Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আমি। আলাদা।

অংশুমান দাশ

 



পরিবেশকর্মী, খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে দীর্ঘদিনের কর্মী

 

 

 

আপনি একটা আখাম্বা বাড়ি বানালেন। পাড়ায় সব থেকে উঁচু। তাতে রং করলেন নীল আর গেরুয়ার মারকাটারি কম্বিনেশন। লোকে ব্যোমকে গেল। গ্যারেজে রাখলেন একটা গাড়ি। তারপর আরও একটা। দু বছর পর পর গাড়ি বদলাচ্ছেন। আর ছ মাস পর পর ফোন। আর ক্ষণে ক্ষণে রাস্তায় যেতে যেতে ফোন বার করে দেখছেন। চলে যেতে যেতে আপনি বুঝতে পারছেন পড়শিদের চারজোড়া চোখ আপনাকে ফলো করছে— আপনার ঠোঁটে একধরনের হাসি খেলে যাচ্ছে। না না, আপনার পিছনে আমি টিকটিকি লাগাইনি। আপনার আয়নার পিছনে আমি কোনও লুকোনো ক্যামেরা ফিট করে আসিনি। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। তবে এমনটাও হতে পারে যে আপনি এরকমটা করেননি। কিন্তু এরকম ভেবেছেন— তাও-ও আমি জানি। আপনি ভেবেছেন মন্দির ঠুকে, মসজিদ বানিয়ে, যে নেই তাকে সামনে রেখে, প্রসাদ বিলি করে, হাজার লোক খাইয়ে আপনি আড়ালে থাকবেন। কিন্তু সেই ভাবনার আড়ালেও আপনি ওই পড়শির চারজোড়া চোখ খুঁজেছেন।

বেশ করেছেন। কেন করবেন না বলুন তো? আধুনিক সভ্যতা যে অকাট্য যুক্তি আমাদের ব্যবহার করতে শিখিয়েছে— ‘অন্যরাও তো করছে’— সে যুক্তি দিয়েই আপনি পার পেয়ে যাবেন, চিন্তা নেই।

যেরকম পার পেয়ে এসেছে এ পৃথিবীর হাজারো ইনফ্রাস্ট্রাকচার। বাংলায় যাকে বলে অবকাঠামো। অন্যদের থেকে আলাদা হতে চাওয়ার একটা সূক্ষ্ম রাজনীতি আছে। অবকাঠামো ওই রাজনীতির একটা বহিঃপ্রকাশ। আপনার আখাম্বা বাড়ি বানানোর মতো। গ্রামে সকলের মাটির বাড়ি— আমার দ্যাখো সিমেন্টের— তাতে গরম লাগে, তবুও হুঁ হুঁ বাবা— সিমেন্টের তো! ক সরকার চার লেন রাস্তা বানিয়েছে— ব সরকার বানাবে ছ লেন— হাততালিতে ফেটে পড়বে ইভিএম। আলাদা হতে চাওয়া যতই সূক্ষ্ম রাজনীতি হোক, তার মোক্ষ লাভ করার গোদা রাস্তা হচ্ছে অবকাঠামো। তাই গাছ কেটে রাস্তা হবে। পুকুর বুজিয়ে বাড়ি। কারণ লোকে গাছ, পুকুর দেখতে পান না— হঠাৎ করে একটা অতিপ্রাকৃতিক কিছু গজিয়ে উঠলে সেটাকেই চশমা ছাড়া দেখতে পান। অবকাঠামোর, বিশেষত বিল্ডিং— সে মানুষেরই হোক বা তথাকথিত ভগবানের, বাতানুকূল বাস স্ট্যান্ড, রেল স্টেশনের অনাবশ্যক সৌন্দর্যবর্ধন, ঘন্টায় ৪০ কিমি চলার ট্র্যাকে ৩০০ কিমি স্পিডের বুলেট ট্রেন— আসল উদ্দেশ্য স্বপৃষ্ঠকণ্ডুয়নের রাজনৈতিক সুড়সুড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়। বৃহৎ, অতিবৃহৎ অবকাঠামোয় একদল মানুষের অন্য একদলের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়াই বাড়ে। এতে ভেদাভেদ তৈরি করার রাজনীতিই উস্কানি পায়, আলাদা হতে চাওয়ার রাজনীতির গোঁড়াতেই জল ঢালা হয়। কারণ এতে বৃহত্তর স্বার্থ— অর্থাৎ নানা শ্রেণির মানুষের একসঙ্গে ভাল হওয়া, মানুষের বাইরে প্রকৃতির ক্ষতি না হওয়া— এইসব কিছু উপেক্ষা করা হয়। এই রাজনীতি আমরা সবাই মনে মনে পুষি।

আজ ১৪ জানুয়ারি। গত বারোদিনে জোশিমঠ ৫.৪ সেমি বসে গেছে। ২১৮০ মিটার উঁচু জোশিমঠ-আউলি রাস্তা থেকে এই শহর বসে যেতে আরম্ভ করেছে। সরকারি মতে ১৭০টি পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে— আসলে কত লোককে সরতে হবে বা সরতে হয়েছে, তার খবর জোশিমঠের স্বয়ং ভগবানও জানেন না। টুরিস্ট বেড়েছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে থাকার জায়গাও বেড়েছে, আবর্জনায় জলনিকাশি ব্যবস্থা বুজে গেছে, ফলে পাথরের পরস্পরের গায়ে আঁকড়ে থাকার উপায় থাকেনি আর। এই এলাকা এমনিতেই বালি ও পাথর দিয়ে গড়া। জলবায়ু বদলের জন্য বৃষ্টিপাত বেড়েছে। ভারি ভারি যন্ত্রপাতি চালিয়ে জাতীয় সড়ক চওড়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ড্যাম— ৫২০ মেগাওয়াটের তপোবন প্রজেক্ট, তার জন্য ২.৫ কিমি লম্বা ভূ-গর্ভস্থ টানেল খুঁড়তে হয়েছে। তার মধ্যেই হৈ হৈ করে এগিয়েছে চারধাম হাইওয়ে। এ অবস্থা হবে তা কি জানা ছিল না? ১৯৭৬ সালেই মিশ্র কমিটির রিপোর্টে সাবধানবাণী শোনানো হয়েছে। আর এরকম হবে তা বুঝতে কোনও বিজ্ঞানীর ফতোয়াই বা লাগবে কেন? এ তো স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে! এই বুঝতে পারা থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে রাখতে বাধ্য করেছে আলাদা হওয়ার স্পৃহা। আলাদা হব। বিশেষ ধর্মের প্রশ্রয় দিয়ে আলাদা থাকতে হবে। লাগুক না লাগুক, কুৎসিত কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়ে— আমি উন্নত, আমি উন্নয়ন এনেছি— অন্যরা পারেনি তাই আমি আলাদা, এই ঢাক বাজাতে হবে। জোশিমঠের প্রতিটি ইট, রাস্তার প্রতিটি ইঞ্চি এই অবকাঠামোর রাজনৈতিক দম্ভের প্রকাশ— সে ব্যক্তিদম্ভই হোক বা রাজদম্ভ।

শুধু জোশিমঠ কেন? আমার শান্তিনিকেতনের খোয়াই হাটের কাছে এসিওয়ালা বাড়ি আছে। আমি আলাদা। আমি পুরুলিয়ায় চাষজমি কিনে কংক্রিটের বাগানবাড়ি করেছি। আমি আলাদা। আমি তিনশো সাতাশটা প্রকল্পের শিলান্যাস করেছি— আগের সরকার দুশো আশিটা। আমি আলাদা। আমি আমি আমি। আলাদা আলাদা আলাদা।

উন্নয়ন ক্রমে এগিয়ে আসছে। জোশিমঠ তার প্রথম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য।