Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ষাঁড়

সাধন দাস

 

নিঃসীম জলা-জংলা-জঙ্গল-জমির ভিতর আমাদের বাড়ি। ছাদের আলসে পেরিয়ে যতদূর চোখ যায়, গাছপালা সবুজ অন্ধকারে ঢাকা। রহস্যময় এলাকাটা নাকি এককালে বিশ ইঞ্চির মোটা পাঁচিলে ঘেরা ছিল। ইতস্তত ছড়ানো ছিল মন্দির, কাছারি বাড়ি, বাগান বাড়ি, হাতিরড্ডিম, আইতে শাল যাইতে শাল, বাইজির নাচ, ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমির হা-হুতাশ। টুকরো টাকরা খুঁজলে নাকি এখনও পাওয়া যায়! সীমানা ছোট হতে হতে, হাল আমলে পাঁচিল আঁটা বাড়িখানার চতুর্দিকে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর মতো সদর দরোজা সারাদিন হাটখোলা থাকে। জঙ্গল বাড়ি একাকার। দুনিয়ার গরু, ছাগল, হাড়-হাভাতে কাঠকুড়ুনি, অরণ্যচারী মানুষদের হাওদাখানা। যে যখন খুশি ঢোকে, বেরোয়। কাউকে চিনি, কাউকে চিনি না। ছোটবেলায় চেনা অচেনার ভিড়ে বাড়িটা ছিল আমাদের স্বপ্নের জগৎ।

হাওদাখানার সদর দিনেরাতে একবার মাত্র বন্ধ হত, সন্ধেরাতে কনকস্যার পড়িয়ে যাওয়ার পর। পড়ানোর চেয়ে শাসনের দিকে স্যারের নজর ছিল কড়া। আমাদের শাসন করতে করতে সময়ের হিসেব ভুলে যেতেন।

মা বলতেন– কনক, রাত অনেক হয়ে গেল, একেবারে দুটো খেয়ে যেও।

স্যার খাতার উপরে ঝুঁকেই বলতেন– সুনুটা (সুনির্মল, মানে আমি) বানানে খুব দুবলা। ভাতে জল দিয়ে আসিনি বৌদি। ঘরেরগুলো ফেলা যাবে।

মা শুনতেন না। একা মানুষকে গরম গরম জিওল মাছের ঝোল-ভাত খাইয়েই ছাড়তেন। রাত আরও বেড়ে যেত। বাড়ি জুড়ে নেমে আসত নিশুত অন্ধকারের ঘনঘটা। রহস্যময় রোমাঞ্চকর জগতে ঢুকে পড়তাম আমরা। ঝিঁ ঝিঁ পোকার সাউন্ড ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড। ভূত-ভূতুম পেঁচা, গাছেদের কটকট, শেয়ালের ডাক ছিল সেই রাতগুলোর কনসার্ট। বিকট ব্যান্ডের তালে শুরু হত অশরীরীদের নাচন-কোঁদন। চলে যাওয়ার সময় স্যার সদর ভেজিয়ে যেতেন। শেষবারের মতো হুড়কো তুলে দিতে স্যারের পিছন পিছন কাউকে না কাউকে যেতেই হত। পড়ার ঘর ছিল বাড়ির সদরপ্রান্তে। সদর ছিল সমস্ত বাড়িটাকে পিছনে ফেলে অন্ধকারময় উঠোন পেরিয়ে, অনেকটা দূর। মাঝখানের পথটুকু ঝোপঝাড়ে ভর্তি নিঃসঙ্গময় আতঙ্কের পাড়ি। যেদিন আমার হুড়কো দেওয়ার পালা পড়ত, মনে হত পথ আর টুকু নেই, খানাখন্দে ভরা, লম্বায় চওড়ায় পাঁচিলের ওপার হয়ে মিশে আছে আফ্রিকা মহাদেশের গহন অরণ্যে। দোল খাওয়া শিকড়ের মতো হাত-পা-ওয়ালা ভূতের ছানাপোনারা পথের উপর, আশেপাশের জংলায় লুটোপুটি খেলছে। গেলেই আমাকে ছেঁকেবেঁকে ধরবে, নিঃশ্বাস নেওয়ার ফাঁকটুকু রাখবে না।

সেদিন প্রাণপনে পড়া মুখস্থ করতাম। আর মাকে বলে রাখতাম, মাছের ঝোল-ভাত রেডি রাখতে। স্যারের পড়ানো, ঝোল-ভাত খাওয়া যেন তাড়াতাড়ি মিটে যায়। তবু সব পড়াতেই গোলমাল করে ফেলতাম। স্যার বেত নাচিয়ে বলতেন,

–কোকোনাট বানান বলো

–সি ও সি ও এ এন ইউ টি

–হুম। বানান করো কোকো

–সি ও সি ও

–বেশ, বলো নাট

–এন ইউ টি

–হাত পাতো। কোকোনাট বানানের মধ্যে একটা সাইলেন্ট এ আছে। এর লজিক লুকিয়ে আছে উচ্চারণে। বানান মুখস্থ হয়েছে বটে, লজিক আসেনি। লজিকের দুর্বলতায় কনফিডেন্স তৈরি হয়নি। কনফিডেন্সই সাহসের আসল চাবিকাঠি। ছপাৎ ছপাৎ।

আমি ছেলেমানুষ। বড়দা, মেজদা, এমনকি ছোটকাকা যে স্যারের ছাত্র ছিল না, সেও লজিক আর কনফিডেন্সে নাজেহাল হয়ে থাকত কনকস্যারের কাছে। আমাদের কনফিডেন্স কোনওদিনই হানড্রেড পারসেন্ট ওক্কে হত না। জ্ঞান, লজিক, কনফিডেন্সের কিছুমাত্র এদিক ওদিক হলেই নাকি জীবন ডিসব্যালান্স হয়ে যাবে। দরজা বন্ধ ছিল উপলক্ষ মাত্র। সাহস শেখানোই ছিল স্যারের আসল কাজ।

আমার মনে হত, সাহস ফাহস বাজে কথা, ভয় দেখানোই ছিল স্যারের আসল উদ্দেশ্য।

ছাত্রদের মধ্যে আমিই ছিলাম ভয়ের ডিম। সাহস বেশি দরকার বুঝে আমাকেই বেশি ভয় দেখাতেন। আমাকে একা পিছনে ফেলে লম্বালম্বা পা ফেলে অন্ধকারে হাওয়া হয়ে যেতেন। ভূতেদের মতো স্যরের ছায়া পড়ত না। পাও দেখতে পেতাম না। ভূত হয়ে যাওয়া স্যারের ছানাপোনাদের হাত থেকে রেহাই পেতে তাঁরই পায়ের গতি ধরে ছুটতাম। দুর্লঙ্ঘ্য সব আপদ বিপদ কাটিয়ে দরজায় পৌঁছে হাঁপাতাম। হাত পা ভার হয়ে আসত। বুকের লবডব তিনচার গুণ বেড়ে যেত। দরজাজোড়া এমন টাইট ছিল, ভেজান খুলে ফের মুখোমুখি লাগিয়ে ভীষণ জোরে ধাক্কা দিতাম। বোমা ফাটার শব্দ হত। হবে জেনেও ভয়ে শুকিয়ে থাকতাম। কেঁপে উঠে নিশ্চিন্ত হতাম যাক, রাতের ভয়ঙ্করতম কাজটা সেরে ফেললাম!

পাড়ায় কালো রঙের একটা বিশাল ষাঁড় ঘুরে বেড়াত। ওর নাম ছিল শম্ভু। আম খেয়ে একবার আঁটি ছুঁড়ে মেরেছিলাম। পরপর অনেক ক’টা। তখন ও শুয়ে ঝিমুচ্ছিল। পাত্তা দেয়নি। আঁটির চেয়ে খুদে, পুঁচকে ডাঁশমাছি তাড়াচ্ছিল কান নেড়ে, চোখ বন্ধ করে। যেন খুব আরাম পাচ্ছে। ছোটকাকা বলেছিল, তোকে চিনে রাখল। বাগে পেলে একদিন না একদিন পেট ঠিক ফুটো করে দেবে।

সেবার ভবঘুরেরা এসে তাঁবু গাঁড়ল নদীর পাড়ে। ওদের একপাল কালোকালো কাদামাখা শুয়োর, সারাদিন পাড়া চষে বেড়ায়। দুনিয়ার ড্রেন, কচুবাগান, বোদপুকুর, রাস্তাঘাট নোংরা জঞ্জাল ছড়িয়ে তছনছ করে রাখে। কালোকালো নেংটি পরা পেটমোটা গলাসরু ওদের ছোঁড়াগুলো খুব বাক্যিঘেঁচরা। মাথায় হোগলার বিশাল ছাতা নিয়ে শুয়োর চড়ায়। বলো, বকো, ভয় দেখাও কথা কানে নেয় না।

ঘোষজেঠুদের কচুবাগানে শুয়ে ছিল শম্ভু। ওখানে ওরা গিয়েছিল পাকামি মারতে। শুয়োরগুলো কচুগাছ, পচা কাদা ছুঁড়ে ছুঁড়ে শম্ভুর গায়ে ফেলছিল আর ফূর্তিতে ঘোঁতঘোঁত সুরে গান গাইছিল। শম্ভু এমনিতে খুব ঠাণ্ডা মেজাজের। গান শুনে কী হল কে জানে! হঠাৎ খেপে উঠে তাড়া করল। বাঘতাড়ান তাড়িয়ে নিয়ে চলল দলশুদ্ধু। এঁটেপাকা শুয়োর আর পেছনপাকা ছোঁড়াগুলো ছাতামাতা ফেলে উর্দ্ধশ্বাসে ছুট। হুটরেমুটরে ছুট। উলটে পালটে পড়তে পড়তে নদীরপাড়ে গিয়ে জমল। তাতেও রেহাই মিলল না। ভবঘুরেদের তাঁবুমাবু ভেঙেচুরে অস্থির করে দিল। শম্ভুর এমন গোঁ পাড়ার কেউ কোনওদিন দেখেনি। শেষপর্যন্ত ওরা পাড়া ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যারা শম্ভুর কীর্তি দেখছিল, কপালে হাত জোড় করে বলল, জয় শম্ভু!

ছোটকার সাথে আমিও নদীর ঘাটে শম্ভুর গোঁ দেখতে গিয়েছিলাম। কী ভয়ঙ্কর! মনে পড়ে গেল শম্ভুকে আঁটি ছুঁড়ে মারার কথা। আতঙ্কে হাত পা  সেঁধিয়ে গেল পেটের মধ্যে। শম্ভুর ছিল তুরপুনের মতো হুঁচলো আর প্যাঁচালো শিং। বাগিয়ে যদি আমার দিকে ছুটতে শুরু করে? পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ছোটকা হাত চেপে ধরল। শম্ভুর দিকে ঠেলে দেওয়ার বদমায়েসি করছিল আর বলছিল– লজিক, কনফিডেন্স আর সাহসের প্রাক্টিশ করে নে, ক্যাবলা।

কেঁদে, কেঁপে, কঁকিয়ে পালাবার জন্যে আছাড়ি পিছাড়ি করছিলাম। শেষ পর্যন্ত ছুট্টে সোজা সদর দরোজায় বোমা ফাটিয়ে নিশ্চিন্ত। সেই থেকে শম্ভুকে যমের মতো ভয় করি। ত্রিসীমানায় ঘেঁষিনে। চোদ্দহাত দূর থেকে জপ করি, জয় শম্ভু।

জয়শম্ভু মনের আনন্দে আমাদের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। চোখে পড়লেই সদর দরজার মুখটুকু ছুট্টে পেরিয়ে যাই, নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে থামি,কপালে বুকে নমস্কার ঠোকাঠুকি করতে করতে বলি, জয় শম্ভু! আমার ডাকে সে একবার সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়ে গেল। আর যায় না। বসে পড়ল। চাল, কলা, ফল সিঁদুর মাখিয়ে ধামা ভর্তি সিধে দেওয়া হল। খেয়েদেয়ে গ্যাঁট হয়ে ঢেঁকুর তুলল। গেল না। বড়রা সদর দিয়ে আসা যাওয়া করছে। ডানপিটে মেজদা ভাঁটুই ফুলের ডগা দিয়ে শম্ভুর নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। কারোরই অসুবিধে নেই। আঁটি ছুঁড়ে মারার অপরাধে আমিই বেরুতে পারছিনে। আমার একটা মাত্র পেট, ছোটকাকা বলেছে, নাকি  ফুটো করার জন্যেই এসে বসে আছে।

জয়শম্ভুর গায়ে জল ঢেলে, আগুন দেখিয়ে যখন কিছুতেই কিছু হল না, কালীগাইকে বেঁধে আসা হল নদীর চরে। জঙ্গলের শেষ সীমানায়। শম্ভু নাচতে নাচতে গাইয়ের পিছন পিছন চলে গেল। কালী নাকি ক’দিন ধরে খুব শম্ভুকে ডাকছিল। সে এসেছিল কালীকে নিতে। ছোটকা বলল, এবার নাকি আমাকে নিতে আসবে।

সেই থেকে রাতে সদর দরজা বন্ধ করতে এলে, প্রথমে পাঁচিলের পাশে লুকিয়ে পড়ি। ভয়ে মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে আসে। হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছি। ভয় শুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করি। তখন প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হয় জয়শম্ভু শিং বাগিয়ে দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ভেজানো কপাট মুখোমুখি লাগিয়ে, বোমা ফাটানো শব্দে বন্ধ করার আগেই ছুটে এসে আমার পেট ফুটো করে দেবে।

পাঁচিলের এপাশ থেকে ধনুকের মতো বেঁকে দরজায় কান রেখে সাড়া নিতাম ওপাশে শম্ভু আছে কিনা? পেট ফুটো হয়ে যাওয়ার ভয়ে দম, চোখ,বন্ধ রেখে, হুড়কো তুলেই ছুট। কনকস্যার যাওয়ার পর, সেদিন তাড়াহুড়োয় টাইট কপাট মুখোমুখি লাগেনি। আঘাটায় লেগেছিল। গায়ের সবচেয়ে জোর খাটিয়েও বন্ধ হয়নি। তীব্রগতিতে দরজা রিবাউন্ড করল। ফিরতি ধাক্কায় মুখ চোখ ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। আমি ভাবলাম শম্ভু, গুঁতিয়েই অদৃশ্য হয়ে গেছে।

(২)

২০০৮ সাল। দেশে দি বিগেস্ট ক্র্যাশ ইন শেয়ার মার্কেট হল। আমার চাকরি গেল। বউ ছেলে নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব! যেন জয়শম্ভুর সামনে পড়ে গেছি। হাত পা কাঁপছে। একটা নয়, তিন তিনটে পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছে। কনকস্যারের দি বিগেস্ট পরাজয়। বয়স যত বাড়ছে, ভয় বাড়ছে। সাহস বাড়াবার কায়দাটা স্যারের ভুল ছিল, না আমার শেখায় অবহেলা ছিল, জানিনে। শেয়ার বাজারে শুয়োর ঢুকে ষাঁড়ের আস্তানা ফর্দাফাঁই। আমার তাঁবু খাটানো চাকরি তছনছ। প্রেম করে বিয়ে করার অপরাধে বাপ জ্যাঠারা বাড়ি থেকে খেদিয়েছিল। চোখের জলে ভেবেছিলাম, ভিটেতে আর কোনওদিন ফিরব না। ষাঁড়ের লড়াইয়ে উলুখাগড়ার মতো চিৎপাত। মাথা হেঁট করে সেই ফিরতেই হবে। এককাপড়ে বেরিয়ে আসার সময় একমাত্র ছোটকা কেঁদেছিল। মা’ও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে পারেনি। মেজদা মুখ টিপে হেসেছিল। জ্যাঠার দাপটে কেউ টুঁ শব্দটি করেনি। ছোটকা চুপিচুপি বলেছিল, কোম্পানির চাকরি ভরসা নেই। বিপদে পড়লে জানাস।

বিপাশাকে বললাম– আর কোথায়? গো ব্যাক টু সেই তোমার শ্বশুরবাড়ি।

সে ঘরের পৈঠেই বসেছিল। যন্ত্রণাদীর্ণ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। নির্বাক। চোখ দিয়ে যেন বলল– সেই শ্বশুরবাড়ি! লজ্জায়, ঘেন্নায়, তাড়া খেয়ে যেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলাম!

তাঁর অসহায় দৃষ্টিতে কনকস্যারের ভয় একটু একটু করে ফুটে উঠছিল।

তোতন ছেলেমানুষ। ওর খুব সাহস। বলে উঠল– শ্বশুরবাড়ি কোথায় বাবা? আমি যাব।

–তোর মা’র শ্বশুরবাড়ি, আমার বাপেরবাড়ি, আমাদের বাড়ি, যাবি?

ছেলের চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে ফুলে উঠল– আমাদের? কোথায়? কবেকার?

–সেই জয়শম্ভুর দেশে। রামায়ণ মহাভারতের দেশে।

ছোট থেকে গল্প শুনে শুনে ও কাল্পনিক জয়শম্ভুর সাথে লড়াই করে।

–সেখানে যুদ্ধ হবে? ইনকিলাব ছেঁড়াহাত।

মাটির পাহাড়ে, অনেক উঁচুতে সেই মালতিপুর স্টেশন। নীচে বটগাছটা বেশ রসেবশে সোমত্ত হয়েছে। তন্বী দেখে গেছি। নীচে চায়ের দোকানি তখন ফ্রকপরা কিশোরী ছিল। থান পরে দোকানদারি করছে। দু’একখানা গরুরগাড়ি অপেক্ষায় থাকত। মাথায় গামছা বেঁধে রহিমকাকা আমাদের ডেকে তুলতেন গাড়িতে। মায়ের সঙ্গে মামাবাড়ি থেকে ফিরতাম। ছোটকা এসে নিয়ে যেত। গরুর গাড়ির চাকা বেয়ে উঠতে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিতাম। ছইয়ের মুখে বসার জন্যে ঠেলাঠেলি। সন্ধে হয়ে এলে, গাড়ির নীচে হেরিকেনের আলো দুলতে দুলতে যেত। বড়দা মেজদা বড়দি খানাখন্দের সাথে দোল মিলিয়ে গান গাইত,

–রহিমকাকার গরুরগাড়ি / হেলতে দুলতে যাচ্ছি বাড়ি/ আরাম ভারি, তাড়াতাড়ি…

আমিও গলা মেলাতাম। মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ত ভাই। রহিমকাকা পাঁচন তুলে বলদ খেদাত– হ্যাদাআ.. হ্যাদাদা-দা-দা-দা…হুট হুট হুট…

এখন ভ্যানরিক্সার সারি। দু একটা বডি রিক্সা। তখন খদ্দের নিয়ে কামড়াকামড়ি ছিল না। প্যাডলারদের মুখ দেখছি। হায় রে! কোন অচিন দেশে এসে পড়লাম! একজনই ব্যাকুল চোখে তাকিয়েছিল। যেন ও-ই চেনা। ডেকে নিলাম। বডিরিক্সার চেয়ে শস্তা। এটাতে হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে বসা যাবে। অন্য একটা ভ্যানে মালপত্তর চাপিয়ে যাত্রা দিলাম। ভ্যান রিক্সার সুবিধে দরজা, জানলা, ছাদ নেই। আকাশ বাতাস, রাস্তা ঘাট, আস্বাদ করতে করতে যাওয়া হবে। বেশি বেলা নেই। যেটুকু দেখা যায়, সেটুকুই সুখ। তারপর রাস্তার সাথে চাকার ঝাঁকুনিতে মালতিপুরে মাটির স্বাদই আলাদা।

ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে, হৈ হৈ বৃষ্টিতে ভিজে স্কুল থেকে ফেরার এই সেই পথ। মাটির পথে গরুরগাড়ির মোলায়েম দুলুনি আর নেই। ভাঙাচোরা ইটের গর্ত, নড়বড়ে খোয়ার রাজত্ব। হয়তো কস্মিনকালে কোনও রাজপ্রতিনিধি রাস্তা বাঁধিয়েছিলেন। ভ্যানরিক্সার চাকায় মেখে উঠে আসছে। চারপাশে আবছায়া ছবি, ধুলোট গন্ধ। আচমকা হেঁচকামারা ঝাঁকুনি খেয়ে বৌ বলে উঠল– এ কী রাস্তা গো? পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যাবে যে!

বললাম– তোতনকে সামলে রেখো। সেই সকালে খাওয়া, নাড়িভুঁড়ি তো হজম হয়েই গেছে। কী আর ছিঁড়বে!

ভ্যানওয়ালা ছেলেটাকে বললাম– সামনে জগবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে দাঁড় করাও।

তোতন বললে– রসগোল্লা খাব।

ভ্যানওয়ালা বললে– আগে এসেছেন বুঝি? জগবন্ধু ভাণ্ডার তো উঠে গেছে।

–আরে বাবা, আমি এদেশেরই ছেলে। বলো তো তোমার বাবার নাম কী?

–গৌরচন্দ্র হালদার।

–অ গৌরকাকা! গৌরেবাঙাল! তা-ই বলো? গৌরকাকা ভালো আছে তো?

–তিনি নেই। তিন বছর হল স্বর্গে গেছেন। আমার নাম চানু।

–আমি জঙ্গলবাড়ির সুনির্মল…

–সুনুদা থুড়ি সেজদা। আপনাকে আগেই চিনেছি।

টুকটুক করে বাতাস বইছে। বাতাসে সেই মিষ্টি হাওয়া এখনও মিহিন হয়ে আছে। চানু ঝুঁকে ঝুঁকে রিক্সা চালাচ্ছে। যেমন গাড়ি তেমন গাড়োয়ান। ক্যাঁচক্যাঁচ, কটকট আওয়াজ তুলে রিক্সা চলতেই চাইছে না। এইখানে ছিল স্যাকরাদের ভুতুরে আম বাগান। আর নেই। তিনতলা বাড়ি উঠেছে। দু’একটা আমগাছের চিহ্ন এখনও আছে। ভুতো বোম্বাই গাছটা নেই। ইয়া পেল্লায় পাথরের মতো কালো ধুমসো সাইজের আম হত। পাকলে মধুর মতো মিষ্টি। স্কুল ফেরার পথে দল বেঁধে ঢুকতাম বাগানে। আশ্চর্য, আমি, শুধু আমিই ওই গাছটার নীচে রোজ একটা করে আম কুড়িয়ে পেতাম। আমটা যেন আমার জন্যেই পড়ে থাকত। কেউ দেখতে পেত না। আসলে গাছটা আমাকে খুব ভালোবাসত। আমার জন্যে আমটা ঝরিয়ে রাখত, পাতার আড়ালে। আমি এলেই বাতাসে পাতা উড়িয়ে বলত– ওই তো তোর আম। তোর জন্যে তুলে রেখেছি।

বন্ধুরা বলত– গাছটা তোর পয়মন্ত।

কতদিন গাছটার নীচে একা একা এসে বসেছি। গাছটাকে বলেছি– পয়মন্তদাদা, আমার বন্ধুদের জন্যে, বেশি না, একটা দুটো আম ঝরিয়ে দিও। নইলে একা একা আম পেতে খুব লজ্জা করে।

গৌরকাকা নেই। গাছটা নেই। বুকের কাছটা কেমন ভার ভার লাগছে। কষ্টের জায়গাটুকু তাড়াতাড়ি পার হওয়ার জন্যে চানুকে তাড়া দিলাম…

–গাড়িটায় একটু তেল মবিল খাওয়াতে পারো না? গাড়িটার কষ্ট হচ্ছে। পায়ে জোর দিয়ে টানো। আঁধার নামল বলে।

–হ্যাঁ দাদা, কোনও ভয় ছিল না। মেয়ে বউরা সোনাদানা গায়ে চড়িয়েই আমার গাড়িতে যেত। স্যাকরারা বড়লোক হওয়ার পর থেকে উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্যে ওরা গুণ্ডা বদমাস পুষেছে, চোর গুণ্ডাদের জ্বালায় রাতবিরেতে চলাই মুশকিল।

দেখতে দেখতে আমাদের জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। নদীপাড়ের পথ। অবেলার চরে কাদের গাই বাঁধা। এইখানে আমাদের কালীগাই বাঁধা ছিল। শম্ভু দাঁড়িয়ে পিছন শুঁকত। সেই শুয়োর তাড়ানো মাঠ। তাঁবুমাবু ফেলে এই পথে ভবঘুরেরা পালিয়েছিল। জঙ্গলের এই সব গাছে উঠে কালো কালো পেটমোটা গলাসরু ছেলেগুলো লুকিয়েছিল। শুয়োরের পাল না ষাঁড়, তখন কে কাকে তাড়া করেছে বোঝা যাচ্ছিল না। সবাই মিলে ছুটছিল। সেই পথে গ্রামে ঢুকছি। জিজ্ঞেস করলাম– জয়শম্ভু কেমন আছে?

–কোন জয়শম্ভু?

–কেন সেই যে বিশাল কালো রঙের ষাঁড়!

মায়ের দিকে ফিরে আঁচল ধরে রিক্সার মাঝখানে বসেছিল তোতন। বলল– আর লড়াই?

তোতনেরও ষাড়ের সাথে যুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেছে। ভাঙা পথের খানাখন্দে অস্থির তোতন আর তোতনের মা। এই বুঝি রিক্সা লাফিয়ে উঠল! এই বুঝি ষাঁড় কোমরে কোঁতকা কষিয়ে দিল। চানু বললে– মেজদার এটা কিন্তু খুব অন্যায় হয়েছে।

–কেন, কী করেছে?

–চারচাকা গাড়ি কিনেছে। বন্দুক কিনেছে।

–তো কী হয়েছে?

–মেজদার গাড়ি ছিল রাস্তা জুড়ে। জয়শম্ভু সে পথেই যাচ্ছিল। পথ বন্ধ। অবোধ প্রাণী। শিংয়ে বাঁধিয়ে গাড়ি ফেলে দিয়েছিল পাশের নয়ানজুলিতে। সেই অপরাধে মেজদা শম্ভুকে গুলি করে দিল!

–সে কী?

–বহুদিন অথর্ব হয়ে পড়েছিল নয়ানজুলিতেই। একদিন সকালে উঠে গ্রামের মানুষ শম্ভুকে আর দেখতে পায়নি। মরে গেছে না বেঁচে আছে কেউ জানে না। সেই থেকে মেজদার সংসারে অভিশাপ লেগেছে। সবাই বলে শম্ভুর ভূতে মেজদাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মেজদা বদমেজাজী, তাই বলে খুন করে ফেলবে?

ছোটকা বলত– জয়শম্ভু আমাদের ঐতিহ্য।

তোতন জিজ্ঞেস করল– কে বন্দুক কিনেছে?

–তোর মেজ জ্যা।

–তার মানে যুদ্ধ হবে।

দায়সারা গোছের উত্তর দিলাম– যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

দরজার সামনে মালপত্তর নামিয়ে যখন দাঁড়ালাম, সন্ধে গড়িয়ে গেছে অনেক রাতে। এ সময় কনকস্যার পড়িয়ে ফিরতেন। দরজা বন্ধ করতে আসতাম। আজ আমি একা নই, ওপারেও নই, আমরা; এপারে। তোতন জিজ্ঞেস করল– বাবা ষাঁড়টা কি দরজার ওপারে?

চানু বলেছিল– মেজদা বাড়ি থেকে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সম্পত্তি একাই ভোগদখল করছে। মেজদা বাদে সবাই বাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে বসত বানিয়েছে। সেখানেই বাস করে। আর মেজদা বিষয়সম্পত্তি বেচে শেয়ারে লাগিয়েছে। যে শেয়ারের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছি, সেই শেয়ার এখানেও! যেখেনে বাঘের ভয় সেখেনে সন্ধে হয়। মেজদার রমরমা অবস্থা। গাড়ি চড়ে বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

তোতনকে বললাম– না বাবা, ওপারে মেজ জ্যা।

মেজদা যদি বন্দুক নিয়ে তেড়ে আসে! কী করব? দরজায় ধাক্কা দেব, নাকি দেব না? থম মেরে দাঁড়িয়ে গেছি। ছোটবেলার সেই ভয় আমাকে পেয়ে বসল। দরোজার এককোণে সরে দাঁড়ালাম। তোতন দেখি দরজার মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপাশা বলল– কৈ সাড়া নাও।

আমার হাত উঠছে না। তোতনকে বললাম– দরজায় ধাক্কা দে।

কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম হুঁশ নেই। কেউ দরজা খোলেনি। খবর পেয়ে মেজদা দোতলার আলসেয় ছোটাছুটি করছে। হাতে বন্দুক। মেজদা আজকাল হিন্দীতে চিৎকার করে– কৈ ভি নেহি ঘুষেগা। ইয়ে মকান মেরা হ্যায়। স্রেফ মেরা। শ্লা, শম্ভুকো উড়া দিয়া। সবকো গুলিসে উড়া দুঙ্গা। ঘুষনে কা কোশিশ মত করো।

–বৌমাকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি!

বুড়ো খুনখুনে একটা মানুষ। সাদা চুলদাড়ির জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ছোটকা। গলার স্বর শুনে চিনতে পারলাম। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম– কেন বাড়িতে?

–মেজ কি আর মানুষ আছে? পাগল হয়ে গেছে। শেয়ারের বাজারে শিববাণী না ফিববাণী কোম্পানি উলটে উৎপাতের ধন চিৎপাতে গেছে। সর্বস্বান্ত, কিচ্ছু নেই। পাগল হয়ে গেছে।

ছোটকার পিছন পিছন চানু এসে হাজির। সেই ছোটকাকে খবর দিয়েছে। মালপত্তর আর তোতনকে ভ্যানরিক্সায় তুলে নিল। তোতন রিক্সায় থাকল না। লাফ মেরে নেমে এল। ছুটে ছোটকার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল– তুমি কি মুনি ঋষি?

বললাম– না তোতন, ছোটদাদাই।

তোতন জিজ্ঞেস করল– দাদাই দাদাই ষাঁড় কোথায়? লড়াই হবে না?

তোতন হেঁটে যাচ্ছিল। ছোটকা নিচু হয়ে তোতনকে বুকে চেপে ধরল। আমাদের বাড়ি দেখিয়ে বলল– ওইখানে থাকে।

হাঁটতে হাঁটতে আমাকে বলল– জানিস তো, মেজ গুলি করে জয়শম্ভুকে মেরে ফেলেছে। সবাই বলে শম্ভুর ভূত মেজর ঘাড়ে চেপেছে।

জঙ্গলের পথ। তোতন, ছোটকা পাশাপাশি হাঁটছে। দু’জন বালক বকবক করেই চলেছে। যেন বই পড়ছে। বিপাশা পিছনে। আরও পিছনে আমি। ফিরে ফিরে দেখছি আর হাঁটছি। সামনে পিছনে কষাড় অন্ধকার। জয়শম্ভু এখানে দাপটে রাজত্ব চালাত। হাঁটছি। দ্রুত। যেন কনকস্যার পড়িয়ে একটু আগেই চলে গেছে। ছুটছি। তবু পিছিয়ে পড়ছি। ভীষণ একা লাগছে। কনকস্যারের সুনু আমি সুনির্মল পালিত। ছুটছি। ঝিঁঝিঁপোকার  কনসার্ট বাজছে। ভূতের জঙ্গল। শম্ভুর ভূত এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে। শুনতে পেলাম, চলতে চলতে ছোটকা বিপাশাকে বলছে– ক্যাবলাটার লজিক, কনফিডেন্স, সাহস কোনওদিনই হল না।

আঁটি ছোঁড়ার অপরাধে শম্ভুর ভূত হঠাৎ লাফিয়ে পড়ল আমার ঘাড়ে। মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।