Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

রামায়ণ: কথক যখন মেয়েরা

রামায়ণ: কথক যখন মেয়েরা -- নবনীতা দেবসেন

নবনীতা দেবসেন

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের এই অধ্যাপক একাধারে ঔপন্যাসিক, কবি, শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। যাদবপুরের এই ছাত্রী পরবর্তীকালে এখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দেশ বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অতিথি অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন, ভ্রমণকাহিনী বা “ট্রাভেলগ” লেখায় তার বিশেষত্ব বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের এক বিরল সম্পদ। পদ্ম-সম্মানে ভূষিতা এবং অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সমাজকর্মী লেখিকা বাংলা সাহিত্যসিন্দুকের এক উজ্জ্বল রত্ন, দুই বাংলাই যার দ্যুতিতে মুগ্ধ।

 

বাংলায়ন : মণীষা দাশগুপ্ত

বিশ্বের মহাকাব্য রচয়িতারা সকলেই পুরুষ। তাঁরা নিজেদের কাব্যে বন্দনাও করেছেন পুরুষের, অস্ত্রধারী বীরদের। বছরকয়েক আগে করা এক গবেষণায় লক্ষ করেছিলাম, যে ৩৮টি মূল উপকরণের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের অধিকাংশ মহাকাব্যগুলো দাঁড়িয়ে, তার মধ্যে মহিলাকেন্দ্রিক মাত্র ন’টি। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়েদের সঙ্গে মহাকাব্যের জগতের বিশেষ সম্পর্ক নেই, নায়কোচিত জৌলুস মেয়েদের জন্য নয়। অপহৃত হওয়া, উদ্ধার হওয়া, জুয়ার পণ হওয়া, নির্যাতিত হওয়া বা অপমানিত হওয়া ছাড়া তাঁদের সেখানে বিশেষ কিছু করার নেই। কিন্তু যদি কখনও কোনও মেয়ে মহাকাব্যের চেনা গল্প নতুন করে বলতে বসেন? ঠিক কেমন হতে পারে সেই গল্প? উত্তর হিসেবে বেশ কয়েকটা বিকল্প ভাবা যেতে পারে।

১. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে পুরুষ কথাকারের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গী অনুসরণেই গল্প বলা, ঠিক যেভাবে মল্লা তাঁর ষোড়শ শতকের তেলুগু রামায়ণ সাজিয়েছিলেন।

২. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখেও মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্প বলা। যেমন বলেছিলেন চন্দ্রাবতী, তাঁর ষোড়শ শতকের বাংলা রামায়ণে।

৩. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে আদর্শবাদী জায়গা থেকে তাকে উপস্থাপন করা। যেমন মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন করে রামের গল্প লিখেছিলেন রঙ্গনায়কাম্মা, তাঁর রামায়ণ বিষবৃক্ষম বইয়ে।

৪. সীতার গল্পের মধ্যে দিয়ে আসলে নিজেরই জীবনের গল্প বলা। ঠিক যেমন শত-সহস্র বছর ধরে বলে আসছেন আমাদের গ্রামের মেয়েরা।

আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। হঠাৎ করেই চন্দ্রাবতী রামায়ণ নতুন করে পড়তে শুরু করেছিলাম। পড়তে গিয়ে বুঝলাম, মেয়েদের রামায়ণ একেবারে আলাদা একটা গল্প বলে। তখন থেকেই মেয়েদের মুখে রামায়ণের গল্প আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ, মল্লার রামায়ণ এবং রঙ্গনায়কাম্মার রামায়ণের ওপর আমার বেশ কিছু কাজ নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে।

আঞ্চলিক ভাষায় রামায়ণের গল্প মেয়েদের মধ্যে প্রথম বলেন মল্লা ও চন্দ্রাবতী। দু’জনের মধ্যে মিল ছিল প্রচুর। দু’জনেই পেশাদার কবি হতে চেয়ে স্বেচ্ছায় অবিবাহিত থেকে গিয়েছিলেন। দু’জনেই শিবের ভক্ত, অথচ রাম-কথা রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁদের পথ ছিল ভিন্ন। মল্লা জাতিতে শূদ্র রমণী হয়েও ধ্রুপদী রামায়ণ রচনা করে ব্রাহ্মণ সভাকবিদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে চন্দ্রাবতী যে রামায়ণ লিখলেন, তা শুধু সীতার কথা বলে, একজন মহিলার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে রামের। রাজসভায় মল্লার রামায়ণ পাঠ করতে দেননি ব্রাহ্মণেরা। আর চন্দ্রাবতীর রামায়ণকে সমালোচকেরা দুর্বল ও অসমাপ্ত বলে খারিজ করে দিয়েছেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে আক্রমণ করায় সামাজিকভাবে একঘরে হতে হয়েছে রঙ্গনায়কাম্মাকে।

গ্রামের মেয়েরা তুলনায় অনেক মুক্ত। তাঁরা রাজসভা বা সমালোচক, কারওরই পরোয়া করেন না, সমাজ পরিবর্তনের বৈপ্লবিক দায়ও তাঁদের নেই। নিজেদের গান নিজেরাই গেয়ে যান তাঁরা। এ বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রয়াত এ.কে. রামানুজনের কাছে যে উৎসাহ পেয়েছি, তাতে সারাজীবন ওঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চন্দ্রাবতী রামায়ণের ওপর আমার গবেষণাপত্র পড়ার পর উনি খুবই উৎসাহিত হন। তেলুগু মহিলাদের রামায়ণ নিয়ে অধ্যাপক নারায়ণ রাওয়ের বেশ কিছু অপ্রকাশিত কাজকর্মের হদিশও তিনি আমায় দেন। রামানুজন মনে করতেন, চন্দ্রাবতীর বহু বক্তব্যের সঙ্গেই এই তেলুগু মহিলাদের ভাবনার বেশ সাদৃশ্য আছে। রামানুজন বিশ্বাস করতেন মেয়েলি ঐতিহ্যের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সভ্যতার এক বিকল্প ছবি পাওয়া যায়, এবং চন্দ্রাবতীর কাজে তাঁর এ ভাবনার সমর্থন মেলে। আমার মাথার মধ্যে বিষয়টা এমনিভাবেই দানা বেঁধেছিল। অধ্যাপক রাওয়ের কাছে হদিশ পেয়ে আরও তথ্যের খোঁজে আমি অন্ধ্রপ্রদেশ গেলাম। তার পরের গন্তব্য বাংলাদেশ এবং সেখান থেকে চন্দ্রাবতীর গ্রাম। ধীরে-ধীরে আমার উৎসাহের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হতে লাগল। এই বিশেষ লেখাটি আমি লিখেছি বাংলা, মারাঠি, মৈথিলী ও তেলুগু ভাষায় সমসাময়িক গ্রাম্য মহিলাদের রামায়ণ গানকে কেন্দ্র করে।

পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদ যেভাবে রামের মিথকে ব্যবহার করে আদর্শ হিন্দু পুরুষের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে, ঠিক সেভাবেই সিস্টেমের স্বার্থে সীতাকে গড়ে তোলা হয়েছে আদর্শ হিন্দু রমণী হিসেবে। এর ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী। বহু বছর আগে স্যালি সাদারল্যান্ড দেখিয়েছিলেন, তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া ভারতীয়দের ৯০ শতাংশেরই প্রিয় পৌরাণিক মহিলা চরিত্র সীতা। সদ্যবিবাহিত বধূকে কেউ দ্রৌপদীর মতো হওয়ার আশীর্বাণী শোনান না। সেখানে রাজত্ব শুধুই সীতা আর সাবিত্রীর। এঁরা দু’জনেই যেন রক্ষাকর্ত্রী। সাবিত্রী তাঁর স্বামীকে রক্ষা করেন মৃত্যুর হাত থেকে, আর সীতা তাঁর স্বামীকে বাঁচান অপমানের হাত থেকে। সীতা নিজে “জনমদুখিনী” হয়েও আদর্শ নারী হয়ে থেকে গেছেন, তাঁর মাধ্যমেই প্রসারিত হয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতার মূল্যবোধ যা মহিলাদের শত অন্যায়-অবিচারও মুখ বুজে মেনে নিতে শেখায়।

কিন্তু একইসঙ্গে এর বিপ্রতীপে গড়ে ওঠে সমান্তরাল মিথ। পুরুষ যখন সীতার মিথ গড়ে তুলেছে মেয়েদের মুখ বন্ধ করার জন্য, উলটোদিকে তখন গ্রামের মেয়েরা নিজেদের মুক্তির উচ্চারণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন সেই সীতা-কাহিনিকেই। সীতা-মিথ মেয়েদের হাতে তুলে দিয়েছে এক আবরণ – একধরনের মুখোশ, যার আড়ালে তাঁরা নিজেদের ব্যক্ত করবেন, বলবেন তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার কথা, নিজেদের মতো করে ভাষ্য রচনা করবেন পুরুষতান্ত্রিকতার।

মেয়েদের এই গল্পে রামের ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক মিথ খণ্ডিত হয়েছে স্বয়ংসিদ্ধভাবে, সম্ভবত অজান্তেই। রাম এখানে একজন রুঢ়, প্রেমহীন, দুর্বল স্বামী। আদর্শ পুরুষের বহু দূরে তাঁর অবস্থান। মেয়েরা তাঁকে ডাকেন পাষণ্ড বা পাপিষ্ঠ বলে। “রাম তোমার বুদ্ধি হইল নাশ” বলে সরাসরি আক্রমণ করেন তাঁকে। এটা সম্ভব, কারণ মেয়েদের এই রামায়ণগাথা কোনও ধর্মশাস্ত্র বা অনুশাসন বৃত্তের বাইরে। তাঁদের সীতা-মিথ নিতান্তই প্রান্তিক, যেখানে সীতা ধরা দেন এক সাধারণ মেয়ে হিসেবে। অন্যদিকে পুরুষের সীতা-মিথে সীতা হয়ে ওঠেন “দেবী”, সমাজের মূলস্রোতে তাঁর বিচরণ। মেয়েদের সীতা কোনও বিপ্লবী নন। তিনি নির্যাতিত, দুঃখিনী স্ত্রী। কিন্তু তাঁর যন্ত্রণার কথা তিনি বলেন। প্রকাশ করেন তাঁর বিরুদ্ধে হয়ে চলা যাবতীয় অন্যায়, তাঁর একাকিত্ব, তাঁর কষ্টের কথা।

মেয়েদের লোকসংস্কৃতিতে স্থান, সময়, ভাষার ব্যবধান পেরিয়ে একই দুঃখের বিনিসুতোয় গাঁথা হয়ে যান সব মেয়ে। এই কথাকারেরা বাস করেন উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁদের পোশাক আলাদা, খাদ্যাভ্যাস আলাদা, রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তাও আলাদা। কিন্তু যখনই তাঁরা গেয়ে ওঠেন রামসীতার কাহিনী, যোজনবিস্তৃত ব্যবধান, পার্থক্য যেন নিমেষে মুছে যায়! অনুভূতিতে, দর্শনে, প্রকাশভঙ্গিতে, ঘটনাবিন্যাসে এবং প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা যেন একে অন্যের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠেন! এমনকী, কাজ করতে গিয়ে কোন গান কার রীতিমত গুলিয়ে যাচ্ছিল আমার। প্রচুর খেটে স্ক্রিনিং করে, গানের ক্যাটেগরি বানিয়ে তবে আমায় মাথার মধ্যে প্রত্যেককে আলাদা করে চিহ্নিত করতে হয়েছে।

গ্রাম্য এই সব মেঠো গান আর পাঁচালি মেয়েদের রামায়ণের এক বিস্তৃত জগত চোখের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। মাঠে ধান রুইতে-রুইতে, ঘরের দাওয়া নিকোতে-নিকোতে বা উঠোনে ধানে ঢেঁকির পাড় দেওয়ার সময় সারা দেশের মেয়েরা গুনগুন করে ওঠেন সেই গান। একটি মেয়ের জীবনের নানা মুহূর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে সব গান। এখানে সীতা এক সাধারণ মেয়ে যে জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে ঋতুমতী হয়, বিয়ে হয় তার, সন্তান ধারণ করে, স্বামীপরিত্যক্ত হয় এবং সন্তানের জন্ম দেয়। নামে রামায়ণ গান হলেও এই গান গেয়ে আসলে সীতাকেই গেয়ে ওঠেন গ্রামের মেয়েরা।

রামায়ণের কথকতায় স্বাভাবিকভাবেই সেই সব পর্ব বেছে নিয়েছেন মেয়েরা যা তাঁদের প্রাণের কাছাকাছি। বীরগাথায় আগ্রহ নেই তাঁদের, তার কোনও ভূমিকাও তাঁদের জীবনে নেই। তাঁরা যে বিষয়গুলি নির্মাণ করেছেন তাকে যদি তাৎক্ষণিক বলা হয়, তা হলে তাঁদের জীবনটাও তাৎক্ষণিক। তাঁদের কাছে এই খণ্ডচিত্রই আসলে সমগ্র। একটি মেয়ের সম্পূর্ণ জগৎ উন্মোচিত হয়েছে এর মাধ্যমে। আমার বর্তমান আগ্রহের বৃত্তে স্থান করে নিয়েছে চারটি ভাষা: পূর্বাঞ্চলের (বাংলাদেশ) জন্য বাংলা, পশ্চিমাঞ্চলের জন্য মারাঠি, দক্ষিণে তেলুগু এবং উত্তরভারতীয় হিন্দি বলয়ের ক্ষেত্রে মৈথিলী।

গান রচনার জন্য মহিলা গীতিকারদের কিছু প্রিয় পর্ব আছে। অধিকাংশ গান তাঁরা নির্মাণ করেছেন বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড থেকে। লক্ষ্যণীয়, এই দুটি পর্বই ধ্রুপদী রামায়ণবেত্তাদের আলোচনায় তেমন পাত্তা পায় না। বালকাণ্ডে বর্ণিত হয়েছে সীতার জন্ম, বিয়ের কাহিনী এবং রামের রাজ্যাভিষেকের আগের জীবন। উত্তরকাণ্ড আমাদের জানাচ্ছে যুদ্ধশেষে রাম-সীতার অযোধ্যায় ফিরে আসার পরের কাহিনী। উত্তরকাণ্ডের ঘটনাক্রম রামের পক্ষে বিশেষ স্বস্তিদায়ক নয়। আর পুরুষদের যে বিষয়গুলি আকৃষ্ট করে, মেয়েদের তা টানে না। তাই মেয়েদের গানে স্থান পায় না যুদ্ধের আড়ম্বর, রামের মাহাত্ম্য, ব্রাহ্মণ্য আচার। বরং সেখানে উঠে আসে পরিত্যক্ত হওয়ার কথা, অবিচারের কথা। আর আসে প্রেম, রোমান্স, বিয়ে, গর্ভধারণ আর সন্তান জন্মদানের দৃশ্য। স্বাভাবিকভাবেই গানের বিষয়বস্তু দানা বাঁধে রাম নয়, সীতাকে ঘিরে। পিতৃসত্য পালনে রামের মাহাত্ম্য বা রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর পরাক্রম মেয়েদের টানে না। কিন্তু রামের একটি নৈতিক অবস্থান মেয়েদের আলোড়িত করে – সীতার অগ্নিপরীক্ষা আর সীতাকে বর্জন।

লক্ষণীয়ভাবে, একজন মাত্র পুরুষ মেয়েদের অধিকাংশ গানে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি লক্ষ্মণ, সীতার দেওর, তাঁর বনবাসের সঙ্গী – অন্য কথায় রামের আর এক দাস। লক্ষ্মণ একমাত্র পুরুষ যাঁর সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের গ্রামীণ মহিলারা একাত্মবোধ করেন, একমাত্র ব্যক্তি যাঁর সঙ্গে সীতা সংযোগ স্থাপন করতে পারতেন।

পল্লীগীতিগুলি আবর্তিত হয়েছে ছ’টি মূল বিষয়কে ঘিরে: সীতার জন্ম, সীতার বিয়ে (বিবাহপূর্ববর্তী অনুরাগের ছোঁয়াও সেখানে জায়গা করে নিয়েছে কিছুটা), সীতার অপহরণ, গর্ভসঞ্চার, বর্জন এবং সন্তানের জন্মদান। ভারত ও বাংলাদেশের গ্রামীণ মহিলাদের অতীত অভিজ্ঞতা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সমতুল এবং সমাজের উচ্চবর্গ রচিত পিতৃতান্ত্রিক কাহিনির প্রতি তাঁদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাঁদের মূল্যবোধ পরস্পরের থেকে বিশেষ আলাদা কিছু নয়, কিন্তু শাসক পুরুষের ভাবনার তুলনায় তা একেবারেই আলাদা। আর মহাকাব্যের আখ্যান গড়ে উঠেছে পুরুষের ভাবনা ঘিরে। কাজেই মূলস্রোতের কবিরা যে রামায়ণ গান করেছেন তার সঙ্গে মেয়েদের গানের কোনও মিলই নেই। মেয়েরা গান গেয়েছেন নিজেদের জন্য, পুরুষেরা গেয়েছেন জনসাধারণের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে। মহাকাব্যকে তাঁরা যেভাবে দেখছেন, যেভাবে গেয়েছেন, তা সম্পূর্ণ আলাদা। পেশাদার কবিগায়কেরা রামের মহিমা গেয়েছেন। গ্রামীণ মহিলারা তাঁদের গানের মধ্যে দিয়ে উদ্‌যাপন করেছেন সীতাকে।

গ্রামীণ মেয়েলি এই গানগুলি আজও ভারতীয় মহিলা, বিশেষত গ্রামীণ মহিলাদের জীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গানগুলির বক্তব্য থেকে দশটি সাধারণ বিষয় খুঁজে পাওয়া যায়।

১. পরিত্যক্ত সীতা। এক অনাথ শিশুকন্যা

২. মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা

৩. বাল্যবিবাহ ও তার সমস্যা

৪. কন্যা সম্প্রদানের গান

৫. শ্বশুরবাড়িতে বধূ, গৃহ নির্যাতনের ধরন

৬. সোনার হরিণ। ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটিকেই দোষারোপ। “ও ইচ্ছে করে বিপদ ডেকে এনেছে” বলার মানসিকতা

৭. পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের স্থান ধরে রাখার জন্য মেয়েদের পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার আকুল বাসনা এবং পুরুষ জীবনের মূল্য

৮. গর্ভসঞ্চার – নানা আকাঙ্ক্ষা, একটু প্রশ্রয় পাওয়ার আকুলতা

৯. কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে সন্তানের জন্মদান

১০. বর্জন। প্রত্যাখ্যান, সামাজিক আত্মপরিচিতি বিলোপ

এই বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকেই বোঝা যায়, সীতা মিথ গ্রামীণ মহিলাদের জীবনের কোন জায়গা দখল করে আছে। গ্রামীণ মেয়েদের ব্যক্তিত্ব ও উচ্চারণ পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সীতা মিথের সঙ্গে।

এই বিষয়বস্তুগুলির কোনও ধর্মীয় গুরুত্ব নেই এবং পুরুষকে তা বিশেষ আকৃষ্টও করে না। মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক সময়, তাঁদের গভীর নিরাপত্তাহীনতার বোধ, শারীরিক ঝুঁকিপূর্ণ সব মুহূর্ত প্রকট হয়ে ওঠে এই গানে। কঠোর শারীরিক পরিশ্রম বা দারিদ্র্য নিয়ে মেয়েদের কোনও অভিযোগ নেই। বরং প্রতিটি গানেই ফুটে উঠেছে অবহেলা আর অধিকারহীনতার যন্ত্রণা। গানগুলি আমাদের বলে দেয়, একটি মেয়ের কোনও নিজস্ব সামাজিক আত্মপরিচয় নেই, তাঁর স্বামী তাঁকে পরিচিতি দেন এবং স্বামীর পরিচয়ই মেয়েটির পরিচয়। মহাকাব্য যখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মহাশক্তিধরের মহিমাকীর্তনে ব্যস্ত, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সীতার গান যেন এক নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মুখে ভাষা হয়ে ওঠে। আসুন দেখি, আমরা যে বিষয়বস্তুগুলি চিহ্নিত করলাম তা কীভাবে গানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সীতার যন্ত্রণার কথা গাইতে গিয়ে প্রতিটি ভাষা তার নিজস্ব কিছু বিশেষ ছোঁয়া রেখেছে। যেমন ধরুন, আলোচ্য চারটি ভাষার মধ্যে মৈথিলী একমাত্র যেখানে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে সীতার হেনস্থা আর তাঁর অপদার্থ স্বামীর মুখ বুজে থাকার বিবরণ উঠে এসেছে। মেয়ের জন্য উপযুক্ত স্বামী খোঁজা নিয়ে জনকের হতাশা, মরিয়াভাবও সবচেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে মৈথলীতে। বনবাসে যাওয়ার আগে বাড়ির অন্যান্য মহিলাদের সীতাকে সাহস জোগানো, সান্ত্বনা দেওয়ার কথা একমাত্র পাওয়া যায় তেলুগু গানে। যদিও সব ভাষার গানেই মহিলারা রামের যথেষ্ট সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তার মধ্যেও সবচেয়ে কড়া ভাষায় রামকে কটাক্ষ করা হয়েছে বাংলায়। বাংলা রামায়ণী গানে রাম ঈর্ষাপরায়ণ, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। তার সঙ্গে তিনি ‘পাষাণহৃদয়’, ‘পাপিষ্ঠ’। চন্দ্রাবতী রামকে বিকৃতমস্তিষ্ক বলেছেন। শুধু সেখানেই থেমে না থেকে তিনি রামের এমন এক ছবি এঁকেছেন যা থেকে রামকে রাজা নয়, রাক্ষসের মতো মনে হয়। অযোধ্যা রাজ্যের পতনের জন্যও চন্দ্রাবতী রামকেই দায়ী করেছেন। এর চারশো বছর পর, ১৯৯২ সালে, যখন একদল রামভক্ত ধর্মোন্মাদের হাতে আমরা গুঁড়িয়ে যেতে দেখলাম বাবরি মসজিদকে, তখন যেন চন্দ্রাবতীর শ্লেষ সত্যে পরিণত হয়ে চোখের সামনে ধরা দিল। সারা দেশ জুড়ে সীতার সঙ্গে একাত্মবোধ করেছেন গ্রামীণ মেয়েরা। বালক রাম বা প্রেমিক রামের প্রতি তাঁরা স্নেহশীল, কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের চোখে রাম স্বৈরাচারী এবং স্বামী হিসেবে নীতিহীন। যতই তিনি ঈশ্বর হয়ে উঠুন, এবং জগতের রক্ষাকর্তা হিসেবে যতই বর্তমানে তাঁর রমরমা বাড়ুক না কেন, গ্রামের মেয়েদের কাছে তিনি কোনওদিনই আদর্শ পুরুষ বা নায়ক হয়ে উঠতে পারবেন না।

পরিত্যক্তা সীতা

এবার কিছু গানের কথা পর্যালোচনা করা যাক। আমরা শুরু করব অনাথ, পরিত্যক্তা সীতার কথা দিয়ে। মারাঠি শ্রমজীবী মহিলারা সীতাকে নিয়ে একটি গান করেন। বনে নির্বাসিতা সীতার কথা বলার মতো কোনও সঙ্গী নেই। তাই তিনি কথা বলেন পাখিদের সঙ্গে, গাছেদের সঙ্গে।

সীতাবাঈ বলছেন:

“আমি কেমন মেয়েমানুষ?

পাঁচবছর বয়সে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল রামের কাছে

মায়ের ভালোবাসা কী জানলাম না

ও আমার তালগাছ, ও আমার বট

সীতা তার জীবনের কথা তোমাদের বলছে

শোনো তোমরা… আমায় কুড়িয়ে পেয়েছিল ওরা লাঙলের ফলায়

বাপ মা নেই আমার

খোলা মাঠে বাক্সের মধ্যে ছিলাম আমি…”

নিঃসঙ্গ, একা মেয়ের অন্যের সঙ্গে যোগস্থাপনের এই উদগ্র আগ্রহ আমাদের স্পর্শ করে। চূড়ান্ত একাকিত্ব ও প্রেমহীন জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে অন্যান্য ভাষায় রচিত গানেও। চন্দ্রাবতীর বাংলা গানের একটুকরো তুলে দিচ্ছি। সীতা লক্ষ্মণকে বলছেন:

“আমার বাপ নেই মা নেই

আমাকে ওরা পেয়েছিল লাঙলের ফলায়

জানি না আমার বাপ-মা কে

ভাইকে চিনি না

স্রোতের টানে শ্যাওলার মতো

এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে ভেসে বেড়াই আমি…”

প্রায় সমসাময়িক একটি মারাঠি গীতে পুনরাবৃত্ত হয়েছে সীতার ৪০০ বছরের পুরনো বাঙালি সত্তা:

“আমার বাপ নেই মা নেই

জীবন কাটাই জঙ্গলে, বুনো ফল খেয়ে থাকি

ভাইবোনও নেই আমার

আমার সত্তা নির্বাসিত

অরণ্যের গভীরে…”

মিথিলার খুব কাছে ছোটনাগপুরের মুন্ডা আদিবাসীদের গানে ফের ভেসে আসে সীতার দীর্ঘশ্বাস:

“ঘাসে ভরা পাহাড়ি জমিতে

আমায় কুড়িয়ে পেয়েছিল চাষিরা

নিয়ে গিয়েছিল রাজার প্রাসাদে…

রসালো ফলের মতোই বেড়ে উঠলাম আমি

জনক আমার বিয়ে দিল রামের সঙ্গে

কিন্তু দুঃখ ভুলতে পারলাম না…

সুখ কাকে বলে জানলাম না…

কেন গ্রামীণ মহিলারা তাঁদের গানে সীতাকে রাজনন্দিনী হিসেবে না দেখে এক দুঃখী, অনাথ মেয়ে হিসেবে তুলে ধরলেন? এই বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। সীতার নামের সঙ্গে বাংলায় (এবং মৈথিলীতেও) একটি বিশেষণ জুড়ে রয়েছে: জনম দুখিনী। আসলে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার জীবনবোধ এই সব গানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জুড়ে রয়েছে। সেই জীবনবোধ অনুসারে সব মেয়েই অনাথ, পরিচিতিহীন, চিরনির্বাসিত এক সত্তা।

সীতার বিবাহ

অনাথ সীতার প্রতি সহমর্মিতাবোধ পোষণ করা সত্ত্বেও গ্রামীণ মহিলা কবিরা সীতার পালক পিতামাতার প্রতিও গভীর সহানুভূতিশীল। কন্যাসন্তানের জন্য উপযুক্ত পাত্র খোঁজার ক্ষেত্রে তাঁরা যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। আজও এ দেশে কন্যাসম্প্রদানকে একটা বিরাট বোঝা হিসেবে দেখা হয়।

পাত্র খোঁজা সংক্রান্ত একটি গান:

“রাজনন্দিনী সীতা ঘর মুছছেন

কাঁধ থেকে খসে যাচ্ছে শাড়ির আঁচল

তাঁর মা, রানী, বাপকে বলছেন

ওঠো ওঠো রাজা জনক! বসে থেকো না

সীতার জন্য পাত্র খোঁজো

বিয়ের বয়স হল তার

জনক ওঠেন, সাদা ধুতি অঙ্গে জড়ান

মাথায় চড়ান পাগড়ি

কৃষির সরঞ্জাম হাতে বেরিয়ে পড়েন

মুঙ্গের আর মগধের দিকে…” (নং ৫০৮)

বোঝাই যাচ্ছে, এক সাধারণ বিহারী পিতা তাঁর কন্যার জন্য পাত্রের সন্ধান করছেন। কোনও রাজসিক সম্বন্ধের প্রস্তুতির চিহ্ন এ ছবি আমাদের দেয় না।

আর একটি গানে আমরা দেখি, তরুণী সীতা ঘরের উঠোন নিকোতে গিয়ে উঠোনের ওপর একটি ভারী ধনুক দেখতে পান। বাঁ হাতে ধনুকটি তুলে ধরে ডান হাতে তিনি উঠোন পরিষ্কার করতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে জনক রাজা অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন কারণ তিনি নিজে ওই ধনুক নিজে সরাতে পারেননি। পরক্ষণেই আর্তনাদ করে ওঠেন তিনি – “আব সীতা রহেলি কুমারী, হো!” (হায়, সীতাকে এবার কুমারী হয়েই থাকতে হবে)। যেহেতু মেয়েরা নিজের চেয়ে শক্তিশালী স্বামী কামনা করে, এবং সীতা অলৌকিক শক্তিসম্পন্না, ফলে তাঁর উপযুক্ত স্বামী কোথায় পাওয়া যাবে? যে ব্যক্তি ওই ধনুকে গুণ পরাতে পারবেন, তিনিই হবে সীতার স্বামী! স্বয়ংবর সভা ডাকা হল। সারা দেশ থেকে পাত্ররা এসে হাজির হলেন। মৈথলী, বাঙালি, তেলুগু এবং মারাঠি ভাষায় সামান্য অদলবদল করে এই কাহিনীটিই বলা হয়েছে। মৈথিলীতে সীতা অনেক সক্রিয়। এই অধ্যায়টি অন্য কোনও রামায়ণে পাওয়া যায় না। যেমন, স্বয়ংবর অনুষ্ঠানে একের পর এক পাণিপ্রার্থী ধনুকে গুণ পরাতে ব্যর্থ হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন সীতার পিতামাতা – “অব সীতা রেহেলা কুমারী, ধনুশা না টুটালা হে!” অর্থাৎ, কেউ ধনুক ভাঙতে পারছে না, এবার সীতাকে সারাজীবন কুমারী হয়েই কাটাতে হবে। বিষাদগ্রস্ত সীতা তখন বাড়ির ছাদে উঠে চিৎকার করে বলেন,

“উঁচি ঝরোখে চড়ি সীয়া চাহুনদিশি চিতবাহি হে

মাই হে, নাই কোই দুনিয়া মে বীর পিতা-প্রাণ রাখাতা হে!”

(অর্থাৎ, হে মা, এই জগতে কি এমন কোনও শক্তিমান পুরুষ নেই যে এই ধনুকে গুণ পরিয়ে আমার পিতার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারবে?) লক্ষ্মণ স্বভাবজাতভাবেই সীতার প্রগলভতায় বিরক্ত। “এত মরিয়া কেন ও? রাম আসবেন, এসে ধনুকে গুণ পরাবেন।” বোঝাই যাচ্ছে, সীতা কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না।

আর একটি মৈথিলী গান শুরু হয় কোনও ভূমিকা ছাড়াই। এখানে সীতা নিজেই তাঁর পিতার কাছে গিয়ে বলছেন,

“সুনো বাবা আরজি হামারি ও, কুমারী কতেক দিন রাখাভা?

ইহো নে উচিত ব্যবহার ও!

(অর্থাৎ, শোনো বাবা, আমার একটা কথা আছে। আর কতদিন তুমি আমায় কুমারী করে রাখবে? এ উচিত ব্যবহার নয়!) ভাগ্যিস লক্ষ্মণের কানে এ বাক্যালাপ পৌঁছয়নি! তবে মেয়ের কথা শুনে নড়ে বসেছিলেন জনক, এত্তেলা পাঠিয়েছিলেন জ্যোতিষীকে।

এই প্রতিটি গানেই পাণিপ্রার্থী রাজাদের মধ্যে রাবণও উপস্থিত। কিন্তু ধনুক তুলতে না-পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে যান তিনি। আমোদ পেয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠেন সীতা। অপদস্থ রাবণ প্রতিজ্ঞা করেন সীতাকে বলপূর্বক হরণ করবেন। তেলুগু, মারাঠি, বাংলা, মৈথিলী, সব ভাষাতেই দশানন রাবণের পর্যুদস্ত হওয়ার রসালো বর্ণনা করেছেন মহিলা কবিরা। প্রবল পরাক্রমী রাবণের সম্পূর্ণ বিপরীতে রামের অবস্থান। রাম এক দীঘল, শ্যামবর্ণ, সুপুরুষ কিশোর। এই ছিপছিপে স্বপ্নালু চোখের তরুণ কি পারবে ওই বিরাট হরধনু তুলতে? – চিন্তিত হয়ে পড়েন সীতা। এমনকী, এইরকম কঠিন পণ করার জন্য নিজের পিতার ওপর খানিকটা রেগেও যান তিনি। কিন্তু কী আশ্চর্য! তামাম শক্তিধর পুরুষ যা পারেননি, এই নবীন কিশোর তা করে দেখান। হরধনু ভঙ্গ করেন তিনি।

বালিকাবধূ সীতা

আসা যাক বালিকাবধূ পর্বে। এই অধ্যায়ে সীতাকে বিয়ের আসরের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। সীতা সেজে উঠছেন শ্বশুরবাড়ির জন্য। এই পর্বের গানগুলিতে যেন চিরন্তন ভারতীয় মেয়ের হৃদয়ের গান। তখনও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠেনি যে বালিকা, তাকে বিয়ে দিয়ে এক অচেনা পরিবেশে পাঠানোর যে যন্ত্রণা, তা এই পর্বের গানগুলিতে পরিস্ফূট। একটি তেলুগু গানের কথা এ প্রসঙ্গে বলতে চাই:

“ছোট্ট মেয়েটা সাতটি জুঁইফুলের সমান

রোদ বৃষ্টি কোনওটাই ওর সয় না

সেই মিষ্টি মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে পাঠানো হচ্ছে রামের ঘরে।”

আবার এর খুব কাছাকাছিই থাকবে বাংলাদেশের আর একটি গান:

“অল্প অল্প ঢাইলো রে জল

সীতার হইব সর্দিজ্বর

গামছা দিয়া তুইল কেশের জল গো”

(অর্থাৎ, জল ঢালো ধীরে ধীরে, গামছা দিয়ে চুল শুকিয়ে দাও, নয়তো সীতার সর্দিজ্বর হয়ে যাবে)। গানটির দৃশ্যপটে, মা-কাকিমা স্থানীয় আত্মীয়ারা স্নান করিয়ে দিচ্ছেন সীতাকে। সমাজে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে গানটির কথায় – যে ছোট্ট মেয়েটি এখনও নিজের যত্ন নেওয়ার মতো পরিণত হয়ে ওঠেনি, বিয়ে দিয়ে তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্ত্রী হয়ে ওঠার মতো এক সামাজিক গুরুদায়িত্ব।

সীতার সম্প্রদান

বালিকাবধূর পর্ব থেকে এবার আমরা এগিয়ে যাব সীতার সম্প্রদান পর্বে। পিতামাতার উদ্বেগ এই পর্বের ছত্রে ছত্রে স্পষ্ট। একটি তেলুগু গানে আমরা দেখি, রাজা জনক রামের পিতা দশরথকে বিবাহবাসরে নিয়ে গিয়ে ছোট্ট সীতাকে দেখান। ফুল দিয়ে সুসজ্জিত বিশাল বিছানায় ঘুমিয়ে রয়েছেন তিনি। জনক বলছেন দশরথকে, “দেখুন ওকে। ফুলের বিছানায় অসহায়ভাবে ঘুমিয়ে রয়েছে – এখনও সীতা নিষ্পাপ শিশু।” আসন্ন বৈবাহিক ধর্ষণের ইঙ্গিত এখানে স্পষ্ট এবং কন্যার পিতা চেষ্টা করছেন বিষয়টির নিষ্ঠুরতা পাত্র ও তার পরিবারকে অনুধাবন করানোর। বালিকাবধূর প্রতিটি পর্বে পিতামাতার আশঙ্কা ফুটে বেরিয়েছে।

আর একটি তেলুগু গানে সীতার মা ভূদেবী একান্তে কথা বলছেন রামের মায়ের সঙ্গে:

“আজ থেকে সীতাম্মা আপনার কন্যা

তার কিছু জানা নেই – দুধ জ্বাল দেওয়া

মাখন থেকে ঘি বানানো – সব ওকে শেখাবেন

ঘরকন্নার কাজ শেখানো হয়নি ওকে।”

সীতা শ্বশুরগৃহে যাত্রা শুরু করার সময় ভূদেবী তাঁকে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। বুঝিয়ে দেন এখন বালিকা থেকে নারী হয়ে ওঠার সময় হয়েছে তাঁর:

“সূর্যাস্তের পর পাশের বাড়ি যেও না

বিকেলে ধোপার কাছেও নয়

পথে চুল খুলে হেঁটো না

হাসতে গিয়ে দাঁত দেখানো নয়

ভিড়ের মধ্যে এদিক ওদিক দেখবে না

লোকসমক্ষে দৃষ্টি থাকবে নিচু

রান্নাঘরের মেঝেয় ছড়ানো তুষে

পা যেন না লাগে তোমার…”

এবং তারপরেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশটি: “স্বামী ছাড়া অন্য কোনও পুরুষকে ফুল দিও না কখনও।” আজও অন্ধ্রপ্রদেশের বিবাহবাসরে এ গান প্রচলিত। শতক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যেক মায়ের পরামর্শ হিসেবে আজও সমকালীন এ গান। ভবিষ্যতের রানীর বিবাহসংগীতের চেয়ে মধ্যবিত্ত গৃহবধূর আচরণবিধি হিসেবেই অধিকতর গ্রহণীয় এ গান।

শ্বশুরগৃহ বাস

যাবতীয় উপদেশ-পরামর্শ সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়িতে নাবালিকা বধূর হেনস্থা কিছু কম হয়নি। সীতাকে শাশুড়ির কাছে কতটা অত্যাচারিত হতে হয়েছিল, তার স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায় মারাঠিতে রচিত ‘সসুরবাস’ গানে। মারাঠি মেয়েদের গানে সসুরবাস খুব জরুরি একটি অধ্যায়। যতবার মহিলাদের কণ্ঠে রামায়ণী গান শোনা গেছে, ততবার তা হয়ে উঠেছে ভাগ্যতাড়িত একটি অসহায় মেয়ের কাহিনি। ব্রহ্মার তাড়া ছিল/সীতার কপালে ভাগ্যরেখা আঁকার সময়/রেখা বেঁকে গেল…”

সীতার শ্বশুরবাড়ির জীবনের আরও একটি উদাহরণ:

“রাম সীতাকে তাঁর প্রেম দিলেন

তেঁতুলপাতায় করে

কৈকেয়ী রামের কানে বিষ ঢালল

রাম একাই পান খান

একাই থাকেন

আর কুটিল কৈকেয়ী দরজার বাইরে

বিষাক্ত বিছের মতো নজর রাখে।”

তেঁতুলপাতার অর্থ খুব স্পষ্ট। তেঁতুলপাতায় যেটুকু প্রেম ধরে, মাত্র সেটুকুই রাম দিলেন সীতাকে। অবসর সময়েও সীতা রামের সঙ্গ পান না – রামের সৎ মা কৈকেয়ী তা হতে দেন না। বর্ণনা উত্তরোত্তর স্পষ্ট হতে থাকে…

“সীতাকে সকলেই অত্যাচার করে

বারো বছর ধরে তার খাদ্য শুধু তেতো নিমপাতা

বারো বছর ধরে তাকে কুমকুম

পরতে দেয়নি ওরা

সীতার চুলভরা জট

বারো বছর ধরে চুল পরিষ্কার করা

বারণ ছিল সীতার।”

শারীরিক ও মানসিক ঘরোয়া নির্যাতনের সুস্পষ্ট ছবি উঠে এসেছে এই গানে। সীতাকে খেতে দেওয়া হয় না, সাজগোজ করতেও দেওয়া হয় না। এমনকী, স্বামীসঙ্গ ও যৌনসুখ থেকেও তিনি বঞ্চিত।

“নিজের শোয়ার ঘরেই

সীতা বনবাসে দিন কাটান

রাম তাঁর বিছানায় আসেননি

আজ বারো বছর

সাতটা ফটকের আড়ালে সীতা বন্দি

রাম দিন কাটান নিজের কাজে

বেচারী সীতার যৌবন বয়ে যায়…”

অর্থাৎ সীতা যে কেবল স্বামীসঙ্গসুখ লাভে বঞ্চিত, তাই নয়। তাঁর গৃহের বাইরে বেরিয়ে অন্য কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করারও সুযোগ নেই। স্বামী রাজকার্যে ব্যস্ত থাকেন, আর সীতা বন্দিনীর মতো দিন কাটান। সামান্য অতিরঞ্জিত হলেও ছবিটা আমাদের পরিচিত। গায়ক বলছেন, “সীতা নিজের শোয়ার ঘরেই নির্বাসনে দিন কাটান।” এরকম অত্যাচার একটু অবাস্তব মনে হলেও ভারতীয় মহিলাদের কাছে, এমনকী শহরের মহিলাদের কাছেও বিষয়টা নিতান্ত অজানা নয়।

বাড়ির বধূর ওপর পণের দাবিতে অত্যাচার, এমনকী তাকে হত্যা করার ঘটনাও শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে বিরল নয়। শুধু পণের দাবিতে নয়, অনেক সময় নিছক ঈর্ষা থেকেও বাড়ির মহিলাদের হাতে বধূ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। যেহেতু শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের হাতে ভারতীয় মেয়েদের নির্যাতনের ঘটনা শতক পেরিয়ে আজও এক চরম সত্য, সেই কারণেই বহু বছরের প্রাচীন এই গানগুলি আজও ফসিল হয়ে যায়নি। আজও তা ভারতীয় মেয়েদের অস্তিত্বের একটি অঙ্গ। মেয়েরা যখন সীতার জন্য কাঁদেন, সে কান্না ততটাই তাঁদের নিজেদের জন্য। সীতার মতো তাঁরাও সেই চিরন্তন ভারতীয় নারীর আদর্শকেই অনুকরণ করেন, পালটা অভিযোগ না করে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করাই যাঁর ধর্ম। বান্ধবীদের কাছে নিজের যন্ত্রণার কথা বলে খানিকটা হালকা হওয়াই যাঁর একমাত্র মুক্তির পথ।

(পরবর্তী অংশ)

(রচনাটি Manushi – Forum for Women’s Rights and Democratic Reforms-র থেকে আহৃত এবং এই সংস্থার অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)