Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বিমুদ্রাকরণের ভরসাপূর্তি

বিমুদ্রাকরণের বর্ষপূর্তি

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 

বিমুদ্রাকরণের এক বছর পার হল। কথা ছিল, সীমান্তে ও দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হবে। কথা ছিল, সমস্ত কালো টাকা উদ্ধার হবে। এও কথা ছিল, দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ হবে। বলাই বাহুল্য, যারা কথা দিয়েছিলেন তাঁরা কথা রাখেননি। বলা কথার আড়ালে তাঁদের অন্য কথা লুকোনো ছিল। অন্য উদ্দেশ্য ছিল। হয়তো সে সব আড়ালের কথা তাঁরা খানিক খানিক রেখেছেন।

একশোর ওপর মানুষের মৃত্যু, অসংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরিহীনতা ও কর্মচ্যুতি এবং ছোট উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে বিমুদ্রাকরণের রথ এখন দানবের আকার নিয়েছে। আরও কষে চেপে বসছে আমজনতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাপনের ওপর। শুরু হয়েছে ‘ডিজিটাল সন্ত্রাস’-এর এক নতুন পর্ব।

বিমুদ্রাকরণের অনতিপরেই শীর্ষ আদালতের প্রশ্নের উত্তরে সরকার জানিয়েছিল, বিমুদ্রাকরণের ফলে ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি কালো টাকা অর্থনীতিতে ফেরত আসবে। কয়েক সপ্তাহ আগে রিজার্ভ ব্যাংক হিসেব দিয়ে জানাল, তেমন মাত্র পাওয়া গেছে ১৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। তাহলে কালো টাকাগুলো গেল কোথায়? হতে পারে, এক, কালো টাকা বলে তেমন বড় পরিমাণে টাকার আদপেই কোনও অস্তিত্ব নেই, অথবা দুই, সেগুলো যথারীতি অর্থনীতির মূল স্রোতে ‘সাদা’ হয়েই জায়গা ফিরে পেয়েছে। তাহলে মোদ্দা ব্যাপারটা কী ছিল? কেনই বা এত নাটকীয় সোরগোল ও ঢক্কানিনাদ!

আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, মূলত দু’টি বা তিনটি উদ্দেশ্যমূলক কারণে মোদি সরকার এই পথে এগিয়েছিল। সকলে জানি, নাটকীয় অভিব্যক্তি ও ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ -– এই দু’টি কলায় মোদি সাহেব ও তাঁর শাকরেদদের পারঙ্গমতা অন্যদের থেকে কয়েক গুণ বেশি। আর যেহেতু কালো টাকা নিয়ে আমজনতার মধ্যে ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা খুব গভীর ও দীর্ঘদিনের, তাই তার নাটকীয় মূল্যও অনেক অধিক। এই পরিস্থিতিটাকেই সুকৌশলে কাজ লাগালেন মোদি টিম। সামনে ছিল উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন (যা রাজনৈতিক ক্ষমতার বিচার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা) ও দায় ছিল অর্থনীতির চাকাকে কর্পোরেটদের পক্ষে পরিষ্কারভাবে ঘুরিয়ে তাদের দৃঢ় আস্থা অর্জন। এই দু’টি কাজই মোদি টিম এক ঢিলে দুই পাখি মেরে সমাধা করার চেষ্টা করেছেন।

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির কাছে জরুরি ছিল বিরোধী পক্ষকে হঠাৎ করে বিপন্নতায় ফেলে দেওয়া। আর এটা সবাই জানেন, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন অনেকটাই নগদ অর্থের জোরে হয়। তাই, হঠাৎ করে যদি বিরোধীদের হাত থেকে নগদ অর্থের যোগান ও ব্যয়বহর কেড়ে নেওয়া যায় তবে তারা অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়তে পারে। রাতারাতি তাই ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে, আগে থেকে নিজেদের কাছে গচ্ছিত উক্ত নোটগুলির উপযুক্ত ব্যবহার সমাধা করে, বিরোধী পক্ষকে বেকায়দায় ফেলে দিতে মোদি টিম সক্ষম হয়। বিরোধীরা আচম্বিতে নগদ শূন্য হয়ে পড়ে।

এর পাশাপাশি, তাঁরা দ্বিতীয় কাজটি করতেও কিছুটা সক্ষম হন। তা ছিল, কর্পোরেটদের ভারতীয় অর্থনীতিতে আরও নিয়ন্ত্রণমূলক জায়গায় নিয়ে আসা ও গোটা অর্থনীতিকে তাদের কব্জায় এনে ফেলা। যদি নগদ লেনদেনে রাশ টানা যায়, ডিজিটাল বিনিময়কে অর্থনীতির নিয়মসিদ্ধ ও প্রাত্যহিক আচার ব্যবহারে বেঁধে ফেলা যায় তবে ভারতীয় অর্থনীতির যে বিপুল অসংগঠিত ক্ষেত্র তার নাগাল কর্পোরেটদের হাতে চলে আসতে পারে। সেই কাজটি মোদি টিম নিপুণভাবে জোরজবরদস্তিভাবে করার চেষ্টা রেখেছেন। এতে যে কর্পোরেটদের পক্ষে কাজের কাজ কিছু হয়নি তা নয়। বিমুদ্রাকরণের প্রথম দু’মাসে ডিজিটাল বিনিময় ও লেনদেন বহু গুণে বৃদ্ধি পায়, অসংগঠিত ক্ষেত্র প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে ও তাদের ফেলে আসা পরিসরে কর্পোরেটরা গেঁড়ে বসার কাজটি শুরু করে দেয়। দেখা যায়, বিমুদ্রাকরণের পরে পরেই ডিজিটাল লেনদেন প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও আরও কয়েক মাস পরে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে, এই বৃদ্ধির হার কমে আসে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতিতে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ক্রেতাদের তথ্য আহরণ প্রক্রিয়া। সমস্ত ক্রেতারাই যখন ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় লেনদেন করছেন তখন তাঁর যাবতীয় তথ্য ব্যাংক ও বিক্রেতাদের কাছে জমা হয়ে যাচ্ছে যার ভিত্তিতে বড় বড় কর্পোরেটরা ক্রেতা প্রোফাইল নির্মাণ করে তাদের বাণিজ্য কৌশল নির্ধারণ করছে। এই তথ্যের ডাটাবেস ও তার বাজারও আজকের দিনে একটি সুবৃহৎ বাণিজ্য। উল্লেখ্য, এক্সিস ব্যাংকের ৩০০ জনের একটি ডাটা টিম আছে যারা শুধুমাত্র এই তথ্যগুলি নিয়েই কাজ করেন। অর্থাৎ, ডিজিটাল লেনদেনের বাধ্যতায় ফেলে দিয়ে আপনাকে কর্পোরেটরা তাদের জালে বন্দী করে ফেলছে। এই কর্পোরেটায়নই ছিল বিমুদ্রাকরণের নামে মোদি টিমের আসল লক্ষ্য, যা রূপায়িত করার জন্য এখন সর্বত্র ‘ডিজিটাল সন্ত্রাস’ জারি করে তাঁরা এগোবার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন।

কালো টাকা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস -– এই সমস্তই বৃহৎ কর্পোরেট বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের যৌথ আঁতাত প্রসূত একটি অনিবার প্রক্রিয়া। তার আরও একবার প্রমাণ মিলল সাম্প্রতিক ‘প্যারাডাইস পেপার্স’-এর তথ্য ফাঁসে। দেখা যাচ্ছে, এতে জড়িয়েছেন কেন্দ্রীয় বিমান পরিবহন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা ও বিজেপির আরেক এমপি। বারমুদা ও সিঙ্গাপুরের দুটি কোম্পানি (যথাক্রমে অ্যাপেলবাই ও এশিয়াসিটি) সারা বিশ্ব জুড়ে ১৯টি ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’-এ কর্পোরেটদের অর্থ পাচার করেছে। এবং তা ডিজিটাল পদ্ধতিতেই। জয়ন্ত সিনহার নাম জড়িয়েছে একটি মার্কিন বিনিয়োগ সংস্থা ‘ডি লাইট ডিজাইন’-এর সঙ্গে যারা এইসব অর্থ পাচারে সিদ্ধহস্ত।

বোঝা যাচ্ছে, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র নামে সন্ত্রাস তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে বাধ্যত ঢুকিয়ে দিয়ে কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষা করাই ছিল বিমুদ্রাকরণের আসল অভিসন্ধি। তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ডিজিটাল পদ্ধতি লাগু করলেই কালো টাকা বা দুর্নীতি বন্ধ হয় না। বরং, সারা বিশ্বে ডিজিটাল লেনদেন মারফতই সব থেকে বড় জালিয়াতি ও লুঠতরাজগুলো চলে।