Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

উত্তর ভারতে বন্যা: সড়ক, বিজলি ও মাক ডাম্পিং

স্বপন ভট্টাচার্য

 


বন্যাপ্লাবিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, কাশ্মির, রাজস্থান এবং উত্তরাখণ্ড। প্রশাসনের ল্যাজেগোবরে অবস্থাটা এখন বলা যায় ‘এক্সপোজড্‌’। মানুষের লোভ আর ভোগবাসনার বলি হচ্ছে পরিবেশ। সেই কাজে মদত দিচ্ছে প্রশাসন। মানুষের তৈরি এই বন্যা তার সামান্য প্রতিক্রিয়া মাত্র। এর মধ্যেই এসে গেল ফরেস্ট কনজারভেশন বিল ২০২৩। মাইনিং-এর শকুনদের বহুদিনের নজর হিমালয়সহ দেশের সব পার্বত্য অঞ্চল। সুতরাং গোটা পাহাড়কেই ‘মাক’-এ পরিণত করার সব আয়োজনই সম্পূর্ণ

 

প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রোষের মুখে পড়েছে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং পঞ্জাব। যমুনার জলে প্লাবিত হয়েছে  দিল্লিও। আমাদের বাংলা প্রচারমাধ্যমগুলিতে অবশ্য সে খবর কদাচিৎ যাত্রাপালায় বিবেকের গানের মতো আসে, তারা কলতলার ঝগড়া থেকে ক্যামেরা সরাতে তেমন কোনও প্রণোদনা পায় না। এমনকি বাংলা সংবাদপত্রেও দুয়োরানির মতো উত্তর ভারতের বন্যার খবর এক চিলতে ঘোমটা পরে কোথায় বসে রয়েছে আপনি চট করে ঠাহর করতে পারবেন না। তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়তা দেখাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ প্রায় প্লাবিত হয়ে চলেছে নদীর পাড় ভাঙার ছবি, বিরাট বিরাট ইমারত নিমেষে তলিয়ে যাবার চলচ্ছবিতে। দেখে বিস্মিত হয়ে ভাবি এই কি সেই বিপাশা বা শতদ্রু নদী, এই কি সেই ক্ষীণতোয়া যমুনা বা চন্দ্রভাগা, যাদের উপল ব্যথিত গতি, আমাদের ভ্রমণসাহিত্যে পড়ে আসা পঞ্চনদীর সঙ্গে কল্পনাতেও মেলানো মুশকিল ছিল? বছর দশ-পনেরো আগেই দেখেছি নদীকে কীভাবে বাঁধছে হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ারের বাঁধ। পাহাড়ের ভিতর দিয়ে ছ্যাঁদা করে ওপর থেকে নিচে অ্যাকোয়াডাক্ট তৈরি করে নদীকে নিয়ে আসার কাজ চলছিল তখন। সারা শতদ্রু জুড়ে ইট-বালি-সিমেন্টের বাঁধন আর বাঁধন, যন্ত্রের ঘর্ঘর, ধোঁয়া, দূষণ এবং নদীর সমস্ত ফণাকে অবনত করিয়ে রাখা লাভ ও লোভের নাগ-নৃত্য। সেই সফরেই দেখেছিলাম লাহুল-স্পিতি উপত্যকায় মেঘ-ভাঙা (ক্লাউডবার্স্ট) তাণ্ডবে কীভাবে পর্বতশিখর পর্যন্ত গুঁড়িয়ে নেমে এসেছে জাতীয় সড়কে। তখনও মনে হয়েছিল, আজও মনে হয়, আর কতদিন এভাবে আফিমের জেরে ঘুমঘোরে পড়ে থাকবে নদী? মেঘ ও মাটির স্পর্শে সে যদি জাগে কোনওদিন, তাহলে কী হবে? কী হতে পারে তার একটা নমুনা রয়ে গেল এই ২০২৩-এর হিমাচলে এবং উত্তর ভারতের বাকি অংশে। এর পরে মানুষ জাগবে কিনা, নাকি লাভের মধু সে ভেসে যেতে যেতেও চাটতে থাকবে তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

হিমাচল প্রদেশ

 

কেন বন্যা?

বন্যার কারণ খুঁজতে গেলে সবচেয়ে সহজ আসামিকেই আগে ধরা ভাল— আকাশ! পার্বত্য অঞ্চলে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে এ-বছর। পয়লা জুন মৌসুমী বর্ষার সূত্রপাত হয় সেখানে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭২০ থেকে ৭৫০ মিলিমিটার হয়ে থাকে এবং কোনও কোনও বছর তার চেয়ে বেশিও হয়, যেমন হয়েছিল ২০১০ বা ২০১৮-তে। এ-বছর জুন থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৫১১ মিমি, যা কোনওভাবেই আশানুরূপ বলা যাবে না। গত পাঁচ বছরে (২০২২ পর্যন্ত) হিমাচলে বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৫০ জন নাগরিক, ১২,৪৪৪টি বাসস্থান হারিয়েছে মানুষ। সেই তুলনায় পরিস্থিতি তখনও যাত্রা, উৎসব ও পর্যটনের পক্ষে খুব প্রতিকূল বলা চলে না। এই সময় পর্যন্ত দিল্লি ও পঞ্জাবে বৃষ্টিপাত ১০০ থেকে ১২০ শতাংশ ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় কিন্তু হিমাচলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৭০ শতাংশ। পরিস্থিতি বদলে যায় জুন মাসের ২৪ তারিখ থেকে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু এবং পশ্চিমা ঝঞ্ঝা-বিক্ষেপের যৌথ আঘাতে ২৪ জুন থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে হিমাচলে ৪১টি ভূমিধস এবং ২৯টি ফ্ল্যাশ ফ্লাড (হড়পা বান) রেকর্ড করা হয়। ৮০ জন শুধু এই পর্যায়েই মারা যান। বৃষ্টিপাত থামার কোনও লক্ষণ নেই। এখন সে পরিমাণ ১৫৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আগস্ট মাসের ১২-১৩ তারিখে আর এক দফা অতিভারি বৃষ্টিপাতে নতুন করে মারা গেলেন ৫৭ জন নাগরিক। হিমালয়ান এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ যানচলাচল, ইস্কুল-কলেজ, বাণিজ্য। এই লেখা লেখার সময় পর্যন্ত শুধু হিমাচল প্রদেশেই সারে চারশো লোক মারা গিয়েছেন। নদীতীর প্লাবিত হয়ে জল ঢুকেছে তীরবর্তী মাটিতে, যে মাটিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে উঠেছিল অজস্র ইমারত পরিবেশবিদদের চেতাবনিকে কোনও তোয়াক্কা না দিয়েই। বাড়িগুলোর ভিতের তলার মাটি নদীবাহিত উচ্ছলিত জলে নরম হতে হতে খোলামকুচির মতো হোটেল বা ধর্মশালা বা মন্দির বা মসজিদকে সমান মর্যাদা দিয়ে নদীস্রোত ভাসিয়ে দিয়েছে। এই বিপুল তরঙ্গ কেড়ে নিয়েছে অফিসিয়ালি সাড়ে তিনশোর বেশি প্রাণ, ক্ষতি হয়েছে (এটাও অফিসিয়াল) ১০০০০ কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তি।

উত্তরপ্রদেশ

উপমহাদেশের পার্বত্য অঞ্চল যে উষ্ণায়নের প্রভাবে একটা প্লাবনভূমিতে পরিণত হতে চলেছে তা ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-VI রিপোর্টে বলা হয়েছিল। পাঠকের মনে থাকতে পারে গত বছর পাকিস্তানে বন্যা-বিপর্যয়ের কথা। সিন্ধুপ্রদেশে বৃষ্টির আগে তাপমান ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছিল এবং প্রায় ৪০ শতাংশ সমতলভূমি প্লাবিত হয়েছিল সে দেশে মরসুমি বৃষ্টির প্রভাবে। দেবভূমিতে হড়পা বান দেখার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। কিন্তু উন্নয়নের দাবির কাছে সেগুলো ‘ইনসিডেন্টাল’ খরচ হিসেবে ‘রাইট অফ’ করা হয়েছে। ফলে বিজলি-সড়ক-মকান-এর চাহিদার কাছে প্রাণ তুচ্ছ। উহাতে ভোট এবং ভেট দুইই বেশি, কে না জানে!

সারা পৃথিবীতেই তাপমাত্রা বাড়ছে। শিল্পবিপ্লবের সময়কার তাপমানের তুলনায় বড় জোর ১.৫ ডিগ্রি  ঊর্ধ্বসীমায় এই গ্রহটির গড় তাপমান বেঁধে রাখার অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল আইপিসিসি-র কিয়োটো প্রোটোকলে। ২০০২ সালের কথা সেটা। কার্বন জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের জন্য কাগুজে সনদ অনেক তৈরি হয়েছে তার পর, কিন্তু কে কতটা কমালে নীল গ্রহে আবার সহনীয় গ্রীষ্ম ফিরে আসবে তা নিয়ে আজ অবধি ঐকমত্য তৈরি হয়নি। দুনিয়াদারিতে দড় যে-সব অর্থনীতি এই টানাটানিতে বোঝা নামানোর ও বোঝা চাপানোর খেলা খেলে যাচ্ছে, তাদের নিজেদের অবস্থাও সুবিধের নয়। আমরা সবাই দেখেছি আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া সাম্প্রতিককালে কীভাবে তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। দাবানলে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাঊই দ্বীপটি সম্পূর্ণ জ্বলে গিয়েছে। ১১৪ জন বাসিন্দা স্রেফ অসহায়ভাবে পুড়ে মরেছে সেখানে।

আমাদের দেশে, উত্তরার্ধে এবার তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। তাপপ্রবাহে এই গ্রীষ্মে নিত্যনৈমিত্তিকভাবে মৃত্যুর খবর এসেছে। উত্তরপ্রদেশ-বিহার-হরিয়ানা মিলিয়ে সরকারিভাবেই মৃতের সংখ্যা দেড়শো ছুঁয়েছে। কিন্তু আরও চিন্তার কারণ যেটা ঘটেছে তা হল মৌসুমী বায়ুর খামখেয়ালি আচরণ। প্রথমত, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর ওপর পশ্চিমি ঝঞ্ঝার অভিঘাত। সময়ে তা ঢুকতেই পারেনি গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলে। দ্বিতীয়ত, এই একই কারণে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক ঘটনা— যাদের সম্মিলিতভাবে ‘এক্সট্রিম ওয়েদার ইভেন্টস’ বলে চেনা যায়। তাপপ্রবাহ থেকে ঘূর্ণিঝড় বর্ষার পূর্বসূরি ছিল এবং তখনই বোঝা যাচ্ছিল চোট আসছে একটা। মাঝপথে বাধা পাওয়া মৌসুমী বায়ু যখন জুলাইয়ে ঢুকে পড়তে পারল পূর্ণমাত্রায়, তখন বৃষ্টিপাতের যে মাত্রা তা ছুঁয়ে ফেলল, তা গত বেশ কয়েক বছরের রেকর্ডে নেই। জুলাইতে দেশের উত্তরাঞ্চলে ১১১৩টি কেন্দ্রে ভারি বৃষ্টিপাত এবং ২০৫টি কেন্দ্রে অতিভারি বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হল। পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের দরুন কিছু বন্যা হবে, কিছু ভূমিধস হবে— এগুলো অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু লাল কিল্লা আর সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে মানুষ কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে থাকবে এ তো একেবারেই হিসেবে ছিল না। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতের পর দিল্লিতে জুলাই মাসের ৯-১০ তারিখে রেকর্ড করা হল ২২১.৪ মিমি অতিভারি বর্ষা, যেখানে সারা ব্জুলাই মাসে দিল্লিতে ২১৫ মিমি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে স্বাভাবিক অবস্থায়। পাহাড়ে যমুনার উৎসমুখে ভারি বর্ষণে যমুনা ফেঁপে উঠে এমন প্রবাহসীমা অতিক্রম করল যা ৪৫ বছরে দেখা যায়নি। হরিয়ানায় যমুনানগর এবং দিল্লিতে নদীবাঁধ উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা প্রবাহগতিকে সামাল দিয়ে আসছে বহু বছর ধরে, এবার তা পারা গেল না। আর্কটিক তেতে উঠলে যে আরব সাগরও তেতে উঠবে, এ আমরা জ্ঞানপাপী, সবাই জানি। কিন্তু আমরা যে বিপর্যয়ের অভিঘাত বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারি তা ঠিক কতটা ক্ষতির পরে মালুম হবে জানা নেই। বর্ষার এই দাপট এবং তার কারণে জীবন-জীবিকার এই ভয়াবহ সঙ্কট— এ শুধু প্রকৃতির রোষ বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

দিল্লি

 

কীভাবে বন্যা?

আকাশের ওপর দায় চাপিয়ে মানুষের স্বকৃত পাপ আর কতটা লাঘব হতে পারে? হিমাচল প্রদেশের উন্নয়ন, সত্যি কথা বলতে কি, পাহাড়ি রাজ্যগুলোর জন্য মডেল বিবেচিত হত এককালে, হয়তো এখনও হয়। যেহেতু সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, তাই পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উন্নয়ন যে দরকার কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না! ১৯৭১ সালে রাজ্য ঘোষিত হওয়ার পর হিমাচল প্রদেশে পরিকাঠামো উন্নয়নের জোয়ার আসে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডঃ যশোবন্ত সিং পারমার-এর হাত ধরে। পারমার মডেলে ভূমিসংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সামাজিক উন্নয়ন ইনডেক্সে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে চলে আসে হিমাচল প্রদেশের নাম। ১৯৮০-র মধ্যে প্রতি বাড়িতে বিজলি বাতি পৌঁছে যায়, গ্রাম-শহরে সংযোগকারী রাস্তা তৈরি হয় দুর্গম এলাকাতেও, হেলথ সেন্টার, স্কুল গড়ে ওঠে প্রায় সব গ্রামেই এবং এর সঙ্গে সঙ্গেই চাষের ধরনে বদল ঘটে। গম, জোয়ার, বাজরা যা ছিল তাদের ট্রাডিশনাল ফসল, তার জায়গা নেয় আপেল, অন্যান্য ফল এবং সবজি। তার কারণ আপেল সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, তাই সড়ক যতদিন উন্নত না হয়েছে আপেল চাষে হিমাচলে এই জোয়ার দেখা যায়নি। পরিস্থিতির বদল ঘটে মুক্ত অর্থনীতির প্রভাবে। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে নিজেদের জন্য আর্থিক সংস্থান জোগাড়ে চাপ দিতে থাকে। এবং রাজ্যের ‘নিজের পুঁজি নিজে জোগাড় করো’ প্রকল্পে অপার প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপুষ্ট পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে সবচেয়ে আগে বিক্রি হয় প্রকৃতি। জঙ্গল তার মাশুল দেয়, জল তার মাশুল দেয়, পরিকাঠামো উন্নয়নের হাত ধরে আসে পর্যটন এবং পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ। দেবভূমি বদলে যেতে থাকে দ্রুত।

কাশ্মির

 

বিজলি-সড়ক-মকান

উন্নয়নের রথে সওয়ার হওয়া পাহাড়ি রাজ্যগুলির রাজস্ব বাড়ানোর একটা বড় অভিমুখ হয়ে দাঁড়ায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। পাহাড়ের উচ্চতর অবস্থান থেকে নেমে আসা নদীস্রোতে বর্ষা ছাড়া কদাচিৎ এমন স্রোত থাকে যাতে টারবাইন চালানো যায়। তাহলে উপায় কী? উপায় পাহাড় ফুঁড়ে নদীস্রোতকে টানেলের মাধ্যমে ৫০,১০০,১৫০ কিলোমিটার অবখাতে বেগে নামিয়ে আনা এবং সেই বেগকে টারবাইনের সাহায্যে শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা। এখনই হিমাচলে ১৬৮টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সক্রিয় এবং ১০,৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে দেশে এবং বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটানে। পরিকল্পনা আছে ২০৩০ সালের মধ্যে এইরকম হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রোজেক্টের সংখ্যা ১০৮৮-তে নিয়ে যাওয়ার এবং ২২,৬৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের। এই যে টেকনোলজি, পাহাড় ফুঁড়ে সুড়ঙ্গপথে নদী বইয়ে দেওয়ার, ‘রান দ্য রিভার’ যার নাম তা যেমন পাহাড়কে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে তেমনই নদীকে বেঁধেছে বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে। নদীর এই অসহায়তা যে কোনও সচেতন মানুষের চোখে জল এনে দিতে পারে। বিপাশা, শতদ্রু এবং পার্বতী-র নদীখাত শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়েছে দেশি-বিদেশি পাওয়ার জেনারেটিং বিজনেসে যুক্ত এইসব বড় বড় কর্পোরেট হাউসের বিজলি-ব্যবসার দাবিতে। এবং পাহাড়ে টানেল তৈরির ফলে জমা হওয়া লক্ষ লক্ষ টন পাঁক, ইংরেজিতে ‘মাক’ বলে যাকে, তা আর যাবে কোথায়? গিয়েছে ওই নদীতেই। ভিডিওগুলোতে লক্ষ করবেন স্রোত যা তা ওই পাঁকের। বিপাশার বুকে ‘মাক’ জমে জমে নদীর গভীরতা এবং নাব্যতা দুই-ই হ্রাস পেয়েছে। পাহাড়ভাঙা বৃষ্টির জল গভীর খাতে বইতে পারেনি। এছাড়া ‘মাক’ জমে জমে বিপাশা নদীখাত একদিকে উঁচু হয়ে গেছে। এ-জন্য জলস্রোত বিপরীত পাড়ে অনবরত ধাক্কা মেরে পাড়ের জমি আলগা করে দিয়েছে। নদীখাত থেকে দু-পাশের ভূমি জল শোষণ করে স্রোতকে প্রশমিত করতে কিছু ভূমিকা নিয়ে থাকে, ‘সিপেজ’ বলে যাকে। নদীর পাড় কংক্রিটে মুড়ে ইমারত বানিয়ে সেই সম্ভাবনা অন্তর্হিত করে দেওয়া হয়েছে।

হিমাচল প্রদেশে ন্যাশানাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI)-এর জোরদার উপস্থিতি যে-কোনও পর্যটকের নজর কাড়বে। সিঙ্গল লেন সড়ক দুই লেনের হচ্ছে, টু-লেন সড়ক ফোর লেন হচ্ছে এবং পিপিপি মডেলে সেখানে কনট্রাকটরদের ষোলো আনা রমরমা আগেই ছিল, এখন আরও বেড়েছে। সময় বাঁধা কাজ, সময়ে হস্তান্তরণের চাপ, ফলে জিওলজিক্যালি নবীন এই পর্বতাঞ্চলের ভূমির দাবিকে তোয়াক্কা করা হয়নি। একটা সাধারণ ব্যাপার, যা আমরা যে কেউ লক্ষ করে থাকব, তা হল পাহাড়ে রাস্তা তৈরি হয় ছোট ছোট ধাপে কৌণিকভাবে পাহাড় কাটতে কাটতে, উল্লম্বভাবে বা খাড়াভাবে কেটে নয়। প্রথমটায় সময় বেশি লাগে, দ্বিতীয়টা শর্টকাট। রাস্তা খারাপ হওয়ার এবং ভূমিধসের একটা বড় কারণ এই উল্লম্ব পাহাড় ছেদন। ফল হয়েছে এই যে, এই বর্ষায় চণ্ডীগড়-মানালি হাইওয়ে সহ ৯৫০টি রাস্তা ধসে বিধ্বস্ত হয়েছে, আটকে পড়া মানুষ নিরাপদ জায়গায় চাইলেও গিয়ে উঠতে পারেনি। পর্যটকদের কষ্ট লাঘব করতে সিমলা ও মানালিতে পাহাড় কেটে রাস্তা ফোর লেন হয়েছে বা হচ্ছে যে কায়দায়, তা কৌণিক চড়াই-উৎরাই নয়, বরং এই ভার্টিক্যাল— অর্থাৎ উল্লম্ব কাট। এইসব রাস্তা বিপর্যস্ত হয়ে গেছে এবং আবার তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হয়তো ভূতত্ত্বের প্রাথমিক সূত্রগুলিকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হবে না।

পঞ্জাব

তবে শুধু ট্যুরিজম নয়, পাহাড় কেটে যথেচ্ছভাবে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে সিমেন্ট কারখানার ট্রাক চলাচলে সুবিধের জন্য। সোলান, বিলাসপুর, ছাম্বা জেলায় অতিকায় সব সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। তাদের জায়গা করে দিতে পাহাড় গেছে, জঙ্গল গেছে। মাটি নগ্ন হয়েছে, ফলে তার জলধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। সাধারণ বৃষ্টিতেই সে মাটি ধসপ্রবণ হওয়ার কথা, অতিবৃষ্টিতে কী হতে পারে তার নমুনা ধরা রইল এই ২০২৩-এর অভিজ্ঞতায়। মাটি বদলে যাওয়ার আর একটা কারণ যে ফসলের চরিত্র বদলে বদলে যাওয়া, তা আগেই বলেছি। পাহাড়ে প্রথাগত শস্য উৎপাদনের জন্য ধাপ চাষই উত্তর-পূর্বের রীতি। ধাপ বা টেরাস ফার্মিং জলের বহতা স্রোতকে অতিবৃষ্টির সময় প্রশমিত করে। এখন রাস্তাঘাট ভাল হওয়ার ফলে চাষিরা ঝুঁকেছেন আপেলের মত ক্যাশ ক্রপের দিকে। ধাপ সমতলে পর্যবসিত হচ্ছে, জমির মালিকানাও হাতবদল হচ্ছে দ্রুত, ছোট চাষি ধাপ বেচে দিচ্ছেন বড়ো আপেলবাগানের মালিককে। মাশুল দিচ্ছে মাটি।

আর মকানের কথা নতুন করে কী আর বলা যায়! যাঁরাই কুলু বা মানালিতে গিয়েছেন তাঁরাই জানেন বিপাশা সেখানে হোটেল আর রিসর্ট মালিকরা কিঞ্চিৎ করুণা করেছেন বলে বহমান। স্বাভাবিক দিনে নদীবক্ষে এক্কা দোক্কা পর্যটকরা দিব্য সেলফি তুলছেন। সবুজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, দখল হয়ে গেছে নদী। তার অববাহিকা বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। সেই বিপাশা নদী ‘মাক ডাম্পিং’-এর অত্যাচার সহ্য না করে গতিপথ পরিবর্তন করে পাড়ভাসি হয়েছে এবং যা কিছু তার প্রবাহপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাকেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কিছুই ছাড় পায়নি। চেতাবনি আগেই ছিল। শ্রীধর রামামূর্তি ‘এনভিরনিকস ট্রাস্ট’ নামক একটি পরিবেশ পরামর্শদাতা সংস্থার জিওলজিস্ট। তিনি বলেছেন, বহুবার ব্যক্ত করা আশঙ্কার তিলমাত্র তোয়াক্কা না করে বিপাশা, শতদ্রু ও পার্বতী নদীতে সড়ক-বিজলির নিমিত্ত ‘মাক ডাম্পিং’ এই বন্যার মুখ্য কারণ। মানালি-কিরাতপুর সড়ক নির্মাণের কাজে জমা হওয়া ‘মাক’-এর কারণে NHAI হিমাচলের হাইকোর্টেও ধমক খেয়েছে, কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই বসল। বিলাসপুরের পরিবেশ আন্দোলনকারী নরিন্দর সাইনির কথা শোনা যেতে পারে। বলছেন, ‘আগেও তো বন্যা দেখেছি, সড়ক প্লাবিত হতে দেখেছি, কিন্তু এভাবে জলের তোড়ে ব্রিজ ভেসে যাওয়া আগে হিমাচলে দেখা যায়নি। শুধু মানালি ও মাণ্ডিতেই বারোখানা ব্রিজ ভেঙেছে। তাঁর কথায়, পরিবেশ ধ্বংসের নিরিখে হিমাচলে জঙ্গল-রাজ চলছে।’

উত্তরাখণ্ড

বাকি উত্তর ভারতের পরিস্থিতিও কমবেশি একইরকম। দিল্লির কথাই যদি ধরি, সেখানে তো বন্যা হবেই না ধরে নিয়ে ড্রেনগুলোর ‘ডিসিল্টিং’-এর কাজই হয় না। বছরের পর বছর ধরে যমুনা অববাহিকায় গড়ে উঠেছে অজস্র আবাসন, মল, বাণিজ্যিক ভবন। বস্তুত, সরকারি আনুকূল্যেই চলছে দিল্লির কংক্রিটিকরণ। নির্মাণের জোয়ার এসেছে সরকারি স্তরে, নতুন পার্লামেন্ট ভবন দিয়ে যার শুরু। এত অবশেষ, এত মাটি খুঁড়ে তুলে আনা ‘মাক’ সব জমা হয়েছে যমুনা অববাহিকায়। রিভারবেড মাইনিং-এর কাজ চলছে হরিয়ানায়। এর ফলে পলি জমা হচ্ছে নদীবক্ষে। বর্ষার স্রোত যখন বাধা পাচ্ছে তখনই নদী খাত ছেড়ে ঢুকে পড়ছে সেই অঞ্চলে যেখানে আগে বন্যাবিধৌত অববাহিকা ছিল, যা লোকালয় এবং নদীর মধ্যে বাফারের কাজ করত। বন্যাপ্লাবিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, কাশ্মির, রাজস্থান এবং উত্তরাখণ্ড। প্রশাসনের ল্যাজেগোবরে অবস্থাটা এখন বলা যায় ‘এক্সপোজড্‌’। মানুষের লোভ আর ভোগবাসনার বলি হচ্ছে পরিবেশ। সেই কাজে মদত দিচ্ছে প্রশাসন। মানুষের তৈরি এই বন্যা তার সামান্য প্রতিক্রিয়া মাত্র। এর মধ্যেই এসে গেল ফরেস্ট কনজারভেশন বিল ২০২৩। মাইনিং-এর শকুনদের বহুদিনের নজর হিমালয়সহ দেশের সব পার্বত্য অঞ্চল। সেখানে জঙ্গল সাফ করে খনিজ আহরণ এতদিন সহজ ছিল না গ্রামসভার অনুমতি বা বিকল্প বনসৃজনের বাধ্যবাধকতা থাকায়। সে বাধা দূর করার প্রয়াস চলছে। হিমালয়ে জঙ্গল সাফ করে, ধরা যাক, রাজস্থানে বাবলা গাছ লাগিয়ে দিলেই হল, শর্ত পূরণ হয়ে যাবে। গ্রামসভার উল্লেখটাও নেই বিলে। সুতরাং গোটা পাহাড়কেই ‘মাক’-এ পরিণত করার সব আয়োজনই সম্পূর্ণ। দেবতাত্মা তার কতটা কী সইবেন, সময় তা বলবে!