Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আজকের ফ্যাসিবাদ

আজকের ফ্যাসিবাদ -- আকাশনীল আলম ঘটক

আকাশনীল আলম ঘটক

 

কে আর জানত হালারা ঢুকবে তো ঢুকবে দোর দিয়ে নয়, সিঁদ কেটে নয়, এক্কেবারে আপামর হিন্দুস্থানির ল্যাদ মেরে। কাণ্ড হে কাণ্ড। আপনার চক্ষু যখন মুদিতপ্রায় বা মন যখন নেহাত ফাঁকা বা হয়ত আপনি এক্কেবারে ফুরফুরে তবু ব্যস্ত নন বা ব্যস্ততাকে একটু টাইমস‌ আপ বলে আলগা হতে বের করেছেন ফোন— বেজেছে তখনই যুদ্ধদামামা এসেছে নোটিফিকেশন। হাথরাসে গণধর্ষণ দলিত মেয়ের। করোনা চিনের দালাল। মুসলমানদের সঙ্গে আগেভাগে মার্কেটিং মিটিং চলেছিল করোনার। আপনিও দেখছেন, হয়তো কোনও বন্ধু শেয়ার করেছেন বা এমনি এসে জুড়ে বসেছে কোনও নিউজফিড। আপনি কী করবেন? পড়বেন অফকোর্স। বাইরে তো জ্যাম। কমেন্টগুলো পড়বেন, সেখানে ‘যত পথ তত মত’ মার্কা সালিশি বসেছে, অতশত না পড়ে আপনি একটা জেনারেল হতাশা নিবেদন করে কেটে পড়লেন অনলাইন শপিং সাইটে বা হয়ত চপচপে কোনও পানু পেজে। আধুনিক ল্যাদ আপনাকে ফর্মাল ওই তিন মিনিট নীরবতা পালনের স্কোরটাও দিল না। দেশ কাঁপানো গরম গরম খবর আপনি জানলেন বা শুনলেন অনলাইন শপিং করতে করতে, বা দুবার হোয়াটসঅ্যাপ দেখে অথবা একটা আপাত হট মেয়ে বা ছেলেকে স্টক করতে করতে। হ্যাশট্যাগ বংশীয় খাসখবর আপনার তপ্ত হিয়ার ত্রস্ত পাঁচ মিনিটও পেল না। আপনি তখন নিজ জীবন পরম দুঃখময় বলে তিন শব্দ কমেন্ট লিখে জিহ্বাগ্রে সবে নামকীর্তন শুরু করেছেন— দেশের কী অবস্থা!

‌‌ফ্যাসিবাদ ভয়াবহ, মারদাঙ্গা খুন-খারাবি নিয়ে আসে ব্যাকুলতার স্পেশাল ডিশ, এহেন অনেক কথাই তাত্ত্বিকরা বলছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদ‌ যে বিউটিফুল আমোদীয় হতে পারে, তা যে আসতে পারে আপনার চূড়ান্ত bore হওয়ার সময়ে— একথা আপনি বাজারে বিশেষ শুনবেন না। ফ্যাসিবাদ আসলে দাঁড়িয়ে আছে এক ডিস্ট্র্যাকশনের অর্থনীতির ওপরে। আধুনিক অনলাইন দিনযাপন সুযোগ নেয় আমাদের ল্যাদ থেকে শুরু করে মনকেমন থেকে ভালো লাগছে না-গুলোর। আপনার মন যখন তেষ্টায় থাকে তুখোর এন্টারটেইনমেন্টের, মুখবই জুড়ে ছেয়ে দেবে ফ্যাসিস্টরা নিজের ইশতেহার। তাই আজকের সময় হিটলারের কিংবা মুসোলিনির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ছবি দেখে অ্যাংজাইটির ওষুধ খাবেন না প্লিজ। আপনাকে ওরা ছোঁবেও না, কিন্তু এত গভীরে স্পর্শ করবে যে আপনি টোটাল প্যাকেজ হয়ে উঠবেন ওকেই মার্কেট করার জন্য। আসলে ফ্যাসিবাদ, তার আগেও সাম্রাজ্যবাদ, আমাদের অর্গাজম থেকে বাসন মাজার সাবানের অ্যাড দিয়ে তৈরি করেছিল তার সামরিক ক্ষেত্র। এমনকি আজকের ইন্টারনেটের সূত্রপাত তো যুদ্ধেরই বাজারে। কোল্ড ওয়ার পরবর্তী যুদ্ধপরিস্থিতিতে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার স্পুটনিক স্যাটেলাইট কাঁপিয়ে দিয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যের ভিত, ১৯৫৭ সালের মার্কিন সমর অভিযানের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছিল APRANET বলে একটি সফটওয়্যার। প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্রে গোপন খবর চালাচালি অথবা শত্রুপক্ষ নিধনের জন্য তাৎক্ষণিক কূটনীতির প্রয়োজনে তৈরি আমাদের আজকের ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপের বাপঠাকুরদা। প্রথমে বিশাল বিশাল কম্পিউটার তৎপরবর্তীতে ফোন তারপর রেডিও এবং সবশেষে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব। তিন দশকের গভীর পরিশ্রম এবং পুঁজিপতিদের বিপুল পুঁজির উপরে দাঁড়িয়ে মার্কিন সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল তার নতুন এই সামরিক সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধ হাতিয়ার। তাই আজ আর এ ভেবে কাজ নেই যে কেন ফ্যাসিবাদ নিজেকে এক অনলাইন প্রফেশন হিসেবে ঘোষণা করেও এড়িয়ে গেছে আইন অথবা সমাজের শূল। আজকের তথ্য সভ্যতায় ভালো ঘুমের সঙ্গে লেপ্টে আছে অ্যান্ড্রয়েড ফোন। সভ্যতার সঙ্গে টেকবাজির তো বহু পুরনো সম্পর্ক, সেই পুরনো শিকারসামগ্রী থেকে অস্ত্র, বোমা এবং এখন ইন্টারনেট। টেকমানবতা ব্যাপকভাবে পরিবর্ধিত করেছে আধুনিক আত্মতত্ত্বকে। একটি অ্যানোনিমাস ‘আমি-বাজি’, যে‌‌ আমি-র কোনও সামাজিক রূপরেখা নেই, সেই আমি-র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে আপনার আমার মস্তিষ্ক থেকে শরীর, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি। পাল্টে গেছে খোলনলচে আমাদের অনুভূতি তত্ত্বের, নয়াউদারবাদের শর্ত আমাদের শিখিয়েছিল এক ধরনের ইমপার্সোনাল বা কর্পোরেট ইমোশানালিটি, যার নিয়ম হচ্ছে আপনার মুখে কিংবা শরীরে আপনার ভেতরে চলতে থাকা অনুভূতির কোনও সিগন্যাল থাকবে না। কাজের জায়গায় আপনি শুধুই শ্রমিক এবং শ্রমিকের অনুভূতি থাকতে নেই। টেকসভ্যতায় এই অনুভূতি তত্ত্ব পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। এখানে অনুভূতিরা পরিণত হওয়ার সময় পায় না, তারা বিক্ষিপ্ত অনেক সময় বিধ্বস্ত অথবা বেশিরভাগই কনফিউজড। ইমোটিকন যখন এ শতাব্দীর সমস্ত আবেগ উচ্চারণকে নিয়ে এসেছে অপশনে তখন এ প্রশ্ন করা অনুচিত নয়‌ যে একটি ফ্যাসিবাদী সময়ে কীরকমের আবেগপ্রণালী প্রমাণ করছে আমাদের নিহিত মানবতার প্রকাশকে। আপনি যখন বোর হন তখন আপনি দেখবেন আপনি সবথেকে উত্তেজিত। ফাঁকা সময় মানুষকে অনেক বেশি কর্মঠ করে তোলে এবং এই সময় নিয়ে আপনি যখন চলে যান ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে, দেখে ফেলেন দলিতকে পিটিয়ে মারার ভিডিও অথবা পড়ে ফেলেন মণীশার উপর হওয়া অত্যাচারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা কিংবা হাহা রিঅ্যাক্ট করেন হিন্দু রিফিউজিকে নিয়ে করা কোনও মিমে, বুঝবেন আপনি ফাঁদে ফেঁসে গেছেন ঠিক আমাদের সবার মতই।

এই উপমহাদেশে অনুভূতির ইতিহাস বহুবিধ এবং অত্যন্ত জটিল। একটি উদাহরণ দিয়ে এটা কি বোঝা যাক। ধরুন দেশভাগ। যারা এদেশে এলেন, যারা রিফিউজি কলোনি বানালেন, যারা সব শেষ হয়ে নতুন করে শুরু করলেন সবকিছু, তাদের চলে আসার কারণ, সেই সময়ের নিগ্রহ, সব ফেলে আসার আন্তঃকলরব এইসবের বিপরীতে তৈরি হয়ে আছে এক অপর, একজনের জন্য, এক ব্যক্তি কিংবা সম্প্রদায়ের জন্য ওয়ালা অপর। এই অপরকে ব্যবহার করে ফ্যাসিস্টরা। একেই মুসলমান বানিয়ে দিলে হিন্দু ভারতের গোল্ডেন খোয়াব পূর্ণ হয়। তখন আপনার ভুলে যাওয়া ক্রোধ হতাশা ফিরে এসে হামলে পড়বে সেই কল্পিত মুসলমানের উপরে যার দায় নিতে হবে দিল্লির দাঙ্গায় নিহত মানুষদের। এনআরসি নিয়ে পড়ে যাবে হুলুস্থুল, গোটা দেশ নেমে পড়বে রাস্তায়। কিংবা ধরুন আদিবাসীদের নিয়ে করা হবে কিছু কমেন্ট তার বিপরীতে পাল্টা কমেন্ট তার বিপরীতে আরও কমেন্ট, কমেন্টে ডিলিসিয়াস কমেন্ট, যখন আপনি বিধ্বস্ত, তর্কের যখন আর শুরু শেষ নেই, যখন উল্লেখিত বিষয়ের কোনও নির্বাহ হয় না, তখনই এরা জিতে যায়। আপনি আপনার ঘেন্না হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন অথবা ঘেন্নাকে পরিণত করেছিলেন রুটিনে, সেই ঘেন্নাকে জাগিয়ে তুলে আপনার অনুভূতিকে দেওয়া হল একটি রাজনৈতিক মানে, একটি তাৎক্ষণিক আর্জেন্সি। যদি আপনি বলেন আদিবাসী বণ্য বা বলেন রিজার্ভেশন অপ্রয়োজন। শুরু হবে ব্যাপক খাপ পঞ্চায়েত গোটা দিন ধরে যার ফলে আর কিছু হোক না হোক আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়া হবে বিষয়টি সম্পর্কে। আপনি হয়তো ভাবছেন ইএমআই নিয়ে বা কী রাঁধবেন তাই নিয়ে বা আলুর দাম কেন বেড়ে গেছে তাই নিয়ে কিন্তু রিজার্ভেশন নিয়ে ওদের যা বক্তব্য সেই বক্তব্য নিয়ে আপনাকে ভাবাবে তো বটেই বরং কনফিউজড রাখবে। পক্ষ নিতে না দেওয়া এদের প্রধান যুদ্ধ হাতিয়ার। আপনার রেগুলার যে ক্ষোভ তা মুসলমানের বিরুদ্ধে হোক কিংবা দলিত আদিবাসী কিংবা মেয়ে কিংবা হিজরেদের বিরুদ্ধে, সেগুলোকে আরও সংগঠিত করে নতুন চিন্তার দিকে আপনি যাতে হেলে না পড়েন তার জন্যই তৈরি এই কনফিউশনের ব্যারিকেড। আপনিও তো ভাবতে চান কিন্তু আপনাকে সময় দেবে কেন, আপনাকে অ্যামাজনের নোটিফিকেশন পাঠাবে জোমাটোর অফার পাঠাবে বডি ম্যাসাজের লিঙ্ক পাঠাবে। আর আপনি বিখিপ্তির সসুন্দর ইশারায় বুদ হবেন পরবর্তী উদ্রেকের জন্য।

এদের রাজনীতির সব চেয়ে সুন্দর জিনিস হল এরা লজিক্যাল, পপুলার নিয়মে। লোকে যেটা খায় এরা পাত পারে সেটা খাওয়াতে জানে। আর এরা যদি লজিক্যালি করেক্ট হয় আমরা পলিটিক্যালি করেক্ট। গরীব হিন্দুর তো সত্যি খুব কষ্ট এই দেশে। আপনি যেই কিন্তু নিয়ে যাবেন অমনি চলে আসবে ভক্তদল শান্তির জল নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে ঢুকছে দুষ্কৃতী তাই আইনি ঝাঁটা প্রয়োজন। যাদের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে কুসংস্কারের উপরে এবং যেখানে লৌকিক দর্শন এই সংস্কারকে দীর্ঘ বছর ধরে লালন করেছে, পার্লামেন্ট এবং ভোটদলগুলি ব্যবহার করে চলেছে, সেই দেশে পলিটিক্যালি করেক্ট কিন্তুর আর কী বৈধতা তা আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। প্রগ্রেসিভ যারা মনে করছেন বিজেপি গেলেই স্বর্ণযুগ আসছে— কিন্তু আধুনিক টেকসভ্যতা এবং আসা না আসা অতীতে যে ক্ষয় শুরু হল তার মেরামত কি এই ব্যবস্থায় সম্ভব? একবারের মান্যতা যে আগামীর কত শতাব্দী নিশ্চিন্তি মানসিক আগ্রাসন তার অপেক্ষা নয় ইতিহাসই করুক।