Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

শাহিনবাগের মা

শাহিনবাগের মা

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

কোথায় যেন পড়েছিলাম, আরবি-তে ‘শাহিন’ শব্দটির অর্থ বাজপাখি। ‘টাইম’ পত্রিকায় রানা আইয়ুবের ছোট্ট অথচ টাইমবোমার মতো শক্তিশালী লেখাটা পড়তে-পড়তে যতবারই প্রৌঢ়া বিলকিসের ছবিটার দিকে চোখ যাচ্ছিল, বারবার মনে পড়ছিল সেই কথাটাই। অসংখ্য বলিরেখার কাটাকুটিতে ভরা সেই মুখে আশ্চর্য এক ঠোঁটচাপা হাসি। সে হাসি ছড়িয়ে আছে কোঁচকানো দুই চোখেও। চোখদুটো হাসছে ঠিকই, কিন্তু তাতে চাপা পড়ছে না তাদের চাহনির ঝকঝকে ধার। আলেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভের (যাঁকে আমরা মাক্সিম গর্কি নামে চিনি) সঙ্গে বিলকিসের দেখা হয়নি, কিন্তু শতাব্দীর ব্যবধান এক লহমায় উড়িয়ে পাভেলের মা পেলাগেয়া নিলোভ্‌না ভ্লাসোভা কী যেন এক ম্যাজিকে নির্ভুল এসে বসেছেন এই মুখে— যাঁর দিকে চেয়ে, যাঁর ভরসায়, কয়েকমাস আগেই শাহিনবাগের প্রতিবাদমঞ্চে জড়ো হয়েছিল অন্য এক ভারতবর্ষ। বিলকিসের চোখের দিকে তাকিয়ে তারা নিঃসংশয়ে বুঝতে পেরেছিল, শাহিন মানে বাজপাখি।

এতক্ষণে আপনারা সবাই জেনে গিয়েছেন, ২০২০-র সেরা ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকায় নাম উঠেছে বিলকিসের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস, গুগ্‌লের কর্ণধার সুন্দর পিচাই, ক্লিনিকাল মাইক্রোবায়োলজির ডাকসাইটে অধ্যাপক রবীন্দ্র গুপ্তা ও বলিউডের আয়ুষ্মান খুরানার পাশে পঞ্চম ভারতীয় হিসেবে সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন শাহিনবাগের দাদি।

২০২০ সালের একেবারে শুরু থেকেই শাহিনবাগ শব্দটি যেন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অথচ, শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে প্রতিবাদী যে মুখগুলি ভেসে ওঠে, সেই মুখগুলিকে আমরা অন্যান্য  আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারি না। যে ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে আমরা কমবেশি সকলেই বিলক্ষণ পরিচিত, বিভিন্ন আন্দোলনের পুরোভাগে যে মুখগুলি আমরা সচরাচর দেখতে অভ্যস্ত, এ আন্দোলন এবং তার কুশীলবরা যেন সেসবের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। কস্মিনকালেও প্রত্যক্ষ রাজনীতির চৌহদ্দির মধ্যে না-থাকা, ঘরের কোণে ছায়ার মতো সংসার-সামলানো মা-মেয়েরাই এই আন্দোলনের একেবারে সামনের সারিতে। আর তার একেবারে সামনে মা-বাজপাখিটির মতো নিজের বিশাল দুই ডানার নীচে সবাইকে আগলে রাখা মুখটি এই ৮২ বছর বয়সী প্রৌঢ়ার।

বিলকিসকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের নাতিদীর্ঘ নিবন্ধটিতে ঠিক কী লিখেছেন রানা আইয়ুব? তিনি লিখেছেন, ভারতে যখন বিজেপি সরকার মহিলা ও সংখ্যালঘুদের কণ্ঠকে নিয়মিতভাবে চুপ করিয়ে রাখার পথ বেছে নিয়েছে, তখন বিলকিস-সহ শাহিনবাগের এক হাজারেরও বেশি মহিলা একজোট হয়ে প্রতিরোধের দেওয়াল গড়ে তোলেন। দেশজুড়ে গণতন্ত্র যখন ক্রমে বিপজ্জনকভাবে স্বৈরাচারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, সেই ফাসিস্ত ঝোঁকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার জন্য যখন একের পর এক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, যখন প্রশ্ন করার অর্থই হল নামের পাশে দেশবিরোধী তকমা জুড়ে যাওয়া— এমন এক শ্বাসরোধী আবহে দাঁড়িয়ে, এনআরসি এবং সিএএ-র বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিলকিস।

সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে রানাকে কী বলেছিলেন বিলকিস? বলেছিলেন, “আমার প্রতিটি শিরায় রক্ত চলাচল যতদিন বন্ধ না-হচ্ছে, ততদিন আমি এইখানে বসে থাকব। বসে থাকব, যাতে এদেশ এবং বিশ্বের শিশুরা ন্যায়বিচার ও সাম্যের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারে।”

১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ভারতীয় সংসদে অনুমোদিত হয় নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট)। জাতীয় নাগরিকপঞ্জী নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল আগে থেকেই; তার সঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনের বিষয়টি জুড়ে যাওয়ার পরই অভিযোগ ওঠে, এই দুই আইনকে হাতিয়ার করে কার্যত সংখ্যালঘু মুসলমানদের দেশ থেকে মুছে ফেলার কাজে নামতে চলেছে বিজেপি সরকার। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ছটি সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে শুধুমাত্র এই শর্তে যে, তারা ছ বছরের অধিক ভারতে বসবাস করেছে এবং ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ সালের আগে এ দেশে প্রবেশ করেছে। আইনের পেছনের আসল উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট হতেই দেশজুড়ে এই মুসলমান-বিরোধী কালাকানুনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের বাইরেও।

কী খেয়ে বেঁচে থাকবেন তার ঠিকানা পেতেই যে দেশে কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, যেখানে থাকার ঘরটুকু পর্যন্ত নেই অসংখ্য মানুষের, সেখানে তাঁদের কাছে পরিচয়-জ্ঞাপক সমস্ত কাগজপত্র ও নথি যথাযথ সংরক্ষিত থাকবে, এমন আশা করাই বাতুলতা। সর্বোপরি, এটি তাদের আত্মপরিচয়েরও প্রশ্ন, কারণ এই আইনের বলে শুধুমাত্র মুসলমান জনগোষ্ঠীকেই তাঁদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করতে হবে, এই দাবিও ঘোরতর আপত্তিজনক। মূলত এই প্রশ্নগুলিকে ঘিরেই আন্দোলন দানা বাঁধে।

সিএএ ও এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে আলোচনার জায়গা এই প্রবন্ধে নেই, কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, যেমন জামিয়া মিলিয়া ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সরকার-বিরোধী ষড়যন্ত্র, দেশ-বিরোধিতা এবং দেশদ্রোহীদের উৎসাহ ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে বারবার, ঠিক সেই একই অভিযোগ শাহিনবাগের বিরুদ্ধেও উঠেছে। সোজা পথে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন ভাঙতে না-পেরে দিল্লিতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে শাহিনবাগের জমায়েতকে তোলারও চেষ্টা করেছে বিজেপি-আশ্রিত গুণ্ডাবাহিনী। এত বিরুদ্ধতার মধ্যেও গোটা দেশ ও বিশ্বের সামনে শাহিনবাগ হয়ে উঠেছে মেয়েদের নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দলিল। আর এই আন্দোলনের একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে বিলকিস হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার আর এক নাম।

এতদিন ধারণা ছিল, নিতান্ত ঠেকায় না-পড়লে মহিলারা সাধারণত বাড়ির বাইরে বেরোন না। বিশেষত দরিদ্র, সংখ্যালঘু মুসলমান পরিবারে যেখানে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সক্ষমতার আলো সেভাবে পৌঁছয়নি, সে সমাজের ক্ষেত্রে তা ছিল আরও বেশি বাস্তব। এও নিশ্চিতভাবেই এক পুরুষতান্ত্রিক নির্মাণের ফল, কিন্তু সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানতাম, ঘরে থেকে সংসার সামলানো, ছেলেপিলে মানুষ করা ও স্বামীর নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলাই এতদিন ছিল তাঁদের পরিচয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম, যে তাঁরা সত্যি অবলা, তাঁদের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নেই, তার অধিকারও নেই— নেই নিজেদের বক্তব্য রাখার কোনও সামাজিক পরিসর। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এই মুসলমান মায়েদের আওয়াজ এই সমস্ত ধারণাকে একেবারে রাতারাতি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই গর্জে ওঠার মধ্যে নেই এক ফোঁটাও হিংসা। এই প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ এবং আত্মবিশ্বাসী। এই প্রতিবাদের ভিত্তিতে রয়েছে যুক্তি এবং সত্যের জোর।

সত্যের জোর না-থাকলে এই আন্দোলনকে ভাঙতে এত কাঠখড় পোড়াতে হত সরকারি গুণ্ডাবাহিনীকে?