Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পশ্চিমবঙ্গে রামনবমী: হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের জমি তৈরির প্রয়াস

প্রবীর মুখোপাধ্যায়

 



প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

 

সাম্প্রদায়িক বিভেদ, তা সে ধর্মভিত্তিক হোক বা ভাষাভিত্তিক হোক অথবা জাতিভিত্তিক হোক, প্রধানত প্রভাবিত করে তাদের যারা নিজেদের কায়িক ও মানসিক শ্রম বিক্রয় করে জীবিকা অর্জন করে। এদের মধ্যে বিভেদ বাঁচিয়ে রাখতে পারলে উপযুক্ত বেতনের দাবি, কর্মসংস্থানের দাবি, সামাজিক সুরক্ষার দাবি এমনকী মানবাধিকারের দাবিগুলি দাবিয়ে রাখতে সুবিধা হয়। দাঙ্গা কখনও আপনা থেকে হয় না, দাঙ্গা লাগানো হয়— পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেকথাই প্রমাণ করছে

 

বহু ধর্ম, বহু উপাসক সম্প্রদায় নিয়ে ভারতের এই সমাজ গঠিত। এদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ-সংঘর্ষ অতীতেও ছিল আর এখনও ঘটে চলেছে। নরসংহার আর দাঙ্গার পৈশাচিক ঘটনা স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার ঘটেছে— যেমন ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী নরসংহার অথবা ২০০২-এর গুজরাটের মুসলিম নিধনযজ্ঞ। কিন্তু আজকের দিনে যে কোনও উপাসক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শোভাযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, দাঙ্গা, হিংসা, লুঠতরাজ, সম্পত্তিহানি আর শোকাবহ মৃত্যু যেন একসূত্রে গ্রথিত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিককালে এইসব ঘটনা এত নিয়মিত ঘটে চলেছে মে এগুলিকে নিত্তনৈমিত্তিক বলেই অভিহিত করা যায়।

আজকের দিনে প্রায় সব ধর্মীয় শোভাযাত্রার সঙ্গেই হিংসাত্মক ঘটনা কেন জড়িয়ে যাচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে একটা সাধারণ সত্য সামনে উঠে আসে। শোভাযাত্রার যে যাত্রাপথ আয়োজকেরা নির্ধারণ করছে তার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে সংঘাত সৃষ্টির উপকরণ। সবক্ষেত্রেই এমন যাত্রাপথ স্থির করা হচ্ছে যা প্রধানত অন্য উপাসক সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থলের বা বাসস্থানের সামনে দিয়ে গেছে। শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে অন্য উপাসক সম্প্রদায়ের লোকজনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয় যে তোমাদের তুলনায় আমরা অধিক বলবান। আর এই চ্যালেঞ্জ ছোড়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে আমাদের অধীন হয়েই তোমাদের থাকতে হবে, আমাদের আদেশই তোমাদের মেনে নিতে হবে। এর থেকেই শুরু হয় সংঘর্ষ যা ক্রমে ক্রমে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, দাঙ্গা, হিংসা, লুঠতরাজ, সম্পত্তিহানি আর শোকাবহ মৃত্যু নিয়ে আসে।

কিন্তু ধর্মীয় শোভাযাত্রা তো নতুন কোনও ঘটনা নয়। সেই কোন ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। ১৯৫৪ সালে স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়েই সিউড়ি শহরে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সেই রথের ওপর চড়ে বসার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। তারও আগে ঝাড়গ্রামে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় দেখেছি তীর-ধনুক হাতে ধামসা-মাদলের বাজনার সঙ্গে নাচতে নাচতে যাচ্ছে সাঁওতাল আদিবাসীরা। দেওঘরে অনুকুল ঠাকুরের ভক্তদের সৎসঙ্গের শোভাযাত্রা দেখেছি, কলকাতায় কখনও কখনও চৈতন্য গৌড়ীয় মঠের শোভাযাত্রাও দেখেছি। বেশ কিছু বছর পরে ইস্কন পরিচালিত ‘কর্পোরাটাইজ়ড’ রথযাত্রা দেখেছি। ‘দিগম্বর’ আর ‘শ্বেতাম্বর’ দুই পরেশনাথের রথ, নানকদেবের জয়ন্তী উপলক্ষে শোভাযাত্রা— এসব দেখেছি। এইসব শোভাযাত্রা দেখে খুব আনন্দ পেতাম। আবার তাজিয়ার সঙ্গে তরোয়াল হাতে নিজেদের শরীরে লোহার চেন দিয়ে আঘাত করতে করতে রক্তমাখা দেহ নিয়ে মহরমের মিছিল দেখে ভয়ও পেয়েছি। একই সঙ্গে হাসান-হোসেনের জন্য দুঃখ অনুভব করে ‘বিষাদসিন্ধু’ জোগাড় করে পড়েছি। সত্তরের দশকে শিবচতুর্দশী উপলক্ষ্যে খোলা তলোয়ার হাতে অশ্বারোহী গেরুয়াধারীদের বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে মিছিল দেখেও ভীত হয়েছিলাম।

পরেশনাথের রথ বা পরবর্তী সময়ে ইস্কনের রথকে বাদ দিলে এইসব ধর্মীয় মিছিল হত খুবই ছোট আর এদের সংগঠকেরা হতেন স্থানীয় কিছু উৎসাহী ও অর্থবান মানুষ। প্রচারের আলো খুব বেশি করে এঁদের ওপর পড়েনি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে রামনবমী আর এই বছরে হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষে ধর্মীয় শোভাযাত্রার নামে ব্যাপক অঞ্চলে যে অশান্তিসৃষ্টিকারী পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেটা একেবারেই সাম্প্রতিক ঘটনা। এখন এইসব ধর্মীয় শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা আর সংগঠক হল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের শাখা-প্রশাখা। আত্মপ্রচারের লাইমলাইটে এইসব শোভাযাত্রা শুধু যে আলো-ঝলমলে তাই নয়, বরং কর্ণপটাহ বিদিরণকারী লাউডস্পিকারও এদের অন্যতম ধারক।

এইবছর রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর ঘটনা ঘটে গেছে কিছুদিন আগেই, স্মৃতিতে এখনও অমলিন থাকার কথা। আমরা আর একটু পিছিয়ে গিয়ে, যে-সময়ের ঘটনা ভুলে যেতে বসেছি সেগুলিকে ধুয়েমুছে সামনে নিয়ে এসে আমাদের আলোচনা শুরু করব। আজকে যা ঘটছে তার সঙ্গে সাম্প্রতিক অতীতের ঘটনার একটা পারম্পর্য আছে, একটা পৌনঃপুনিকতা আছে। গত কয়েক বছর ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুধু ঘটে চলেছে তাই নয়, ঘটনার মাত্রা আর স্থানিক বিস্তৃতি বছর থেকে বছরে বেড়েই চলেছে। আজকের অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়া এত দ্রুততার সঙ্গে এই সব ঘটনার একের পর এক খবর-ছবি আমাদের সামনে চাপিয়ে দেয় যে সেগুলো ভালভাবে মনে দাগ কাটার আগেই মুছে যায়। ‘ক্ষণপ্রভা প্রভাদানে বাড়ায় মাত্র আঁধার পথিকে ধাঁধিতে’— যা দেখলাম সেই বিষয়ে চিন্তাসূত্র গঠিত হয়ে উঠতে পারে না।

 

রামনবমী: সূত্রপাত

পশ্চিমবঙ্গে, রামনবমী উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রার প্রথম আয়োজনের খবর, যতদূর মনে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে এসেছিল ২০১৬ সালে। এর উদ্যোক্তা ছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। এর কথা মনে পড়ার অন্যতম কারণ কলকাতার রাস্তায় তরোয়াল আর ত্রিশূল নিয়ে ‘হিন্দু’-দের মিছিল ছিল সেটা। আর এই ধর্মীয় মিছিলে স্লোগান ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। মিছিল থেকে শোনা গেল বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের বাণী: “এখানে যুদ্ধ চলেছে রামজাদা আর হারামজাদা এদের মধ্যে।” বিজেপি-র সরকারি ফেসবুকের পাতায় সাবধানবাণী উচ্চারিত হল “সাবধান বঙ্গবাসী, দিনে দিনে এই রাজ্য হয়ে উঠছে জেহাদিদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল।” ৭ এপ্রিল তারিখের ই-পত্রিকা Scroll.in জানাচ্ছে যে রামনবমী উপলক্ষে তরোয়াল নিয়ে সশস্ত্র মিছিল করার অপরাধে দিলীপ ঘোষকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।[1]

রাজ্যের বিশেষ এক উপাসক সম্প্রদায়, যারা আবার সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর অংশ, তাদের ধর্মীয় এক শোভাযাত্রা রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রে চলে এল, না তাকে পরিকল্পিতরূপে নিয়ে আসা হল? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজতে যাচ্ছি না।

২০১৭ সালে রামনবমী আর একটু বেশি ধূমধামের সঙ্গে পালন করা হল। সব ‘হিন্দু’-রা বুঝি আরএসএস-এর ঝুলিতে ঢুকে পড়ল— এই ভেবে শাসক দল তৃণমূলও রামনবমী উদযাপন শুরু করে দিল ওই ২০১৭ সালেই। “সারা বাংলা জুড়ে রামনবমী উদযাপিত হল— আরএসএস-এর চাপে টিএমসি শিলিগুড়িতে ঢুকে পড়ল রামনবমী উৎসবে”— লিখছে ই-পত্রিকা DNA Watch তাদের ৫ এপ্রিলের প্রতিবেদনে।[2] আর বাংলায় রামনবমী উদযাপনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনার সূত্রপাত হল এই সময় থেকে। ঘটনাস্থল পুরুলিয়া আর বর্ধমান।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সালে যথেষ্ট পুলিশি তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও রামনবমী শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মাত্রা বেড়ে গেল। আসানসোলের কয়লা অঞ্চলের শহর রানিগঞ্জে পরিস্থিতি ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ অবধি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক রাজ্য সরকারের কাছ থেকে রিপোর্ট চেয়ে পাঠাল আর জানাল যে প্রয়োজনে আধা-সামরিক বাহিনি পাঠাতে কেন্দ্র প্রস্তুত।[3] ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে এনডিটিভি জানাচ্ছে যে “রামনবমী উপলক্ষ্যে বিজেপি-র আয়োজিত সশস্ত্র মিছিলে সংঘর্ষে একজন মারা গেল পুরুলিয়া-য়।”[4] এই শোভাযাত্রা যে রাস্তা দিয়ে গেল তার আশপাশের দোকানগুলোতে আর দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আসতে লাগল। মুর্শিদাবাদের কান্দিতে সশস্ত্র জনতা আক্রমণাত্মক মেজাজে পুলিশ থানার মধ্যে ঢুকে গেল। বর্ধমানে এক পূজামণ্ডপ আক্রমণ করা হল। পুরুলিয়ায় একজনের মৃত্যুর কথা আগেই বলা হয়েছে। ওখানে পাঁচজন পুলিশকর্মীও সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন। সশস্ত্র মিছিলের ওপর সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তাকে অগ্রাহ্য করে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিজেপি কর্মীরা তরোয়াল উঁচিয়ে শোভাযাত্রা করল। এখন আর শুধু ধর্মীয় স্লোগান নয়, সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করতে এইসব মিছিল থেকে কাশ্মির পাকিস্তান এসব নিয়েও স্লোগান দেওয়া হল।

একটা লক্ষণীয় বিষয় এই যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কিন্তু এই সময়ের আগে পর্যন্ত নিশ্চুপ। এইবার তাঁর কাছ থেকে প্রথম বিবৃতি পাওয়া গেল। ২০১৮-র মার্চ মাসের ঘটনার পর। “বাইরে থেকে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু ব্যক্তি এসেছে… এই বিশৃঙ্খলাকারীরা পিস্তল আর তরোয়াল নিয়ে গুণ্ডামি করছে। এটা পশ্চিমবঙ্গ। এসব আমাদের সংস্কৃতি নয়। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, গণপতিপূজা আমরা শান্তিতে করে থাকি। আমরা রমজানও পালন করে থাকি।” প্রায় একই কথা শোনা গেল অ্যাডিশনাল ডিজিপি (ল’ এন্ড অর্ডার) অনুজ শর্মার মুখে— “পুলিশ অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র মিছিল বার করা হয়েছে। পুলিশ এদের বিরুদ্ধে আইনানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

অপরদিকে তরোয়াল হাতে একটি মিছিলে যাকে দেখা গেছে, বিজেপির সেই তৎকালীন রাজ্যসভাপতি দিলীপ ঘোষের মত কিন্তু অন্য। তাঁর যুক্তি, অস্ত্রপূজা রামনবমীর এক স্বাভাবিক অংশ। “২০১১ সাল থেকে আমি হিন্দু জাগরণ মঞ্চ দেখাশোনা করছি। যারা পার্টিশান-দেশভাগ দেখেছে আর হিন্দুসমাজে বিভেদ দেখেছে সেইসব হিন্দুদের কণ্ঠস্বর আমরা তুলে আনতে চেয়েছি। যেভাবে মুসলিমদের তোষণ করা হচ্ছে তার ফলে এই হিন্দুরা নিজেদের বিপন্ন বলে মনে করছে। তারা ভাবছে নিজের জমিতেই তারা উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। হিন্দুদের স্বপক্ষে কোনও রাজনৈতিক পার্টি কথা বলছে না। হিন্দুদের পক্ষে কথা বললেই তাকে সাম্প্রদায়িক বলে মার্কা মেরে দেওয়া হচ্ছে। ভোট পাওয়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক পার্টিরা মুসলিমদের কথা বলছে। এই বিষয়টি আমরা লক্ষ করতে পেরেছি। আমাদের প্রয়োজন ছিল এমন একটা বিষয় যা দিয়ে আমরা হিন্দু কণ্ঠস্বর ঐক্যবদ্ধ করতে পারব। রামনবমী-কে আমরা সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছি। রামনবমী বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ নয়। কিন্তু আমরা বিরাট সাড়া পেয়েছি আর আমাদের দিক থেকে দেখতে গেলে আমাদের পক্ষে এটা খুব ভালই ফল দিয়েছে।”[5] কোনও রাখঢাক নয়, দিলীপ ঘোষ পরিষ্কার ভাষায় বলে দিলেন যে বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ না-হওয়া সত্ত্বেও রামনবমীকে তাঁরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে সাফল্য পেয়েছেন। অতএব আশা করা যায় যে এই প্রক্রিয়া এখন থেকে চালু হয়ে গেল। অবশ্য এখন থেকেই বা বলছি কেন? বিজেপি অনেক আগেই, দিলীপবাবুর কথা অনুসারে, ২০১১ সাল থেকেই তো কাজ শুরু করে দিয়েছে। আর তৃণমূল ২০১৭ সাল থেকে রামনবমী উপলক্ষে মিছিল করতে শুরু করেছে। মিছিলের রাস্তার পাশে ‘বামপন্থী’রা বইয়ের স্টল দেবে কি না এটাই এখন দেখতে হবে!

চলে আসি গতবারের অর্থাৎ ২০২২ সালের ঘটনায়। নানাদিকে যত বাধাবিপত্তিই থাকুক না কেন বর্তমান ভারতে নানা রূপে ধর্মের বিকশিত হওয়ার রাস্তা ভক্তিরসতৈলসিঞ্চনে সুমসৃণ। তাই নতুন নতুন এলাকায় দেখা গেল রামনবমীর শোভাযাত্রা। ২০২২ সালে রামনবমী পড়েছিল এপ্রিল মাসের ১১ তারিখে। এই উপলক্ষে ওইদিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১০০০ শোভাযাত্রা সংগঠিত করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান, হুগলি-চুঁচুড়া আর হাওড়া-র অধিকাংশ মিছিলই যে সশস্ত্র ছিল তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় এই যে এইসব মিছিলের সামনের সারিতে দেখা গেল বিজেপি আর তৃণমূল উভয় দলেরই নেতাদের। মালদার এক শোভাযাত্রায় তরোয়াল ঘোরাতে দেখা গেল তৃণমূলের ব্লক সভাপতি মনোতোষ ঘোষকে। হাওড়ার শিবপুরে তরোয়াল হাতে বিজেপি নেতা উমেশ রায়, দুর্গাপুরে লাঠি ঘোরাচ্ছেন বিজেপির নেতা দিলীপ ঘোষ। ভাটপাড়ার বিজেপি (সাবেক এবং অধুনা তৃণমূল) সাংসদ অর্জুন সিং-এর অভিযোগ, পুলিশ লোকেদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বাজেয়াপ্ত করছে। তাঁর মতে রামনবমীর ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অস্ত্রপ্রদর্শনকে বাধা দিয়ে পুলিশ জনগণের ধর্মীয় রীতি পালনের আইনসঙ্গত অধিকারকে বাধা দিচ্ছে। ওই ভাটপাড়াতেই আর্য সমাজের মিছিলে দেখা গেল একশো যুবকের হাতে আছে তরোয়াল। আর্য  সমাজের এই মহাবীর জয়ন্তী কমিটির প্রধান— তৃণমুল বিধায়ক সোমনাথ শ্যাম।

এইসব মিছিল থেকে উত্তেজক স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ শোনা গেল। রাজ্যের যে তিনটি জেলা, বাঁকুড়া, হাওড়া আর শিলিগুড়িতে বিজেপি যথেষ্ট শক্তিশালী, সেখান থেকেই প্রধানত এই অভিযোগ শোনা গেল। The Cognate.com ই-পত্রিকা তাদের সাংবাদিক এ মোহাম্মদের ১১ এপ্রিলে পাঠানো বার্তা উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে যে শিলিগুড়ি শহরের এই মিছিলে পুরুষ, মহিলা এবং শিশুরা একসঙ্গে নাচতে নাচতে মুসলিম-বিরোধী গান গাইছে যার কথাগুলো এরকম— “যো ছোয়েগা হিন্দুওকে হস্তি কো/ মিটা দেঙ্গে উসকে হর এক বস্তি কো/ রহনা হ্যায় তো রহিম বনকে রহো/ আওরঙ্গজেব বনোগে তো কাট ডালেঙ্গে।” আর তার পরেই উঠছে ‘জয় শ্রীরাম’ আর ‘হিন্দুরাষ্ট্র’-এর স্লোগান।

এই ধরনের উত্তেজনা ছড়ানোর ফল কী হল? বাঁকুড়া, হাওড়া আর কাঁকিনাড়া থেকে ‘উভয়পক্ষের মধ্যে’ সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে, অন্ততপক্ষে ২০ জন ব্যক্তি গুরুতর আহত হল, পুলিশ ৩০ জনকে, যাদের অধিকাংশই বিজেপি-র কর্মী বলে চিহ্নিত, গ্রেপ্তার করল। মনে রাখতে হবে ভাটপাড়া সাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে খুব স্পর্শকাতর এক এলাকা।

হাওড়ার ঘটনার বর্ণনা শোনা যাক TV9 Digital থেকে: রবিবার সকালে হাওড়ার শ্যামাশ্রী সিনেমা হলের সামনে থেকে রামরাজাতলা পর্যন্ত রামনবমীর শোভাযাত্রা বের করে বিজেপি। মহা ধূমধামের সঙ্গে গেরুয়া শিবিরের এই রামনবমী পালনে তরোয়াল হাতে বিজেপি-র রাজ্য কমিটির সদস্য উমেশ রায়কে দেখা গেল। ডি জে বক্সে জয় শ্রীরাম ধ্বনির সঙ্গে ধর্মীয় সঙ্গীতও বাজতে লাগল সারা রাস্তা জুড়ে। কড়া পুলিশ প্রহরায় মিছিল শুরু হল। বস্তুত বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে হাওড়ার সদর অঞ্চলের নানা এলাকায় রামনবমীর শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সাঁকরাইলে বিশাল সশস্ত্র মিছিল রাজগঞ্জ থেকে মানিকপুর পর্যন্ত যায়। এলাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন ছিল। এর আগে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিছিল করায় বিতর্কে জড়িয়ে ছিলেন তাবড়-তাবড় বিজেপি নেতা। ২০১৬ সালেই দিলীপ ঘোষ অস্ত্র হাতে মিছিল করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। হাতে ত্রিশূল নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করায় ২০১৮ সালে বিজেপি নেতা সমীর সাহা আর লাল্টু ঘোষের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা রুজু করে পুলিশ। পরে অবশ্য এইসব মামলার কী হয়েছে তা সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে না।

অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার প্রসঙ্গে বিজেপি নেতা উমেশ রায় বলেন: “আজকে রামনবমীর পুণ্যতিথিতে রামভক্তরা অস্ত্র নিয়ে পুজো করে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছে। এখন অনেকে প্রশ্ন করছেন কেন এই অস্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রা? সনাতনী হিন্দুরা জানেন যে যখন অসুর শক্তি সমাজে বেড়ে যায় তখন অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয় ধর্ম রক্ষার জন্য। আমাদের ধর্মেই বলা রয়েছে যখন যখন ধর্ম সংকটে পড়বে তখন তখন সমাজে শান্তি রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে।”[6]

দক্ষিণ হাওড়ার বিই কলেজের পার্শ্ববর্তী ফজিরপুর এলাকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। সশস্ত্র এই মিছিলে পুরুষরা যেমন তরোয়াল ঘোরাচ্ছিল মহিলারাও তেমন ত্রিশূল নাচাচ্ছিল। মিছিলটা যাওয়ার কথা ছিল হাওড়া ঘাটের দিকে, কিন্তু যেই মিছিল পিএম বস্তি এলাকায় প্রবেশ করল তখনই শুরু হয়ে গেল পাথর ছোড়া। এই পিএম বস্তি এলাকায় প্রধানত গরীব মুসলিমদের বাস। নিউজক্লিক-এর রিপোর্ট বলছে যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল মিছিল থেকে, এমনকি মাঝে মাঝে মিছিল দাঁড় করিয়ে উত্তেজক বক্তৃতাও দেওয়া হচ্ছিল সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ করে। তারই ফলে এই পাথর ছোড়ার ঘটনার সূত্রপাত। এই ঘটনায় পুলিশ সহ অন্তত ১০ জন আহত হয়, কিছু বস্তিঘর ভাঙচুর করা হয় আর পুলিশের কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন লাগানো হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার ১১ এপ্রিল সংখ্যায় স্যুইটি কুমারী লিখছেন যে ‘মিছিলে উত্তেজক স্লোগান দেওয়া থেকে হাওড়ায় সঙ্ঘাতের সূত্রপাত।’ পুলিশ জানাচ্ছে যে লাঠিচার্জ করে দুষ্কৃতিদের সরানো হয়। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স নামানো হয়। রাস্তার যে অংশ অবরুদ্ধ হয়েছিল সেই অংশ উন্মুক্ত করা হয় আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।[7]

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রমজানের জন্য জমজমাট কেনাকাটা চলছিল হাওড়ার শালিমার অঞ্চলের এক জায়গায়।  রামনবমীর আরেকটি মিছিল থেকে কিছু লোক সেখানে ঢুকে পড়ে মুসলিমদের লক্ষ্য করে মুসলিম-বিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। ফলে দুদলের মধ্যে সংঘর্ষ-বিবাদের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সশস্ত্র মিছিল আটকাতে আর জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করল। এলাকায় কার্ফু জারি করা হল। জনগণকে বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় উড়ো খবর প্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলা হল। “আমরা শহরে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সকলকে অনুরোধ করছি বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু প্রচার করার আগে যথাসম্ভব নিরুদ্বেগ আর সতর্ক থাকুন। শিবপুরের মিছিল প্রসঙ্গে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন। সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে এমন কিছু পোস্ট করবেন না কারণ তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।”— হাওড়া সিটি পুলিশের সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া পেজে প্রকাশিত।

হাওড়ায় গ্রেপ্তার হল ১৭ জন। পাথর ছোঁড়ার ঘটনায় অনেকের মাথা ফেটে যায়, মাথায় স্টিচ করতে হয়, বেশ কিছু লোককে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। হিংসাত্মক কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স নামাতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় যে এতসব ঘটনা ঘটার পরেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হল যে “হিংসা ছড়ানোর ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক কিছু ছিল না আর গুরুতরভাবে আহত হওয়ার কথাও শোনা যায়নি।” কৌশলগত কারণে সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকার করার সূত্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘটনার কয়েকদিন পরে মুখ খুললেন। বললেন একটিও অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেনি। দাবি করলেন উৎসবের সময়ে বাংলায় হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার কোনও ইতিহাস নেই।[8]

এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হল নানারকম। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি যে ভিত্তিহীন সেটা প্রমাণ হল যখন তৃণমূলেরই দুই সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন আর মহুয়া মৈত্র রামনবমী উপলক্ষে হিংসাত্মক ঘটনার তীব্র নিন্দা করলেন। ওদিকে আবার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বললেন যে পুলিশ আর তৃণমূল হাতে হাত মিলিয়ে রামভক্তদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আক্রমণ করেছে বলে রামভক্তরা নির্বিবাদে নিজেদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতার অধিকার পালন থেকে বঞ্চিত হল। শুভেন্দুবাবু ট্যুইট করলেন: “হাওড়ার শিবপুরে রামনবমী উপলক্ষে রামভক্তরা যখন এক শোভাযাত্রা বার করে সে সময়ে হাওড়া পুলিশের এক কনস্টেবল আর অফিসার তাদের লাঠিপেটা করে।” হাওড়া সিটি পুলিশ কমিশনার সি সুধাকর হিন্দুস্থান টাইমস-কে জানালেন: “কোনও ব্যক্তিই গুরুতর আহত হয়নি। পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আমরা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সংখ্যাটা সন্ধ্যাবেলায় জানা যাবে।”

অন্য রাজ্যেও যেভাবে রামনবমী শোভাযাত্রা থেকে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানো হয় সেই একইভাবে এখানেও শোভাযাত্রা থেকে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তবুও শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা আর বিজেপির প্রথম সারির নেতারা দাবি করতে লাগলেন যে মুসলিমদের জবাব দিতে হবে সেই সদা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের: ‘কে প্রথম হিংসা শুরু করেছে?’ প্রিয়ঙ্কা শর্মা, ভারতীয় জনতা যুব শাখা-র ভাইস-প্রেসিডেন্ট, দাবি করলেন যে শোভাযাত্রা থেকে কোনওরকম প্ররোচনা ছাড়াই ফজিরপুর এলাকায় হিংসা আর পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার হিংসার ঘটনার নিন্দা করতে গিয়ে দুষ্কৃতিদের তৃণমূলের সদস্য বলে চিহ্নিত করেছেন।

এবারে আসি বাঁকুড়ার ঘটনায়। বাঁকুড়া শহরের মাচানতলা এলাকায় নুনগোলা আর সুভাষ রোডের মধ্যবর্তী অঞ্চলে একই পরিস্থিতি তৈরি করা হল। মুসলিম-বিরোধী উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে শোভাযাত্রা থেকে, ফলে পাশের সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে পুলিশ ওইখানে মিছিলকে আটকে দিল। রাস্তায় সেইমতো ব্যারিকেড করে দেওয়া হল। কিন্তু মিছিল কিছুদূর এগোতেই এই সশস্ত্র মিছিলের ভেতর থেকে কিছু লোক পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে তাদের পুরনো রাস্তাতেই মিছিল করে যাবে বলে স্থির করল। পুলিশ যখন এই পথ মিছিলের যাওয়া আটকাতে গেল তখনই পাথর ছোড়া শুরু বলে অভিযোগ। মাচানতলা পেট্রল পাম্পের কাছে মসজিদের সামনে মিছিল পৌঁছতেই উত্তেজনা চরম পর্যায়ে উঠল।[9] মিছিল ভেঙে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে স্থানীয় দোকানপাট আর ঘরবাড়ি ভাঙচুর আর দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে আগুন লাগানো শুরু হল।[10] পাথর ছোড়ার ফলে কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছিলেন।

এই ঘটনায় পুলিশ আঠেরোজনকে গ্রেপ্তার করে। বাঁকুড়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেনডেন্ট বিবেক বর্মা আহত হয়েছিলেন। র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স নামান হয়। লোকেদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার এক পুলিশ অফিসার বলেন “তিনজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছিল। লোকেদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে আর টিয়ার গ্যাস ফাটায়। ওই স্থান থেকে সাতজন বিশৃঙ্খলাসৃষ্টিকারীকে প্রেপ্তার করা হয়।”[11]

বাঁকুড়াতে হিংসাত্মক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বিকেল পাঁচটা নাগাদ। সশস্ত্র মিছিল থেকে প্রায় তিন ঘন্টা সময় ধরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ এসব চালানো হয়। পুলিশ কোনওক্রমেই এদের সামাল দিতে পেরে ওঠে না। শেষে রাত আটটা নাগাদ জেলার পুলিশ সুপার ধৃতিমান বিরাট পুলিশ বাহিনি নিয়ে এসে লাঠি চার্জ করে আর টিয়ার গ্যাস ফাটিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই শোভাযাত্রার সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের যোগ আছে বলে জোর দিয়ে বলছেন ডঃ সুভাষ সরকার, কেন্দ্রীয় সরকারে শিক্ষাবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী। “বাঁকুড়াতে রামনবমীর শোভাযাত্রায় পাথর ছোড়া হয়েছে। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ওরা আমার গাড়িতে পাথর ছুড়েছে। আমি পুলিশের কাছে আবেদন করছি যে এদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হোক।”

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এই বছরেও ঘটেছে। তবে আগের বছরের সঙ্গে পার্থক্য একটাই সংঘর্ষের এলাকা আর মাত্রা দুটোই বেড়েছে। আগের বছরে যে ঘটনা শুধু রামনবমীর দিনকে কেন্দ্র করে ঘটেছে এ বছর থেকে সেটা বেড়ে গিয়ে হনুমান জয়ন্তীর দিন অবধি চলেছে। ‘নবমী’র মিছিল ‘দ্বাদশী’র দিন কী করে হয় সে প্রশ্ন মিছিলে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক নেতাদের কোনও সাংবাদিক করেননি।

এই একই ঘটনা আমরা গত কয়েক বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘটতে বা ঘটানো হতে দেখছি। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি কারা কী কারণে এই ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে আর এর পরিণাম কী হতে চলেছে? টিভিতে দেখলাম যে কলকাতার বড়বাজারে এক দোকান থেকে আড়াইশো টাকার বিনিময়ে তরোয়াল পাওয়া যাচ্ছে। কারা নিয়ে এল এগুলি? পুলিশ কী করে দেখতে পেল না, এমনকি যখন তরোয়াল বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে তখনও নয়, এসব কথা আমাদের মাথায় আসার আগেই এক চাকরিবিক্রেতার সুন্দরী সহকর্মীর বাড়ি থেকে পাওয়া ওএমআর শিটের গল্প এসে চাপা দিয়ে দিল আমাদের ভাবনা।

 

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

সংবাদমাধ্যম, যাকে আমরা সগর্বে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে থাকি, তারা কী বলছে আগে দেখে নিই। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এইসব ঘটনাকে ‘দাঙ্গা’ অর্থাৎ দুই গোষ্ঠীর, প্রধানত দুই ধার্মিক গোষ্ঠীর, সংঘর্ষ বলে দেখাচ্ছে। অথচ ঘটছে যেটা, সেটা হল সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এক গোষ্ঠী উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্লোগান দিতে দিতে সশস্ত্র মিছিল নিয়ে পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে প্রধানত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করছে। আর তার পরেই ‘পাথর ছোড়া’, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ আর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। মেটিয়াবুরুজের বাসিন্দা এক যুবককে অস্ত্র হাতে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে দেখা গেল— পুলিশ তাকে মুঙ্গের থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এল। পুলিশি সাফল্যের এই ঘটনায় সবাই পুলিশকে বাহবা দিল। তারপর যুবকের মা টিভিতে বললেন যে পয়সার বিনিময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিছিলে তাঁর পুত্র যোগ দেয় কারণ সে বেকার, অন্য উপার্জনের রাস্তা তার নেই। রাজনৈতিক নেতারা কীভাবে লুম্পেন বেকার যুবকদের ব্যবহার করে ধর্মের মুখোশের আড়ালে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে তার জীবন্ত এই উদাহরণ নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটিও আর করল না। কিশোরদের হাতে পিস্তল-তলোয়ার আর সাধারণভাবে অস্ত্রপ্রদর্শন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হলেও এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনও দাবি সংবাদমাধ্যম করেছে বলে দেখা যায়নি। এমনকি মহিলাদের হাতে ত্রিশূল দেখা গেলেও সে বিষয়ের কোনও উল্লেখ কোথাও নেই। সংঘর্ষের কথা বলা হলেও ঘটনায় আহত বা গ্রেপ্তার হওয়া কোনও ব্যক্তির কথা তাদের মুখ থেকে শোনানো হয়নি। কথা শোনা গেছে হয় রাজনৈতিক নেতাদের অথবা পুলিশের। সাধারণ মানুষের ওপর এই সাম্প্রদায়িক ঘটনার প্রভাব সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম নিশ্চুপ।

বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের এই সাধারণ ধারার একমাত্র ব্যতিক্রম রিপাবলিক বাংলা টিভি। রিপাবলিক বাংলার যুক্তি— রামনবমীকে কেন্দ্র করে এইসব হিংসাত্মক ঘটনার মাধ্যমে এটাই প্রকাশিত হচ্ছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হিন্দু’ জনগণের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করার অধিকার ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে চলেছে। ১১ মার্চ ২০২২ তারিখে প্রচারিত অর্ণব গোস্বামীর ‘প্রাইম টাইম ডিবেট’-এ জোর দিয়ে বলা হল যে এইসব শোভাযাত্রা কোথা থেকে যে আক্রান্ত হল বোঝা গেল না (‘attacked out of nowhere’)। এইসব আক্রমণ হিন্দুদের ওপর সরাসরি আক্রমণ যার ফলে তারা নিজেদের জায়গায়ই ভীত-সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। অর্ণব গোস্বামী আরও বললেন যে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনায় মুখোশধারীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এইসব সংঘর্ষ ঘটাচ্ছে ‘দেশবিরোধী শক্তি’-রা। অন্য সংবাদমাধ্যম যখন হিংসাত্মক ঘটনার কথা বলছে তখন দেখা যাচ্ছে যে রিপাবলিক টিভি ‘সত্য উন্মোচন’ করে ফেলেছে আর কোন ধর্মের লোকেরা পাথর ছুড়ছে সেটাও চিহ্নিত করে ফেলেছে— যদিও এর কোনও প্রমাণ তারা হাজির করেনি।

কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও এটা বোধহয় মনে করা দরকার যে এই ‘পাথর ছোড়া’র কাহিনি শুরু হয়েছে কাশ্মির থেকে কয়েক বছর আগে। আর তখন থেকেই শুধু যেন মুসলিমরাই পাথর ছোড়ে এমন একটা ব্যাপার করে ছোড়া পাথরেও ধর্মের ছাপ লাগানো হয়েছে।

 

কোথায় চলেছি

২০১৬ থেকে ২০২৩ অবধি অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেল। সব ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্তসার করলে কী দাঁড়ায়? পশ্চিমবঙ্গের সমাজে আনা হয়েছে এক নতুন ধর্মীয় উন্মাদনা— রামনবমীকে উপলক্ষ করে সশস্ত্র মিছিল। হ্যাঁ শোভাযাত্রা নয়, মিছিল।  বর্তমান বছর ২০২৩ থেকে তাতে নতুন সংযোজন হনুমান জয়ন্তী।

চৈত্র মাসে বাংলার হিন্দুদের পুজো বলতে ছিল বাসন্তীপুজো আর অন্নপূর্ণাপুজো। সমাজের ওপরতলার লোকেরাই এই পুজো করতেন। আর নিম্নবর্গের মানুষদের একটা বড় অংশ সন্ন্যাস পালন করে সংক্রান্তির দিন গাজন উৎসবে যোগ দিত। ‘বাবা তারকনাথের শ্রীচরণে সেবা লাগে’ বলে ভিক্ষা করতে আসত এইসব সন্ন্যাসব্রতধারীরা। ভিক্ষান্নেই তারা সারা মাস ধরে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করত। আমার সমবয়স্ক অনেকেই এই কথা মনে করতে পারবেন। রামনবমী খুব ব্যাপকভাবে পালন করা হত না, কোনও কোনও স্থানে, যেমন হাওড়ার রামরাজাতলায়, স্থানীয়ভাবে উৎসব পালন হত। হনুমান জয়ন্তীর কথা শুনিনি কখনও। সাম্প্রতিক অতীতে নতুন দেব-দেবীর পুজোর সূত্রপাত হয়েছে ঠিকই— যেমন সন্তোষীমা। শিবের মাথায় জল দেওয়ার জন্যে বাঁক কাঁধে ছেলেমেয়েদের মিছিল দেখে বুঝেছি ধর্মীয় উন্মাদনা কীভাবে আর কী রূপে বেড়ে চলেছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ দেখতে পাইনি। রামনবমী হনুমান জয়ন্তী কিন্তু সরাসরি ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির যোগাযোগ স্পষ্ট করে দিল। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সুতরাং রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক অনেক গভীর সেটা বুঝতে বা স্বীকার করতে আর দ্বিধা থাকছে না।

কিন্তু কী এমন বাধ্যবাধকতা যে ধর্মকে হাতিয়ার করতে হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে? ব্রিটিশ শাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাজন— এসব কিছুকে অতিক্রম করে ভারত নিজের জন্য যে সংবিধানকে ভিত্তি করে নতুন সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছে সেই সমাজ হবে সব ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতিকে নিয়ে সাম্যভিত্তিক আর রাষ্ট্রব্যবস্থা হবে একান্তভাবে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু এখানেও এক গোষ্ঠী আছে যারা ‘ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান’-এর আদলে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গত শতকের তিরিশের দশকে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে গণভিত্তি বিকশিত হচ্ছে, যখন জাতি-ধর্ম-ভাষার বিভেদ অগ্রাহ্য করে কৃষকসভা, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠছে, সেই সময়েই শোনা গেল এক ভিন্ন স্বর: ভারতে নাকি দুটি ‘নেশন’ দীর্ঘসময় ধরে পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত। একদিকে আছে তারা যাদের পিতৃভূমি আর ধর্মভূমি দুই-ই ভারতে সেই ‘হিন্দু’-রা, আর অন্যদিকে আছে যাদের পিতৃভূমি ভারতে হলেও ধর্মভূমি বিদেশে যেমন মুসলিমরা আর খ্রিস্টানরা। বললেন কে? বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভার সভাপতি হিসাবে এই ঘোষণা করলেন। আর এর তিন বছর পরে মুসলিম লিগ মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি নিয়ে এল। ভারতে এই চিন্তাধারার ধারক ও বাহক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আর এর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক আর সামাজিক সংগঠনগুলি যাদের সাধারণভাবে সংঘ-পরিবার বলা হয়। ভারতের জনগোষ্ঠীকে ‘আমরা’ অর্থাৎ ‘হিন্দুরা’ আর ‘ওরা’ অর্থাৎ প্রধানত ‘মুসলমানেরা’ এই দুই ভাগে বিভাজনের যে প্রক্রিয়া সেদিন শুরু হয়েছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সেই প্রক্রিয়া চালু থাকলেও বিশেষ রাজনৈতিক সুফল অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু এখন যখন কেন্দ্রে শাসনক্ষমতা এই সংঘ-পরিবারের হাতে, তারা সাধারণভাবেই চাইবে তাদের এই ক্ষমতা দেশের নতুন এলাকায় বিস্তৃত হোক। সেই কাজেরই অঙ্গ হচ্ছে বাংলায় রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর নামে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী মতবাদ জনগণের মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া।

সংঘ-রাজনীতির কেন্দ্রভূমি, যাকে সাধারণভাবে ‘গো-বলয়’ বলে চিহ্নিত করা হয়, সেই জনপদের সনাতনী ‘হিন্দু’-দের চোখে বাঙালি হিন্দুদের স্থান কিন্তু নিচের দিকে। সেখানকার প্রধান আরাধ্য দেবতা রামকে যদি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করা যায় তাহলে ‘খাঁটি’ হিন্দুত্বের যেমন জয় হবে তেমনই রাজনৈতিক ফায়দাও তোলা যাবে। বামপন্থী সরকারের অপশাসন, স্বজনপোষণ আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তৃণমূল দলকে গোপনে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও আর্থিক সহায়তা করা হত সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকে। ২০১১ সালে তৃণমূল দল ক্ষমতায় এসে সংঘ পরিবারের বিরোধীশূন্য গা-জোয়ারি বহুত্ববাদ-বিরোধী রাজনীতিই চালিয়ে গেছে। বিরোধ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের পর থেকে লুঠের মাল ভাগাভাগির প্রশ্ন নিয়ে। এ যেন সেই বাটা কোম্পানির জুতো বিক্রির ব্যবসা— একই কারখানায় প্রস্তুত জুতো সরাসরি কোম্পানির দোকান থেকে বাটা ব্র্যান্ডে বিক্রি হছে। আবার সেই জুতোই এজেন্টদের দোকান থেকে বিএসসি নামে বিক্রি হচ্ছে। এখন লড়াই এই এজেন্টের সঙ্গে কোম্পানির নিজস্ব দোকানের। যাই হোক না কেন, বাটা কোম্পানির বিক্রি বাড়বে। সেই একই পরিস্থিতি এখানে তৃণমূল আর বিজেপির পারস্পরিক বিরোধিতার ঘটনায়। তাই রামনবমীর মিছিলে গতকাল ছিলেন বিজেপি-র সাংসদ অর্জুন সিং, এ-বছর ওই একই মিছিলে তিনি তৃণমূলের! দু-দলই চাইছে রামনবমী হনুমান জয়ন্তীর সুযোগে পেশি-আস্ফালন। আর ভয় দেখানোর লক্ষ্য শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় নয়, সেইসব হিন্দুরাও যারা এই সব ঘটনার বিরোধিতা করছে বা প্রত্যক্ষ সমর্থন করছে না। তৃণমূল জিতুক বা বিজেপি জিতুক— যাই হোক না কেন, সংঘ পরিবার জিতবে। প্রকৃত বিরোধীদের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া হবে না।

 

পেনাল কোড

সেই কারণেই প্রশাসনের, বিশেষ করে পুলিসের, এই নির্লিপ্ত ভূমিকা। এমন নয় যে প্রশাসনের হাতে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার বিশেষ ক্ষমতা নেই। ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা আইপিসি-তে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কী ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে সেটা পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। টমাস মেকলে-র মত ও কাজ নিয়ে আমাদের অনেক সমালোচনা থাকলেও তাঁর দূরদৃষ্টির প্রশংসা কিন্তু করতেই হবে। আজ থেকে ১৬৩ বছর আগেই টমাস মেকলে বুঝেছিলেন যে বিভিন্ন উপাসক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শোভাযাত্রা আর তার পথ নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসাত্মক বিরোধ সৃষ্টি হতেই পারে। ওই সময়ে মেকলের নেতৃত্বে তৈরি হচ্ছিল ইন্ডিয়ান পেনাল কোড IPC অর্থাৎ ভারতীয় দণ্ডসংহিতা। কোন অপরাধের জন্য কী শাস্তি দেওয়া হবে সেটা তখন লিপিবদ্ধ করা হচ্ছিল। যেসব স্থানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় বা কোনও ধর্মীয় সমাবেশে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দাঙ্গা করার জন্য উস্কানি দিলে তার উপযুক্ত শাস্তিবিধান আইপিসি-র ১৫৩ ধারায় আছে। কোনও ধর্মকে অপমান করার উদ্দেশ্যে ধর্মস্থান ভাঙচুর করা বা অপবিত্র করার শাস্তি ২৯৫ ধারায় বলা আছে। আবার ১৮৮ ধারায় বলা আছে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকার আধিকারিকের আদেশ অমান্য করা এক ধরনের অপরাধ। আইপিসি-তেই ওই ধারার এই অপরাধের উদাহরণ হিসাবে বলা হচ্ছে: “আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রদত্ত এক সরকারি আধিকারিক এমন এক আদেশ দিলেন যে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা বিশেষ এক রাস্তা দিয়ে যেতে পারবে না। এক ব্যক্তি সচেতনভাবে সেই আদেশ অমান্য করলেন আর সেই কারণে দাঙ্গার বিপদ সৃষ্টি হল। [পেনাল কোডের] এই ধারায় যে অপরাধের কথা বলা হয়েছে ওই ব্যক্তি সেই অপরাধ করলেন।” সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ প্রশাসনের হাতে যথেষ্ট আইনি অধিকার ও ক্ষমতা আছে এই ধরনের অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধ করার। তাহলে প্রশাসন নির্লিপ্ত কেন? উত্তর একটাই— রাজনৈতিক প্রশাসনিক নেতাদের অঙ্গুলিহেলন— যা ঘটছে তাকে ঘটতে দাও।

 

সাম্প্রদায়িক বিভেদ, তা সে ধর্মভিত্তিক হোক বা ভাষাভিত্তিক হোক অথবা জাতিভিত্তিক হোক, যাই হোক না কেন, প্রধানত প্রভাবিত করে সমাজের নিচুতলার লোকেদের, বিশেষত যারা নিজেদের কায়িক ও মানসিক শ্রম বিক্রয় করে জীবিকা অর্জন করে। এদের মধ্যে বিভেদ বাঁচিয়ে রাখতে পারলে উপযুক্ত বেতনের দাবি, কর্মসংস্থানের দাবি, সামাজিক সুরক্ষার দাবি এমনকী মানবাধিকারের দাবিগুলি দাবিয়ে রাখতে সুবিধা হয়। সেই কারণে শাসক দলের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় এইসব বিভেদসৃষ্টিকারী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হয়। দাঙ্গা কখনও আপনা থেকে হয় না, দাঙ্গা লাগানো হয়— পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেকথাই প্রমাণ করছে।


[1] West Bengal BJP chief booked for taking out sword procession on Ram Navami. Scroll.in. Apr 7, 2017.
[2] Ram Navami celebrated across Bengal: facing RSS heat, TMC joins festivities in Siliguri. DNA. Apr 5, 2017.
[3] Nath, Sujit. Ram Navami Clash: MHA Asks Report From Bengal Govt, Promises Paramilitary Forces If Required. NEWS 18. Mar 28, 2018.
[4] One Dies In Clashes As BJP Holds Rally In Bengal’s Purulia On Ram Navami. NDTV. Mar 26, 2018.
[5] Pal, S. The Bengal Conundrum. 2021. p.563.
[6] হাতে তলোয়ার, সঙ্গে জয় শ্রীরাম ধ্বনি! সকাল থেকেই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় রামনবমী পালন বিজেপির। TV9 Bangla Digital. Apr 10, 2022.
[7] Violence in 2 Ram Navami processions in West Bengal; 30 arrested: Police. HT. Apr 11, 2022.
[8] পূর্বোক্ত।
[9] Banerjee, Falguni. Ram Navami Bankura march turns violent. TOI. Apr 11, 2022.
[10] Clashes broke out during Ram Navami procession in Bankura. Youtube: News Tag India. Apr 11, 2022.
[11] দ্রষ্টব্য, টীকা ৭।