Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ফাঁসি কা ফান্দা

ফাঁসি কা ফান্দা -- প্রতিভা সরকার

প্রতিভা সরকার

 

কয়েদি মুন্নুর দারুণ অহঙ্কার, তার হাতে বানানো ফাঁসির দড়ি কার না কার গলায় উঠেছে। নির্ভয়া কেসের মাদারচোদ চারটে রেপিস্ট, কি বিরিয়ানি-খোর কাসভ, সবাইকে এই বান্দার হাতে বানানো দড়িতেই লটকে পড়তে হয়েছে।

সবটাই হরদম বাড়িয়ে বলা মুন্নুর স্বভাব, আর নিজেকে ফাঁসির দড়ি বানাবার একচ্ছত্র কারিগর বলে প্রমাণ করতে চাওয়াটা তার অভ্যাস। আগে সে ছিল কামার, এখন মুখে মুখে মাস্টার, কিন্তু নিজেকে মাঝে মাঝে এমনকি ভগবান মনে হয় তার, বিশেষ করে যখন কাগজে জড়ানো গাদা গাঁজা বিড়ি খৈনি শীতের জামাকাপড় কিম্বা ঘরে বানানো রুটির তলায় পাচার হয়ে তার হাতে পৌঁছে যায়। গাঁজা, মদ তো ভালো, চাইলে কোকেনও জুটে যাবে জেলের ভেতর বসেই। কে দেয় জিজ্ঞাসা করা বেকার, আট ন বছর জেলের ওয়ার্ডেনের ডানহাত হয়ে যে রয়েছে, জেলের বাইরেও তার প্রতিপত্তি আপনা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। গরীবগুর্বো ভিতু কয়েদির দল দু পাঁচ মিনিট বাড়ির লোকের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারবে কি না, মা-বৌয়ের বানানো খাবারটা তার কাছে পৌঁছবার আগেই লুট হয়ে যাবে কিনা, তা ঠিক করে এই মুন্নু মাস্টার আর তার চেলাচামুন্ডারা।

গাঁজা টানলেই খিক খিক করে হাসতে থাকে মুন্নু, আর ওয়ার্ডেন এসে ঠাট্টা করে হাতের মোটা রুল দিয়ে খোঁচায়, যেন দেখে তার চামড়া কত মোটা।

–সালে, ফিরসে গঁজা ফুকত কা হো?
–না হো, গঁজা নই খে, অম্রুৎ বা। ভগোয়ান ভি হমেশা পিত রহেল বানি। আমিও এখন ভগবান বনে গেছি।

ভগবানত্ব থেকে মুক্তি পেলে মাড়ি আর গালের মাঝখানটায় ঠেসে খৈনি ভরে মুন্নু পা ছড়িয়ে কুয়োতলায় বসে। ভারতবর্ষে এই একমাত্র জেল, কয়েদির আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়েও যাতে একটি বিশাল কুয়া আছে। তার জল নাকি ফাঁসির দড়ি মোলায়েম করার জন্য মোক্ষম। তাই মুন্নুর সামনে এক ড্রাম তোলা জল রাখা, তাতে কড়াপড়া হাত ভিজিয়ে সে ফাঁসির দড়ি পাকায়। তখন ইচ্ছেমতো সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে থুথু ছেটায় যাবজ্জীবন পাওয়া এই আসামি। থুঃথুঃ। কেউ কারণ জিজ্ঞাসা করলে অচানক রেগে গিয়ে বলে, তোর মুখে থুকি গিধধর। তোর মায়ের মুখেও। খানকির ছেলে আমাকে ঘাঁটাতে আসিস না৷

নিজেও সে ভাবে। দড়ি পাকাতে বসলে রোজ খৈনির গন্ধমাখা একরাশ থুথু মুখের ভিতর কোত্থেকে হাজির হয়! জেলের মাইনে করা মনের ডাগদারবাবুর কাছে একদিন গেলে তিনি বুঝিয়েছিলেন, রাগের মাথায় কতল সে করেছিল বটে, রাগের যথেষ্ট কারণও ছিল, কিন্তু পুরানো সেই মুন্নু কামারের ভেতরের তরস বা দয়া, সমবেদনা সব তো আর কতল হয়ে যায়নি। যখন সে দড়ি পাকাচ্ছে, তার বিবেক তাকে কষ্ট দিচ্ছে, এদেশে ঠিক বিচার তো হয় না, কোন না কোন নির্দোষকে লটকে দেওয়া হবে তার বানানো দড়িতে, এইটা ভেবেই তার নিজের ওপর ঘিন আসছে, থুথু ছিটছে মুখ থেকে।

তারপর যে কথাটি তিনি বলেছিলেন মুন্নু তা খুব ভালো বোঝেনি। মানুষ যখন সিস্টেমের অঙ্গ হয়ে যায় তখন এইরকমই হয় গোছের কিছু কথা।

হবেও বা তার মন এমন দুধারি তলোয়ার! বাইরে রসসিদার হিসেবে অহঙ্কার মটমট করছে, ভেতরে জমা আছে তরস, চুনের জলের নিচে যেমন থিতিয়ে থাকে সাদা চুন। তবে দুর্দান্ত মুন্নু মাস্টারের ভেতরে এখনও ঘাপটি মেরে রয়েছে পুরানো আলাভোলা মুন্নু কামার, এ কথায় ভেবলে গিয়ে ফিরে এসে ছিলিমে সে এমন জোরদার টান মেরেছিল, যেন বুকের গভীর থেকে অপছন্দের অতীত মানুষটাকে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে দেবে।

ঝোপের আড়ালে নিজের মা মরা একমাত্র মেয়ের ওপর চড়াও হতে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি মুন্নু কামার, হাতের ধারালো হাঁসুয়া চালিয়ে দিয়েছিল পঞ্চায়েত প্রধানের থার্কি লওন্ডার গলার নলি বরাবর। তারপর মাথা একটু ঠান্ডা হলে বস্তায় পুরে নহরের ধারে ফেলে এসেছিল লাশটাকে। আধমরা মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছিল আত্মীয়ের বাড়ি।

এ অব্দি সব মোটামুটি ঠিক ছিল। কিন্তু পরদিনই বোকামিটা করে বসল মুন্নু। পুলিশ এসে বস্তা খুঁজে পেল, ভেতরে অবিকল মায়ের পেটের ভেতরের বাচ্চার মতো হাঁটু মুড়ে বসে থাকা লাশ, দড়ির ফাঁস খুলতেই ঘাড়ের চামড়ার সঙ্গে অল্প লেগে থাকা কাটা গলা দুম করে পেছনদিকে হেলে গেল। আকাশমুখো হয়ে গেল প্রধানের সুপুত্তুরের কালো বাসি রক্তমাখা মুখ, চোখদুটো পুরো খোলা। এমনিতে মরা দেখলে ছোটবেলা থেকেই কামারের কাঁপন ধরে, কিন্তু খুনি তো খুনের জায়গায় যাবেই, মুন্নুও ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, লাশের চোখে চোখ ফেলতেই তার মাথা গোলমাল হয়ে গেল, দুহাতে ভিড় সরিয়ে, একে লাথি, তাকে ধাক্কা মেরে সোজা দৌড়, যেন গঙ্গার ধারের ঝোপঝাড়ের খাটাশ। বোধহয় সাঁতরে নদী পেরিয়ে ওপারের ঝোপ জঙ্গলে সটকাবার ইচ্ছে ছিল।

যতই খাটাশের মতো দৌড়াক, পুলিশের সঙ্গে পারে! তাকে ধরেবেঁধে যখন গাড়িতে ছুঁড়ে ফেলা হল, মাথা ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে, বিস্ফারিত চোখে কোনও দৃষ্টি নেই, লাশটার মতোই। পশুর মতো মার খেল, সাজা হল, তারপর জেলখানা তাকে দুনিয়াদারি শিখাল, মুন্নু কামার ক্রমে দাদা হয়ে মুন্নু মাস্টার বনে গেল।

বক্সার সেন্ট্রাল জেলকে ঘিরে গঙ্গা এইখানটায় ধারালো কাস্তের মতো বাঁক নিয়েছে। বিহারের এই জেলখানার কয়েদিদের মধ্যে যে কটি এই তল্লাটের বা আশেপাশের, তারা জানে ইংরেজ আমলের এই পুরনো বিশাল দবেজ জেলটি আলাদিনের চিচিং ফাঁকের গল্পের মতো। ঢুকতে চাও তো ঢোকো, কিন্তু বেরোবার কথা ভুলে ঢোকো, কারণ বেশিরভাগ আসামিই এখানে কম সে কম চোদ্দ বছরের খদ্দের।

শহরে তো বটেই গঙ্গার তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলোতে পড়াশুনো করে যে অল্প কজন তারা কেউ কেউ জানে এই তল্লাটে আংরেজ-লোগের সঙ্গে তুলকালাম লড়াইয়ের কথা। আর তার ফলশ্রুতি, এই জেলখানার সঙ্গে জুড়ে থাকা অদ্ভুত সব কাহিনি, তার কিছু সত্যি, কিছু বানানো। উদ্ভট যে কথাগুলো জেলখানার হাওয়া বাতাসে পাক খায় তার মধ্যে প্রধান হল সাহেব ভূতের গল্প। রাত নিশুত হলেই তার ঘোড়ার নালের খটাখট শব্দ শুনেছে এমন কয়েদিই বেশি। যারা শোনেনি তারা তা স্বীকার করতে লজ্জা পায়, যেন সাহেব ভূতের দর্শন বঞ্চিত হওয়া মানে নিজের তুচ্ছতাকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেওয়া। ঘোড়সওয়ার সাহেবের ভূত যারা স্বচক্ষে দেখেছে তারা বলে ভূতের ডানহাতে পাকানো সাদা দড়ি, সারাক্ষণ সেটা হাওয়া কেটে বনবন করে ঘোরে। একমাত্র মুন্নুই বলে, সব বাজে কথা। সারা রাত আমি হাপর টেনে দা বানাই, হাতুড়ি ঠুকি। এই বুরবক ডরপোকগুলো আমার হাতুড়ির আওয়াজকেই ঘোড়ার নালের শব্দ বলে ভুল করে। রাতে গঙ্গার দিক থেকে শনশন হাওয়া চললে গোরার চাবুকের শব্দ ভেবে আঁতকে ওঠে। বাকিটা ওদের খোয়াব।

সত্যির মধ্যে সত্যি, এই জেলেই তৈরি হয় ফাঁসি কা ফান্দা, সারা দেশে যত লোক ফাঁসির সাজা পায়, তাদের গলায় এঁটে বসার রশি সাপ্লাই হয় এখান থেকে। আর সেই রশি বানাতে মুন্নু মাস্টারের মতো এক্সপার্ট আর কোনও মাই কা লাল এই জেলে নেই। প্রথম প্রথম হাত শিরশির করত, আঙুল কাঁপত। আর মুখে থুথুর জোয়ার। ডাগদার সাহেবের কথা শুনে চিন্তাভাবনা করার পর প্রথম দুটো আর হয় না।

ফাঁসির দড়িকে হতে হয় মজবুত অথচ মোলায়েম। এই কারণে পাট বা নারকেলের ছোবড়া নয়, তুলো থেকে ওঠানো সুতোর বিনুনি গেঁথে গেঁথে, সেই বিনুনিগুলিকে আবার একসাথে পাকিয়ে তৈরি হয় এই ফাঁসি কা ফান্দা। ঝুলন্ত লোকটার দম বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু ঘাড়ে কোনও ক্ষত হবে না। মৃত্যুর পরে পোস্টমর্টেমের সময় এটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখা হবে। কর্কশ দড়ির কারণে যদি কোনও ক্ষতস্থান তৈরি হয় তাহলে বক্সার জেল কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হবে। মুন্নু মাস্টারের মতো রসসিদারদের পক্ষে সে ভীষণ লজ্জা। তবে কটাই বা ফাঁসি আজকাল হয়। আর যদিও এখন মেশিনেই বেশিরভাগ কাজটা হয়ে যায়, তবু বানিয়ে তোলার প্রথম পর্বে এখনও মানুষ লাগে। তাই হাত চালু রাখতে চার-পাঁচজন সাগরেদ নিয়ে নকল দড়ি বানানোর মকশো চলে দু-পাঁচ দিন ছাড়া ছাড়া।

প্রধান সাগরেদ সোনুয়ার হাতের থেকে মুখ চলে বেশি। আসল জিনিস চর্মচক্ষে দেখবার সৌভাগ্য হয়নি তার, তাই জিজ্ঞাসা করে,

–পঞ্জাব সে আতা হ্যায় ক্যা?
–হাঁ হাঁ পঞ্জাব সে। এই সুতো বানাবার জন্য স্পেশাল তুলোর চাষ হয় সেখানে। তবে শুধু তুলো তো নয়, গঙ্গাজির ওপর দিয়ে বহে যাওয়া মিঠা বাতাস ছাড়া এই রসসি বনবে না। হাওয়া পানির গুণেই ফান্দা খোলতাই হয়। আর কোথাও যে রসসি তৈরি হয় না, সেকি এমনি এমনি?

–ওহি তো ঠিক বাত, মাস্টারজি, শুধু ফান্দা কেন, মানুষের গা গতরও উলসে ওঠে এই জলহাওয়ায়। গোটা বক্সার জিলায় গঙ্গার ধারে ধারে যত গ্রাম, তাদের মানুষজনকে দেখবে কেমন তন্দুরস্ত! বাচ্চা থেকে বুড্ডা, বিমারি কাকে বলে কমই জানে। তবে শুনছি আজকাল…

মুন্নুও শুনেছে। গাঁয়েগঞ্জে নাকি রাজ করে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত জ্বর। সঙ্গে গা-মাথা ব্যথা। শেষকালে শ্বাসকষ্ট। ব্যস। তিন/চার দিনের মধ্যে খতম। হাসপাতালে বেড নাই, দাওয়াই নাই, মরার পরও নাকি শ্মশানে চিতা জ্বালার মতো কাঠ নাই, গোর দেওয়ার জায়গা নাই। গঙ্গার দুপারে শুধু কান্নার রোল।

জেলের ভিতরে অব্দি মুখ ঢাকার তোড়জোড় চলছে, হাত সাবুন দিয়ে রগড়ে না ধুলে এই মুন্নুই কঞ্চি চালায় সপাসপ।

তাকে যেদিন পুলিশ ধরে নিয়ে আসে সেদিনের পর থেকে মেয়েকে আর দেখেনি মুন্নু। শুনেছে আত্মীয়েরা চাঁদা তুলে দোজবরের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছে বহুদূরে পূর্ণিয়া জিলায়। শর্ত একটাই। খুনি বাপের সঙ্গে ভবিষ্যতেও কোনও সম্পর্ক থাকবে না। আজ এই মড়কের কথা শুনে অনেকদিন পর মুন্নুর মেয়ের কথা মনে পড়ল। কোথায় যেন মোচড় দিল একটু। মেয়েকে মনে পড়লে বৌ আর বাকি থাকে কেন! মুখরা আর শ্যামলা ছিল সে। রোজ ভোর ভোর বিরাট পেতলের কলস মাথায় নিয়ে নদীতে জল আনতে যেত। শত চেষ্টা করেও এতদিন পরে বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে মরে যাওয়া মেয়েছেলেটার নাক চোখ মুখ আলাদা করে কিছু মনে পড়ল না মুন্নুর।

তবে ঐ অব্দিই। গাঁজা আর দড়ির নেশায় বৌ-মেয়ের ভাবনা ধোঁয়ার মতোই উবে যায়, মুন্নু দোপহরের খাবার সময় একে চাঁটি, তাকে লাঠি মেরে নিজের জন্য বড় দেখে দুটো ডিম আলাদা করে রাখল, আর একবাটি ঘন ডাল। সাধারণ কয়েদিদের ডালে ভাতের মাড় মেশানো, আর পাঁচ মেশালি ঘ্যাঁট বরাদ্দ। এসব ভালো খাবার রাজবন্দিদের পাওনা, সেখান থেকে ঝাড়ার কায়দা মুন্নু ভালোই জানে। সবে খাওয়া শুরু হয়েছে, সোনুয়া এসে হাজির,

–মাস্টারজি নদীতে নাকি শয়ে শয়ে মুর্দা ভেসে যাচ্ছে!
–শয়ে শয়ে! শালা, ভাত কি গঁজা দিয়ে মেখে খেয়েছিস?
–না না, তুমি দ্যাখো। সেন্ট্রির কাছ থেকে শুনে সবাই বলাবলি করছে।

মুন্নুর কাছে সেন্ট্রি ফেন্ট্রি কোনও ব্যাপার না। যাওয়া যাবেখন। আগে তো সে আয়েশ করে ডিমগুলো খাবে। খাওয়া শেষ হলে মোটা মোটা আঙুল চাটে মুন্নু, এঁটো আঙুলের ইশারায় ছুটে আসে একটা বাচ্চা কয়েদি। তার পাত তুলে বাসন মেজে চকচকে করে রেখে দেয়। দিবানিদ্রা দেওয়া মুন্নুর অভ্যাস। নতুন বাচ্চাটাই তার পা টিপে দেয়, আর নতুন বলেই মুন্নুর নাক ডাকার আওয়াজে চমকে চমকে উঠতে থাকে।

ঘুম ভাঙে যখন, জেলের এধারের বড় ফলসা গাছগুলোতে পাখিরা ফড়াৎ ফড়াৎ বিষ্ঠা ত্যাগ করতে করতে লাফালাফি করছে। পাতার ওপর পশ্চিমা আলো। ঘুমভাঙা চোখেই অনেকটা দুধ চিনি দিয়ে কাঁসার বড় গ্লাসে খুব ঘন এক গ্লাস চা খাওয়া মুন্নুর বহুদিনের অভ্যাস। সেসব সারা হলে আস্তে ধীরে সে পূব দিকের টাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। নামেই টাওয়ার, কিন্তু চব্বিশ ফুটিয়া দুই দেওয়াল যেখানে মিলেছে সেই কোণটিতে দেওয়ালের গাঁথনিকে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়েই মাথা তুলেছে এই টাওয়ার। ফলে তার মাথার দিকের চার ফুট মাত্রই মূল প্রাচীরের ওপর জেগে রয়েছে। গোল গম্বুজের মতো ছোট অপ্রশস্ত ঘর, মেঝেতে দাঁড়ালে বুকের কাছ থেকে ওপরে নিচে ছোট ছোট চৌকো গর্ত। রাইফেলের নল তাক করা যায়, আবার নজরও রাখা যায়। গোটা জেলে চারপাশে চারটে মূল টাওয়ার। মাঝেও আরও অনেকগুলি। সেগুলোতে অন্য ব্যবস্থা।

সিঁড়িতে উঠতে উঠতে মুন্নু হাঁক ছাড়ে, মিশ্রাজিইই! কোন সেন্ট্রির কোথায় ডিউটি তা জানা তার বাঁয়া হাথ কা খেল। দরজা খুলে যায় শব্দ করে। ইউনিফর্ম পরা মিশ্রের শরীর দৃশ্যমান হয়, আরে মুন্নু, কা ভইল বা? মুখে জিজ্ঞাসা করলেও মিশ্র জানে মুন্নু মুর্দা দেখতে এসেছে। আসবে যে এটাও সে জানত। ওয়ার্ডেনের এই বশংবদ পোষ্যটিকে সমীহ করে সবাই। মিশ্র তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে চৌকো গর্তের কাছে তাকে চোখ রাখবার সুবিধে করে দেয়।

প্রথমে খুব ছোট লাগে সবকিছু। যেন খেলনার মতো। অন্যদিন নদীতে নৌকা যায়, সূর্য ওঠে, অস্ত যায়, জাল পড়ে ছপাছপ। স্নান সারে স্ত্রী পুরুষ, খাবার জল নিয়ে ঘরে যায়, বাচ্চারা জলে দাপাদাপি করে, এত উঁচু থেকে তাদের মনে হয় ছোট্ট ছোট্ট পুতুল। আজ চোখ সয়ে গেল যখন মুন্নু দেখল অন্যদিনের চেনা ছবি সব হাপিশ। শুনশান বয়ে যাচ্ছে গঙ্গা মাইয়া, জনমানব নেই কোনওখানে। শুধু পুতুলের মতোই কারা যেন ঢেউয়ের মাথায় মাথায় শরীর এলিয়ে ভেসে আসছে বাঁদিক থেকে। এক দো তিন চার পাঁচ… গিনতি করবার সময় নিজের অজান্তেই গলা চড়ছিল মুন্নুর, তাই পচাশ পেরিয়ে যাওয়ার পর ভাঙা গলা আর কাশির বেগ নিয়ে সে চুপ মেরে যায়। কিন্তু নজর হটে না।

এত দূর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় না, তাই সান্ত্রির বাইনোকুলারটা একরকম কেড়েই নিল মুন্নু। ঐ উবুড় হয়ে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ে যে মুর্দাটা উঠছে নাবছে, লম্বা চুল ভাসছে দেখে বোঝা যায় সেটা একটা মেয়েছেলে। নিচের দিকটা পুরো নাঙ্গা, কিন্তু পিঠে ত্যানা মতো কী একটা জড়ানো, বেলাউজ টেলাউজ হবে। পাছার ওপর বসে আছে দুটো কাক। তাকে পাশ কাটিয়ে যে চিত হওয়া লাশটা ভেসে গেল সেটার পেট ফুলে ঢোল, কিন্তু পরনের লুঙ্গি ছিঁড়ে হাঁটুর ওপরে লেগে আছে। নদীর ধারে একটা ঘূর্ণির মতো সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে গোল হয়ে ঘুরছে কতগুলো মরা, মনে হল দু তিনখান বাচ্চাও আছে। এছাড়া মূল প্রবাহের মাঝখানে ভেসে আসছে যে মুর্দাগুলো সেগুলো ঢেউয়ের মাথায় দোল খেতে খেতে চোখের নিমেষে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। হতবাক মুন্নু চোখ কচলে এইবার দেখতে পেল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে খানকতক পুলিশ। একটা পুলিশের গাড়ি। সঙ্গে নিয়েছে হয়ত ডোমেদের, কারণ কাঠকুটো জড়ো করে আগুন ধরিয়েছে লোকগুলো, আর হাঁটুজলে নেমে বাঁশ দিয়ে টেনে আনছে পাড়ে আটকে থাকা লাশ, বাঁশ দিয়েই গুঁতিয়ে গুঁজে দিচ্ছে ধোঁয়াওঠা আগুনের কুণ্ডলিতে।

মুন্নুর হাত থেকে বাইনোকুলার খসে পড়ে গেল। চুক চুক শব্দ করে সেটা তুলে নিল মিশ্র, সহানুভূতির গলায় বলল, আজ তো তাও আগুন জুটেছে, কাল তো বালির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দিচ্ছিল। দেশে গরমেন্ট নাই রে। থাকলেও সব নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। নাহলে কি আর এমনভাবে বিনা চিকিৎসায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়! এত লোক মরছে, যে সদগতি করতে না পেরে মরাগুলোকে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে, নয় তো চরায় পুঁতে দিচ্ছে!

টাওয়ারে যে মুন্নু উঠেছিল, আর যে নীচে নেমে এল, দুজনের মধ্যে যেন আকাশপাতাল তফাত। তার গুম ধরা মুখ আর লাল চোখ দেখে সোনুয়া পালিয়ে গেলেও পাগলা রতন দাঁত কেলিয়ে বলল,

–দেখা না মাস্টারজি? আপার ইউপি-সে আয়া সব মুর্দা। সিধা চলা যায়েগা কলকাত্তা। ইউপি সে আয়া মেরা দোস্ত/ দোস্ত কো সালাম করো…

অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি সহকারে গান ধরেছিল রতন, ক্রুদ্ধ বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে মুন্নু তার ওপর চড়াও হল। যথেচ্ছ কিল চড় লাথি ঘুষির পর যখন রতনের নাক দিয়ে রক্ত ছুটছে, দু বার ঝাঁকিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলে বলল,

–শালে বহেনচোদ, একহি কতল কিয়া ম্যয়নে। লাইফার বন গ্যয়া আউর জেল কি চাক্কি পিষ রহা হুঁ। আর যে হারামখোরেরা এত এত লোক মারল, লাইফার তো তারা হবে না, এত কম শাস্তিতে তাদের কী হবে! তাদের সিধে ফাঁসিতে চড়ানো উচিত। তা তাদের কবার ফাঁসি দেব রে? তু বোল শালে, কিতনা বার ফাঁসি পে চঢ়ানা চাহিয়ে?

স্বয়ং ওয়ার্ডেন তেড়ে না এলে রতন সেদিন আরও মার খেত। মরেও যেতে পারত। তারপর থেকেই কী যে হল মুন্নুর, মাতব্বরি করে না, দড়ি পাকায় না, এমনকি গাঁজাও টানে না। সকাল নেই বিকেল নেই, টাওয়ারের দরজা খটখটিয়ে ঢুকে পড়ে, বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে মুর্দা দেখে। আর মুর্দাও আসছে বটে! রোজ এবং অগুনতি। ক্রমে কাজের ব্যাঘাত ঘটা নিয়ে সেন্ট্রিদের সঙ্গে তার বচসা শুরু হয়। কিন্তু মুন্নুর গিনতি থামে না। সঙ্গে চলে অবিরাম হাহাকার আর শাপশাপান্ত। হায় রাম, ইতনা সারা! কারও তো বাপ মা বহেন বহু বাচ্চা ছিল এরা! আর এখন শুধুই কাক-শকুনে ঠোকরানো মুর্দা! দেশে কি কোনও নিয়মশৃঙ্খলা নেই! পাপীর সাজা হবে, পূণ্যবান পুরস্কার পাবে, ভগবানের ঠিক করে দেওয়া এই নিয়মই বা কোথায় গেল!

একটি মাত্র মরার খোলা চোখে চোখ রেখেই একদিন কামার মুন্নু পাগল হয়ে ছুট লাগিয়েছিল, আজ এতদিন পর এত মৃতদেহের ঢের দেখে সেই পাগলামিই যেন মুন্নু মাস্টারের মুখোশ ভেদ করে উঠে আসতে চাইছে। একটিই অবুঝ প্রশ্ন তার। সে যদি সাজা পেয়ে থাকে, তাহলে এদের খুনিরা সাজা এড়ায় কী করে! দেশের রাজা বলেই তাদের সাত খুন মাফ হতে হবে!

তার ছোটবেলার সেই মুর্দাসংক্রান্ত ভয় আবার ফিরে এল, যে জন্য মা ধরমবাবার থান থেকে তাবিজ এনে হাতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। অতি শৈশবে শ্মশানে চিতার ভেতর আধপোড়া জেঠানির শব দেখে সে ঘুমের মধ্যে ভয়ে চিৎকার করে উঠত বহুকাল। এখন শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে বসে থাকে মুন্নু, ঠান্ডা আঙুলের ডগাগুলো বাহুর ওপর তাবিজ পরার জায়গাটাকে এমনি এমনি ছুঁয়ে দেখতে থাকে। নিষিদ্ধ ভয়, অবশিষ্ট ঔচিত্যবোধ, অসহায়তা, দেশের রাজার ওপর অক্ষম ক্রোধ, আর যা নেই বলেই এতদিন মনে হয়েছিল তার, সেই বিবেকের কাঁটা হঠাৎ সুতীক্ষ্ণ হয়ে তাকে এমন খোঁচাতে লাগল, মুন্নুমাস্টার নাওয়াখাওয়া ছেড়ে ফলসাগাছের নিচে বসেই কাটিয়ে দিল কয়েক দিন। সারাক্ষণ তার মনে হতে লাগল এই মড়কে সে জেলের ভেতর দাওয়াইয়ের অভাবে মরলে ঐভাবেই ছুড়ে ফেলা হবে তার শব, নামহীন গোত্রহীন মুন্নু ভেসে যাবে অগুনতি মুর্দার সঙ্গে। আজ বাইনোকুলারে যত মরার মুখের আদল বুঝতে পেরেছে সে, প্রত্যেকের সঙ্গে নিজের আশ্চর্য মিল দেখেছে। যেন সব কটা চিৎপাত মুর্দাই মুন্নু, মুখ হাঁ করে বেমালুম ভেসে যাচ্ছে, চোখ কখনও খোলা, কখনও বোজা। একটা তুমুল ঘোর আর আচ্ছন্নতার মধ্য থেকে শত চেষ্টা করেও মুন্নু আর বেরোতে পারল না।

সেই রাতে জেলের পূব মহল্লার সমস্ত কয়েদি, গার্ড অন্ধকারে আবছা দেখতে পেল কে যেন গোটা উঠোন, ফলসাগাছের তলা, কুয়োর চারপাশে হন্যে হয়ে দৌড়চ্ছে! দীর্ঘদেহী মানুষটার গায়ে কয়েদির পোশাক, বাবরি চুল হাওয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে কিছু বলছে সে আর হাতে বন বন ঘুরছে দুদিন আগে শেষ করা, মুন্নুমাস্টারের বানানো নকল ফাঁসির ফান্দা। কাউকে বাগে পেলেই সে গাছের ডালে তাকে লটকে দেবে, এটা তার হাবেভাবে বেশ পরিষ্কার। গায়ের জোরে পাগলপনের সঙ্গে লড়া কঠিন, তাই চাচা আপনা জান বাঁচা জপতে জপতে বাদবাকিরা সবাই চুহার মতো ঢুকে গেল যে যার সেলে।

জেগে বসে সবাই যখন ভাবছে লোকটির ওপর সাহেব ভূতের ভর হয়েছে, গভীর রাতে ওয়ার্ডেন লাঠি হাতে সব খতিয়ে দেখতে এল। দেখেশুনে ক্রমে তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে সে বলল,

–এত কষ্ট করে একটা সাগরেদ বানিয়েছিলাম। কত হেল্প করত। তা এই গাঁওয়ারগুলোকে যতই পড়াও, যতই শেখাও, এ শালারা গাঁওয়ারই থেকে যাবে। … রতন, সোনুয়া, রাম, যা সবাই মিলে পাকড়ে নিয়ে আয় ওটাকে। ডরফোকটাকে এখন দড়ি দিয়ে বেঁধে মেঝেতে ফেলে রাখ। কাল সকালে পাগলা ওয়ার্ডে শেকল-বান্ধা করে রেখে আসব মুর্দাখোরকে।