Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গীর স্রষ্টা: মুজফফর আহমদ

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গীর স্রষ্টা: মুজফফর আহমদ | শিবরাম চক্রবর্তী

শিবরাম চক্রবর্তী

 

মুজফফর আহমদের জন্মশতবর্ষে নবজাতক প্রকাশন থেকে মজহারুল ইসলাম সাহেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘সঙ্গ-প্রসঙ্গ: মুজফফর আহমেদ’ বইটি। সেই বইটিরই অন্তর্গত শিবরাম চক্রবর্তীর এই রচনাটি থেকে মুজফফর আহমদের অন্য একটি দিক আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। নবজাতক প্রকাশনের বর্তমান কর্ণধার বুলবুল ইসলামের সহৃদয় অনুমতিক্রমে লেখাটি আমরা স্টিম ইঞ্জিন বিভাগে প্রকাশ করলাম। প্রসঙ্গত, বইটির নতুন সংস্করণ এই বছরই প্রকাশিত হতে চলেছে বলে বুলবুল আমাদের জানিয়েছেন।

চোরবাগানের আমার বাসা থেকে মৌচাকে আসাটা সুদূরপরাহত নয়। মার্কাস স্কোয়ারের পাশ ঘেঁষে মাঝের তরিতরকারির বাজারটা পাশিয়ে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের বড় এলাকাটার খপ্পরে গিয়ে পড়তে হয়। সেখানে খুপরিতে খুপরিতে বইয়ের দোকান। মাসিক কলরবের থেকে শুরু হয়ে, এভারেস্ট উৎরে নবজাতক প্রকাশনকে বাঁ দিকে রেখে (ওঁরা বামপন্থী বলে নয়, বাধ্য হয়েই) ডানদিকে অশোক প্রকাশন (আমার অনেকগুলি বইয়ের প্রকাশক), তাঁদের দোকানে খানিক দাঁড়িয়ে (পথের দক্ষিণে বলে নয়, দক্ষিণার পথে যৎকিঞ্চিৎ প্রাপ্তিযোগের ভরসাতেই) তার পরে এশিয়া পাবলিশিং-এ রোশনাইয়ের মায়া কাটিয়ে চলে যাই। পূব দিক দিয়ে বেরুবার পথে মদীয় নাম লাঞ্ছিত আমার ভাগনে-ভাগনির বইয়ের দোকানে একটু দর্শন দিয়ে— সেটা একটুক্ষণের হোল্ডিং স্টেশন আমার— তারপরে সোজাসুজি চলে যাই ওই মৌচাকে। মৌচাকের আড্ডাখানা— আড্ডা এবং খানায়।

সেদিন বাজারের অলিগলিপথে পেরুবার কালে এক নবজাতকের গলা কানে এল। সেখান থেকে একজনা ডাকছেন আমাকে— শিব্রামবাবু এদিক হয়ে যাবেন একটু?

গেলাম। ইসলাম সাহেব ডাকছিলেন।– আমাদের কাকাবাবুর খবর জানেন? শুধোলেন তিনি আমায়।

‘কাকাবাবু কে?’ বিস্মিত হয়ে শুধাই।
‘কমরেড মুজফফর আহমদ সাহেব। তিনি যে গুরুতর পীড়িত তা কি জানেন না?’
‘হাঁ, জেনেছি। কদিন আগে খবরের কাগজে দেখেছি যে। কী হয়েছে বলুন তো?’
‘বার্ধক্যের যে ব্যায়রাম। নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁকে।’ বললেন ইসলাম সাহেব: ‘বহুদিন তো দেখাসাক্ষাৎ হয়নি আপনাদের?’
‘তা ঠিক। ওঁর ঠিকানাও জানা ছিল না। থাকলেও যেতে পারতাম কিনা সন্দেহ। উনি আমার চেয়ে একটু বড়ই হবেন বোধ হয়। এই বয়সে ভাই, নড়াচড়ার উৎসাহ হয় না। আগে খাওয়ার লোভে আত্মীয় বন্ধুর বাড়ি হানা দিতাম। এখন রক্তের চাপটা বেড়ে উঠে সে চাপল্যেও মানা।’
‘তাই বুঝি?’
‘আর জানি তো, প্রাণের টান থাকলে ত্রিভুবনের কোথাও না কোথাও আমাদের মুলাকাত হবেই। সকলেই তো এক পথের পথিক। সেই পরলোকেই দেখা শোনার ভরসায় থাকা এখন।’
‘কোনো বন্ধুবান্ধবেরই খবর রাখতে পারেন না আর?’
‘প্রায়। জানি তো, তাঁরা সবাই এখন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন যে ঘরে বসেই যথাযময়ে তাঁদের খবর পাওয়া যায়। রোগবিয়োগ কিছু একটা ঘটলে—প’
‘যোগবিয়োগের কথা কী বলছেন?’
‘যোগবিয়োগ নয়, রোগ-বিয়োগ। রোগ হলে বা বিয়োগ ঘটলে, এই বয়সে রোগ হবার পরেই যেটা অবশ্যঘটনীয়, ঘরে বসে রেডিয়ো বা খবর কাগজ মারফত খবরটা মিলে যেত যথাসময়ে। আমার ত্রিসীমানায় অবশ্যি রেডিয়ো নেই, সঠিক বললে কোনো রেডিয়োর ত্রিসীমানাতেই আমি নেইকো— গানবাজনার জ্বালা আমার সহ্য হয় না। কর্ণপটাহ ততটা ঘাতসহ হয়নি। তবে খবরের কাগজ আমার একাধিক— ওইরকম একটা কাগজের দপ্তরেই আমার দপ্তরীর কাজ কিনা! কারো তেমন কিছু হলে সংবাদ পাবার কোনো বাধা হয় না৷’
‘কাকাবাবু ইদানিং আপনার কথা খুব বলতেন আমাদের। নার্সিং হোমে যাবার আগেও বলেছেন। দেখা করতে চেয়েছিলেন আপনার সঙ্গে। ওঁর গণবাণী সম্পাদনার সময় থেকে আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব নাকি, তিনি বলতেন।’
‘হাঁ, বন্ধুত্ব তো বটেই। সত্যি বললে আমি ওঁর বেজায় রকম গুণমুগ্ধ। ওঁর মতন এমন গদ্য আমাদের কালে লিখতে পারেনি কেউ, পারত না কেউ। সে কথা তাঁকে বলেওছিলাম— সেই সময়েই।’
‘সেই কথাই বলতেন কাকাবাবু। বলতেন আপনিই একমাত্র তাঁর লেখার প্রশংসায় মুক্তকণ্ঠ ছিলেন।…’
‘একমাত্র নই নিশ্চয়ই। যাঁরা লেখা বোঝেন তাঁরা সবাই করতেন অবশ্য। তবে আমার মতন অমন মুক্তকন্ঠ হয়ত নয়। সবাই তো আর সমান প্রগলভ হয় না। সে কথা যাক— আমিও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে উদগ্রীব— সব সময়ই তৈরি। কখন যাবো, কখন যেতে হবে বলুন? কোন নার্সিং হোম?’
‘খুঁজে-পেতে কি যেতে পারবেন আপনি? একদিন বিকেলে, এধারে এলে, আমিই নিয়ে যাব আপনাকে। আমি তো রোজই সেখানে যাই— আজ তাঁকে জানিয়ে আসব। এই চিঠিটা তিনি আপনাকে দিয়েছেন। লিখেছিলেন অবশ্য দিন কয়েক আগে, এর মধ্যে নার্সিং হোমে তাঁকে নিয়ে যেতে হয়েছে। অসুখটা হঠাৎ খারাপের দিকে গেল কিনা!’

চিঠিখানা নিলাম। বললাম, ‘এর একটা জবাব কাল আপনার হাতে দেব। তবে আমি প্রস্তুত, এর ভেতরে যেদিন  বলবেন চলে যাব আপনার সঙ্গে। এই বাজারের ওধারে ওই কোণেই তো আমার ভাগনেদের বইয়ের দোকান, সেখানে গোপালকে বললে সে সঙ্গে সঙ্গে আমায় খবরটা দেবে, আমি বাসার থেকে চলে আসব তক্ষুনি। দেখা করতে হলে তাড়াতাড়ি হওয়াটা দরকার, কেননা এই সব অবশ্যদর্শনীয় মানুষ দেখতে না দেখতে অদর্শন হন, এই জানলাম তিনি অসুস্থ, হাসপাতালে, তার পরই খবর পেলাম তিনি প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে গেছেন!’

আমার কথায় একটু হাসলেন ইসলাম সাহেব।– আপনাকে খুব শীগগিরই নিয়ে যাব তাঁর কাছে।

বাসায় ফিরে পড়লাম তাঁর চিঠিটা—

প্রিয় শিবরাম,

আপনাকে আমি ‘আপনি’ বলতাম না ‘তুমি’, তা ভুলে গেছি। আমার মনে হয় আপনিই বলতাম। কারণ তুমি বলার লোক আমার খুব বেশী নেই। আপনার ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, নবজাতক প্রকাশনের মালিক বললেন তার সঙ্গে আপনার রোজই দেখা হয়, রোজই আপনি কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে আসেন। এতে আমার ঠিকানা সমস্যাটার সমাধান হয়ে গেছে। আরো বুঝেছি যে, আপনি চলা-ফিরা করতে পারেন।

আমার বয়স আগামী ৫ই আগস্ট তারিখে ৮৪ বছর পূর্ণ হবে। আমার চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেছে, চোখে ঝাপসা দেখি, কাজে কাজেই লেখা বন্ধ। সম্প্রতি কিছুদিন থেকে লিভারের বেদনা শুরু হয়েছে। আপনাকে একবার আমার দেখার বড় ইচ্ছে করে। আসতে কি পারবেন একবার? এই পত্রে আমার ঠিকানা আছে। তা ছাড়া আসার রাস্তা ইসলাম বলে দেবেন। তিনি আপনাকে নিয়েও আসতে পারেন।

মুজফফর আহমেদ

একদা কলকাতায়, তিনটে সাপ্তাহিক প্রায় এক কালেই বেরিয়েছিল। একসঙ্গে পাশাপাশি চলেছিল বেশ কিছু দিন। মুজফফরের গণবাণী (অথবা লাঙল), নজরুলের ধূমকেতু আর আমার নবপর্যায়ের যুগান্তর।

এর ভেতরে, তাঁর ধারকবাহক সংগঠনী শক্তি বেশি ছিল বলে মুজফফরের গণবাণী চলেছে ধারাবাহিক, নজরুলের কাগজটাও বেশ কিছুকাল, আর আমার পত্রিকাটা দারুণ লেখার দরুন রাজদ্রোহের দায়ে পড়ে আমার জেলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। তার পরেও জেল থেকে বেরুবার পরও মাঝে মধ্যে কখনো কদাচ আমার খেয়ালমাফিক।

তিনটি পত্রিকা স্বতন্ত্র ধাঁচের হলেও এর মধ্যে সুরের কোথায় যেন একটা মিল ছিল কেমন।

নজরুলের ধূমকেতু ছিল নিছক বিপ্লববাদের জয়ধ্বজা, বিদ্রোহী আন্দোলনের ইন্ধন যোগানো, আর মুজফফরের পত্রিকাটা সোজাসুজি কৃষক-মজুরদের মুখপত্র, কমিউনিজমের তত্ত্ব বোঝাবার হাতিয়ার আর আমারটা যে কী না!

যুগান্তর নবপর্যায় ছিল জমিদার মহাজন গুরু পুরোহিত থেকে শুরু করে ধনিক বণিক শাসনকারী শোষণকারী সবার বিরুদ্ধে সামাজিক ব্যবস্থার সর্ববিধ অনাচার অত্যাচারের বিপক্ষে সর্বব্যাপী আগডুম-বাগডুম।

তিনটি কাগজই বিক্রি হত খুব। সে যুগের যুবকদের চিত্তহরণ করেছিল মনে হয়। তার মধ্যে নজরুলের ধূমকেতু তো যারপর নাই।

নজরুলের লেখার কী পরিচয় আর দেব? সবারই তা জানা। আর আমার লেখার ধারা কালে কালে পালটেছে, যে যুগে কী ধরনের লিখতাম তা আমি ভুলে গেছি— এখন তা সকালের আত্মশক্তি আর যুগান্তরের গর্ভেই নিহিত— সে সব কপির পাত্তা কোথায় কে জানে! কোথাও যদি থাকে তো সেই জাতীয় পাঠাগারেই হবে কিংবা পুলিশ লাইব্রেরীতে। তবে কিছুটা পরিচয় হয়ত মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী বইয়ে মিলতে পারে।

তবে মুজফফরের কথা বলতে হয়। গণবাণী-তে ওঁর গদ্যরচনায় আমি যেমন চমৎকৃত তেমনি বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। সে কথা তাঁকে তখনি আমি জানাতে দ্বিধা করিনি।

এমন আশ্চর্য গদ্য তখনকার বাংলা সাহিত্যে আর দেখা যায়নি।

তখন ছিল প্রমথ চৌধুরীর বীরবলী আমল। চলতি ভাষায় ফ্যাশান। বিজলী পত্রিকা চলতি ভাষায় শুরু হয়েছিল। সব পত্রিকার ভাষাই তখন তাই। কেবল দৈনিক সংবাদপত্রগুলি তাদের ভাষার সাধুতা বজায় রেখেছিল তখনো।

সেকালের বঙ্কিমানুসারী ভাষার অলঙ্কৃত ঝংকারের প্রেক্ষিতে প্রমথ চৌধুরীর ভাষার দৃঢ়বদ্ধ বিন্যাস সে-যুগকে যেন মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। সেই কালেই মুজফফর আমদানী করলেন তাঁর আশ্চর্য গদ্য।

সোজা সব কথার সরল ঋজু গদ্য, সহজ ভাষার ভেতর কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই, যা বলবার সোজাসুজি বলা— যা নাকি তীরবেগে গিয়ে পাঠকের মর্মমূলে বিদ্ধ হয়। লেখার মর্ম আর পাঠকের মর্ম এক হয়ে লেখকের বক্তব্য পাঠকের অন্তরে গাঁথা হয়ে যায়।

গান্ধীজীর ইয়ং ইন্ডিয়ার ইংরেজি ছিল ঠিক যে-ধারার তার সঙ্গে সমতুলনীয় ছিল মুজফফরের ঐ গদ্য।

মুজফফরের গণবাণীর লেখাগুলি গ্রন্থিবদ্ধ করে গ্রন্থবদ্ধ হয়ে সংরক্ষিত হওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যও হতে পারে।

উনি যে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিরাট এক সংগঠক বা মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিলেন সে সবের আমি বিশেষ কিছুই জানি না, এদেশে কমিউনিজমের কেবল অগ্রদূত নন, তার অগ্রগতির মূলেও তাঁর অবদান যে সবিশেষ, সে বিষয়েও আমি অজ্ঞ, রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, কিন্তু তিনি যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গীর স্রষ্টা— সেই কথাটাই আমার কাছে মুখ্য।

কমিউনিস্ট বলেই হয়তো এই আশ্চর্য সহজ ভঙ্গী তাঁর সহজাত হয়েছিল। কমিউনিজম যেমন মেদিনীর ক্যাপিটালিস্ট মেদভার লাঘব করতে উদগ্রীব— উদ্যোগী, তেমনি কমিউনিস্ট লিখিয়েদেরও ভাষাভঙ্গী ঐরকম নির্মেদ, নির্ভার। এমন পরমাশ্চর্য গদ্যশৈলী আমি সুভাষ মুখুজ্যেরও দেখেছি।

আমাদের তিনটি পত্রিকার প্রকাশ পর্বটাও ছিল যেমন এক বিশেষ কালীন। চারিধার থেকে নানারকম সম্ভাবনার আসন্নতা তখন দেখা দিয়েছে। সবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মিটেছিল। এদেশে গান্ধীজীর অহিংস অসহযোগের অভ্যুদয় উদ্দাম। ও-দেশে ঘোরতর সহিংস সংগ্রামে সারা রাশিয়াকে বে-জার করে, সেই সঙ্গে জারের বন্ধু পশ্চিম য়ুরোপীয় রাষ্ট্রদেরও বেজায় রকমের ব্যাজার করে বলশেভিকদের অভ্যুত্থান, এ দিকে ইহলোককে সশরীরে লোকোত্তরদানের সাধনায় নিমগ্ন পণ্ডিচেরীর সাধকবৃন্দ তার ওপরে কংগ্রেসের রাজনীতিমঞ্চে দেশবন্ধু, সুভাষচন্দ্র ও জহরলালের আবির্ভাব— সব মিলিয়ে এক ধুমধাড়াক্কা।

সেই কালেই পণ্ডিচেরীর নয়া ব্রাহ্মণরা পৈতে ছিঁড়ে বলশেভিকদের বাপান্ত থেকে শাপশাপান্ত করতে লেগেছিলেন। সুরেশ চক্রবর্তী, নলিনী গুপ্ত, মহেন্দ্র রায়, দিলীপকুমার এবং আরো কারো কারো জেহাদী রচনাগুলি প্রবাসী ও বিজলী পত্রিকায় ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করেছিল। তাই যথাসাধ্য তার প্রতিবাদে বাধ্য হয়ে কলম ধরতে হয়েছিল সামান্য এই আমাকেও। নবশক্তির পৃষ্ঠায় প্রকাশিত আমার সেই রচনাগুলিই পরে বই হয়ে মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী নামে বেরয়।

কমিউনিজম নিয়ে বিশেষ কিছু যে আমি জানতাম তা নয়। তখনো মার্কসবাদী বইপত্তর এদেশে চালু হয়নি। তবে বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার একটা ভাসা ভাসা আভাস বাতাসে ভাসছিল তখন। যে ভাবের বশে প্রেমেন সেকালে লিখেছিলেন, আমি কবি যত মেথরের যত ইতরের, সেই ভাবের তাড়নাতেই আমার ওই কলম ধরা।

আসলে যে করেই হোক কমিউনিজমের একটা সহবোধ চারিয়ে পড়েছিল চারধারে। সেই বোধকে সোজাসুজি নিয়ে আমার মতন কয়েকজন লাফাতে শুরু করেছিল, তাদের এবং যাঁরা সেই বোধকে অধিকন্তু বুদ্ধি দিয়ে ছেঁকে নিয়েছিলেন সেই বুদ্ধিজীবীদেরও সেই সঙ্গে ধরে বৌদ্ধ কমিউনিস্ট বলা যায় বোধ হয়। সেই কালে কমিউনিস্টদের বেদ দাস ক্যাপিটাল খুব কম ভারতীয়েরই পড়া হয়েছিল। সেদিক দিয়ে মার্কসবাদী বৈদিক কমিউনিস্ট একমাত্র ওই মুজফফর। কিন্তু তখনো তান্ত্রিক কমিউনিস্টরা দেখা দেননি এদেশে। প্রখর নখদন্ত প্রকট করে খাঁটি কমিউনিস্টতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়নি তখনো।

যাই হোক, না-বোঝা কমিউনিজমের সেই অশিক্ষিত পটুত্বের বাহাদুরি আমার মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী সেকালের যুবজনের অনেককেই জীবনের অনেককেই ভুলিয়েছিল যার ভেতরে সশস্ত্র বিপ্লবপন্থীরাও ছিলেন আমি জানি। হয়ত মুজফফর সাহেবও তাইতে ভুলে থাকবেন। কিন্তু আসলে তা ছিল আমার মস্কো নিয়ে পণ্ডিতি আর পণ্ডিচেরী নিয়ে মস্করা। তা বই কিছু নয়। ওই বইটির ভূমিকাতেও সেই কথাই আমি বলেছিলাম।


*বানান অপরিবর্তিত