Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রিয় অধ্যাপক চমস্কি…

সমর বাগচি

 


পরিবেশবিদ এবং বিড়লা ইন্ড্রাস্টিয়াল অ্যান্ড টেকনিক্যাল মিউজিয়ামের প্রাক্তন ডিরেক্টর সমর বাগচির এই চিঠিটি অধ্যাপক নোম চমস্কিকে উদ্দেশ করে লেখা। উপলক্ষ, সিওপি ২৬ উপলক্ষে গত ৩১ অক্টোবর অধ্যাপক চমস্কির স্ট্যান কক্সকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার। মূল ইংরাজি চিঠিটি চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের জন্য অনুবাদ করে দিয়েছেন সোমরাজ ব্যানার্জি

 

 

 

 

৩১ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে স্টান কক্সকে দেওয়া আপনার অসাধারণ সাক্ষাৎকারটি সদ্য পড়া শেষ করলাম। সাক্ষাৎকারটি পড়ে বুঝতে পারলাম যে জলবায়ু বিপর্যয়ের সমস্যাটিকে পুঁজিবাদের নিরিখে দেখলে চলবে না। তাহলে এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে কীরকম সমাজ গড়ার লক্ষ্যে মানুষ তার লড়াই জারি রাখবে।

এক. প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব যে আমাদের পৃথিবী শুধুমাত্র বিশ্ব উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারাই প্রভাবিত নয়। বর্তমান সময়ে অরণ্য, জীববৈচিত্র্য, জল— সবকিছুই খুব দ্রুত হারে উধাও হয়ে যাচ্ছে; ভুমিক্ষয় ও মরুকরণ অব্যাহত; সমুদ্র, বাতাস ও জলদূষণ বেড়েই চলেছে; কোটি কোটি টন বিপজ্জনক বর্জ্য সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

দুই. আমার মনে হয়, সমস্যাটা পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ে নয়। সমাজতান্ত্রিক হোক বা পুঁজিবাদী, এই সমস্যার মূলে রয়েছে শিল্পায়ন ও ভোগবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সমাজ। মার্ক্স ও এঙ্গেলস লিখেছিলেন, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে উৎপাদক শক্তিগুলোর বৃদ্ধি অসীমে পৌঁছে যাবে। যদিও তাঁদের দুজনেরই একটা ইকোলজিকাল ভিশন ছিল, যার ব্যাপারে কোহেই সাইতো তাঁর ‘ইকোসোশ্যালিজম অফ মার্ক্স’ বইতে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু শিল্পায়ন কীভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সে ব্যাপারে অনুমান করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইউএসএসআর চেয়েছিল মাথাপিছু উৎপাদনের লড়াইতে আমেরিকাকে পরাস্ত করতে। মার্ক টোয়েন লিখেছিলেন, ‘সভ্যতা হল অপ্রয়োজনীয় প্রয়োজনের এক সীমাহীন বিস্তার।’ ১৮০০ সালে শিল্পবিপ্লব চলাকালীন সময়ে একজন আমেরিকান যখন বাজারে যেতেন, তখন ১৫০ বর্গমিটার বাজারে মাত্র ৩০০টি বিকল্পের মধ্যে তাকে তার পছন্দের জিনিস বেছে নিতে হত। ২০০০ সালে, প্রায় ১ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত শহরের অধিবাসী একজন আমেরিকান যখন বাজারে যান, তিনি ১.৫ মিলিয়ন বর্গমিটার জায়গায় ১ মিলিয়ন পণ্যের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দের জিনিসটা বেছে নিতে পারেন। ভারতের গান্ধির মতে, “ভারত যেন কখনই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমি সভ্যতার অনুকরণ না করে। একটা ছোট দ্বীপ-সাম্রাজ্য আজকে সারা বিশ্বকে তাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে। যদি ৩০০ মিলিয়ন জনসখ্যার একটি দেশ একইভাবে অর্থনৈতিক শোষণের প্রক্রিয়া শুরু করে, তাহলে তা সর্বগ্রাসী পঙ্গপালের মতো গোটা বিশ্বকে নিঃস্ব করে দেবে।” ভারত এবং চিনের একত্রিত সর্বমোট জনসখ্যা প্রায় ২.৭ বিলিয়ন। তারা যদি লুক্সেমবার্গ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বাস্তুতন্ত্রিক পদচিহ্ন রাখে, তাহলে আমাদের এই পৃথিবী কয়েক দশকের মধ্যেই সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। এই সমস্যা অনুধাবন করে গান্ধি ভারত তথা সারা বিশ্বে ভবিষ্যৎ সমাজের গঠন নিয়ে কী ভেবেছিলেন? স্বাধীনতার ঠিক ২ বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা একটি চিঠিতে গান্ধি বলেছেন, “আমি নিশ্চিত যে ভারত যদি সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করতে চায়, এবং তার মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীর মুক্তি হয়, তাহলে আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, মানুষকে গ্রামে থাকতে হবে, শহরে নয়, তাদের বাস করতে হবে কুটিরে, অট্টালিকায় নয়। কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে অট্টালিকায় বা শহরে কোনওমতেই শান্তিতে থাকতে পারে না। তাহলেই তারা ক্রমশ অসত্য ও হিংসার পথ বেছে নেবে (আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয় তাঁর কথা কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল)….. আমি মানসচক্ষে আমাদের গ্রামগুলোকে এখনকার মতো এত নোংরা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখছি না। মহিলা ও পুরুষ সবাই পৃথিবীর যে কারুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করার ক্ষমতা রাখবে।”

এই চিঠির উত্তরে ৯ই অক্টোবর নেহেরু গান্ধিকে লেখেন, “আজ থেকে ৩৮ বছর আগে ‘হিন্দু স্বরাজ’ (আধুনিক সভ্যতা বিষয়ে ১৯০৭ সালে গুজরাটি ভাষায় গান্ধির লেখা বিখ্যাত বই) লেখা হয়েছিল, কিন্তু তার পরে পৃথিবীটা অনেক বদলে গেছে এবং এই বদলটা সম্পূর্ণ ভুল দিকে হয়েছে। হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন যে, এই পৃথিবী বা তার অধিকাংশটাই আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। সভ্যতায় প্রোথিত একটা অশুভ বীজ অবধারিতভাবেই তার ডালপালা বিস্তার করে চলেছে।” পশ্চিমি উন্নয়নের যে দৃষ্টান্ত আমরা আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে গ্রহণ করেছি, তার ফলস্বরূপ: ক। সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষ ভারতে বাস করেন, খ। ৭০ মিলিয়নেরও অধিক মানুষ, মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং গ্রামবাসীরা, এই উন্নয়নের ফলে ভূমিহারা হয়েছেন। নেহেরু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “আমরা পরিবর্তনের স্রোতকে আটকাতে পারব না, আবার এই স্রোতপ্রবাহ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখাও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যারা একবার স্বর্গোদ্যানের ফল ভক্ষণ করেছেন, তারা আর ওই আদিম জীবনযাপনে ফিরে যেতে পারবেন না।” ধনী ও গরিবের মধ্যেকার এই ব্যবধান দ্রুতহারে বেড়েই চলেছে।

তাহলে বিশ্বব্যাপী আমাদের এই লড়াই কীরকম সমাজ গড়ার লক্ষ্যে চালিত হবে:

ক। একটা ন্যায়নিষ্ঠ গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ যেখানে আন্তঃপ্রজন্মের মননে সমদর্শিতা বজায় থাকবে, খ। এমন একটা সমাজ যেখানে সহজিয়া জীবন প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলবে, গ। লিঙ্গসমতা মেনে চলবে, ঘ। সমাজ হবে জৈবনির্ভর, ধাতুনির্ভর নয়, ঙ। যেকোনও রকম উন্নয়নের পরিকল্পনার সময়ে সমাজের শেষ মানুষটির কথাও ভাবা হবে, যেমনটা গান্ধি বলেছেন, চ। আত্মনির্ভর সমাজ, যেখানে বাজারের প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে যাবে, ছ। পরিকল্পনা শুরু হবে নিচু স্তর থেকে, উপর থেকে নিচে নয়।

পুঁজিবাদ ও শিল্পায়নের পথকে পরিহার করে আমরা যারা পৃথিবীকে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখার কথা চিন্তা করি, তাদের একটাই আদর্শ অবলম্বন করা উচিত, ‘সংগ্রাম ও নির্মাণ’। এ বিষয়ে নোবেলজয়ী ভারতীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা আমাদের স্মরণ করে বলতে হয়, সরলতা সভ্যতাকে সূচিত করে, বর্বরতার থেকে বেশি।

আন্তরিক শুভেচ্ছা…