত দেখেছে, পাকিস্তানের বাপ-বাপান্ত করেছে বাড়ি ফেরার পথে, তৈরি করেছে নিরাপদ ‘ভদ্রলোক’ সমাজ, যে সমাজে মুক্তকণ্ঠ-মুক্তচিন্তার পরিধিই ছিল সবচেয়ে বড় শ্লাঘা। কিন্তু শেষ বয়সে এসে চাকরি খোয়ানোর ভয়ে তাঁদের যদি মুখে কুলুপ আঁটতে হয়, তবে তাদের গোটা জীবন তথা শ্রেণিশ্লাঘাটাই তো প্ৰশ্নের মুখে পড়ে যায়! তাঁরাও মুক্তমনা ছাত্র, মুসলমান, দলিত, কাশ্মিরি ইত্যাদি দেশের পাঁচটি ‘অপর’-এর মতো অপাঙক্তেয়জন বলেই বিবেচিত হন। এই পতন মধ্যবিত্ত সইবে? এতটা বেড়েই বা খেলতে হল কেন বিরাটহৃদয় বিরাটবপু ভদ্রমহোদয়দের? সামনে কি ক্যু? রাষ্ট্র কি ভূত দেখে ফেলেছে?