Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পূর্বা দামের চলে যাওয়া একটা বড় শূন্যতা

পূর্বা দাম | রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী

অভ্র বসু

 


লেখক প্রাবন্ধিক, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

 

 

 

সালটা সম্ভবত ১৯৭৭ কি ১৯৭৮। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তখন ঢাকুরিয়া ব্রিজের নিচে, নিখিল ভারত বঙ্গভাষা প্রসার সমিতির বাড়ির একাংশে। সেখানে একটি সভা। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আলোচনা করছেন আমার বাবা সোমেন্দ্রনাথ বসু, সঙ্গে গান গাইছেন দুজন— অর্ঘ্য সেন আর পূর্বা দাম। আমি তখন নিতান্ত শিশু— কিন্তু সেদিনের পূর্বা দামের গাওয়া একটি গান আজও মনে আছে: হেথা যে গান গাইতে আসা আমার হয়নি সে গান গাওয়া। অল্প দিনের মধ্যেই বাবা একটা রেকর্ড নিয়ে এলেন। আকারে ছোটে সেই রেকর্ড, কিন্তু 45 rpm নয়, 33 rpm। 45 rpm-এর মতো এক পিঠে দুটি করে গান নয়, তিনটি করে গান। তিনজন গায়ক, পূর্বা দাম, অর্ঘ্য সেন এবং সম্ভবত, খুব যদি ভুল করে না থাকি, মায়া সেন। সেখানে পূর্বা দামের এই গানটি ছিল। অন্য পিঠে ছিল তাঁর গাওয়া আমি আছি তোমার সভার দুয়ারদেশে। সেই ছোটবেলা থেকেই এই দুটি গানকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক আশ্চর্য মুগ্ধতা— গান, গায়ন, গায়ক সব মিলিয়ে নিয়ে এক সম্মিলিত অনুভূতি।

তারপরে চার দশক পেরিয়েছে। সেই মুগ্ধতা ক্রমশ ঘনীভূত হয়েছে। কী বিস্ময়কর গান তিনি গেয়েছেন। কিছু গান তাঁর কণ্ঠে ছাড়া ভাবাটাই কঠিন হয়ে যায়— শান্তি করো বরিষণ বা শ্রান্ত কেন ওহে পান্থর মতো গান তাঁর সঙ্গে একাকার হয়ে আছে। কতবার কত অনুষঙ্গে শুনেছি তাঁর নয়ান ভাসিল জলে। রাগসঙ্গীতের অনুষঙ্গবাহী এই কঠিন গানগুলির গায়নে তিনি এত অনায়াস যে মনেই থাকে না গানগুলি আসলে কত দুরূহ!

তিনি ছিলেন সুচিত্রা মিত্রের ছা্ত্রী। সুচিত্রার গায়কী এত সার্থকভাবে আর কেউ বহন করতে পারেননি। কোনও ঘরানার শিল্পী তখনই ভালো থেকে মহান হয়ে ওঠেন, যখন তিনি ঘরানার সমস্ত গুণাবলি স্বীকার করে স্বকীয় হয়ে উঠতে পারেন। পূর্বা দামের গান শুনলে অনায়াসে বোঝা যাবে তিনি সুচিত্রার ছাত্রী, এমনকী কোথাও কোথাও অন্যমনস্ক হলে চকিত বিভ্রম হওয়াটাও একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু কোনও মুহূর্তেই মনে হবে না তাঁর গান সুচিত্রার অনুসরণ। এমন অসামান্যভাবে তিনি তাঁর গুরুকে আত্মস্থ করেছেন যে তাঁর স্বকীয়তাও মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে অতিরিক্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস সুচিত্রার গানের একেবারে বিলক্ষণ লক্ষণ, তা পূর্বার গানে নেই। সুচিত্রার তুলনায় পূর্বা আরও সংহত, সংযত, বাহুল্যবর্জিত। সবচেয়ে চোখে পড়বার মতো ফারাক নিশ্চয়ই তাঁদের গান গাইবার দৃশ্যরূপে। গুরুর ম্যানারিজমগুলি তিনি সযত্নে সরিয়ে রেখেছিলেন। অত্যন্ত অবিচল, স্থির, আতিশয্যহীনভাবে গান গাইতেন পূর্বা। যা সুচিত্রা মিত্রকে মানায় তা যে সকলকে মানায় না, খুব ঘনিষ্ঠ ছাত্রী হয়ে সেটা উপলব্ধি করাটা কিন্তু সহজ নয়। গুরুকে অঙ্গীকার করতে গিয়ে গুরুর ভঙ্গির অনুকরণ হয়ে ওঠে সাধারণের ক্ষেত্রে অনিবার্য, কিন্তু যিনি অসাধারণ, তিনি জানেন কোনটা নেওয়ার, কোনটা নয়। পূর্বা দাম প্রকৃত অর্থেই অসাধারণ শিল্পী।

তাঁর রেকর্ড বা সামনাসামনি শুনতে গিয়েও দেখেছি তিনি প্রধানত পূজার গানই গেয়েছেন। পূজার গানে তাঁর যে আত্মনিবেদন, তাঁর গান গাইবার ভঙ্গির সঙ্গে মিশে অনির্বচনীয় হয়ে ওঠে। অসীম ধন তো আছে তোমার কিংবা সীমার মাঝে অসীম তুমি— এই দুটি গান শুনলেই মনে হয় না কোথাও কোনও সীমা আছে বলে। পূজার গানে সত্যিই তিনি অদ্বিতীয়। কত গানের কথা মনে হলেই তাঁর কথা মনে হয়: তব সিংহাসনের আসন হতে, এমনি করে ঘুরিব দূরে বাহিরে, ওরে মাঝি ওরে আমার মানব জন্মতরীর মাঝি, দেওয়া নেওয়া ফিরিয়ে দেওয়া বা আসা-যাওয়ার মাঝখানে। শেষ গানটিতে তাঁর উচ্চারণে ‘একলা’ শব্দের উচ্চারণটির মধ্যে ‘অশ্রু-ভরা’ গানের যে রূপটি মূর্তি লাভ করে তা অনবদ্য। আমার বিশেষ করে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করে তাঁর গাওয়া তোরা শুনিসনি কি শুনিসনি তার পায়ের ধ্বনি। গানটির গায়নে এবং লয়ের মধ্যে দিয়ে যেন তার পায়ের ধ্বনি স্পষ্ট শোনা যায়।

আগে বলেছি ধ্রুপদী গানে তাঁর সিদ্ধির কথা। কিন্তু তাঁর ঘরানার গুণ চমৎকার বেরিয়ে আসে লোকসুরের গানে— আমি কান পেতে রই, আমি তারেই জানি তারেই জানি, সে যে মনের মানুষ অথবা তুমি বাহির থেকে দিলে বিষম তাড়ার মতো গানে বাউলাঙ্গ মাত্রাটা খুব স্পষ্ট করে সুচিত্রা মিত্রের ভঙ্গিকে স্বীকার করেই স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কিন্তু আমার বারেবারেই আক্ষেপ হয়েছে অন্যান্য পর্যায়ের গান তুলনায় এত কম গেয়েছেন কেন! ধরা যাক বিচিত্র পর্যায়ের কিছু গান— রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, আমি ফিরব না আর ফিরব না রে কিংবা মধুর ধ্বনি বাজে— এর কি কোনও তুলনা আছে? প্রেম পর্যায়ের গানের মধ্যে ওরে কী শুনেছিস ঘুমের ঘোরের কথা বিশেষ করে বলতে হয়।

প্রকৃতির গান, বিশেষ করে তাঁর গাওয়া বর্ষার গান আমার ভারি পছন্দ। হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে বা গহনরাতে শ্রাবণধারার মতো গান কী ভীষণ সুন্দর। বিশেষ করে মুগ্ধ হয়ে শুনি তাঁর শ্রাবণবরিষণ পার হয়ে গানটি। গানটিতে চারবার রয়ে রয়ে রয়ে রয়ে কী অদ্ভুত এক আবেশ। গানটার মধ্যে শব্দটির বারবার ব্যবহারের মজা আছে। সেই মজাটা ফুটে উঠেছে তাঁর অনাবিল গায়কিতে।

এই কথা হয়তো বলা যায় স্বদেশ পর্যায়ের গানের সম্পর্কেও। তাঁর বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখির মতো গান বেশি নেই। মিষ্টত্ব এবং বলিষ্ঠতার কী অপূর্ব সংমিশ্রণ সেই সমস্ত গান।

দু-একটা ব্যক্তিগত গল্প বলি শেষে। সুচিত্রা মিত্র ছিলেন আমার বাবার সহপাঠী। ১৯৮০ সালে আমি তাঁর অটোগ্রাফ নিই— তিনি সই করেছিলেন সুচিত্রাপিসি বলে। আমি তাতে একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছিলুম সেই বয়সে— মনে হয়েছিল সইটা পুরো নাম যদি না হয়, তাহলে তা ঠিক ঠিক অটোগ্রাফ হল না। ঠিক তিনদিন পরে পূর্বা দামের অটোগ্রাফের জন্য সেই খাতাটি যখন বাড়িয়ে দিলুম, তিনি দেখলেন তাতে “সুচিত্রাপিসি” নামে সই। আমি খানিকটা অনুমান করেই বললুম যে পুরো নামটা সই করতে হবে কিন্তু। তিনি একটু হেসে সই করলেন: “পূর্বাপিসি”। বললেন “সোমেনদার ছেলের আমি পিসি হব না?” তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা কয়েক বছর আগে, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে। আমার ছেলের সেই প্রথম দেখা। তাকে তো তিনি খুবই আদর করলেন। করতে করতেই কোনও এক ছাত্রী তাঁকে একটি পান দিতে তিনি মুখে পুরে ফেললেন। হঠাৎ আমার ছেলে বলে উঠল, “তুমি জানো না আমি পান খেতে ভালোবাসি?” সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাপিসি চিন্তায় পড়ে গেলেন। এই রে, পান তো আমার কাছে নেই! ‍যিনি দিয়েছিলেন, তাঁর কাছেও ওই একটিই পান ছিল। তিনি তখন তাঁর সমস্ত ছাত্রীদের ডেকে পাঠালেন— “কার কাছে পান আছে বার করো, সোমেনদার নাতি পান খেতে চেয়েছে!” বলা বাহুল্য, পানের ব্যবস্থা হয়েছিল।

আমরা যখন বলি, কোনও যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, বহু সময়েই সেটা যেন কথার কথা হয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার একটি পুরনো বাদ্যযন্ত্রবিরল, কোনও অপ্রয়োজনীয় কায়দাকানুন বর্জিত সহজ অথচ শিক্ষিত, মার্জিত গায়নরীতি ইতিমধ্যেই হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই যুগের একজন প্রতিনিধিস্থানীয় গায়িকা পূর্বা দাম। যুগ হয়তো আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাঁর গানও শেষ কয়েক বছরে আর আমরা শুনতে পাইনি। তবু তিনি ছিলেন একটা যোগসূত্রের মতো। আমাদের মতো যারা পুরনো গান রুচিতেই অভ্যস্ত রয়ে গেছি, তাঁদের কাছে পূর্বা দামের চলে যাওয়া একটা বড় শূন্যতা।