Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আয়ু, জল ও রৌদ্র অভ্যুত্থান

কুণাল বিশ্বাস

 


লেখক কবি ও গদ্যকার

 

 

 

 

এক

আমি তাই কালোরূপ ভালোবাসি,
জগ-মন মজিলি এলোকেশী।

                       (রামপ্রসাদ সেন)

অবচেতনের ক্রিয়া সতত রহস্যময়। সে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের কুয়ো নিয়ে বিবাদের জের আর করবীর শাদা ঢেউ একইসঙ্গে লালন করে। কৃষি ও সঙ্গীতের কারু একই স্নায়ুজালে পাশাপাশি রেখে কাউকে গণ্য, অপরকে নগণ্য করে। সেই অবচেতনেরই অদ্ভুত খেলা এই লেখা, যার শুরু রামপ্রসাদের বহুশ্রুত গানে।

Before, when I didn’t know what colour to put down, I put down black. Black is a force.

                                           —Henri Matisse

এই সেই কালো, শূন্য ক্যানভাসে যাকে শুরু ভেবে ব্রাশ চালিয়েছেন অঁরি মাতিস, সেই কালো যা কবি উৎপলকুমার বসুর কাছে বর্ণশ্রেষ্ঠ, অননুকরণীয়, আর বহু আলো ও আলপথ ঘুরে এই সন্দর্ভ-প্রয়াসীর কাছে মৃত্যু নামক এক অতল আশয়, যার ভিতর সদ্য অভিষিক্ত হয়েছেন কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল।

দুই

নিজের লেখার দার্শনিক প্রস্থানভূমি নিয়ে সবচেয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ, অথচ স্পষ্ট কথা বলে গেছেন পার্থপ্রতিম স্বয়ং, ‘শাদা পাথরের গোলাপগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থের ‘ডোম’ শীর্ষক কবিতায়—

রসাভিলাষিণী গঙ্গা, বটপল্লব, শিলা, বিষ্ঠা, মালাচন্দন, স্থানীয় মস্তান, ভিখারি, মৃতদেহ, হরিধ্বনি, জিলিপি, চা, পুরানো কেক, ইলেকট্রিক চুল্লী, দেয়ালে চক দিয়ে লেখা নাম, খই, কলসী, ছাই, অয়েলমিল, বাঁশ-হাতে চণ্ডালের সুখমুহূর্ত, উড়ন্ত অঙ্গার এবং স্নানকর্তৃক নগ্নতায় নড়িতে-থাকা রমণী – এইসব উপাদানে যেসকল লেখা আমি তৈরি করি তাহা অনশ্বর কি না প্রশ্ন থাকে। কেননা, ইহার মধ্যে কফিন ও কবরের সুমিষ্ট কূটতা নাই। ব্রীজ বা গঙ্গার দূরবর্তী বাঁক অধিকতর কিনা, শ্মশানযাত্রীদের বিশ্রামনিবাসে ইহা লইয়া আলোচনা হয়।

আলোচকেরা পটুয়া।

তাসার ভিতরে, আমি, আমার মগ্নতা পাইয়াছিলাম, এখনো পাই।

লেখার উপাদান হিসেবে যে নামবিশেষ্যগুলোর উল্লেখ কবি করেছেন, সেগুলো পরপর উচ্চারণ করা মাত্রই গোটা বঙ্গদেশের এক মানস অবয়ব ফুটে ওঠে— যা আবহমান, যার প্রাণকেন্দ্রে একে একে মূর্ত হন চর্যাপদের কবি ও শাক্ত পদাবলীর প্রণেতাগণ— বৈজু চাঁড়াল ও তৎসহ ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র দৃশ্যকাব্য, সুফি সাধক, বৌদ্ধ শ্রমণ, প্রদোষ ও প্রাকৃতজন— জলবায়ু পরিবর্তনে আশরীর রসাধিক্য নিয়ে মধু সাধু খাঁ ও রালফ ফিচ নাম্নী সাহেব। লক্ষণীয়, গঙ্গার আগে ব্যবহৃত ‘রসাভিলাষিণী’ বিশেষণটি। ঊর্ধ্বগতিতে কৈশোর ও মধ্যগতিতে যৌবন অতিবাহিত হওয়ার পর পথসায়াহ্নে নিম্নগতিতে এসেই যেন নদী প্রকৃত রসিকা হয়ে উঠেছে। ‘বাঁশ-হাতে চণ্ডালের সুখমুহূর্ত’— এই অংশ থেকেই পার্থপ্রতিমের রাজনৈতিক বোধের গভীরতা বোঝা যায়। বস্তুত, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণেই বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতার চর্চায় উদার নিম্নভূমি বাংলার এক মিনিয়েচার শংসা এখানে ফুটে ওঠে।

বিষয়-দর্শনের কথা বাদ দিয়ে যদি প্রকরণ ও শৈলীর কথা ভাবি, তাহলেও পার্থপ্রতিম এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পুরোধা:

দেবী, মুদ্রা ব্যবহারে আজ সকল সম্পর্কগুলি হয়েছে কুটিল অস্পষ্ট,
একদেশদর্শী, বদ্ধ। যাকে পিতা বলে জানি তিনি অবান্ধব, অবান্তর, যাকে
জেনেছি প্রেমিকা, সেও নয় হৃদয়জননী, যে বন্ধু, তার ব্যবহারে থেকে
যায় অনভিভাবক উদাসীন দৃষ্টিপাত। মানুষের মুদ্রা ব্যবহারে, যশ ব্যবহারে
এ সকল বিপত্তি হয়েছে। আজ কোন্ কবিতার স্তব শুদ্ধভাবে শুক্লতার
সঙ্গে তুলে আনবো, পুনর্বার হিরণ্ময় হবে তোমার রূপের অমলতা।

জন্ম-পঙক্তি থেকেই এই কবিতার স্বর বাকিদের চেয়ে আলাদা। এই অংশ, এমনকী এইরকম আরও কিছু পঙক্তির নিরিখে প্রথম পাঠে মনে হতে পারে, এই কাব্য আসলে চণ্ডীপুরাণ-এর আয়াত ও ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। কিন্তু, না। শিরোনামহীন এই কবিতাগুলোর ভিতরে দেবী কখনও-বা মৃন্ময়ীরূপ অতিক্রম করে রক্ত-জল-মাংসের ভীষণ মানবী:

শিশিরের প্রক্ষালন শেষে
হাসো তুমি অনবদ্য মুখে
ওই দশকের পঙক্তি সূচনা করেছে যেন
চুম্বনব্যাকুল ঠোঁট, জীবনতৃষ্ণার জিহ্বা, কাব্যপঙক্তি, বাণী।

হাসো, হেসে শুভ্র করো সঞ্চয়ের কালিমা
উত্তাপপ্রদানে ব্যর্থ মনস্তাপ মুছে দাও ঊষা
আকাশে দিয়েছি নীল, ওই নীল ফিরে পেতে চাই
তুমি যাত্রা, রূপস্তব, দূত
খোলো খোলো নির্ঝরের চঞ্চলতা, উচ্ছল হিরণ
নির্মল তোমার হাস্যে ব্যয়শীল প্রাণ যেন বৃক্ষের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জাগে।

হাসো দেবী, শ্বেত উত্তরীয়
গগনে ছড়িয়ে দাও, করো মুগ্ধ শত্রু ও মিত্রকে।

এই কাব্য একাধারে প্রথমবার মেলার মাঠে নাগরদোলা দেখে বালক চোখের স্ফটিক বিস্ময়, আবার বাবার হাত ধরে বাজারে গিয়ে দেখা কসাইখানার শানবাঁধানো মেঝের উপর মুরগির গলা কাটার দৃশ্যে উদ্ভূত ভয়— যথাক্রমে আনন্দ ও বীভৎস, আলাদা দুই রসের সমসত্ত্ব মিশ্রণ। তবুও এই কাব্য অজস্র ধ্বনি ও কলার ভিতরেও এক দারুণ শান্ততার বোধ জাগিয়ে তোলে।

অথচ ‘দেবী’ নামক এই স্পর্ধা থেকে ক্রমশ বেরিয়ে আসলেন পার্থপ্রতিম। পুনরাবৃত্ত হলেন না। যথাক্রমে বারো ও তেরো বছরের ব্যবধানে ‘রাত্রি চতুর্দশী’ ও ‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’-য় সেই তরুণ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন আরও বেশি মেধা ও কবিতায়। গোয়েন্দা-পাঠক হয়তো তার মধ্যেও চিনে নিয়েছেন তাঁর হাতের অমোঘ পাঞ্জাছাপ, তথাপি এই পার্থপ্রতিম আরও সংহত, সিনিক এবং ঝুঁকিপ্রবণ— পোলিটিক্যাল কারেক্টনেসের দায় তাঁর নেই। নাম-কবিতায় (‘রাত্রি চতুর্দশী’) সবুজ ডাব, প্রস্রাবের জলজপ, সর্পপ্রজ্ঞা, চরসের অনুষঙ্গ, আর এক জোরালো ঘাই:

ঈশ্বর, তোমাকে জানি মলমূত্রবৎ।

বিস্ময় এখানে থেমে গেলে হত। এর ঠিক পরেই—

বিপরীত প্রসূতিসদনে, বাচ্চার চিতার কাছে
রুপোর খাঁড়ারা ওঠে, গর্ভগর্ত, নড়ে জিহ্মজিভ
উরুব্যাদানের পল্লী, কঁহি ধুঁয়া য়হাঁ নাচেনাচে

আউয়া আউয়া।

আমাদের প্রচলিত অভ্যাস, পাঠরুচি, ভিক্টোরিয়ান মরালিটির সমতুল কবিতার নিজস্ব শুচিতাবোধ তছনছ করে সাবেক চতুর্দশপদী ফর্মে পার্থপ্রতিম তুলে আনছেন বাপ্পি লাহিড়ীর জনপ্রিয় ডিস্কো গানের লাইন, অর্থাৎ সাম্প্রতিক জনরুচি, অর্থাৎ জনসংস্কৃতি, অর্থাৎ সমকাল, অর্থাৎ মহাকালের নিরিখে সময়ের এক নিখুঁত প্রোজেকশন।

বাংলা কবিতার ভোকাবুলারি নিয়ে বহুদিন আগে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন এমনই এক যুবা— একদা এমনভাবেই যাবতীয় পিয়োরিস্ট চেতনার উল্টোপথে হেঁটে ‘পোয়াতি’, ‘পিঁচুটি’, ‘বিয়োনো’— আপাত-ম্লেচ্ছ এই শব্দগুলোকে কবিতায় নিয়ে এসে তৈরি করেছিলেন বিকল্প এস্থেটিক্স। তাঁর নাম জীবনানন্দ দাশ!

পার্থপ্রতিমও, বস্তুত, তেমনই একক ঘোড়সওয়ার, আগুয়ান ব্লিজার্ডের মুখে যার ঘোড়া থমকে গেলেও তিনি নিজে কখনও থেমে যান না।

তিন

মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় সহ আরও বহু হাত ঘুরে চতুর্দশপদী কবিতা বাংলার আলো-জল-হাওয়া-রৌদ্রের কাছে ক্রমশ প্লুত হয়েছে। কবিতার শরীরে অষ্টক-ষটক আর পঙক্তিতে আট-ছয় বিন্যাস, অথবা আঠারো মাত্রার এলায়িত মহাপয়ার বাংলা চতুর্দশপদীকে ভাস্করের লাবণীমূরতি হতে প্রণোদনা দিয়েছে।

পার্থপ্রতিম এই ধারার এক প্রতিনিধিস্থানীয় কবি। তবে এখানেও তিনি আলাদা। ‘রাত্রি চতুর্দশী’-র চোদ্দটি কবিতা প্রথমবার সনেট-সংকলন নামেই প্রকাশ পেয়েছিল। অথচ, বহু বছর পরে, ১৯৯৮ সালে এই পুস্তিকা ‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’ পুস্তিকার সঙ্গে এক মলাটে বেরোনোর সময় সেই বইয়ের মুখবন্ধে ‘প্রাগজ্যোতিষ’ শিরোনামে কবি লেখেন:

ষোলো বছর আগে, ‘রাত্রি চতুর্দশী’ বেরিয়েছিল। তখন এই গ্রন্থিকাকে ‘সনেট সংকলন’ বলা হয়েছিল। এই মন্তব্য প্রত্যাহার করা দরকার বোধ করছি। সনেটের স্তবক ও মিলবন্ধের কোম্পানী আইন ভেঙে যে সব উদারনৈতিক সনেট, তাদের Quotorzain বা ‘চতুর্দশী’ বলাই ঠিক – বাংলা ভাষার সনেট শ্রমিক শ্রী উত্তম দাশ যেমন বলেছেন।

এর পরবর্তীকালে তাঁর রচিত চতুর্দশপদীগুলোর অধিকাংশই বিদেশি কবিদের ব্যবহৃত স্তবক ও মিলকাঠামো অনুসরণ করে— এডওয়ার্ড এস্টালিন কামিংস, স্যার টমাস ওয়াট, জাপানি তানকা, ফরাসি ও পেত্রার্কান সনেটের আদলে সব মিলিয়ে ৫৬টি, দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটির আদলে ৩১টি এবং ফাৎসিও দেল্ই উবের্তির আদলে রচিত ৯টি সনেট মুদ্রিত আছে ‘পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত’ আর ‘বর্ণজীবের সনেট এবং আগন্তুক’ কাব্যগ্রন্থ দুটি জুড়ে।

এখান থেকেই পার্থপ্রতিমের সুদীর্ঘ ছন্দচর্চা ও অনুশাসনপ্রিয় এক কবিসত্তার কথা জানা যায়।

সন্দর্ভ-প্রয়াসীর অবচেতন আবারও দোল খায়। কবিতা ছেড়ে মনে পড়ে ছবির কথা। ‘The Thinking Eye’ নামক এক মহার্ঘ্য গ্রন্থে Paul Klee বলছেন,

At the dawn of civilization, when writing and drawing were the same thing, it was the basic element. And as a rule our children begin with it; one day they discover the phenomenon of the mobile point, with what enthusiasm it is hard for us, grown-ups to imagine. At first the pencil moves with extreme freedom, wherever it passes.

But once he begins to look at these first works, the child discovers that there are laws which govern his random efforts. Children who continue to take pleasure in the chaotic are, of course, no artists; other children will soon progress towards a certain order.

এখান থেকে একটা পুরনো প্রতর্ক শুরু হতে পারে। নিয়মসিদ্ধিই কি শিল্পের অনিবার্য লক্ষ্য? নাহ!

তবে পার্থপ্রতিম এবং পল ক্লি-র দুটো বিবৃতি পাশাপাশি রেখে খেয়াল করলে আমরা দেখব, দুজনেই অভিন্ন এক অনুশাসনের কথা বলেছেন, যা আসলে প্রেম ও আনন্দহীন নয়। বড়রা যেমন ছোটোদের খেলার জন্য নির্দিষ্ট গণ্ডি বেঁধে দেয় শৈশবে, উঠোনের ভিতর— অলঙ্ঘনীয়, জরুরি, অথবা যেভাবে সূর্যমুখী ফুলের দলসজ্জা, ঈগলের উড্ডয়ন পথ কিংবা ঘূর্ণাবর্তের গতিপথ— কোমল ও কঠিন প্রাকৃতিক প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় Fibonacci numbers দ্বারা, কবিতায় ছন্দের তাৎপর্য ঠিক ততটাই। বস্তুত, বাংলা কবিতায় অক্ষরবৃত্ত এমনই এক ছন্দ, যার ভিতর এক স্থিতিস্থাপক ধর্ম আছে— কবিতার লক্ষ্য, গতিপথ অনুসারে যে নিজেকে পালটে নেওয়ার মতো উদার। আবার চাইলে কবিতার অভিপ্রায় সে একাই ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আমার বিশ্বাস, পার্থপ্রতিমের সওয়াল ছন্দের এই সুপ্রাচীন, দৈব, প্রাকৃতিক ক্ষমতার পক্ষে…

চার

অথচ কবিতা এবং যেকোনও মহৎ গদ্যের মতো গদ্যকবিতার ভিতরেও এক অন্তর্লীন ছন্দোস্পন্দ আছে। আবার, গদ্যকবিতায় সেইভাবে কোনও পঙক্তি-বিভাজনের সুবিধাও নেই। নিখুঁত ছন্দে লেখা আদর্শ উল্লম্ব কবিতায় কবিত্ব, ক্র্যাফট কিছু কম থাকলেও পাঠকের কানে ও প্রাণে অন্তত ছন্দটুকু লেগে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গদ্যকবিতার ভাগ্যে সেটুকুও নেই। এক সুবিশাল বিয়োগ চিহ্নের জোয়াল বয়ে তার যাত্রা শূন্যের দিকে। তার সংকট কিছু কম নয়। কিন্তু, হিমেনেথের ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’, অঁরি মিশোর ‘আ সার্টন প্লুম’, ফ্রাঁসিস পঁজের ‘দ্য ভয়েস অফ থিংস’, আরও আগে কোঁত দ্য লত্রেয়ামোঁর ‘মালদোরোর অ্যান্ড পোয়েমস’, কিংবা কাফকার প্যারাবল বা ফ্ল্যাশ ফিকশনগুলোর সমমানের সার্থক গদ্যকবিতার উদাহরণ বাংলা ভাষায় খুব বেশি নেই। তবুও যে অল্পসংখ্যক আছে, তার মধ্যে একাধিক গদ্যকবিতা শুধু পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের একার লেখা। সাধু ক্রিয়াপদ আশ্রিত পার্থপ্রতিমের একেকটি গদ্যকবিতা বাংলা ভাষার চিরকালীন সম্পদ। ব্যক্তিগত পাঠে বারবার মনে হয়, ওঁর ‘আত্মকথন’ কবিতাটি সার্বভৌম আধুনিক কবিতাবিশ্বের একটি মানমন্দির। কোনও প্রকৃত কবিতা পাঠকের চেতনা-সংবেদ এই কবিতা পাঠের আগে ও পরে কখনও এক থাকতে পারে না:

চলিত ক্রিয়াপদের বাংলা আর লিখিতে ইচ্ছা হয় না। এই বাংলা বড় সাহিত্যিক। যদিও আমার বয়স ত্রিশ বৎসর ও ২ মাস পূর্ণ হইয়াছে এবং এক্ষণে আমি রবিবারের মধ্যাহ্নে, ত্রিতলে, খাটে বসিয়া আছি, চারিদিক বেশ শান্ত, একটি কাক ডাকিতেছে— কেমন ধারণা হইতেছে যে ইহার মধ্যেই মিশিয়া আছে আমারই মরণোন্মুখতা। কোনো-না কোনো একটি সত্য বলিতে ইচ্ছা করিতেছে। আমার ব্যক্তিগত সত্য। জীবন এপর্যন্ত যতোটা যাপিত হইয়াছে, তাহার তথ্য ও চিত্রের ভিত্তিতে কিন্তু এই সত্য প্রস্তুত নয়। কেবলই মনে হইতেছে আঁটপুর বা ওইরকম কোনো একটা গ্রামের বাড়িতে বসিয়া থাকিতে পারিলে বিলক্ষণ শান্তি হইত। না, যে থাকিত সে কোনো ত্রিশবয়সী লোক নয়। তাহার বয়স কোনোমতেই সতেরোর বেশি হইবে না। সে ধুতি ও হাতকাটা গেঞ্জি পরিবে। এখন নির্জন দুপুর, কলাঝাড় পার হইয়া সে জামের বনে যাইতেছে। সেখানে কি একটি বালিকা থাকিবে না, যে তাহাকে আঁকাবাঁকা হরফে বহু সাধ্যসাধনায় একটি চিঠি দিয়াছে কিছুদিন আগে— ‘কেমন আছ। আমার প্রণাম নিবে।’ তাহার মুখ ও হাবভাবের বর্ণনা, আমি, ওই সতেরো বছরের হাতকাটা গেঞ্জি ও ধুতি পরা-যুবা, দিতে মনস্থ করিতেছি না; শুধু পাঠকের সঙ্গে কথা বলিতে ভাল লাগে তাই বলিব, তাহার নাম পূর্ণশশী। কতবার ভাবিয়াছি— ওই তো সে এখনো ভাবিতেছে আজ হয়তো তাহার হাত বশ মানিবে না, আলিঙ্গন করিবে; আজ হয়তো তাহার মুখ চুম্বনে চুম্বনে পূর্ণশশীকে জানাইয়া দিবে সে ডাগর হইয়াছে, সে শহরে গিয়া সব জানিয়াছে; কিন্তু ঐ তাহাকে দেখা যায়, পূর্ণশশীর হাত হইতে জাম খাইতেছে যেভাবে পোষা ঘোড়ায় মানুষের নিকট হইতে দানা খায়, শুধু একটি করতল পূর্ণশশীর পদমূলে। জামবনে হাওয়া অতি ধীরে বহিতেছে। পাঠক, আপনাকে ভগবান জানিয়া বলিতেছি, আমি এই।

২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮০

[মুসাবিদাটা হওয়ার পরই, দোতলা থেকে মায়ের আর্ত আওয়াজ। বাবার স্ট্রোক। তখন দুপুর আড়াইটে। রাত আটটা থেকে একটা জিনিস মনে হতে লাগল — যদি এই লেখাটা পুড়িয়ে দিই, বাবা, হয়তো বেঁচে যাবেন। কেউ হাওয়ার শব্দে কানের কাছে এ কথাই বলছে। লোডশেডিং। মাঝে মাঝেই মোমের আগুনের কাছে কাগজটাকে নিয়ে যাচ্ছিলুম। তারপর আর পারছিলুম না। পকেটে দেশলাই ও লেখাটাকে নিয়ে একসময় হাসপাতালে যেতে হল।… বাবা, রাত, আড়াইটের একটু বাদে, মৃত্যুহত জিভে সেই শীর্ষবিন্দুর কথা একটু রিপোর্ট ক’রে, চোখের সামনে চলে গেলেন। তখনো কাগজটাকে জ্বালাতে পারলুম না, যদিও দৃঢ় বিশ্বাস, লেখাটা নষ্ট করলে, তিনি বাঁচতেন। দেশলাইটা, পরের দিন, তাঁর চিতার কাজে লেগে গেল। লেখাটা, তাঁর…]

—পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল/’আত্মকথন’, ‘পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত’

এই কবিতাটি ছাড়াও এই একই কাব্যগ্রন্থের ‘নতপিশাচ’, ‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের ‘কবি’, ‘বালককালের প্রথম বেশ্যা’ এবং ‘শাদা পাথরের গোলাপগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিতর্কপ্রস্তাব’, ‘একটি বৃদ্ধের গল্প’ আর ‘কপালকুণ্ডলা’— গদ্যে রচিত এই ছটি কবিতা সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে বলা যায়— ‘এই আমাদের বাংলা ভাষা…’

পাঁচ

সাধু ক্রিয়াপদ এবং আগাগোড়া একটি মন্থর ভঙ্গি বজায় রেখে লেখা ‘আত্মকথন’ কবিতাটিতে একদম শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার সুর চড়া।

চলিত ক্রিয়াপদের বাংলা আর লিখিতে ইচ্ছা হয় না। এই বাংলা বড় সাহিত্যিক।

চলিত ত্রিয়াপদ কী? সে এক শহুরে ভাষার উপকরণ, প্রথম লাইনেই যাকে আক্রমণ করছেন কবি। কোথাও কি আহ্বান করছেন লুপ্তপ্রায় অপিনিহিতি ও অন্যান্য শক্তিকে, যারা একে একে হারিয়ে গেছে অভিশ্রুতি-লব্ধ নাগরিক ক্রিয়াপদের (করলে, খেলে, বললে ইত্যাদি আরও) ভিতর?

এরপর সপ্তদশবর্ষীয় ধুতিগেঞ্জি পরা যে যুবা, তার মনের ভিতরে ঢুকে, তার প্রবৃত্তির পক্ষাবলম্বন করছেন পার্থপ্রতিম। এমনকী দ্বিধা ও সংশয়ের মুহূর্তেও দুর্বলতা, কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না, লিখিত মুসাবিদা অক্ষত রাখছেন। পরিবারতন্ত্রের বিপরীতে, নিয়মের বিরুদ্ধে ভয়কে জয় করে পার্থপ্রতিমের এই যাত্রা এক Realization of Utopia-র দিকে।

অথবা, ‘নতপিশাচ’ কবিতাটিতেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাধু ক্রিয়াপদ, এমনকী বক্রোক্তি ব্যবহারেও তৎসম শব্দের উপর ভরসা করেছেন কবি। এক জায়গায় লিখছেন—

সমস্ত যুবতীরই আশা থাকে, যে, সে সৌভাগ্য আনিয়া দিবে। এই স্বপ্নের জন্য আজো দরিদ্রের বিবাহ হয়, দরিদ্রতরদের সংখ্যা বাড়ে, মানবিক দুর্বলতা আর একটু বাড়িয়া যায়। যথারীতি এই বিবাহ-ও কোনো ইন্দ্রজাল দেখায় নাই, বরং নিকিরিবস্তির খাটা টাট্টিখানার পিছনের দেওয়াল — যেখানে নিকিরিরা খুন হয় ও নিকিরিরমণী গলায় দড়ি দিয়া মরে — সেই দেওয়াল দেখাইতেছিল। দেহ বাঁচিতে চাহিতেছিলেন, কারণ অতিশৈশব হইতেই তিনি অন্য বহুপ্রকার চাপ সহ্য করিয়া আসিতেছিলেন। দেহ বাঁচিতে চাহিতেছিলেন, কেননা, প্রথম যৌনসঙ্গমের মধ্যে ওঙ্কারশব্দের অভিজ্ঞতা তাঁহার হইয়াছিল।

এই কবিতায় চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত পাঠককে ঘায়েল করবার অজস্র উপাদানে ভরা। কিন্তু, আমি মূর্ছা যাই ‘নিকিরিবস্তির খাটা টাট্টিখানার পিছনের দেওয়াল’ দেখতে পেয়ে। ‘টাট্টিখানা’ শব্দটির অব্যর্থ প্রয়োগ আমাকে ছুঁড়ে ফেলে জোড়াসাঁকো সংলগ্ন পুরনো কলকাতার অভ্যন্তরে, যার কেন্দ্রে পুঁথিপত্রময় বাঙালি সংস্কৃতিকে চারিদিক থেকে ঘিরে আছে পূতিগন্ধময় বিহারি মেথরপট্টি, পাশ দিয়ে প্রবহমান গঙ্গা এবং সোনাগাছি। শুধু এক ‘টাট্টিখানা’ শব্দটির ব্যবহারে কবি আমার সামনে হাজির করেন কয়েকশো বছরের নাগরিক জনজীবন ও বিচিত্র ডেমোগ্রাফ, যার অধিকাংশ সময় জুড়ে সুশীল বাঙালি কর্তৃক অন্ত্যজ বিহারির জন্য বরাদ্দ ‘খোট্টা’ নামের এক খিস্তি সম্ভাষণ।

ইঃ, ইঃ, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেন!! স্যোন্, বাড়ি আমি যাবো না!’ আমি এখানে র‍্যালা করবো, ফুত্তি করবো — ফুত্তি করবো — বুঝলি-ই-ই?’ কেউ জবাব দেয় না। সহসা সমস্ত দিক নিঝঝুম হয়ে আসে। কান খাড়া ক’রে আমি শুনি, সে নিরভিনয় ভাষায় বলে: বাড়ি আমি যাবো না।

–‘বালককালের প্রথম বেশ্যা’/ ‘টেবিল, দূরের সন্ধ্যা’

পার্থপ্রতিম সেই বিরলতম কবি, সামান্য একটি-দুটি শব্দ, চিত্রকল্প কিংবা সংলাপের মাধ্যমে যিনি নাড়িয়ে দিতে পারেন গোটা বাংলা ভাষার জায়গির।

ছয়

ব্যক্তিগত আড্ডায় অনেককে বলতে শুনেছি, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের অনেক কবিতার দর্শন নাকি সংস্কারাচ্ছন্ন। আমার মনে হয়, এটা একটা স্বেচ্ছাকৃত ফাঁদ। পার্থপ্রতিমের কবিতায় পুরাণ ও ভারতীয় মিথের যে প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে আসে এবং কবিতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভিন্নস্তরের আরও অনেক কবিতা অথবা কবিতার সম্ভাবনা, তা আসলে সেমি-ফিউডাল, সেমি-কলোনিয়াল একটা দেশের আবহে তৈরি টেম্পেরা। যুক্তিক্রম ও আধুনিকতা যেখানে অন্যায় ও অত্যাচারের হাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে শিল্পীর কাছে আপাত-সংস্কারই হয়ে ওঠে রসদ, সভ্যতাকে বাঁচানোর উপায়।

যে লুঠেরা ইউরোপ সমুদ্র, জাহাজ, অস্ত্র, বাণিজ্য, ধর্ষণ ও সিফিলিসের মাধ্যমে জয় করতে চেয়েছিল আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূভাগ, তার সমকালে প্রেক্ষাপট-ভাষ্য হিসেবে একে একে উঠে এসেছিলেন জুলে ভার্ন, ওয়াল্টার স্কট, আলেকজান্ডার দুমা। দখল, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ খুব মাইক্রো লেভেলে হলেও ছিল তাঁদের লেখায়, বলা ভালো, তাঁদের লেখার অবচেতনে।

স্মরণাতীত কোনও আলোচনায় এক বন্ধু বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এর প্রসঙ্গে বলেছিলেন ভারী অদ্ভুত ও চমৎকার একটা কথা— গ্রামীণ উপদেবতার ফরমান অগ্রাহ্য করে আলভারেজ যে মারা গেল, তার মধ্যে দিয়ে বিভূতিভূষণের আলগা পক্ষপাত দেখা যায় শঙ্করের প্রতি, তার সংস্কৃতির প্রতি, যা কোনও-না-কোনওভাবে পাশ্চাত্য আগ্রাসনের বিপ্রতীপ। আমার মতে, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল সেই প্রাচীন গ্রামদেবতা, যার কবিতার অবচেতন লড়াই করে বিদেশি ও দেশি সব ধরনের কালচারাল হেজিমনির বিরুদ্ধে।

কবি রণজিৎ দাশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পার্থপ্রতিম বলেছিলেন, “ভারতবর্ষ এমন একটা দেশ যেখানে কোনও ধর্ম নেই, পুরাণ আছে…”

আমার মনে হয়, পার্থপ্রতিমের কবিতাও আসলে এক দ্রোহ, যা ওই পুরাণ পুনর্লিখনের কাজে ন্যস্ত।

সংযোজন: আর্কিমিডিস কেবলই প্লবতার সূত্র কিংবা বক্রতলের অন্তর্গত জায়গার ক্ষেত্রফল নির্ণায়ক সূত্রের আবিষ্কারক ছিলেন না। কয়েক বছর আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ ছিল ছাগলের চামড়ার উপর তাঁর আরও অনেক গবেষণার কথা, যেগুলো পাঠোদ্ধারে নেমেছিলেন গণ্যমান্য অনেক বিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ। শোনা যায়, পনেরো বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করা পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের বেশিরভাগ লেখাই এখনও অগ্রন্থিত। বিভিন্ন কাগজ ও সাময়িকপত্রে চাপা পড়ে আছে সেইসব কালো ভ্রমর অক্ষরগুচ্ছ…

সোনার খাদ নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কারের আনন্দে আর্কিমিডিস যেমন নগ্ন হয়ে রাজপথ বরাবর ছুটতে পারেন ‘ইউরেকা ইউরেকা’ বলে, কবি পার্থপ্রতিমও তেমনই সাক্ষাৎ কাকের মতো একাধারে সুদৃশ্য ফল ও কৃষ্ণবমন ঘেঁটে তুলে আনেন অমৃতের ভাণ্ড। তারপরেই শ্যামখ্রিস্টান বাগানে গিয়ে নিরালায় বসে থাকেন দু-দণ্ড। কুইলার কুচের মতো দেখে যান নীরবে— ঘাসেদের বেড়ে ওঠা— আহত পাতায়, শিশিরে।

দূর পুকুরপাড়ে ধুনি জ্বেলে সিধের প্রত্যাশী কোনও ফকির— উদ্বাস্তু কলোনি থেকে ছুটে আসে রোদ, একপ্রস্থ হাওয়া…

 

(কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের ছবি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত…)

 

ঋণ: অতনু চট্টোপাধ্যায়, রঘু জাগুলীয়া, শৌভ চট্টোপাধ্যায়, শিমূল সেন