Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

‘গানের স্রোতে কে ভাসালে’

‘গানের স্রোতে কে ভাসালে’ -- প্রবুদ্ধ বাগচী

প্রবুদ্ধ বাগচী

 

স্কুলে পড়ার শেষ বছরে যখন একটু একটু সাবালক হয়ে উঠছিলাম আমরা, তখন বাড়ি থেকে অনুমতি মিলেছিল বছরখানেক আগে কেনা সাইকেলটায় চেপে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ানোর। স্কুল, প্রাইভেট টিউশনির বাইরে পড়ে-পাওয়া সামান্য উদ্বৃত্ত সময়— দু চাকায় চেপে হয়তো ও-পাড়ার বন্ধুর বাড়িতে ক্ষণিকের আড্ডা, কখনও সেখান থেকে সরে গিয়ে আরেক এলাকায়। আর এই উদ্দেশ্যহীন পরিভ্রমণের সূত্রে যেসব অলিগলি— মনে পড়ে, তারই আনাচকানাচ থেকে ভেসে আসত গান। বিভিন্ন বাড়ির বাইরের ঘরে অথবা অন্য কোথাও অবস্থান করত বেশ দুটো ভারি কাঠের বাক্স, যার লৌকিক নাম বক্স। যে সময়ের কথা বলছি, তার কয়েকবছর আগে স্টিরিও মিউজিক সিস্টেম এসে গেছে কলকাতায়। একটু সঙ্গতিপূর্ণ মানুষরা তা কিনে অবগাহন করতে পারতেন সঙ্গীতে। তুলনায় যারা একটু কম পয়সার মানুষ, তাঁদের জন্য মোনো। গ্রামোফোন রেকর্ড তখন আস্তে আস্তে প্রায় অচল হয়ে আসছে, মাথা তুলছে ক্যাসেট সাম্রাজ্য। ফলে গ্রামফোন রেকর্ড শোনার জন্য যাঁরা স্টিরিও সিস্টেম কিনে ফেলেছিলেন তাঁরা কিছুটা ধন্দে।

অবশ্য এর অল্প পরেই বাজারে এসে গেল দুটো জিনিস— একটার নাম অ্যামপ্লিবক্স, যেটা ক্যাসেট প্লেয়ারের সঙ্গে বাজানো যেত, এটা স্টিরিও নয়; অন্যটা ক্যাসেট বাজানোর ব্যবস্থা সহ দুটি বক্স যার ধ্বনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকত মাঝখানে অবস্থিত ক্যাবিনেটে। স্টিরিও রেকর্ডপ্লেয়ার কোম্পানির দুই দিকপাল কোম্পানি সোনোডাইন (এটি বাঙালি কোম্পানি) এবং বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে যাওয়া ফিলিপস এই ব্যবস্থায় তখন কিছুটা কোণঠাসা। কারণ সন্তোষ কোম্পানি তখন অনেক কম দামে বাজারে এনে ফেলেছে বক্স ও ক্যাসেট প্লেয়ার। অবশ্য ফিলিপস কিছু কিছু এসে পড়েছে ক্যাসেট রেকর্ডার ও ফাঁকা ক্যাসেট তৈরির বাজারে— তবে গুণমানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার দাম অনেকটাই বেশি। কিন্তু ধ্বনি প্রক্ষেপণের শিরোপা-পাওয়া সোনোডাইন গুণের বিচারে তখনও অপ্রতিরোধ্য। এপাড়ায় ওপাড়ায় ঘোরার সূত্রে ভেসে আসে গান— ‘গহন মেঘের ছায়া ঘনায়’— মান্না দে-র ভরাট কণ্ঠের সঙ্গে যোগ্য আধার হয়ে দেখা দেয় সোনোডাইন স্টিরিও সিস্টেম। যদিও বাস বুস্টিং টেকনোলজি তখন অনেক দূরে।

সোনোডাইন স্টিরিও অ্যামপ্লিফায়ার

আমাদের প্রজন্মের পক্ষে একটা বড় প্রাপ্তির কথা আমি অনেক জায়গায় বুক বাজিয়ে বলেছি যে আমরাই হলাম সেই প্রজন্ম যারা পোস্টকার্ড ও হোয়াটসঅ্যাপ দুটোই দেখার সুযোগ পেয়েছি। দেখেছি রেলের পাতলা কাগজে ধ্যাবরা করে কার্বন পেপারে লেখা রিজার্ভেশন স্লিপ ও ই-টিকিট। দেখেছি, সারি সারি কাঠের খোপে রাখা কার্ড থেকে সই মেলানো ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থা থেকে হাল আমলের ঝকঝকে স্মার্ট ব্যাঙ্কিং। আর এই বিপুল পরিবর্তনের সমান্তরালে আরও একটা বদলে যাওয়ার আদল রয়েছে আমাদের গান শোনায়। ব্যক্তি থেকে সমষ্টির অভ্যাস বদলের এক বিরাট সঞ্চারপথ আমাদের সামনে। মধ্যবিত্ত বাঙালির বিবর্তনের ধারা নিয়ে যদি কখনও সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা হয় তাতে উঠে আসবে অনেক আশ্চর্য তথ্য।

 

২.

ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষার পর, আমাদের বাড়িতে একটি রেকর্ড-প্লেয়ার যন্ত্র আসে— এইচএমভি কোম্পানির তৈরি মডেল ফিয়েস্টা পপুলার। তার আগে আমার ও আমাদের বিনোদন ও বিশ্বজগতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল একটা ট্রানজিস্টার রেডিও, ঘটনাচক্রে সেটিরও নির্মাতা ছিল এইচএমভি। মিডিয়াম ওয়েভ ছাড়াও শর্ট ওয়েভের অনুষ্ঠান শোনার জন্য তিনটি বোতাম ছিল তাতে, ছিল একটা ফোল্ডিং অ্যান্টেনা। আমার গান শোনার কানেখড়ি ওই রেডিওতেই। মামার বাড়িতে ছিল পুরনো দিনের একটা ভাল্ভ রেডিও, সেকালের আরেক খ্যাত কোম্পানি মারফি-র তৈরি। এই ধরনের রেডিও বাড়িতে থাকলে পোস্ট অফিসে বছরে একটা লাইসেন্স ফি জমা দিতে হত তখন— টাকা জমা দিলে একটা পাশবইয়ের মতো বইয়ে পোস্ট অফিস থেকে গোল স্ট্যাম্প মেরে তা ফিরিয়ে দিত গ্রাহকের হাতে। সেই রেডিওর সুইচ অন করলে ভাল্ভ গরম হতে একটু সময় নিত, তারপর চালু হত সেই রেডিও। চমৎকার আওয়াজ। তিনতলার খোলা বারান্দায় চালিয়ে দিলে তার আওয়াজ ছড়িয়ে যেত প্রায় আবাসনের সর্বত্র। সকাল ছটায় রেডিও স্টেশন চালু হওয়া থেকে টানা আটটা অবধি চালু থাকত সেই যন্ত্র। এই সময়কালে বাজত ভক্তিগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, সঙ্গীতাঞ্জলি, সংবাদ ও কথিকা। সন্ধে সাড়ে সাতটায় রেডিওর খবর শোনা ছিল আমার দাদুর একেবারে ঘড়ি-ধরা রুটিন যার সামান্যতম নড়চড় আমার স্মৃতিতে নেই। এছাড়া শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থী আমার মাসি নিয়মিত শুনতেন সকাল সাড়ে আটটার ক্ল্যাসিকাল গান ও রাত নটায় সর্বভারতীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান।

মারফি ভাল্ভ রেডিও

কিন্তু সেই সময়ের রেডিওর প্রযুক্তি অনুযায়ী প্রতি পরিবারে একটি রেডিও থাকাটাই ছিল রীতি। ওই একটি রেডিওই প্রয়োজন মেটাত পরিবারের সকলের। হয়তো শুক্রবারের রেডিও-নাটকের বিষয়বস্তু কিঞ্চিৎ অন্যরকম যা শিশু-কিশোরদের না শোনাই বাঞ্ছনীয়, তখন তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হত বাড়ির অন্য ঘরে— বড়রা নিজেদের মতন শুনতেন নাটক। আবার উল্টোটাও হত। শিশুমহল বা গল্পদাদুর আসরের সামনে শিশুদের বসিয়ে রেখে বড়রা গুলতানি করতেন অন্য জায়গায়। আবার রেডিওর ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান কমবেশি সব বাড়িতেই বাজে। পাড়ার সারি সারি বাড়ির সারিবদ্ধ জানলা দিয়ে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের একখানা গান হু হু করে ছড়িয়ে যাচ্ছে জনপদে। হয়তো তারই ভিতর দিয়ে সাইকেলে বা হেঁটে আসছেন কেউ— দু কলি গুনগুনিয়ে উঠল তারও গলায়। শনিবার দুপুরে স্কুল ছুটির পরে পড়ুয়ারা ফিরে যাচ্ছে যে যার ঘরে, ঠিক তখনই রাস্তার পাশের বাড়ির খোলা রেডিওতে বেজে উঠল একটা চেনা ছায়াছবির গান— ‘শহরটার এই গোলকধাঁধায় আঁধার হল মন’— ‘হংসরাজ’ ছবির সেই মনকেমন করা সুর!

আসলে গান শোনা বিষয়টা তখন ছিল অনেকটাই খোলামেলা। তার একটা বড় কারণ হল, গান শোনার উৎস হিসেবে যে রেডিও যন্ত্রটাকে প্রধানত আমরা পাচ্ছি তা একটা সামাজিক মাধ্যম। সেখানে সম্প্রচার হয় সকলের জন্য। ব্যক্তিবিশেষ সেখানে থাকেন ও নিজের অভিরুচি বজায় রেখে সকলের সঙ্গে তিনি সঙ্গীত উপভোগ করেন। একান্তে নিজের মতো করে গান শোনার পরিসর তখন ছিল না। রেকর্ড প্লেয়ারের কথা আগে বলেছি, কিন্তু, সেই অর্থে সেটাও ঠিক একান্তের উপকরণ নয়। কারণ তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মাঝারি বা বড় মাপের প্রক্ষেপণ যন্ত্র, যাকে বলা হচ্ছে স্পিকার— স্পিকার শব্দকে অল্প থেকে বেশিতে বিস্তৃত করে, ছড়িয়ে দেয়। তার মধ্যবর্তিতায় একান্তে গান শোনার চেষ্টা করলেও সেখানে ঢুকে যাবে রাস্তার ফেরিওয়ালার শব্দ, সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বা রিকশার হর্ন— কিংবা বারোয়ারি কলতলার উচ্চকিত শব্দের সম্ভার। আর এগুলো যদি বা এড়িয়েও যাওয়া যায়, পাশের বাড়ির গাছ থেকে হঠাৎ একটা পাখির ডাক, টিঁক টিঁক করে এক ঝাঁক টিয়ার উড়ে যাওয়ার শব্দ বা স্তব্ধ দুপুরে ইশারাময় ঘুঘুর ডাক বা পায়রার বকবকম কিংবা কাকের বিরক্তিকর কা কা শব্দকে এড়িয়ে থাকা যাবে কী করে! এগুলোও তখন গানের নাছোড়বান্দা অনুষঙ্গ।

 

৩.

প্রচার-প্রযুক্তির নিত্য বদলের সঙ্গেও কিন্তু বদলে বদলে গেল আমাদের গান শোনার ধরন। বড় মাপের ভাল্ভ রেডিওর যুগ শেষ হতেই এসে গিয়েছিল ট্রানজিস্টার— আকারে ছোট, দামে সস্তা, ব্যবহার করা সহজ। একটা বাড়িতে বড় রেডিও থাকলেও তারই মধ্যে একজন কিনে ফেললেন একটা ট্রানজিস্টার, একান্তই তার শোনার জন্য। চেনা এক পাড়াতুতো দিদি রেডিও-র নাটক শুনতে ভালোবাসতেন বলে মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে তার বাবা তাকে একটা ট্রানজিস্টার কিনে দিয়েছিলেন। শুক্রবার সন্ধে বা রবিবার দুপুরে সেই দিদি তার জন্য বরাদ্দ একচিলতে পড়ার ঘরে রেডিও শুনত, একাই। যদিও সেই শ্রবণ একেবারেই একাকী ছিল কি না বলা কঠিন, কারণ, তার কোনও সহপাঠী বা আমাদের মতো অনুজকে সেই শ্রবণের শরিক হতে তিনি বাধা দিতেন না কোনওদিনই। আমরা ইচ্ছে করলেই তাতে ভাগ বসাতে পারতাম।

পাড়ার মোড়ে পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে ট্রানজিস্টার বাজা একসময় আমাদের চেনা ভুবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আসা-যাওয়ার পথের ধারে পান কিনে বা সিগারেট কিনে পাশে ঝোলা লম্বা দড়ির আগুনে তা ধরিয়ে নিতে নিতে কানে আসত বিবিধ ভারতী বা রেডিও সিলোন। অথবা কিশোর বা হেমন্ত বা লতা। এই শোনাটা খরিদ্দারের পক্ষে অনায়াস হলেও আসলে ওই ট্রানজিস্টার ছিল দোকানির একান্ত গান শোনার বাহক। যদিও তা পুরোপুরি ব্যক্তিগত হয়ে উঠতে পারেনি কক্ষনও। বিকিকিনির পাশাপাশি রাস্তার কোলাহল, গাড়ির শব্দ নয়তো কুকুরের ডাক এই ব্যক্তিপরিসরকে ছিন্ন করে দিয়েছে বারবার।

ট্রানজিস্টার রেডিওর পকেট-সাইজ এডিশন একসময় খুব চালু হলেও তার প্রধান উপযোগিতা ছিল ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী শোনার জন্য। রাস্তায়-ঘাটে দোকানে-ক্লাবঘরে টেলিভিশন তখন এত সুলভ নয় আর সারাক্ষণ তার সামনে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার সময়ই বা কই— তাই রাস্তায় বেরোনো ক্রীড়ামোদীরা সঙ্গে রাখতেন একটা পকেট ট্রানজিস্টার। বাসে-ট্রামে-ট্রেনে কানের কাছে সেটিকে ধরে আস্বাদন করতেন ধারাভাষ্য— মাঠের উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়ে যেত তাদের মধ্যে। পাশের উৎসুক সহযাত্রী তার মুখের দিকে তাকিয়ে ‘দাদা, কত হল?’-র পাশেপাশে বাড়তি কৌতূহলে এই প্রস্তাবও দিয়ে বসতেন, কান থেকে বাড়িয়ে যদি ওই গ্রাহক যন্ত্রটি একটু বাড়িয়ে ধরা যায় বাকিদের মধ্যেও। গান নাই হোক, ধারাভাষ্য শোনার ব্যক্তিপরিসরও এইভাবে ভেঙে যেতে দেখা গেছে সেই সময়।

গ্রামোফোন ডিস্কের বিলুপ্তির পর যখন ক্যাসেটযুগের সূচনা ও বিকাশ তখন একটা প্রবণতা এল রেডিওর বাইরে গিয়ে ক্যাসেটে গান শোনা। যদিও এই সময় সবচেয়ে যে যন্ত্রটা জনপ্রিয় হয়েছিল তার নাম টু-ইন-ওয়ান— যাতে ক্যাসেট বাজানো, রেকর্ড করা ও রেডিও শোনা তিনটে কাজই চলত। বলতে গেলে একই যন্ত্রের আধারে একাধিক উপযোগিতাকে নিয়ে আসার সেই সূত্রপাত। কিন্তু এর পরে যে যন্ত্রটি আমাদের গান শোনার অভ্যাসকে বহির্মুখ থেকে অন্তর্মুখে টেনে নিয়ে এল তার নাম ওয়াকম্যান। ওয়াকম্যান যন্ত্রের নাম ও ট্রেডমার্ক ছিল বিশ্বখ্যাত সোনি কোম্পানির, গুণমানে যা ছিল সেরা। যদিও একই জিনিস অন্যান্য কোম্পানি আলাদা আলাদা নামে বাজারে এনেছিল। কিন্তু নাম যাই হোক না কেন এই যন্ত্র ব্যক্তির গান শোনাকে গড়ে দিল একদম নতুন আদলে। হেডফোন কানে লাগানো শ্রোতা একেবারে এক নিজস্ব পরিসরে গান শোনেন, কেউ তাকে কোনও অনুরোধ করতে পারেন না, তার শ্রুতি ভাগ করে নিতে হয় না অপরের সঙ্গে— আর একেবারে কানঢাকা গানের দেওয়ালের ওপারে সামাজিক শব্দগুলিও তখন তার নাগালের বাইরে নিরালা। হেডফোন নিয়ে এল এক যুগান্তরের বার্তা।

৪.

নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকেই ক্যাসেটের প্রতিস্পর্ধী হয়ে মাথা তুলছিল কমপ্যাক্ট ডিস্ক বা সিডি, আর তার ভিত্তি ছিল রেকর্ডিং এর আনকোরা ডিজিটাল প্রযুক্তি। কটা গানের বদলে তখন বিবেচ্য হতে থাকল কত মেগাবাইট (এমবি) জায়গা আছে তাতে। এরপরে এমপি-থ্রি প্রযুক্তির (যদিও এমপি-থ্রি আদপে একটি অডিও ফাইলের ফরম্যাট বা চরিত্র) কল্যাণে ধীরে ধীরে একটা সিডিতে রেকর্ডিং করা যেতে লাগল দুশো-আড়াইশো গান— যেখানে একটি ক্যাসেটে ষোল বা কুড়িটির বেশি গান রেকর্ড করা সম্ভব ছিল না। বাজারের নিয়মে এমপি-থ্রি সিডির দামও ছিল বেশ আয়ত্তের মধ্যে। যদিও প্রথম দিকে নামী রেকর্ডিং কোম্পানি এইচএমভি (পরে সারেগামা) বা ‘হিন্দুস্থান’ নিজেরা এমপি-থ্রি ফরম্যাটের সিডি বাজারে বার করেনি। তাদের তৈরি ক্যাসেট অ্যালবাম নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি গড়ে পঞ্চাশ টাকা দামে বিক্রি হত, অডিও সিডি্র দাম মোটামুটি একশো থেকে একশো কুড়ি টাকা। একই সময়ে দুশো গানে ভরা এমপি-থ্রি সিডি তিরিশ চল্লিশ টাকাতেই বিকোত। বলা বাহুল্য এর মূলে আছে মিউজিক পাইরেসি যার সূত্রপাত ক্যাসেট যুগে। গুলশন কুমার নামক মুম্বাইয়ের এক ফুটপাথের ফল-ব্যবসায়ী এই পাইরেসির সূত্রেই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির টাইকুন হয়ে ওঠে তার টি-সিরিজের দৌলতে। টি-সিরিজ তার থাবা বসিয়েছিল বাংলার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতেও— কিশোরকুমার বা লতা মঙ্গেশকর থেকে বাংলার হেমন্ত-মান্না-সন্ধ্যার গানের ক্যাসেট একসময় তারা দশ টাকাতেও বিক্রি করেছে। তবে এই কথাটাও বলা দরকার ক্যাসেটযুগের পর পাইরেসির প্রযুক্তি আরও সহজ ও অনায়াস হয়ে গিয়েছিল সিডিযুগে। তার একমাত্র কারণ কম্পিউটারের ব্যবহার। একটি কম্পিউটারের সাহায্যে সিডিতে গান সঙ্কলন করা ও সেটাকে প্রকাশ করা একেবারেই সোজা বিষয়। আর এইরকম একটি মূল সিডি তৈরি করে তার হাজার হাজার কপি নকল প্রকাশ করার জন্য যেসব যন্ত্র লাগে তার দামও খুব বেশি ছিল এমন নয়। ফলে অল্প বিনিয়োগ করেই এই কাজ প্রায় একটা কুটিরশিল্পের পর্যায়ে এসে পড়ল। পরের দিকে, মোটামুটি এই শতাব্দীর প্রথম দশকে এই পাইরেসির সঙ্গে পাল্লা দিতে সারেগামা তাদের কিছু এমপি-থ্রি সিডি প্রকাশ করতে আরম্ভ করে যাতে ষাট/সত্তরটা গান থাকত— দাম মোটামুটি সত্তর টাকার আশেপাশে।

মোট কথা অল্প দামে প্রচুর গান এসে গেল আমাদের নাগালে। অন্যদিকে সাবেকি আকাশবাণী কলকাতার মিডিয়াম ওয়েভ সাম্রাজ্যের আরেক প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে এসে গেছে এফএম প্রচারতরঙ্গ এবং সেখানে সারাদিনই গান বাজে। শুধু গান বাজে বললে ঠিক বলা হল না সেখানে সবরকম গান বাজে। আকাশবাণীর স্টুডিওতে কেবলমাত্র গ্রামোফোন রেকর্ডে ধৃত গানই বাজানো হত, ক্যাসেটের রেকর্ডিং বাজানোর অনুমোদন ছিল না— এই বিধিনিষেধ উঠে গেল এফএম চ্যানেলের ক্ষেত্রে। ফলে ক্যাসেট বা সিডিতে ধরা সব গান মানুষ শুনতে পেলেন ওই মাধ্যমে। পরে এই এফএম চ্যানেলের পরিচালনায় এসে গেল বেসরকারি কোম্পানি, সে এক অন্য ইতিহাস।

বরং অন্য একটা তথ্য খেয়াল করে দেখা যাক। ক্যাসেটযুগ থেকে সিডিযুগে উত্তরণের যাবতীয় উৎপাদক সংস্থাগুলি তাদের মিউজিক সিস্টেমগুলি বদলে ফেলেছিল সিডি বাজানোর যন্ত্রে, যার প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। এর পরে আবার সেগুলি পাল্টে যায় ডিভিডি বাজানোর যন্ত্রে। ডিভিডির প্রযুক্তিতে একটি ডিভিডিতে অনায়াসে বারোশো থেকে দেড় হাজার গান সংগ্রহ করে রাখা যায়। যদিও ডিভিডির মূল ব্যবহার ছিল ভিডিও ফাইল বা ফিল্ম দেখার জন্য। কিন্তু গান শোনার অপশন যেহেতু বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে ব্যক্তিগত গান শোনার পরিসর ফলে বাড়িতে বড় বড় মিউজিক সিস্টেম রাখার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হতে থাকল ব্যক্তিগতভাবে গান শোনার ছোট পারসোনালাইজড যন্ত্র। এইখানে সবাইকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল ছোট এমপি-থ্রি প্লেয়ার (কিছু কিছু ক্ষেত্রে রেকর্ডিং ও রেডিও শোনার সুবিধে সমেত)— এর মেমরিতে রাখা যায় একসঙ্গে অনেক গান, প্রয়োজনে সেগুলি মুছে দিয়ে নতুন গান সঙ্কলন করে নেওয়া যায়, করা যায় ভয়েস রেকর্ডিং। এগুলির আয়তন একটি দেশলাই বাক্সের থেকেও ছোট, দাম সেই সময় তিন হাজারের আশেপাশে। ব্যক্তিগত গান শোনার আয়তনকে প্রশস্ততর করল এই যন্ত্র। ওয়াকম্যান যেখানে ক্যাসেটের ষোল বা কুড়িটি গান শোনার সুযোগ দিত, এটা তার থেকে অনেকগুণ বেশি গান শোনার খোলা মাঠ নিয়ে এল শ্রোতার সামনে। তার ওপরে ক্যাসেটের দিক বদল করার হাঙ্গামা নেই, নেই ফিতে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ওয়াকম্যানের হেডফোন বদলে গেল এমপি-থ্রি প্লেয়ারের ইয়ারফোনে, আয়তনে আরও ছোট অথচ গুণে ও সম্ভাবনায় আরও দরকারি। বিশালাকার ভাল্ভ রেডিও থেকে সাড়ে তিন মিলিমিটারের ইয়ারফোন— আমাদের গান শোনার চরিত্র বদলের এই হল দুই প্রান্তীয় মাইলস্টোন, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাকে সরিয়ে দিচ্ছে একটি উপপ্লব— যার নাম মোবাইল ফোন।

এমপি-থ্রি প্লেয়ার

 

৫.

মোবাইল বা সেলুলার ফোন যন্ত্রটির উদ্ভাবন ঘটেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিপ্রেক্ষিতে যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বেতার প্রযুক্তিতে তথ্য পরিবহন। কিন্তু প্রযুক্তি যখন যন্ত্রবাহিত হয়ে সামাজিক পরিসরে আসে তাকে শুধু প্রয়োজনটুকু বিচার করলেই চলে না, ভাবতে হয় বিপণনের নানা মাত্রা। অন্তত মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে এই বিবর্তন খুব স্পষ্ট। গোড়ার দিকে ঢাউস মোবাইল ফোনগুলি কেবল বার্তা বিনিময়ের বাহক হলেও হু হু করে তার প্রযুক্তির দিকবদল মোবাইল ফোনের সঙ্গে জুড়ে দিতে থাকে কিছু বিনোদনমূল্য। বাজারে উৎপাদকদের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা, তাই সামান্য কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধার ঘোষণা হলেই তার বাণিজ্য-সম্ভাবনা প্রবল— এই বিবেচনায় অল্পদিনের মধ্যেই বাজারে এল ফিচার ফোন। এই ফোনে নখাগ্র আকৃতির মেমরি কার্ড (মাইক্রো এসডি কার্ড) ভরে গান শোনা সম্ভব, সম্ভব ভয়েস রেকর্ডিং, ছবি তোলা বা এফএম-এর অনুষ্ঠান শোনা— সবটাই একটা যন্ত্রের মুঠোয়। যেহেতু আস্তে আস্তে সুলভ হয়ে পড়ল মোবাইল ফোন, সস্তা হয়ে গেল তাতে কথা বলার খরচ, ফলে একটা ফোন কিনলে তাতেই দিব্যি শোনা যাচ্ছে গান। আর সেটা মূলত ইয়ারফোন-বাহিত একান্ত পরিসর, কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কোনও দায় নেই।

স্মার্টফোন এসে এই ব্যবস্থাটা আরও অবাধ করে দিল শুধু ফোন ব্যবহারকারীর কাছেই নয়, গানের শ্রোতাদের কাছেও। এ এমন এক সব পেয়েছির আসর যেখানে গান-ছবি-সিনেমা-টিভি সবই পাওয়া যায় সামান্য বিনিময়মূল্যে। ফিচারফোনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মেমরি, দশ-বিশ হাজার গান অনায়াসে ধরে রাখা যায় এর স্মৃতিতে— শুধু তাই নয়, ইদানীং ইন্টারনেট পরিষেবার মাশুল কমে যাওয়ায় কল্যাণে গানের ওয়েবপোর্টাল থেকে সরাসরি পছন্দসই গান শুনে বা ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। আমাদের গান শোনার সাবেকি ধারনা তছনছ করে স্মার্টফোন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে এক আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। সম্ভবত তারই সুবাদে রাস্তায়-ঘাটে, স্টেশনে-টারমিনাসে, বাসে-ট্রামে-অটোয়-অ্যাপ ক্যাবে-অফিসে-দোকানে-সুলভ শৌচালয়ে, রাজদ্বারে-শ্মশানে হয়তো বা বেশ্যালয়েও সকলের কানে ঢুকে আছে ইয়ারফোনের প্লাগ— সকলেই গান শুনছেন। যে যার ব্যক্তি অভিরুচি অনুসারে। প্রতিটি শ্রোতাই আজ ব্যক্তিগত। বাসের এক সহযাত্রীর সঙ্গে অন্যের প্রাকার নির্মিত হয় এই গানের ভিতর দিয়ে। শহর বা শহরতলির সব গান বিপণিগুলি আজ লুপ্ত কারণ কোম্পানির দাক্ষিণ্যে আর নয়, শ্রোতারা আজ নিজেরাই বেছে নিতে পারেন তাদের নির্বাচন, নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিতে পারেন তাদের সঙ্কলন।

সেই কবেকার অনুরোধের আসরে শ্রোতার দূরান্ত থেকে আর্তি জানাতেন বেতারে কোনও এক প্রিয় শিল্পীর গান শোনানোর। শ্রোতার নাম সহ সেই গান প্রচারিত হত বেতারে। শুধু সেই শ্রোতাই নন, বঙ্গদেশের পাড়ায় পাড়ায় রাস্তায় রাস্তায় অগণিত শ্রোতা ভাগ করে নিতেন সেই শ্রবণ। হায়, সেইসব অনুরোধ-আর্তি আজ ইতিহাস! যে যার খুশিমতো গান শুনছেন যে যার নিজস্ব পরিসরে— সামাজিক এককের মতোই তারা আজ বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত। গান শোনা ব্যাপারটা কখন যে সামাজিক পরিধির মঞ্চ ছেড়ে ঢুকে পড়েছে ব্যক্তির খাঁচায় আমরা কি তার ঠিকানা রেখেছি?

বয়স বেড়েছে আমাদেরও। পাড়ায় পাড়ায় সাইকেলে ঘুরে বেড়ানোর দিন আজ অস্তমিত। সেই গান-বিধুর সকালের হাওয়া আর সন্ধের অবসর হারিয়ে গেছে ধূসর স্মৃতিপটে। তবুও কখনও স্তব্ধ বিকেলে সন্ধ্যের নিঃশব্দ পদসঞ্চারের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে আচমকা ভেসে আসে গান— সে কোন বা অলৌকিক অতীতের স্মৃতি বেয়ে, অন্য জন্মের ওপার থেকে। দূরের সে সুর এসে ধাক্কা দেয় অকস্মাৎ, দুলে ওঠে ভাসমান স্মৃতির তরণী। যদি হায়, জীবন পূরণ নাই হল তব অকৃপণ করে!