Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভারতবর্ষ ও ভাবাবেগ: বঙ্কিম নজরে

দেবব্রত শ্যামরায়

 



রাজনৈতিক ভাষ্যকার

 

 

 

জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষে! আপনি কহিলেন যে, কলিযুগে ভারতবর্ষে ভাবাবেগের প্রাদুর্ভাব ঘটিবে এবং মনুষ্যকুল ভাবাবেগের বশবর্তী হইয়া নানাবিধ কুকর্ম সম্পাদন করিবেন। কেমন করিয়া এই সঙ্কটের উদ্ভব হইবে এবং ভাবাবেগ-তাড়িত মনুষ্যকুল কীরূপ দুষ্কার্য করিবেন, তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তারে বর্ণন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে নরবর! আমি সেই মন্দবুদ্ধি, সঙ্কীর্ণহৃদয় ভারতবাসীকে আখ্যাত করিব। আপনি শ্রবণ করুন। রাজন, অবগত হউন, ভাব যুক্ত আবেগ ইজ ইকুয়াল টু ভাবাবেগ, অর্থাৎ ভাবাবেগ এমন বস্তু যাহাতে যুক্তি বা কাণ্ডজ্ঞানের লেশমাত্র নাই। কলিযুগে গোটা ভারতবর্ষ ভাবাবেগে চলিবে, তথাপি তাহাতে পেট্রোল বা ডিজেলের মূল্যের কিছুমাত্র হ্রাস হইবে না। আমি সেই অতিস্পর্শকাতর, আবেগচালিত ও যুক্তিরহিত ভারতবাসীর চরিত্র কীর্তিত করিতেছি, আপনি শ্রবণ করুন। স্মরণে রাখুন, ভাবাবাগের সহিত মৌলবাদের তফাত কেবলমাত্র ডিগ্রির, ভাব ও আবেগ অধিক মাত্রায় ও অপাত্রে জমিয়াই মৌলবাদের সৃষ্টি। হে রাজন, যাহারা গেরুয়াশোভিত, তিলক-চর্চিত অথবা নম্রভূষা সামান্যবেশী, টিকিযুক্ত অথবা টিকিহীন, ফেজ পরিহিত বা টুপিবিযুক্ত, মেহেন্দিকৃত শ্মশ্রুবিশিষ্ট অথবা নিতান্তই মাকুন্দ, তাহারাই মৌলবাদী। অর্থাৎ সহিষ্ণুতা ও মৌলবাদ উভয়ই ভূষণ-নিরপেক্ষ। আপনি দেখিয়া চিনিতে পারিবেন না, কিন্তু অল্পক্ষণ বার্তালাপ করিলে নিশ্চিত হইবেন৷ যাহারা আত্মগর্বী, একদেশদর্শী, স্বার্থপরায়ণ, পরমত-অসহিষ্ণু, তাহারাই মৌলবাদী। মহারাজ! স্মরণ রাখুন, মৌলবাদী অর্থে যে সর্বদাই অশিক্ষিত, অসাম্যপীড়িত হাড়-হাভাতে প্রজাবৃন্দ হইবে, তাহা নহে। কলিযুগে এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন্ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত জন্মিবেন, যাহারা বহুভাষাবিদ হইবেন, অথচ মাতৃভাষায় বাক্যালাপে অসমর্থ হইবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু খেতাব অর্জন করিয়া অষ্ট অঙ্কের বেতন তুলিবেন, বাতানুকূল গৃহে বসবাস করিবেন ও সর্বদা চারিচক্র যানে যদৃচ্ছা ভ্রমণ করিবেন, ম্লেচ্ছদেশে অবকাশযাপনে যাইবেন, সপ্তাহান্তে নৃত্যগীতাদি সহযোগে দ্রাক্ষারস আদি পান করিবেন, প্রয়োজনে উপপত্নী বা উপপতি রাখিবেন, অথচ হেলায় অযুক্তি ও ধর্মীয় ভাবাবেগে সংক্রামিত হইবেন৷ যাহাদের দশেন্দ্রিয় অপ্রকৃতিস্থ, বৃহত্তর সমাজবিচ্ছিন্ন, অতএব অপরিশুদ্ধ, যাহাদের মস্তিষ্ক-মনন-জিহ্বা পরজাতিবিদ্বেষ-বমনে পবিত্র, তাহারাই মৌলবাদী৷

হে রাজন! কতিপয় উদাহরণ দিলেই আপনার প্রত্যয় জন্মিবে৷ কলিযুগে নুপুর শর্মা নাম্নী ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠ এক মৌলবাদী রমণী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামের উদ্গাতা হজরত মহম্মদকে গালি দিবেন, প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইসলামের অনুগামীগণ প্রতিবাদ করিবেন, যাহা ন্যায়সঙ্গত। অথচ ভাবাবেগের প্রবল তাড়নায় এই প্রতিবাদ সহসা যুক্তিবুদ্ধির মাত্রা অতিক্রম করিয়া যাইবে। বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী পথ অবরোধপূর্বক যানবাহন আক্রমণ করিবেন, গৃহস্থের ঘরবাড়ি পুড়াইবেন, নিরীহ সহনাগরিককে ক্লেশ দিবেন, এমনকি ইহাদের কয়েকজন দানবীয় ঘৃণার বশবর্তী হইয়া দুয়েকজন নুপূর-সমর্থকের কণ্ঠচ্ছেদ করিতেও কুন্ঠাবোধ করিবেন না। ইহাও মৌলবাদ৷ ইহা কুৎসিত। দণ্ডবায়সও কদর্য, কিন্তু তাহা কেবল বহিরঙ্গে। বায়স বায়সের মাংস খায় না, কিন্তু মৌলবাদ একে অপরের মাংস মল মূত্র ভক্ষণ করিয়াই বাঁচিয়া থাকে,পরিপুষ্ট হয়। ইহাই ভারতীয় উপমহাদেশের ভবিতব্য।

হে নরশ্রেষ্ঠ! শ্রবণ করুন। উপরোক্ত প্রতিবাদে অতিরেক করিয়া ইসলামের অনুগামীগণ অর্থাৎ যবনেরা তাহাদের নৈতিক জয়মাল্যটি হারাইবেন, নুপুরদেবীকে সাতিশয় ভৎসনা-পূর্বক স্বয়ং উচ্চতম ন্যায়ালয় যে নৈতিক জয় একদা সুনিশ্চিত করিয়া দিয়াছিলেন। ভাবাবেগের এই আতিশয্য গুরুতর, জেলিফিশ-আবরণীর ন্যায় স্পর্শানুভূতি প্রজা ও রাজা, দেশ ও দশ- সকলের পক্ষেই অমঙ্গলজনক। অথচ যবনেরা একবারও ভাবিয়া দেখিবেন না, ঘটনার চতুর্দশশত বৎসর পূর্বে মহম্মদ যেমত ইসলাম নামক মত ও পথের প্রবর্তন করিয়াছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি মরুদেশে প্রাদুর্ভূত সকল প্রাচীন ও ইসলাম-পূর্ব মতাবলম্বীদের ভাবাবেগে কী তীব্র আঘাত হানিয়াছিলেন।

জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষে! মূঢ়তা মার্জনা করিবেন। আমার সকলই গুলাইয়া যাইতেছে। এতদ্বধি আপনার কথায় যাহা বুঝিলাম, তাহা হইল— ইসলাম এক নবীন মত এবং তাহার নব্য অনুগামীরাই সকল নষ্টকর্মের মূলে…।

বৈশম্পায়ন ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, হে নরাধিপ! আপনি ভুল বুঝিলেন। উত্তেজনা সংবরণ করুন। বস্তূত, আপনিও কলিযুগের অর্ধশিক্ষিত সনাতনীদের ন্যায় সাধারণীকরণের ফাঁদে পড়িলেন। অবশ্যই ইসলাম এই মেদিনীর বুকে এক নবীনতম ধর্মমত এবং জন্মসময়ে তাহা অনেকানেক প্রাচীন মতের তুলনায় প্রগতিশীল থাকিবে। হজরত মহম্মদ বর্বর ও দুর্ধর্ষ তাতার জাতিকে সংগঠিত ও সভ্য করিবার উদ্দেশ্যে ইসলামের প্রবর্তন করিবেন, তৎকালে তাহা অনেকাংশে সদর্থক ও যুগপোযোগী থাকিবে, ক্ষেত্রবিশেষে বৈপ্লবিকও বটে। তথাপি কালের নিয়মে বিশ্ববীক্ষা বদলায়, মূল্যবোধ পরিমার্জিত হয়, পুরাতন নীতিশাস্ত্রের ছিদ্র ধরা পড়ে, বিচারের নব নব কষ্টিপাথরে ধর্মের অনুশাসনগুলি কিছু ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ফেল করিয়া তামাদি হইয়া পড়ে। রাজন! পুনশ্চ শ্রবণ করুন, এই একই সত্য শুধু ইসলাম কেন, প্রতিটি প্রাচীন-নবীন, ভারতবর্ষীয় বা বহির্দেশীয় ধর্মমতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ নিন্দুকেরা কহেন, প্রতিটি ধর্মমতই প্রাথমিকভাবে উদ্গাতার বা উদ্গাতাদিগের সামাজিক অবস্থানসাপেক্ষ, অতএব তাহাদের নিজ শ্রেণি, নিজ গোষ্ঠী ও লিঙ্গের স্বার্থরক্ষাকারী, সর্বজনীন নহে। ফলত কালের নিয়মে তাহাদিগের সীমাবদ্ধতা প্রকাশিত হইয়া পড়াই অনিবার্য। অতএব একাকী ইসলামকে দোষী ঠাউরাইয়া ফললাভ হইবে না। পৃথিবীতে যেকোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের একদা-উদার নীতিগুলি মানবমুক্তির মহতী লক্ষ্যে প্রচারিত হইলেও শত সহস্র বৎসর পরেও তাহার সমস্ত নির্দেশ অন্ধভাবে মানিয়া চলার অর্থ সমকাল হইতে পিছাইয়া পড়া। তখন তাহা মানবকে মুক্ত করিবার পরিবর্তে মানবকে অযথা শৃঙ্খলিত করে। রাজন! আমরা যে কলিযুগের কথা আখ্যাত করিতেছি, ভারতবর্ষে সেই যুগ এমনতর অন্ধকারে সমাসন্ন।

হে নরবর! পুনশ্চ শ্রবণ করুন, কলিযুগের ইসলামি মৌলবাদ ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশে অবশ্য থাকিবে, তথাপি তাহা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির ন্যায় ভারতবর্ষের প্রধান আসুরিক শক্তি নহে। কলিযুগে ‘হিন্দু ধর্ম’ নামক আরেক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ভারতবর্ষে সংখ্যাগুরুর আচরিত ধর্ম হইবে, আপনি তাহারও নাম আগে শোনেন নাই, তবে ইহারা অতি পুরাতন এবং আমাদিগের স্ববংশজাত। ‘হিন্দু’ নামটি ম্লেচ্ছ ফিরিঙ্গিদের প্রদত্ত, ভারতবর্ষের ভূখণ্ডে মূলত বেদভিত্তিক ধর্মমত ও অ-বৈদিক মতের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সংশ্লেষে এই আচরণপ্রণালী প্রবহমান, একক উৎস হইতে উৎসারিত নহে বলিয়াই তাহা বরাবর কিঞ্চিৎ শিথিল থাকিবে। কিন্তু কলিযুগে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদীগণ ইহার উদার শৈথিল্য বর্জন করিয়া ইহাকে সঙ্কীর্ণ ও সামরিক প্রাতিষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ করিতে চাহিবে— যাহার একমাত্রিক রূপটি হইবে ব্রাহ্মণ্যবাদ। সনাতন মৌলবাদী গোষ্ঠী ইহাকে রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকারের অস্ত্র করিবে এবং সফলও হইবে। তাহাদের ক্ষমতাদখল ও ক্ষমতা রক্ষার সহজ পন্থাই হইবে সংখ্যাগুরু প্রজার অর্থাৎ হিন্দুদিগের ভাবাবেগে বায়ু প্রদান। যবনগণকে হীন ও ঘৃণ্য প্রতিপক্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিবার মাধ্যমেই তাহা অর্জন করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে, অসাম্যপীড়িত, সমস্যাজর্জর দেশে সকল ভাবাবেগী জনসাধারণের অসহায় বোধহীনতা লইয়া রাজপুরুষগণ ধর্ম ধর্ম খেলিবেন। পাঁচশত কি সহস্র বৎসর পূর্বে ইসলামের লুণ্ঠনের সুপ্রাচীন ইতিহাস খুঁজিয়া আনিয়া বর্তমানে তাহার মীমাংসা দাবি করা হইবে। ইতিহাসের অপরাধের বিচার করিবে বর্তমানের আদালত ও তাহা করিতে গিয়া পুনরায় আরেকটি অপরাধ করিবে। যবন ধর্মস্থান হইতে প্রাচীন শিবচিহ্ন খুঁজিয়া পাইলে ধর্মস্থান ধ্বংস করিবার দাবি উঠিবে। যবন নামধারী কেহই যদি রাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করেন, তাহাকে পত্রপাঠ কারান্তরালে নিক্ষেপ করা হইবে, বিচার নামক প্রহসন চলিবে, অথবা তাহারা পথিমধ্যে নিহত হইবেন। রাজন! কতিপয় নাম স্মরণ রাখুন, ছাত্রনেতা উমর খলিদ, চিকিৎসক কাফিল খান, সাংবাদিক মহম্মদ জুবেইর ইত্যাদি৷ উমর খলিদ রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করিয়া দেশদ্রোহিতা আইনে কারাগারে পচিবেন৷ কাফিল খান চিকিৎসালয়ে নিজ উদ্যোগে শিশুদের শ্বাসবায়ু যুগাইয়া রাজপুরুষের কোপে পড়িবেন। মহম্মদ জুবেইর মুখপুস্তক প্রাকারে একটি ব্যঙ্গচিত্র টাঙাইয়া হিন্দু ভাবাবেগের শিকার হইবেন। এমত দৃষ্টান্ত অনেকানেক। সনাতনীদের পরম আরাধ্য পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র, তাই হনুমানের সহিত এই হিন্দুত্ববাদীদের বিশেষ সাদৃশ্য হইবে। পবনপুত্র বিশল্যকরণীর খোঁজে গন্ধমাদন উৎপাটিত করেছিলেন; কলিযুগের হনুমান রাজপুরুষ অবতারে বিপুল হর্ষে দেশ হইতে সকল চালু বিনিময় মুদ্রা উৎপাটন করিয়া আণুবীক্ষণিক মুষিক প্রসব করিবেন। হনুমান লেজের আগুনে স্বর্ণলঙ্কা ধ্বংস করিয়াছিলেন, কলিযুগে ভারত রাষ্ট্রের ক্রোধাগ্নিতে চৈনিক টিকটক ধ্বংস হইবে।

কলিযুগে বিশেষত হিন্দুহৃদয়সম্রাটের রাজত্বে গোমাংস সংক্রান্ত হিংসার ঘটনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাইবে। যবনের গৃহের অন্দরে জোরপূর্বক ঢুকিয়া তাহার গোমাংস ভক্ষণের প্রমাণ পাইলে তাহাকে হত্যা করা হইবে। যবন গোমাংস ভক্ষণ করিলে নাকি হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত লাগে। কলিযুগে গোমাংস ক্রয়-বিক্রয় ও ভক্ষণের অপরাধে বহু যবনকে লাঞ্ছিত, নিগৃহীত ও নিহত হইতে হইবে। এক গরিব যবন পথিপার্শ্বে পক্ষীমাংস তৈলে ভাজিয়া, পুরাতন সংবাদপত্র মুড়িয়া বিক্রয় করে, কোটাল তাহাকে এই মর্মে গ্রেফতার করিবে যে সংবাদপত্রে দেবদেবীর চিত্র মুদ্রিত থাকিতে পারে, তাহাতে মাংস বিক্রয় হিন্দু ভাবাবেগে চরম আঘাত। হে নরনাথ! বিস্মিত হইবেন না। আমি যাহাদিগের কথা বলিলাম, তাহাদিগের মনে মনে বিশ্বাস জন্মিবে যে, আমরা গোমাংস নিষিদ্ধ করিয়া অথচ গোমূত্র সেবন করিয়া, বিরুদ্ধাচারী যবনদের দেশান্তরী করিয়া, নিম্ববর্ণ ও অহিন্দুদের ব্রাহ্মণ্যবাদের পদতলে আনয়ন করিয়া ভারতবর্ষের পুনরুদ্ধার করিব। মহারাজ! বিস্মিত হইবেন না। আপনি নিশ্চয়ই ভাবিতেছেন আমাদিগের স্বাভাবিক ভক্ষ্য গোবৎস-মহিষ-ছাগ অশ্ব প্রভৃতির মাংস, কবে, কার রাজত্বকালে ভারতবর্ষে নিষিদ্ধ হইল? সেই আলোচনা বারান্তরে করা যাইবে।

জনমেজয় কহিলেন— কী ভয়ানক! হে মুনিবর! আপনি এত যে ধর্মের কথা কহিলেন, কিন্তু প্রকারান্তরে এ সকলই তো অধর্ম। ভারতবর্ষের রাজপুরুষেরা তৎকালে কোন রাজকার্য্যে ব্যস্ত থাকিবেন? তাহাদের প্রজাণুরঞ্জন, পরহিতৈষণা, রাজধর্ম পালন— এগুলির কোনও উল্লেখ দেখিলাম না। সেযুগের মহাজ্ঞানী মার্গদর্শক সর্বজ্ঞ ঋষিরাই বা কোথায়?

বৈশম্পায়ন কহিলেন— হে কুরুকুলভূষণ! আমরা যে ভারতবর্ষের কথা বর্ণন করিতেছি, তাহা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ভারতবর্ষ, উহা ‘অচ্ছে দিন’ বা সুসময় হিসাবে ভূষিত হইবে, জানিবেন তৎকালে রাজা ও ঋষির দিন গিয়াছে। সেই পৃথিবী শাসন করার কথা সাধারণ প্রজাবর্গের, সাম্য, সামাজিক ন্যায় ও মৈত্রীর ধারণার দ্বারা দেশ চালিত হওয়া কর্তব্য— দেশের আধুনিক সংবিধানে এইরূপ নানা পুণ্যশ্লোক লিখিত থাকিবে অথচ তাহা কদাচ পালিত হইবে না। রাজপুরুষেরা প্রজাদের দৈন্য দুর্দশা লাঘব করা দূরস্থান, তাহাদিগের ভাবাবেগ উসকাইয়া দিয়া বৈশ্যদের সহিত হাত মিলাইয়া তাহাদিগেরই পকেটলুণ্ঠন করিবেন। আর ঋষিদের কথা যত কম বলা যায় তত ভালো। ঋষিকুল পর্বতকন্দরে কৃচ্ছসাধন ইত্যাদি পরিত্যাগ করিয়া লাইফস্টাইল গুরু রূপে সোশাল মিডিয়ায় সর্বদা অনলাইন থাকিবেন। আরেকজন মহাঋষি সাবান, শ্যাম্পু এবং দন্তমঞ্জন প্রভৃতি বেচিবেন।

জনমেজয় কহিলেন, হে মুনিপুঙ্গব! থাক থাক, আর শুনিয়া কাজ নাই। কলিযুগের এমতি ভারতবর্ষের কথা শ্রবণ করিয়া শিহরিত হইলাম। ভারতবাসীর জয় হউক। আপনি অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করুন।