Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পরিচয়ের রাজনীতি বন্ধ হোক

পরিচয়ের রাজনীতি বন্ধ হোক | নন্দিতা হাকসর

নন্দিতা হাকসর

 


এতদিনকার পরিচয়ের রাজনীতি উত্তর-পূর্বের সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে? উত্তর-পূর্বের জনতা ক্রমশই এক অতলস্পর্শী অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিকেরা কোনও সমাধান দিতে অপারগ। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের মধ্যে সাতটির ক্ষেত্রেই মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ, জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। ১৫ বছর আগেও কিন্তু এর মধ্যে চারটি রাজ্যে মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ, জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি ছিল। ফলে প্রথমেই আমাদের স্বীকার করতে হবে পরিচয়ের রাজনীতি সমাধান নয়, পরিচয়ের রাজনীতিই সমস্যা এখানে

 

অনুবাদ: অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

[নিবন্ধটি ফোর্স ম্যাগাজিনে গত ৮ আগস্ট প্রকাশিত]

১৯৪৯ সালে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত হলেও পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে মণিপুর স্বীকৃতি পায় ১৯৭২-এ; মধ্যবর্তী সময়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে মণিপুর তার অস্তিত্ব বজায় রাখে। উত্তরে নাগাল্যান্ড, দক্ষিণে মিজোরাম ও পশ্চিমে অসম রাজ্য দিয়ে মণিপুরের সীমানা নির্ধারিত। এছাড়াও মায়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, পূর্বে সাগাইন ও দক্ষিণে চিন প্রদেশের অংশবিশেষের সঙ্গে মণিপুরের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। কাজেই, আক্ষরিকভাবে মণিপুরকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার বলা চলে। ভারতের ‘পুবে তাকাও’ অথবা ‘লুক ইস্ট’ নীতির ক্ষেত্রে এই রাজ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত হওয়ার সময় থেকেই এলাকা বা অঞ্চল হিসেবে মণিপুর উগ্রপন্থার বিভিন্ন ঘটনায় দীর্ণ হয়ে এসেছে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমশই বেড়েছে, আর এভাবেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ঠিক সেই একই কারণে আজ ভয়াবহ দ্রুততার সঙ্গে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘর্ষের ঘটনাগুলি ক্রমশই আরও রক্তাক্ত হয়ে পড়েছে। এ যেন সেই গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ক্রনিকলস অব আ ডেথ ফোরটোল্ড’-এর উপাখ্যান। সকলেই জানে কী বীভৎসার সম্মুখীন হতে চলেছে, কিন্তু কেউই তাকে ঠেকাতে সচেষ্ট নয়।

এক কথায় বলতে গেলে মণিপুরের এই হিংসার পিছনে প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে পরিচয়ের রাজনীতি ও তার চূড়ান্ত রূপের বহিঃপ্রকাশ। পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে, সেই ১৯৮১-তেই অসমের বিশপ নীরদ কুমার বিশ্বাসের কনিষ্ঠ পুত্র নিবেদন বিশ্বাস, ‘নির্মল নিবেদন’ ছদ্মনামের আড়ালে একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ছিল ‘উত্তরপূর্ব ভারত — এক জাতিগত বিস্ফোরণ’। বইটির মুখবন্ধে নিবেদন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:

এ এক জাতিগত বিস্ফোরণের ঘটনা। এই বিষয়ে আর কোনও সংশয়ের জায়গা নেই। সারা পৃথিবীর সমস্ত সরকারের দায়িত্ব, বিশেষত ভারত সরকার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে সমস্ত দেশ, তাদের সরকারগুলির ক্ষেত্রে আরও বেশি করে আজ এটি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে— জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আরও বেশি করে সমীক্ষা চালানো; সে বার্মাদেশের কাচিন বা কারেনদের বিষয়েই হোক, অথবা ভারতের মিজো কিংবা অহোমদের বিষয়ে। ভারতের জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে, বিশেষত যারা মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীভুক্ত, তাদের বিষয়ে অতিরিক্ত নজর দেওয়া উচিত। কারণ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবে পিঠে বিষাক্ত তীর-কাঁড় নিয়ে লড়াই করে আসা আদিবাসীদের দিন গিয়েছে। এই ৮০-র দশকে দাঁড়িয়ে জাতিগত সংখ্যালঘুরা কিন্তু আধুনিকতম অস্ত্রের ব্যবহার জেনে ফেলেছে, তদুপরি তারা রাষ্ট্রের সেনাবাহিনির সঙ্গেও লড়ে যেতে পিছপা হচ্ছে না। এককথায় তারা চরম উগ্রতার সঙ্গে নিজেদের জাতিগত পরিচয়কে অক্ষত রাখতে বদ্ধপরিকর… সকলের জন্যই এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে চলেছে। যা একই সঙ্গে ভয়াবহ ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চরম ব্যয়সাপেক্ষও বটে। এই যুদ্ধে বিজেতা হিসেবে কেউই হয়তো উঠে আসবে না। হয়তো দুপক্ষই শেষ অবধি সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পরাজিত হবে।

চলতি সংঘর্ষের কোনও নিরপেক্ষ বা সে অর্থে বস্তুনিষ্ঠ বিবরণী পাওয়া অসম্ভব। কারণ, অতীতের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই এই বিষয়ে নিজস্ব বক্তব্য বা ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন জনৈক সাংবাদিক তাঁর প্রতিক্রিয়াতে বলেছেন, “বলা হয়ে থাকে প্রত্যেক ঘটনারই দুপিঠের বিবরণ রয়েছে, এবং সত্যি ঘটনাটি মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে। তবে মণিপুরের ক্ষেত্রে সত্য যে কেবল মাঝখানটিতে রয়েছে তাই নয়, বহুস্তরীয় ও পারস্পরিক বিরোধিতায় মোড়া গুচ্ছ ব্যাখ্যা ও বক্তব্যতে সম্পৃক্ত হয়ে, তা আরওই জটিল আকার ধারণ করেছে।”

ঐতিহাসিক বিবরণীর ক্ষেত্রেও এমন বহুল পরিমাণে বিতর্ক থাকায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে মণিপুর সরকার ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য ঐতিহ্যগত দিক থেকে মণিপুর-সংক্রান্ত সমস্ত প্রকাশিত বই বা লিখিত তথ্যের সত্যতাকে সম্পূর্ণরূপে খতিয়ে দেখে, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে; এর ফলে ভবিষ্যতে রাজ্যের বিষয়ে কোনওরকম তথ্যবিকৃতি রুখতে এই প্রকল্প সহায়তা করবে বলে প্রশাসনের তরফে আশা প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মণিপুরের ইতিহাস বিষয়ে কোনও লেখক যদি কিছু লিখতে চান, তবে তাঁর পাণ্ডুলিপিকে সর্বাগ্রে মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও সে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের কাছে পেশ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে সেই পাণ্ডুলিপি খতিয়ে দেখবে ও তার সত্যতা, তথ্যনিষ্ঠতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে, তবেই প্রকাশের অনুমতি দেবে। এই মুহূর্তে মণিপুরের মানুষ, সে রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায় ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছেন— সেগুলি নিয়েই আজ বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

 

আদিবাসী কে?

আদিবাসী কে, আর কেই বা তা নয়— এই নিয়ে বহুল বিতর্ক রয়েছে। এর একটি প্রেক্ষিত হল ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনও দেশের জনতার শ্রেণিবিন্যাস করা। যদিও, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে, দেশের সংবিধান ও আইন অনুসারে, কোনও ব্যক্তি যদি তফশিলি জনজাতিগোষ্ঠীর সদস্য হন, তবেই তাঁকে আদিবাসী তকমা দেওয়া চলে।

বৃহদর্থে মণিপুরের সংখ্যালঘু জনসংখ্যাকে দুইটি সম্প্রদায়ে ভাগ করা চলে, যারা কিনা তফশিলি জনজাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে প্রথমটি হল নাগা সম্প্রদায়, ও অপরটি হল কুকি-চিন-মিজো সম্প্রদায়। যদিও, সংখ্যাগুরু মেইতেইরা তফশিল-ভুক্ত জনজাতি হিসেবে এখনও স্বীকৃত নয়। তারা তফশিলভুক্তির দাবিতে আন্দোলন করছে, বিপরীতে আদিবাসী ও পাহাড়ের বাসিন্দা তফশিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই দাবির বিরোধিতা করছে।

সম্প্রতি এই দাবিটিকে নিয়ে বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেলের তরফে চলতি নির্দেশিকা ও নিয়ম অনুসারে মণিপুরের মেইতেই সম্প্রদায়কে তফশিলি জনজাতির স্বীকৃতি আদৌ দেওয়া যাবে কিনা, সেই বিষয়ে কোনওরকম প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত বা অবস্থান জানাতে অস্বীকার করা হয়।

রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর সূত্রে জানানো হয়, এই বিষয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আনলে, তা “দেশের সার্বিক ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে; তদুপরি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিরাপত্তা ও কৌশলগত বৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে; বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি এর ফলে হিংসার ঘটনারও সূত্রপাত হতে পারে।”

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আদিবাসী বা জনজাতি শব্দদ্বয়ের ব্যবহার নিন্দনীয়, সেগুলির পরিবর্তে ‘স্বদেশজাত’ বা ‘দেশজ’ শব্দের ব্যবহার করা হয়। ‘দেশজ মানুষের অধিকার’ বা ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লরেশন অন দ্য রাইটস অব ইণ্ডিজেনাস পিপল’, ঘোষণাপত্রটি রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে, ১৪৪টি দেশের সমর্থনে গৃহীত হয়।

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী জনজাতি [উপজাতি না বলে এই শব্দটিই আমরা ব্যবহার করব— অনুবাদক] গোষ্ঠীর মানুষদের জন্য একাধিক বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। বৃহদর্থে দেখলে, উন্নত গোষ্ঠীর মানুষদের তরফে অনগ্রসর জনজাতি গোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের উপর, তাদের যে অত্যাচার ও নানা উপায়ে জোর খাটিয়ে ভোগ করার চেষ্টা, তা থেকে জনজাতির মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, জনজাতি গোষ্ঠীভুক্ত নন এমন কোনও মানুষ জনজাতি এলাকায় জমির মালিকানা পেতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, জনজাতি গোষ্ঠীর এলাকাতে জনজাতি-ভুক্ত মানুষেরা নির্দিষ্ট সীমা অবধি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পেয়ে থাকেন। মিজোরাম ও মেঘালয় এই প্রসঙ্গে ষষ্ঠ তফশিলের অন্তর্ভুক্ত হলেও, নাগাল্যান্ড এই সুবিধা নিতে অস্বীকার করে। মণিপুরের জনজাতি গোষ্ঠীভুক্ত মানুষেরা সংবিধানের ৩৭১-সি ধারার মাধ্যমে সংরক্ষিত। এছাড়াও তাঁদের মালিকানাধীন জমি, জনজাতি নন বা বহিরাগত – এমন কোনও মানুষ এসে যাতে কোনওভাবে কিনে নিতে বা দখল করে নিতে না পারেন— তার জন্যও একাধিক বিশেষ আইন রয়েছে। তদুপরি, বিবিধ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, যেমন কিনা শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সংরক্ষণ, ইত্যাদির মাধ্যমে জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে সন্তুষ্ট রাখা চেষ্টা করা হয়েছে।

 

তফশিলি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির পূর্বশর্তগুলি কেমন?

কোনও সম্প্রদায়কে তফশিলি জনজাতি হিসেবে ঘোষণা করা যাবে কিনা, সেই বিষয়ে ভারতীয় সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। ১৯৬৫ সালে লোকুর কমিটির মতামত অনুসারে কোনও সম্প্রদায় তফশিলি জনজাতি গোষ্ঠীগুলির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা, তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সেই মতামতে উল্লিখিত পূর্বশর্তগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, সম্প্রদায়গুলির আদিম বৈশিষ্ট্য, মৌলিক সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনাগ্রহ, ও অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে তাদের অনগ্রসরতা ইত্যাদি।

পূর্বশর্তগুলি, ও তাদের বিচারের প্রক্রিয়াগুলি— উভয়ের ক্ষেত্রেই সরকারের একটি নিজস্ব টাস্কফোর্সের তরফে চরম আপত্তি জানানো হয়। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, এই টাস্কফোর্সের তরফে লোকুর কমিটির পরামর্শগুলিকে ‘প্রাচীন’, ‘অসংবেদনশীল’, ‘আদিম মনোভাবাপন্ন’, ও ‘রক্ষণশীল’ বলে আক্রমণ করা হয়। তদানীন্তন জনজাতি বিষয়ক দপ্তরের সচিব হৃষিকেশ পণ্ডার নেতৃত্বে এই কমিটির তরফে জানানো হয়, কোনও সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তাকে জনজাতি হিসেবে মান্যতা দেওয়া হবে কিনা, এই বিষয়কে বিচারের যে প্রক্রিয়া রয়েছে তা অদরকারিভাবে দীর্ঘ; তদুপরি “এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে, সংবিধান অনুসারে সকল সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তির যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে এদেশে চিরকাল মান্যতা দেওয়া হয়েছে, তার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।” টাস্ক ফোর্সের তরফে জানানো হয় এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সারা দেশে অন্ততপক্ষে ৪০টি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তাদের তফশিলি জনজাতি গোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অপ্রয়োজনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

টাস্ক ফোর্সের এই পরামর্শের উপর ভিত্তি করে, ২০১৪ সালে শপথগ্রহণের পরবর্তীতে কয়েক মাস মাত্র না যেতেই, প্রথম নরেন্দ্র মোদি মন্ত্রীসভার তরফে, উল্লিখিত পূর্বশর্ত ও তাদের বিচারের প্রক্রিয়াগুলিকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে একটি খসড়া ক্যাবিনেট নোট পেশ করা হয়। যদিও আট বছরেরও বেশি সময় ধরে সেটিকে ঝুলিয়ে রাখার পর, অবশেষে প্রস্তাবটিকে আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

সেই সময় থেকেই, জনজাতিবিষয়ক মন্ত্রী অর্জুন মুণ্ডা সংসদে বারংবার এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেছেন যে, লোকুর কমিটির পরামর্শগুলিই সঠিক ও যথোপযুক্ত, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি কখনই রাতারাতি তাদের বৈশিষ্ট্য পালটিয়ে ফেলে না। যদিও, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক থেকে প্রাপ্ত, সাম্প্রতিক অন্য একটি নির্দেশিকা পড়লে জানা যাচ্ছে সরকার সত্যি করেই তফশিলি জনজাতি হিসেবে কোনও সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টির ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করতে সচেষ্ট রয়েছে।

১৫ জুন ১৯৯৯ সালের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, (যা আবার ২৫ জুন ২০০২ তারিখে সংশোধিত হয়) তফশিলি জনজাতিদের তফশিলে অন্তর্ভুক্তি, বহিষ্কার অথবা অন্যান্য সংশোধনের বিষয়গুলি ও সেই বিষয়ক প্রক্রিয়াগুলি নির্ধারিত হয়। এই নির্দেশিকা অনুসারে, সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চল দ্বারা যে যে প্রস্তাবগুলি মান্যতা পাবে, কেবল সেই বিষয় বা প্রক্রিয়াগুলিকে নিয়েই এগোনোর কথা বলা হয়। এরও পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার জেনারেল ও জাতীয় জনজাতি বিষয়ক কমিশনের তরফে সেই সিদ্ধান্তসমূহকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে, তারও পরবর্তীতে যা কিনা আইন বা বিধি হিসেবে প্রণয়ন বা সংশোধনের জন্য সংসদে গৃহীত হতে পারবে।

জনজাতি বিষয়ক দপ্তরের তদানীন্তন সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্বশর্ত ও সেগুলি যাচাইয়ের যে প্রক্রিয়া— সেগুলিকে পরিমার্জনের জন্য একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। এই কমিটি জনজাতিসমূহের তফশিল-ভুক্তির বিষয়ে পূর্বশর্তগুলিকে পরিমার্জন করে, ও অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াকে সরলীকরণ করতে বেশ কিছু পরামর্শ দেয়। কমিটির তরফে সেই পরামর্শগুলি সুপারিশের আকারে মন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয়। মন্ত্রকের তরফে সেই সুপারিশ বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির কাছে তাদের প্রতিক্রিয়া চেয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের তরফে তাদের মতামত জানানো হলেও একটি রাজ্য আজ অবধি এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনও প্রতিক্রিয়া জমা দিয়ে উঠতে পারেনি।

 

মণিপুরের বিতর্ক

মণিপুরের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু মেইতেইরা দীর্ঘদিন ধরে তফশিলি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। দেশজ আদিবাসী হিসেবে তারা নিজেদের জন্য এই অধিকার দাবি করছে।

২০১৫ সালের মণিপুর সরকারের তরফে সংশ্লিষ্ট বিধানসভায় তিনটি বিল পেশ করা হয়। সেগুলি হল যথাক্রমে, মণিপুর ভূমিরাজস্ব ও ভূমি-সংস্কার বিষয়ক সপ্তম সংশোধনী বিল (২০১৫), মণিপুর নাগরিক নিরাপত্তা বিল (২০১৫) ও মণিপুর রাজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিষয়ক দ্বিতীয় সংশোধনী বিল (২০১৫)।

মণিপুরের আদিবাসী জনতা মিলিতভাবে এই বিলগুলির বিরোধিতা করে ও প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল, এই বিলগুলির মাধ্যমে কার্যত মেইতেই জনসংখ্যাকে ‘দেশজ আদিবাসী’ হিসেবে মেনে নেওয়া হবে, যা কিনা আদতে তাদের তফশিলি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ারই সমতুল। আদিবাসী ও জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের বক্তব্য ছিল, এই বিলগুলির মাধ্যমে মণিপুর রাজ্যে মেইতেইদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ক্রমশই বিস্তৃত হবে। পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা, যারা জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ, তাদের তরফে দাবি করা হয় সমতলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলে উন্নয়নের কাজ থমকে রয়েছে, একাজে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে না, এমনকি পাহাড়ি এলাকার জন্য বরাদ্দ অর্থও সমতলের উন্নয়নের প্রয়োজনে ব্যয় করা হচ্ছে।

এই বিলগুলির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ক্রমশই হিংসাত্মক চেহারা নেয়। ১১ বছরের এক কিশোর-সহ মোট ৯ জন মানুষ এই হিংসায় প্রাণ হারায়। কুকি জনজাতির মানুষেরা তাদের মৃত সহযোদ্ধাদের ৬৩২ দিন ধরে সৎকার করতে অস্বীকার করে। আদতে মেইতেইদের তরফে এই বিলগুলি আনার উদ্দেশ্য ছিল ইম্ফল উপত্যকায় ইনার লাইন পারমিট ব্যবস্থা চালু করা ও তার মাধ্যমে অ-মণিপুরি কেউই যদি সে রাজ্যে ঢুকতে চায়, তবে নির্দিষ্ট নিয়ম মোতাবেক তাদের অনুমতি দেওয়া ও একই সঙ্গে তাদের গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করা।

যদিও তদানীন্তন কংগ্রেস সরকারের তরফে দাবি করা হয়, তাঁদের দলীয় বিধায়কদের প্রত্যেকের সঙ্গে, এমনকি জনজাতি-আদিবাসী বিধায়কদের সঙ্গেও আলোচনা করেই এই বিলগুলি পেশ করা হয়েছে— আদিবাসী গোষ্ঠীগুলি সেই দাবি মানতে অস্বীকার করে। তারা জানায় এই বিলগুলি পেশের আগে তাদের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা করা হয়নি, তদুপরি তারা জানিয়ে দেয় যে, তারা মনে করছে এই বিলগুলির মাধ্যমে আদতে অন্যান্য সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীকে, বিশেষত মেইতেই গোষ্ঠীকে— জনজাতি এলাকার জমি গ্রাস করার জন্য খোলাখুলি মদত দেওয়া হচ্ছে।

 

স্বদেশজাত মানুষ কারা?

২০১৮ সালে মণিপুর নাগরিক নিরাপত্তা আইন পাশ হয়, কারণ মণিপুরের নাগরিকদের একাংশের তরফে জানানো হয়েছিল বহিরাগতদের হাত থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চয়তা না পেলে তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯-কে সমর্থন করবে না। আদিবাসীরা বিলের বিরোধিতা করলেও ৬০ আসনবিশিষ্ট মণিপুরের বিধানসভায় ৪০টি আসন পেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার নিরিখে মেইতেইরাই শক্তিশালী ছিল। যদিও পাহাড়ি এলাকার মানুষদের জন্য হিল এরিয়া কমিটি থাকলেও পরিচয়ের রাজনীতির কারণে ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে তারা সে অর্থে আদিবাসী মানুষদের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে তেমন কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মণিপুর বিধানসভায় আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে যে বৈষম্য রয়েছে তা আবারও সকলের চোখের সামনে এসে পড়ে। এছাড়াও, ১৯৫১ সালেরও আগের সময় থেকে মণিপুরের বাসিন্দা এমন একাধিক গোষ্ঠী, যেমন কিনা নেপালি জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও এই বিলের বিরোধিতা করে কারণ, মণিপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার মতো কোনও বৈধ কাগজ তাদের কাছে নেই।

মণিপুর নাগরিক নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে প্রধানত দুটি আপত্তির জায়গা রয়েছে। প্রথমত ‘দেশজ মানুষ’দের পরিচয়ের প্রশ্নে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও সেই প্রসঙ্গে রাজ্যে বসবাস শুরু করার প্রশ্নে যে প্রথম তারিখটিকে বেছে নেওয়া হবে— সেটিকে ১৯৭১ থেকে পিছিয়ে ১৯৫১-তে নিয়ে যাওয়া। এর মাধ্যমে মেইতেইদের ‘দেশজ মানুষ’ হিসেবে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা কিনা আবার তাদের তফশিল-ভুক্তির বিষয়টিকেও সহায়তা করে। দুই প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠীই, যথাক্রমে নাগা গোষ্ঠী ও কুকি-চিন-মিজো গোষ্ঠীর মানুষেরা, উভয়েই এই নীতির বিরোধিতা করে এসেছে।

সরকারের তরফে এই বিল পেশের সময় দাবি করা হয়, মেইতেইদের পক্ষ থেকে মণিপুরে ইনার লাইন পারমিট চালুর বিষয়ে যে দীর্ঘমেয়াদি দাবি রয়েছে সেটিকে স্বীকৃতি দিতে ও বহিরাগতদের হাত থেকে মণিপুরকে রক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েই এই বিলটি আনা হচ্ছে। ইনার লাইন পারমিট হল বিশেষ এক অনুমতিপত্র যা প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককেই বহন করতে হয়, যদি তাঁরা দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে, মূলত স্পর্শকাতর সীমান্ত-অঞ্চলগুলিতে ভ্রমণ করতে চান। ইনার লাইন পারমিট বিষয়ক যৌথ কমিটি বা JCLIPS-এর তরফে এই দাবিকে মান্যতা দেওয়ার জন্য, ও আইন হিসেবে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য আন্দোলন ক্রমশই জোরদার হয়ে উঠেছে। তাদের তরফে বলা হচ্ছে, দেশজ মানুষকে বহিরাগতদের হাত থেকে রক্ষার জন্যই এই বিধি কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

 

বহিরাগত কারা?

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো মণিপুরেও ‘বহিরাগত’ শব্দটিকে অপমানসূচক শব্দ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। স্থানীয় ভাষায় ‘মায়াং’ অর্থে বহিরাগত বোঝানো হয়, এবং বিশেষ করে ভারতীয়দের বর্ণনার ক্ষেত্রেই এই শব্দটি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। মঙ্গোলয়েড কোনও মানুষ অথবা মিজো বা বার্মিজদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি সচরাচর প্রয়োগ করা হয় না।

মায়ানমার ও ভারতের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণের সময় মণিপুরের বহু জনজাতি-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ই বিভাজিত হয়ে পড়ে। তৎসত্ত্বেও ভৌগোলিক সীমানার ওপারে তাদের পরিবার, পরিজন ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থেকে যায়। কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর দাবি হল, আন্তর্জাতিক এই সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যার ফলশ্রুতিতে সম্প্রদায়গুলির মধ্যে এই ভৌগোলিক বিভাজন আর না থাকে। মেইতেইরাও এই আন্তর্জাতিক সীমানাকে মানতে অস্বীকার করে। মায়ানমারের কাবো উপত্যকার উপর তারা নিজেদের মালিকানা দাবি করে। অন্যদিকে নাগা উগ্রপন্থীরা মনে করে বার্মার নাগা জনসংখ্যাকে ভারতীয় নাগাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

কুকিরাও নিজেদের মতো করে মনে করে, কুকি-অধ্যুষিত সমস্ত অঞ্চলকে একত্রে নিয়ে এসে কেবল কুকিদের জন্যই আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কমবেশি ১৯টি এমন কুকি উগ্রপন্থী সংগঠন রয়েছে যারা ভারত রাষ্ট্রেরই অভ্যন্তরে পৃথক কুকি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন জারি রেখেছে। ১০ জন কুকি বিধায়কের তরফে জানানো হয়েছে, তারা মণিপুরে থাকতে অপারগ ও সেই পরিস্থিতিতে তাদের জন্য পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু হওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাস বলছে, নাগা উগ্রপন্থীদের তরফে প্রথম মায়ানমার ও ভারতের নাগা-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে একত্র করার দাবি তোলা হয়েছিল। প্রথমদিকে তারা সার্বভৌম পৃথক রাষ্ট্রের দাবি করলেও সাম্প্রতিককালে তারা মণিপুরের নাগা-অধ্যুষিত এলাকাগুলির সঙ্গে নাগাল্যান্ডের সংযুক্তির দাবি জানিয়েছে। এছাড়াও অসম ও অরুণাচল প্রদেশের এমন এলাকাগুলির ক্ষেত্রেও তাদের একই বক্তব্য রয়েছে। যদিও, ইতিপূর্বে নাগা ও কুকিদের মধ্যে এলাকা দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইতিহাস থাকলেও, সাম্প্রতিক গণ্ডগোলের ঘটনায় নাগারা অংশ নেয়নি।

স্বদেশভূমির উপরে দখল কায়েমের চেষ্টা এই মুহূর্তে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে কারণ, মায়ানমারে এই মুহূর্তে সেনাশাসন জারি রয়েছে। যার কারণে মণিপুরে ক্রমশই বহুল সংখ্যাতে বর্মি শরণার্থীর আগমন ঘটছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই চিন জনজাতির মানুষ, কিন্তু সুদূর ইয়াঙ্গন (রেঙ্গুন) থেকে পালিয়ে এসে মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছে— এমন মানুষের সংখ্যাও আজ নেহাত নগণ্য নয়।

২০১৭ সালে ভারত সরকারের তরফে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিকে একটি নির্দেশিকা পাঠিয়ে মায়ানমার থেকে আসা এমন ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’দের বিরুদ্ধে সচেতন করে দেওয়া হয়, ও তাদের আটকানোর বিষয়ে প্রশাসনকে সচেষ্ট হতে বলা হয়। ১০ মার্চ ২০২১ তারিখে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আরও কড়া বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় রাজ্য সরকারগুলি যেন কোনওভাবেই এসমস্ত ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’কে ‘শরণার্থী’ হিসেবে গণ্য না করে।

কিন্তু নিজস্ব নাগরিকদেরই চাপে মণিপুর ও মিজোরাম কেন্দ্রের এমন নির্দেশিকার বিরুদ্ধাচরণ করে; এবং ফেব্রুয়ারি, ২০২১-এ ঘটে যাওয়া মায়ানমারের সেনা-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যাচারিত, পালিয়ে আসতে চাওয়া বর্মি জনতার প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে।

মণিপুরের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ আগত শরণার্থীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ও সহমর্মিতা জানায়। কিন্তু বিশেষ করে, অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা এসমস্ত আশ্রয়প্রার্থীদের ন্যূনতম বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্ব গিয়ে পড়ে কুকিদের উপর। শেষ অবধি কেন্দ্রীয় সরকারের হুকুম মেনে নিয়ে মণিপুর সরকার মায়ানমার থেকে আগত সমস্ত মানুষকে ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে ঘোষণা করে। তাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে গির্জার এক পাদ্রিকে অবধি গ্রেফতার করা হয়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে জানানো হয় ইউএনএইচসিআর-এর তরফে বিলি করা পরিচয়পত্র থাকলেও, কোনও শরণার্থীকেই আর শরণার্থী বলে গণ্য করা হবে না। তদুপরি, তৃতীয় কোনও দেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেও, কোনও অনুপ্রবেশকারীকেই আর ভারত ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। যদিও ইউএনএইচসিআর-এর কার্যনির্বাহী কমিটিতে সদস্য হিসেবে ভারতীয় বিদেশমন্ত্রকের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।

মেইতেই ও নাগা সম্প্রদায়ের তরফে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে মায়ানমার থেকে আসা চিন সম্প্রদায়ের মানুষেরা অনেকেই হয়তো আর ফিরে যাবে না। তারা এখানেই জমি দখল করে বসবে, ও সবশেষে হয়তো ভোটাধিকার অবধি পেয়ে যাবে। এই কারণ দেখিয়ে মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষ অবিলম্বে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি চালু করার দাবিতে সরব হয়েছে।

এছাড়াও, মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের যে অবস্থান, তা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরওই জটিল করে তুলেছে। এই মানুষেরা মায়ানমারে থাকার সময়েও নাগরিক অধিকার পায়নি, এবং কার্যত ‘রাষ্ট্রহীন বস্তুসমূহ’ বা ‘স্টেটলেস এনটিটিস’ হিসেবে তারা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্যান্য শরণার্থীদের চেয়ে মুসলিম রোহিঙ্গাদের যে আরও অনেক বেশি পরিমাণে অসুবিধা ও বিদ্বেষের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, সে আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

সহজ একটি সমাধান হতে পারত, যদি সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে মায়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের বিষয়ে নিজস্ব পরিচয়পত্র ইস্যু করার ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া থাকত। এর ফলে একদিকে যেমন আগত শরণার্থীরা মানবিক সুবিধা পেত, তারই সঙ্গে কজন ‘বহিরাগত’ এসেছে সেই বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকত। পক্ষান্তরে মেইতেইরা এনআরসি-র দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। ‘বহিরাগত’দের ঠেকাতে এই যুদ্ধং দেহি মনোভাব, ক্রমশ আরও হিংসার ঘটনাকেই ত্বরান্বিত করছে।

 

জমির প্রশ্ন

এমন বেশিরভাগ সংঘর্ষের ঘটনারই মূলে রয়েছে জমি-সংক্রান্ত সমস্যা। মেইতেইদের একাংশ মনে করে, তারা যে চাইলেই পাহাড়ি এলাকাতে জমি কিনতে পারে না অথচ জনজাতির মানুষেরা ইচ্ছে করলেই সমতলে জমির মালিকানা পেতে পারে, এই বৈষম্য পীড়াদায়ক। সাম্প্রতিককালে মণিপুর সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলি থেকে আদিবাসী জনতাকে উচ্ছেদ করতে শুরু করেছে। ২০২০ সালে লঙ্গোল সংরক্ষিত বন-এলাকায় অন্ততপক্ষে ১৩৪৬টি নির্মাণকে একতরফাভাবে বেআইনি ঘোষণা করে সেইসব বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নোটিস ধরানো হয়। সেই বিষয়ক বিভিন্ন মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। অন্ততপক্ষে ৯৫টি পরিবার এই উচ্ছেদের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছে। লঙ্গোল এলাকা ইম্ফলের প্রান্তে পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত।

অজস্র আইনি ও বেআইনি পদ্ধতির মাধ্যমে আদিবাসীদের তাদের জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উন্নয়নের নামে তাদের জমি গ্রাস করা হয়েছে। জমি সংক্রান্ত সমস্যাগুলির মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ক্রমাগত বাড়তে থাকা পোস্তচাষ। ড্রাগ পাচারকারীদের অন্যতম আড্ডা বলে রাজ্যের দুর্নাম থাকলেও, এখন কার্যত তা উৎপাদন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মণিপুরের সংঘর্ষের ঘটনায় এই প্রতিটি কারণ নিজস্ব অবদান রেখেছে।

 

সংঘর্ষ সমাধান

আইনসভায় এই সমস্যাগুলিকে নিয়ে আলোচনার পরিসর থাকা উচিত ছিল, কিন্তু প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে আদিবাসীরা সেখানে সংখ্যালঘু হওয়ায়, আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আদিবাসী-বিরোধী সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণের সময় তারা কোনওরকমে সেগুলির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।

আদিবাসীদের নিজস্ব ছাত্র সংগঠন রয়েছে, গির্জা ও অন্যান্য সংগঠন রয়েছে। একইরকমভাবে মেইতেইদেরও এমন নিজস্ব সংগঠন রয়েছে। কিন্তু এমন কোনও মঞ্চ বা সংগঠন নেই যেখানে দুই গোষ্ঠীই সামনাসামনি এসে আলোচনা করতে পারবে। মুক্ত ভাবনা, আলোচনা অথবা মতবিনিময়ের কোনও পরিসরই সেখানে নেই। প্রত্যেক গোষ্ঠীরই নিজস্ব দাবি রয়েছে, এবং প্রত্যেকেরই পিছনে রয়েছে সশস্ত্র একেকটি সংগঠন।

ধর্মীয় মতবাদের দ্বারা সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে মদত দেওয়া হচ্ছে। সপ্তদশ শতক অবধি মণিপুরের মানুষেরা নিজস্ব ধর্ম পালন করত। উপত্যকা অঞ্চলে মেইতেইরা সনামহী বলে নিজস্ব ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, তাদের নিজস্ব মন্দির, অর্চনাপদ্ধতি ও শাস্ত্র ছিল। পরবর্তীতে হিন্দুধর্মের প্রচারকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত হয়। যারা বৈষ্ণব ধর্মে ধর্ম পরিবর্তন করেনি, স্বাধীন ভারতে তারা তফশিলি জাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়। বাকপটু মেইতেই জাতীয়তাবাদীদের একাংশ আবার তাদের প্রাচীন ধর্মেও ফিরে গিয়েছে। একাংশ এই কারণে, রাজপরিবার থেকে আসা অনেক মানুষও এই ধর্ম-ভিত্তিক গোলমালের কারণে অনগ্রসর জাতির সুবিধা পেলেও, ক্ষত্রিয় নাগরিকেরা কোনওভাবেই সেই সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয়।

প্রাচীন সনামহী ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দুইটি প্রধান উগ্রপন্থী মেইতেই সংগঠনের জন্ম হয়, যারা মণিপুরের সাম্প্রতিক হিংসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এরা হল যথাক্রমে আরামবাই টেঙ্গোল ও মেইতেই লিপুন। এই দুই গোষ্ঠীই তাদের ‘দেশজ’ সনাতন ধর্মের প্রতি আস্থা রেখে চলে। দুই গোষ্ঠীই মণিপুরের সাম্প্রতিক হিংসার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

নাগাদের মধ্যেও এমন একাধিক সম্প্রদায় রয়েছে, যারা খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হতে অস্বীকার করে ও নিজেদের প্রাচীন দেশজ ধর্মের প্রতিই আস্থা রেখে চলে। এমনই এক ধর্ম হল হেরাকা ধর্ম। এদেরই মধ্যে বিজেপির তরফে রানি গাইদিনলিউকে খ্রিস্টান মিশনারি-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরএসএস এমন দেশজ ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হয়েছে।

নাগা এবং কুকি-চিন-মিজোরা প্রধানত খ্রিস্টান ধর্মের অনুগামী। উত্তর-পূর্ব ভারতে খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ ও গির্জা পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উত্তর-পূর্বে আরএসএস আধিপত্য প্রসারের প্রশ্নে খ্রিস্টান মিশনারিরা সবদিক থেকে তা আটকানোর চেষ্টা করেছে। এই বিষয়ে ভারত ও অন্যান্য দেশেরও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের তরফে তারা সমর্থন পেয়ে থাকে।

এছাড়াও মণিপুরে অতিক্ষুদ্র এক মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মেইতেই মুসলিম অথবা পাঙ্গাল নামে পরিচিত। অনেক দশক তো বটেই, হয়তো অনেক শতক ধরেই তারা এই অঞ্চলের বাসিন্দা। কাজেই সেখানে মুসলিম সংগঠনগুলিও বিস্তৃত হয়েছে, বিশেষত মে ১৯৯৩-এর ঘটনার পর (যে ঘটনায় ইম্ফলে ১০০-র ওপর মুসলিম সংখ্যালঘুকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল), মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। মে ১৯৯৩-এর ঘটনার প্রেক্ষিতেই মণিপুরে পিপলস ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট বা পিইউএলএফ-এর জন্ম হয়। ২০০৭ সালে আরেকটি মুসলিম সংগঠন, ইসলামিক ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা আইএনএফ, পিইউএলএফ-এর সঙ্গে মিশে যায়।

 

পরিচয়ের রাজনীতি

কাজেই এমন কোনও মঞ্চ বা পরিসর নেই যেখানে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষই এসে দাঁড়িয়ে খোলা মনে মতামত ব্যক্ত করতে পারে।

নাগা ও কুকি গোষ্ঠীর সদস্যেরা নিজেদের ‘মাতৃভূমি’ রক্ষার লড়াইতে ব্যস্ত। কখনও বা ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করে, আবার কখনও বা ভারতেরই অভ্যন্তরে আলাদা স্বশাসিত অঞ্চল দাবি করে, তারা নিজেদের আন্দোলন জারি রেখেছে। এদেরই একাংশ আবার নিজস্ব ধর্মতান্ত্রিক দেশ বা অঞ্চল গঠনের স্বপ্নেও দিব্যি মজে রয়েছে। রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলি এমন সমস্ত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে আলাদা আলাদা করে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। তাদের রাজনীতি বা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে কিছু বলতে যাওয়াও বিপজ্জনক।

এমন প্রত্যেক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে, তাদেরও এমন গোষ্ঠী-ভিত্তিক বা সম্প্রদায়-ভিত্তিক অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজস্ব কায়েমি স্বার্থ রয়েছে। এমন অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারলে বিবিধ সুযোগ ও সুবিধা মেলে। আদর্শের দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে পড়া রাজনীতির কারণে, জনজাতি ও জনজাতি নয়, উভয়পক্ষের তরফেই ‘বহিরাগত’ মানুষদেরকে সকল সমস্যার মূল হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ‘বহিরাগত’দের মধ্যে সবচেয়ে প্রান্তিক ও সবচেয়ে গরিব যে অংশ, অভিবাসী শ্রমিকেরা, তারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অকল্পনীয় হিংসার শিকার হচ্ছে।

বাড়তে থাকা দারিদ্র্য অথবা ধনী ও গরিবের মধ্যে বেড়ে চলা বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে নিয়ে কেউই আর মাথা ঘামাতে রাজি নয়। সে রাজ্যের হাজার হাজার যুবক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে, এবং তারা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন শহর ও মহানগরে ছড়িয়ে পড়ছে। মণিপুরের বাইরে অন্যান্য জায়গাতে এমন শ্রমিকেরা একত্রিত হয়ে কেবল ‘মণিপুরি’ নামেই পরিচিত হচ্ছে।

অনেক পরিবারেরই অল্প পরিসরে চাষের জমি রয়েছে। কিন্তু তা থেকে উৎপাদিত ফসল সংসার চালানোর পক্ষে যথেষ্ট হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশীয় অর্থনীতির সংযুক্তির কারণে নগদ অর্থের প্রয়োজন বাড়ছে। বৃহৎ পুঁজির প্রতিনিধিরা এই সমস্ত জমির অংশকেই দখলের জন্য ওঁত পেতে রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে

উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যগুলির মতো মণিপুরেও দীর্ঘদিন যাবৎ আন্তর্জাতিক গুপ্তচর সংস্থাগুলির উপস্থিতি রয়েছে, এবং স্বভাবতই এমন পরিচয়ের রাজনীতির অস্তিত্ব থাকলে, তার সুযোগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে তারা চিরকালই উৎসাহ দেখিয়েছে। একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ লাগিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনায় তারা চিরকালই নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে। বেসরকারি সংস্থা, নানাবিধ মানবাধিকার সংস্থার পরিচয়ের আড়ালে এই সমস্ত গুপ্তচর সংস্থাগুলি নিজেদের কাজ চালায়, ও তারই মাধ্যমে উত্তর-পূর্বের অধিবাসীদের মধ্যে বিভাজনের বিষবৃক্ষ রোপণ করে। পাশ্চাত্যের তরফেই প্রথম প্রচার করা হয়, কেবলমাত্র পরিচয়ের রাজনীতিরই কারণে উত্তর-পূর্বের অধিকাংশ হিংসা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। শ্রেণি, জাতি, পিতৃতন্ত্র ও অন্যান্য এমন বিষয়গুলিকে কারণ হিসেবে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না।

এতদিনকার পরিচয়ের রাজনীতি সেখানকার সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে? উত্তর-পূর্বের জনতা ক্রমশই এক অতলস্পর্শী অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিকেরা কোনও সমাধান দিতে অপারগ। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের মধ্যে সাতটির ক্ষেত্রেই মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ, জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। ১৫ বছর আগেও কিন্তু এর মধ্যে চারটি রাজ্যে মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ, জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি ছিল।

দেশের অন্য রাজ্যগুলির মধ্যে মিজোরাম অন্যতম দ্রুততার সাথে নিজেদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেই একই সময়ে দাঁড়িয়ে মণিপুর দেশের তৃতীয় দরিদ্রতম রাজ্য হিসেবে নেমে গিয়েছে। অন্তঃসারশূন্য শান্তির বার্তা এই রাজ্যকে আজ একচুলও সমাধানের অভিমুখে এগিয়ে দেবে না। প্রথমেই আমাদের স্বীকার করতে হবে পরিচয়ের রাজনীতি সমাধান নয়, পরিচয়ের রাজনীতিই সমস্যা এখানে।

যদি মণিপুরের সমস্ত জনজাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে আসতে না পারে, তাহলে তাদের সমস্ত ভূসম্পত্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদই বেহাত হয়ে যাবে। অপেক্ষমান বিরাট পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলি সীমানার ঠিক বাইরেটাতেই দাঁড়িয়ে ওঁত পেতে রয়েছে। মণিপুরের মানুষ যদি যূথবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ না করে, তাহলে অচিরেই পুঁজিপতিদের অপেক্ষার অবসান হবে, আর তখনই ‘নির্মল নিবেদন’-এর কথায়, প্রত্যেক সম্প্রদায়ই “শেষ অবধি সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পরাজিত হবে।”

মণিপুরের হিংসা ভারতীয় গণতন্ত্রের ব্যর্থতার উদাহরণ। জাতীয় রাজনীতির যে সাম্প্রতিক বৈশিষ্ট্য, তা ক্রমেই সাধারণ মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিপরীতে পরিচয়ের রাজনীতির অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিই পারে সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে আবারও একত্রে নিয়ে আসতে।