Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তাজমহল– বিতর্কিত?

সৈয়দ কওসর-জামাল

 

কালের কপোলতলে এক বিন্দু নয়নের জল হয়ে যে শুভ্র সমুজ্জ্বল তাজমহল, তার গায়ে বিতর্কের কালো দাগ লাগানোর চেষ্টা আজ শুরু হয়নি, এর শুরু ১৯৬৪ সালে, যখন পি. এন. ওক নামের এক লেখক ‘তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি’ গ্রন্থে তাজমহলকে শিবমন্দির বলে দাবি করেন, যে মন্দিরের নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’। পুরুষোত্তম নাগেজ ওক শুধু একটি বই লেখেননি। তার অন্য কয়েকটি বইয়ের নাম হল The Agra Red Fort was a Hindu Palace, The Fatehpur Sikri is a Hindu City, The Lucknow Imambaras are Hindu Temples ইত্যাদি। তবে তাজমহল সম্পর্কে ‘সত্যকথন’-টি এবং ‘তাজমহল মন্দির ভবন হ্যায়’ বইদু’টি মাঝেমাঝেই হিন্দুত্ববাদীদের উত্তেজনার খোরাক জুগিয়ে চলেছে। তাজমহল নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রও একই।

ইঁট, কাঠ, পাথর দিয়ে ধর্ম চেনা যায় না, সংস্কৃতিও চেনা যায় না। কিন্তু এই সমস্ত দিয়ে যে স্থাপত্য তৈরি হয় তাকে চেনা যায়। যেকোনও চোখে তাজমহলের দিকে তাকালে এর ইসলামিক শিল্পের নিদর্শন মেলে। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যকলার চরম উৎকর্ষের নিদর্শন শাহজাহান নির্মিত এই স্মৃতিসৌধটিকে ভারতবাসী মাত্রেই বিস্ময়ের চোখে দেখে থাকেন। ইংল্যান্ডের যেমন বিগ বেন, ফ্রান্সের যেমন আইফেল টাওয়ার, তাজমহলও তেমনি ভারতীয় সংস্কৃতির গর্ব। গুটিকয় হিন্দুত্ববাদীর দাবিতে ভারতীয়দের মন থেকে এই গর্বের জায়গাটিকে চ্যুত করা সম্ভব বলে মনে করি না।

ঐতিহাসিকরা জানাচ্ছেন যে সমরখন্দে তৈমুরের যে পুরনো সমাধি, তার সঙ্গে আগ্রার তাজমহলের মিল শুধু চিন্তার দিক থেকে নয়, সৌধের বিন্যাসেও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই চিন্তা ও বিন্যাস মধ্য-এশীয়। ইসলামের প্রভাব শুধু নয়, ইসলামিক স্থাপত্যেরও স্পষ্ট ছাপ এই স্মৃতিসৌধে। তাজমহল চত্বরে একটি মসজিদও বিদ্যমান, যেখানে প্রথম থেকে নমাজ পড়া হয়ে আসছে (এবং এই কারণে শুক্রবার তাজমহল দর্শন বন্ধ রাখা হয়)। সৌধের গাত্রে কোরান থেকে উদ্ধৃতিও লক্ষণীয়।

হিন্দুত্ববাদীদের ভাবনায় মুসলিম শাসকমাত্রেই লুঠতরাজ, সাম্প্রদায়িক রাহাজানি, ধর্মান্তরকরণের প্রতীক। নিঃসন্দেহে অনেক মুসলিম শাসক নানাভাবে হিন্দুদের ওপর আঘাত করেছেন, কিন্তু সমস্ত শাসকই অত্যাচারী ও হিন্দুবিদ্বেষী এই ধারণা অমূলক। মোগল সম্রাটরা শুধু অত্যাচারই করেননি, আকবরের মতো শাসকও ছিলেন, যিনি সর্বধর্মসমন্বয়ের কথাও ভেবেছিলেন। এই তাজমহল সম্রাট শাহজাহানের নির্মাণ, শাহজাহান মোগল, সুতরাং তাঁর নির্মাণ হিন্দুবিরোধী। এই কারণে যোগী আদিত্যনাথের টুরিস্ট মানচিত্র থেকে তাজমহল বাদ দেওয়া যায়। এই কারণে একজন বিজেপি জনপ্রতিনিধি শাহজাহানকে ‘অত্যাচারী’ শাসক হিসেবে চিহ্নিত করে বলতে পারেন– ‘এইসব লোকেরা যদি ইতিহাসে স্থান পায়, তবে তা খুবই দুঃখের… আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি যে এই ইতিহাস আমরা বদলে দেব।’ পরে অবশ্য দায়সারা মন্তব্য করে আদিত্যনাথ জানান– ‘তাজমহল কে নির্মাণ করেছেন, কেন নির্মাণ করেছেন, কী উদ্দেশ্যে, তা জানার প্রয়োজন নেই… যা জরুরি তা হল ভারতের শ্রমিক ও তাদের পুত্রদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে তাজমহল তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে অবশ্য তাজমহল নির্মাণের সত্যটি উঠে এসেছে। তিনি অবশ্য পুরুষোত্তম নাগেজের মতো বলেননি যে উত্তর ভারতের সব মোগল সৌধই ছিল হিন্দুমন্দির, সৌধের গম্বুজও হিন্দুস্থাপত্যরীতি। আরও অগ্রসর হয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইন্দো-আরবিক স্থাপত্য বলে কিছু ছিল না, হিন্দুস্থাপত্যই পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিল।

ইন্দো-আরবিক বলে সত্যিই কিছু হয় না, যা আছে তা হল ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্য। আর এই ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যকেই মানতে চান না হিন্দুত্ববাদীরা। আমরাও এখন থেকে মানব না, বরং বলব এইসব স্থাপত্যমাত্রই ভারতীয় কলা ও সংস্কৃতির অঙ্গ।