Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

টিয়ার্স ইন হেভেন…

টিয়ার্স ইন হেভেন… -- অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

 

কোনও কোনও দিন এমন হয়। যা কিছু চরম প্রত্যাশিত তা হঠাৎই ঘটে গেলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। বিশ্বাস। তার পাশ দিয়ে অপেক্ষা হেঁটে যায়। আঠাশ বছরের। কান্না। স্মৃতি। ভীড় করে। অ্যালবামের মতো সেজে ওঠে দৃশ্য। তা ঠেলে ঠেলেই এগিয়ে যাওয়া। অপেক্ষা থেকে শুরুর দিকে। পুর্নজন্মের দিকে৷ নবজাগরণের দিকে!

১৩ জুলাই, ২০১৪। সকাল ১১টা। একটা চিঠি এল।  হঠাৎই। সমস্ত পরিশ্রম, যাবতীয় একাগ্রতায় হঠাৎ ছেদ৷ ফাইনালে খেলা যাবে না। চোট বাড়তে পারে। ব্যবসা। বিজনেস। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে পণ্যের দাম কমে যায়। চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার পর ছেলেটা বলেছিল, আমি খেলব। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত খেলব। চোখে জল। বাইরে তখন ফেটে পড়ছে বোমা। বাজি। মনে ক্ষোভ। তারপর দৌড়৷ বলটা উড়ে আসছে। অনেকটা চিঠির মতো। ঠিকানালেখা পাস। মাঝমাঠ থেকে। একটা আলতো তুলির মতো ফার্স্ট টাচ। বাঁ পায়ে। তারপর সামনে টেনে নেওয়া। এগিয়ে আসা গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে একটা লব। সেই মারাকানা। সেই ব্রাজিল। সেই কান্না। হাতে ছেঁড়া জালের টুকরো। ইচ টাইম হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ, দ্য প্রাইস গোজ আপ। শাপমুক্তি?

বাড়তি। অতিরিক্ত। যে শব্দে বেশি বোঝালেও মানুষ খুশি হয় না। কারণ তাতে তাচ্ছিল্য মিশে থাকে। ফয়েথ নেই। মোলিনার চোট। তাই অগত্যা সুযোগ পেয়ে যাওয়া দলে। মিডিয়ার রাগ। বিশেষজ্ঞদের মস্করা। ফ্যানদের কটূক্তি। চিন্তা। ভয়। তবুও বিশ্বাস। আ মিসটেক ক্যান এন্ড আপ বিয়িং দ্য বেস্ট ডিসিশান ইউ এভার মেড। একের পর আছড়ে পড়ছে আঘাত। নেইমার। এভার্টন। ভিনিসিয়াস। ওয়ান টাচ খেলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা প্রতিহত হচ্ছে বার বার। ঝরে পড়ছে রক্ত। ব্রাজিলের যাবতীয় আক্রমণ পৌঁছে যাচ্ছে ভুল ঠিকানায়। ভুল? বাড়তি? অতিরিক্ত? বাট সামটাইমস ইভন দ্য রং ট্রেন টেকস আস টু দ্য রাইট ডেস্টিনেশান!

উন্মত্ততা, উৎসাহের পাশেই থাকে হতাশা৷ হেঁটেচলে বেড়ায়।

সাড়া জাগিয়ে তুললেই প্রত্যাশা পূরণের অদৃশ্য চাপ এসে বসে পড়ে ঘাড়ে। তাই ব্যর্থতা। বার বার। বুয়েনস আয়ার্সের রেসিং থেকে ভ্যালেন্সিয়ার মতো বড় মঞ্চে এসেও বার বার থমকানো। চাপ। ক্লান্তি। বেরিয়ে যেতে হয় লোনে। বাট পেন, ইউ মেড মি আ, ইউ মেড মি আ বিলিভার। তাই ইতালি।  উদিনেস। হায়েস্ট চান্সেস ক্রিয়েটেড। পারফেক্ট লংবল। পজিশানিং সেন্স। আর লড়াই। কোয়ার্টার ফাইনালে ডেডলক ব্রেকিং গোল। ফাইনালে টুর্নামেন্ট জেতানো অ্যাসিস্ট। গোটা ব্রাজিল মিডফিল্ড যেন থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল এক উপেক্ষিত নায়কের প্রতি মুহূর্তে লিখে চলা মহাকাব্যিক আখ্যান। সমস্ত আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ বশ্যতা স্বীকার করে নুইয়ে পড়ছিল মাটিতে। ফিরে আসা? প্রত্যাবর্তন? যন্ত্রণা? লেট দ্য বুলেটস ফ্লাই, লেট দেম রেন। মাই লাইফ, মাই লাভ, মাই ড্রাইভ, ইট কেম ফ্রম পেন!

দীর্ঘ আট বছর। তবুও প্রথম একাদশে শিকে ছিঁড়ল না। বছর বছর লোনে এ দল-ও দল ঘুরে বেড়ানো। তারপর  ব্রাইটন। লেনো। চোট। সময় থমকাল। জীবনও। ক্রুয়েফের মতো টার্ন নিল হঠাৎই। এসে গেল সুযোগ। পারফরমেন্স। ট্রফি। এসব পেরিয়ে অ্যাস্টনভিলা। এভ্রি ডিসঅ্যাডভান্টেজ হ্যাজ ইটস ওন অ্যাডভান্টেজ। সেমিফাইনাল। সামনে কলম্বিয়া। এক্সট্রা টাইম নেই। তাই শুট আউট। চাপ। উত্তেজনা। দায়িত্ব। তিন তিনটে সেভ। এরপর ফাইনাল। গ্যাব্রিয়েল বারবোসা। দুর্দান্ত শট। শেষ মুহূর্তে। হাতে লেগে ছিটকে বেরিয়ে গেল। হু এভার গোয়িং টু কিক, ইট ওয়াজ নট গোয়িং টু গো ইন। কীভাবে ব্যাখ্যা করবে একে? আস্থা? প্র‍ত্যয়? অথচ নিয়তি জানে, ওহ হামারা ওয়াক্ত নেহি থা, ইসকা মতলব ইয়ে নেহি কে ওহ ইশক নেহি থা!

আর এই সমস্ত কিছুর পর, একটা দেশ। অভাবে, অনটনে। দুর্দশায়, দারিদ্র‍্যে জর্জরিত একটা দেশ। দুটো মানুষ। আর ফুটবল। যে সমস্ত স্বপ্ন রোজ সত্যি হয়ে যায়, তাদের তারা মারাদোনা বলে ডাকে। রূপকথার গল্প শোনালে লিওনেল মেসি বোঝে। শীতকালে কেঁপে যাওয়া একটা দেশের বুকে বহু বহু বছর পর বসন্তের স্রোত বয়ে যায়। রাতের আকাশে রোদ খেলা করে। অসম্পূর্ণ ইচ্ছেরা বেঁকতে বেঁকতে বেঁকতে জালে জড়িয়ে যায়। রোসারিওর ছোট্ট ছেলেটা বাচ্চার মতো লাফিয়ে ওঠে। হাসে। দৌড়ায়। রক্তাক্ত হয়। তারপর কেঁদে ফেলে। আবার। বিশ্বাসঘাতক। স্বার্থপর। আবেগহীন তকমারা বদলে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। ক্রুশের বাঁধন পেরিয়ে যিশুর ঘরে ফেরার সময় হয়ে আসে। পরীক্ষা শেষ হয়। দশে দশ। অঙ্ক মিলে যায়। লানুস থেকে রোজারিও ধরা পড়ে যায় এক অদৃশ্য ভালোবাসার বন্ধনে। ঝাঁকড়া চুলের মতো কেঁপে কেঁপে ওঠে বুক। ঈশ্বরের হাতের ছায়ায় ঢেকে যায় গোটা দেশ। আর আকাশের বুক চিরে বেজে ওঠে একটা গান, বিয়ন্ড দ্য ডোর, দেয়ার ইজ আ প্লেস, আই অ্যাম সিওর অ্যান্ড আই নো দেয়ার উইল বি নো মোর টিয়ার্স ইন হেভেন!

ভ্যামোস, ভ্যামোস, আর্জেন্টিনা!